কনটেন্টটি শেষ হাল-নাগাদ করা হয়েছে: সোমবার, ১৬ মার্চ, ২০২৬ এ ১০:৫৭ AM
কন্টেন্ট: কৃষি কথা মাস: চৈত্র সাল: ১৪৩২ প্রকাশের তারিখ: ১৬-০৩-২০২৬
পটলের ক্ষতিকর পোকামাকড় দমন ব্যবস্থাপনা
ড. মোঃ জুলফিকার হায়দার প্রধান
পটল গ্রীষ্মকালে চাষযোগ্য একটি জনপ্রিয় এবং পুষ্টির দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ সবজি ফসল, যা উচ্চ বাজার চাহিদা এবং বছরব্যাপী প্রাপ্যতার কারণে ব্যাপকভাবে চাষ করা হয়। এতে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন, আঁশ, ক্যালসিয়াম এবং এন্টি অক্সিডেন্ট রয়েছে। পটল একটি দীর্ঘমেয়াদি ফসল, মাঠে বিভিন্ন প্রকার ক্ষতিকর পোকা দ্বারা ফসলটি আক্রান্ত হয় এবং এদের আক্রমণে ফসলের উল্লেখযোগ্য অংশ নষ্ট হয়ে যায়। প্রধান কীটপতঙ্গগুলোর মধ্যে রয়েছে ফলের মাছি, কাটুই পোকা, সাদা মাছি, সর্পিল সাদা মাছি, পামকিন ক্যাটারপিলার, লুপার পোকা ও স্কেল পোকা, যা বিভিন্ন বৃদ্ধির পর্যায়ে ক্ষতি করে। এমতাবস্থায় বিভিন্ন ক্ষতিকর পোকা হতে ফসল রক্ষার জন্য এদের আক্রমণের ধরন এবং ব্যবস্থাপনা সর্ম্পকে জ্ঞান লাভ করা অত্যন্ত জরুরি। নি¤েœ পটল ফসলের প্রধান প্রধান ক্ষতিকর পোকার আক্রমণ এবং ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে আলোচনা করা হলো।
ফলের মাছি পোকা: স্ত্রী মাছি পোকা কচি এবং নরম ফলে ডিম পাড়ে। সদ্যজাত লার্ভা ফলের ভেতরের অংশ খায়। ফলের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হয়, ফল লালচে রঙের হয়ে যায়, আক্রান্ত ফল ঝরে পড়ে অথবা বিকৃত হয়ে যায়। ফলের ভেতর পোকার লার্ভা ও মল দেখা যায় এবং ফল খাওয়ার অনুপযোগী হয়ে যায়। পূর্ণ বয়স্ক স্ত্রী পোকা ডিম পাড়ার অঙ্গ দ্বারা নরম কচি ফল ছিদ্র করে একটি একটি করে অথবা গুচ্ছাকারে প্রতি গুচ্ছে ৪-১০টি সাদাটে ডিম পাড়ে। একটি স্ত্রী পোকা তার জীবন চক্রে প্রায় ২০০টি ডিম পাড়তে পারে। গ্রীষ্মকালে প্রায় ২ দিন এবং শীতকালে ৩-৫ দিন পর ডিম ফুটে লার্ভা বের হয়। লার্ভার ৩টি ধাপ, লার্ভা হালকা হলুদ বর্ণের, পূর্ণ প্রাপ্ত লার্ভা প্রায় ১০ মিমি লম্বা। সদ্যজাত লার্ভা গ্রীষ্মকালে প্রায় ৩ দিন ও শীতকালে ২ সপ্তাহ ফলের ভেতরের অংশ খাওয়ার পর পূর্ণতা প্রাপ্ত হয় এবং ফল থেকে মাটিতে চলে আসে। এরা মাটির ১০-১৫ সেমি. ভেতরে পিউপায় পরিণত হয়। পিউপা ৫-৮ মিমি লম্বা, বাদামি বা হলদে বাদামি রংয়ের। পিউপা ধাপ গ্রীষ্মকালে ৫-৮ দিন এবং শীতকালে ২-৩ সপ্তাহ স্থায়ী হয়। গ্রীষ্মকালে এদের জীবন চক্র ১০-১৮ দিন এবং শীতকালে ৫-৬ সপ্তাহ স্থায়ী হয়।
ব্যবস্থাপনা
গাছে ও মাটিতে পতিত আক্রান্ত লালচে ফল সংগ্রহ করে লার্ভাসহ নষ্ট করে ফেলতে হবে; আক্রান্ত এলাকায় লাইকোম্যাক্স বিঘাপ্রতি ১ কেজি গাছের গোড়ার মাটিতে প্রয়োগ করতে হবে। লাইকোম্যাক্স মাটিতে অবস্থানরত মাছি পোকার পিউপা ধ্বংস করে; সেক্স ফেরোমন ফাঁদের ব্যবহারের মাধ্যমে এ পোকা সাফল্যজনকভাবে দমন করা যায়। গাছে ফুল ধরার পর জমিতে ক্রমানুসারে ১০ মি দূরে দূরে সেক্স ফেরোমন ফাঁদ স্থাপন করতে হবে; আকর্ষণ ও মেরে ফেলা পদ্ধতি : এ নতুন পদ্ধতিতে পুরুষ ও স্ত্রী পোকা আকৃষ্ট করে দমন করা যায়। পুরুষ পোকা আকৃষ্ট করার জন্য ফেরোমন ও জৈব বালাইনাশক মিশ্রিত জেল বা পেস্ট ব্যবহার করা হয়। ১০-১২ মিটার দূরে দূরে এই পেস্ট মাটি থেকে ৩-৪ ফুট ওপরে গাছের কা-ে বা খুঁটিতে প্রয়োগ করতে হবে। স্ত্রী পোকা আকৃষ্ট করার জন্য জৈব বালাইনাশক মিশ্রিত ফেরোমন ফাঁদ ফসলে ১০-১২ মিটার দূরে দূরে স্থাপন করতে হবে। এতে স্ত্রী পোকা আকৃষ্ট হয়ে মারা যাবে।
কাটুই পোকা : পোকার লার্ভা মাটি সংলগ্ন চারা গাছের গোড়া কেটে দেয় এবং পাতা ও বিটপ খেয়ে ফেলে। এরা খাওয়ার চেয়ে চারা কেটে বেশি ক্ষতি করে এবং একটি লার্ভা একাধিক গাছের গোড়া কেটে দিতে পারে। লার্ভাগুলো দিনের বেলায় মাটির ফাটলে, ঢেলা ও আবর্জনায় লুকিয়ে থাকে এবং রাতের বেলায় ক্ষতিসাধন করে। এরা নিশাচর। লার্ভাগুলোকে স্পর্শ করলে এরা ‘ঈ’ আকৃতি ধারণ করে। পূর্ণ লার্ভা মাটিতে পিউপা ধাপ সম্পন্ন করে।
ব্যবস্থাপনা
জমি চাষের সময় লার্ভা এবং পিউপা সংগ্রহ করে মেরে ফেলতে হবে; কাটা চারার নিকটে লার্ভাগুলো লুকিয়ে থাকে। এজন্য সকাল বেলা হাত দ্বারা আশেপাশের মাটি খুঁড়ে লার্ভা সংগ্রহ করে মেরে ফেলতে হবে; জমিতে সেক্স ফেরোমন ফাঁদ ব্যবহার করতে হবে; বিষটোপ প্রয়োগ: হেক্টর প্রতি ২ কেজি কার্বারিল (সেভিন) অথবা কারটাপ (সানটাপ), ১ কেজি গম বা ধানের কুঁড়া এবং ১০০ গ্রাম ঝোলা গুড়ের সাথে পরিমাণমত পানি মিশিয়ে এমন একটি বিষটোপ তৈরি করতে হবে যা হাত দিয়ে ছিটানো যায়। এ বিষটোপ সন্ধ্যাবেলা আক্রান্ত ক্ষেতে চারাগাছের গোড়ায় ছিটিয়ে প্রয়োগ করলে কাটুই পোকার লার্ভা দমন সহজ হয়; আক্রমণের মাত্রা বেশি হলে নিম্নলিখিত কীটনাশক প্রয়োগ করতে হবে-
ক্লোরপাইরিফস (ডারসবান ২০ ইসি বা পাইরিফস ২০ ইসি বা ক্লাসিক ২০ ইসি) প্রতি লিটার পানিতে ৫ মিলিলিটার অথবা ফসল লাগানোর সময় ফারটেরা বা এনফিউজ (ক্লোরানট্রানিলিপ্রল) প্রতি হেক্টরে ১০ কেজি।
সাদা মাছি: সাদা মাছি কুমড়াজাতীয় সবজি, বেগুন, টমেটো, সজিনাসহ বিভিন্ন সবজিতে আক্রমণ করে। বয়স্ক পোকা ও নিম্ফ ফ্লোয়েম ছিদ্র করে গাছ থেকে ক্রমাগত রস শোষণ করে। পাতা বাদামি বর্ণের হয় ফলে গাছের খাদ্য তৈরি প্রক্রিয়া ব্যহত হয়। পাতা অসম প্রকৃতির এবং ক্রমান্বয়ে শুকিয়ে যায়। অত্যধিক আক্রমণে গাছের বৃদ্ধি ও ফলন কমে যায়। চারা গাছে আক্রমণ হলে চারার বৃদ্ধি কমে যায়, চারা দুর্বল হয়ে যায়।
ব্যবস্থাপনা
ফসলের অবশিষ্টাংশ নষ্ট ও আগাছা পরিষ্কার করতে হবে; জমিতে ১০-১২ মিটার পরপর আঠালো হলুদ ফাঁদ ব্যবহার করতে হবে; জৈব বালাইনাশক ফিজিমাইট বা বায়োক্লিন (১ মিলি/লিটার) বা বায়োম্যাক্স (১ মিলি/লিটার) বা ট্রেসার (০.৪ মিলি/লিটার) বা সাকসেস (১.২ মিলি/লিটার) স্প্রে করতে হবে; অতিরিক্ত আক্রমণ দেখা গেলে ইমিডাক্লোপ্রিড (এডমায়ার, ইমিটাফ) প্রতি লিটার পানিতে ০.৫ মিলি বা পেগাসাস (ডায়াফেরথুরান) প্রতি লিটার পানিতে ১ মিলি স্প্রে করা যেতে পারে।
সর্পিল সাদা মাছি : বয়স্ক পোকা ও নিম্ফ ফ্লোয়েম ছিদ্র করে গাছ থেকে ক্রমাগত রস শোষণ করে। পাতা বাদামি বর্ণের হয় ফলে পাতার খাদ্য তৈরি প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়। পাতা অসম প্রকৃতির এবং ক্রমান্বয়ে শুকিয়ে যায়। অত্যধিক আক্রমণে গাছের বৃদ্ধি ও ফলন কমে যায়। চারা গাছে আক্রমণ হলে চারা দুর্বল হয়ে যায়।
ব্যবস্থাপনা
ফসলের অবশিষ্টাংশ নষ্ট করে ফেলতে হবে এবং আগাছা পরিষ্কার করতে হবে; অধিক আক্রান্ত পাতা কেটে ডিম ও পোকাসহ ধ্বংস করতে হবে; আক্রমণের মাত্রা বেশি হলে এসিটামিপ্রিড (তুন্দ্রা ২০ এসপি বা প্লাটিনাম ২০ এসপি) প্রতি লিটার পানিতে ১ গ্রাম এবং জৈব বালাইনাশক ফিজিমাইট বা বায়োক্লিন (১ মিলি/লিটার) ১৫ দিন পর পর পর্যায়ক্রমে প্রয়োগ করতে হবে।
পামকিন ক্যাটারপিলার : সদ্যজাত লার্ভা কচি পাতা ডগার শীর্ষস্থ অংশসহ জড়িয়ে ফেলে এবং পাতা ও ডগার নরম অংশ খায়। এরা ফুল ও কচি ফলের ত্বক ছিদ্র করে খায়। অতিরিক্ত আক্রমণে ডগার বাড়ন্ত অংশ নষ্ট হয় এবং ফলন কমে যায়। স্ত্রী পোকা রাতের বেলায় শীর্ষস্থ পাতা, ফলের বোটা ও শাখায় একটি একটি করে বা গুচ্ছে, প্রতি গুচ্ছে ২-৩ টি ডিম পাড়ে। ৩-৪ দিন পর ডিম ফুটে। লার্ভার ৫টি ধাপ, প্রায় ৯-১০ দিন স্থায়ী। লার্ভার ১ম দুটি ধাপে এরা পাতার উপরের ত্বক খায় এবং পরবর্তী ধাপগুলোতে সমস্ত পাতা খেয়ে ফেলে। পূর্ণতা প্রাপ্ত লার্ভা মোড়ানো পাতার ভেতরে, শুকনো শাখায়, পতিত পাতায় বা মাটিতে সাদা কোকুন তৈরি করে পিউপায় পরিণত হয়। প্রায় ৫ দিন পর পিউপা বয়স্ক পোকায় পরিণত হয়। এদের জীবন চক্র সম্পন্ন করতে প্রায় ১৭-১৮ দিন সময় লাগে।
ব্যবস্থাপনা
জমি আগাছামুক্ত রাখতে হবে। পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন চাষাবাদ, মাটিতে পতিত পাতা ও ফসলের অবশিষ্টাংশ ধ্বংস করতে হবে; লতার অগ্রভাগ থেকে পোকার লার্ভা সংগ্রহ করে নষ্ট করে ফেলতে হবে; অত্যধিক আক্রান্ত এলাকায় আক্রমণ দেখার সঙ্গে সঙ্গে স্পাইনোসেড (ট্রেসার ৪৫ এসসি প্রতি লিটার পানিতে ০.৪০ মিলি অথবা সাকসেস ১.২ মিলি) ¯েপ্র করতে হবে।
লুপার পোকা : লুপার পোকা বেগুন, টমেটোসহ বিভিন্ন সবজি ফসলে আক্রমণ করে থাকে। পোকার লার্ভা গাছের পাতা খায়, পাতা ছিদ্রযুক্ত করে ফেলে। এরা লুপিং করে এক পাতা থেকে অন্য পাতা এবং এক গাছ থেকে অন্য গাছে ছড়িয়ে পড়ে। পূর্ণ লার্ভা পাতায় সিল্কের প্রকোষ্ঠ তৈরি করে পিউপা ধাপ সম্পন্ন করে। লার্ভাগুলো প্রায়ই উপকারী পোকা দ্বারা আক্রান্ত হয়।
ব্যবস্থাপনা
জমি আগাছা মুক্ত ও পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে; পাতার নিচে অবস্থানরত পোকার লার্ভা ও পিউপা সংগ্রহ করে মেরে ফেলতে হবে; লার্ভাগুলো উপকারী পোকা দ্বারা আক্রান্ত হয় বিধায় জমিতে উপকারী পোকার বংশবৃদ্ধির প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
স্কেল পোকা : স্কেল পোকা পটলের পাতা ও ডগা ছিদ্র করে রস চুষে খায়। আক্রান্ত পাতা হলুদ হয়ে যায়, গাছের উজ্জ্বলতা কমে যায়, গাছ দুর্বল হয়। অতিরিক্ত আক্রমণে পাতা ও ডগা সম্পূর্ণরূপে শুকিয়ে যায় এবং ফলন কমে যায়। স্কেল পোকা প্রধানত অযৌন পদ্ধতিতে বংশবিস্তার করে তবে বিশেষ পরিস্থিতিতে যৌন পদ্ধতিতেও বংশবিস্তার করতে পারে। স্ত্রী পোকা অন্ড-জরায়ুজ পদ্ধতিতে তার শরীরের ভেতর ডিম পাড়ে এবং তারপর সেই জীবিত বাচ্চা জন্ম নেয়। একটি স্ত্রী পোকা সাধারণত ৩০-৬৫ দিন সময়ে প্রায় ৮০-২৫০টি ডিম পাড়ে। প্রথমপর্যায়ের নিম্ফ স্ত্রী পোকার স্কেল হতে বের হয়। প্রথম পর্যায়ের নিম্ফকে ঈৎধষিবৎ বলে, এ পর্যায়ে এরা চলাচলে সক্ষম, এরা পাতা বা ডগায় বসতি স্থাপন করে ও রস চুষে খায়। নিম্ফ এর তিনটি ধাপ, ২য় ও ৩য় পর্যায়ের নিম্ফ চলাচল করে না। স্কেল পোকা মধু রস নিঃসৃত করে যেখানে শুঁটিমোল্ড তৈরি হয়।
ব্যবস্থাপনা
আক্রান্ত পাতা ও ডগা সংগ্রহ করে নষ্ট করে ফেলতে হবে; জৈব বালাইনাশক জৈব বালাইনাশক বায়োম্যাক্স এম ১.২ ইসি (১ মিলি/লিটার) অথবা বায়োক্লিন (১ মিলি/লিটার পানি) বা বায়োট্রিন (১.৫ মিলি/ লিটার পানি) বা ট্রেসার (০.৪ মিলি/লিটার পানি) বা সাকসেস (১.২ মিলি/ লিটার পানি) হারে মিশিয়ে স্প্রে করতে হবে।
আক্রমণের মাত্রা বেশি হলে এসিটামিপ্রিড জাতীয় কীটনাশক (তুন্দ্রা ২০ এসপি বা প্লাটিনাম ২০ এসপি) প্রতি লিটার পানিতে ১ গ্রাম প্রয়োগ করতে হবে। তবে কীটনাশক স্প্রে করার পর অপেক্ষমাণ সময় শেষ হওয়ার পূর্বে সবজি খাওয়া যাবে না।
লেখক : মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা (কীটতত্ত্ব), মসলা গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট শিবগঞ্জ, বগুড়া, মোবাইল : ০১৭১৬০৭১৭৬৪,