নীরব ঘাতক রোগ দমনে করণীয়
ফারজানা রহমান ভূঞা
অসংক্রামক রোগ সাধারণত একজনের থেকে অন্যজনের দেহে সংক্রমিত হয় না। অসংক্রামক রোগগুলো দীর্ঘস্থায়ী হয়। সঠিক ও পর্যাপ্ত চিকিৎসা না পেলে অসংক্রামক রোগ জটিল আকার ধারণ করে, যা আক্রান্ত ব্যক্তিকে অকালমৃত্যু অথবা দীর্ঘমেয়াদি পঙ্গুত্বের দিকে ঠেলে দেয়। বৈশ্বিক ও বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট বিবেচনায় এই রোগগুলো হচ্ছে হার্ট অ্যাটাকসহ অন্যান্য হৃদরোগ-উচ্চ রক্তচাপজনিত স্ট্রোক (মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ), ডায়াবেটিস, ক্যান্সার, কিডনি রোগ, শ্বাসতন্ত্রের দীর্ঘমেয়াদি রোগ ও মানসিক রোগ। এই রোগগুলোকে মূলত নীরব ঘাতক বলা হয়।
া বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার (ডঐঙ) ২০২৫ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী-
ি বাংলাদেশে অসংক্রামক রোগে আক্রান্ত হয়ে
৭১% মানুষ মৃত্যুবরণ করেন;
ি এর মধ্যে হৃদরোগজনিত কারণে মৃত্যুবরণ
করেন ৩৪% মানুষ;
া প্রতি ০৫ জনের মধ্যে ০১ জনের উচ্চ রক্তচাপ রয়েছে এবং প্রাত্যহিত ৫২% মানুষ বিভিন্ন ধরনের তামাক গ্রহণ করে (NCD Report, icddr,b; 2021);International Diabetes Foundation (IDF)Diabetes Atlas Bangladesh, ২০২৪ সালের রিপোর্ট অনুযায়ী বাংলাদেশে ১১৩.৫৪ মিলিয়ন মানুষ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত এবং এই ডায়াবেটিসজনিত কারণেই ১৩.৮৭ মিলিয়ন মানুষ মৃত্যুবরণ করেন। উক্ত রির্পোট অনুযায়ী প্রায় ১৩.২% মানুষ ডায়াবেটিসজনিত বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত।
অসংক্রামক রোগের প্রধান কারণসমূহ
অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস; অপর্যাপ্ত কায়িক পরিশ্রম; তামাক গ্রহণ এবং; মানসিক চাপ, দুশ্চিন্তা ও বিষন্নতা। খাদ্যাভ্যাসজনিত বিষয়গুলোকে প্রভাবিত করার পেছনে অর্থনৈতিক উন্নয়ন, তথ্যপ্রযুক্তির প্রসার এবং নগরায়ণের বিরাট ভূমিকা রয়েছে।পুষ্টিকর খাবার না খাওয়া এবং বাইরের ফাস্ট ফুড খাবার খাওয়ার কারণে দেহে অতিরিক্ত চর্বি জমা হয়, যার ফলশ্রুতিতে : অতিরিক্ত ওজন বা স্থূলতা; উচ্চ রক্তচাপ; রক্তে গ্লুকোজের আধিক্য; রক্তে চর্বি বা কোলেস্টেরলের আধিক্য; যা পরবর্তীতে অসংক্রামক রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি অনেকাংশে বৃদ্ধি করে।
অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস
Non-communicable Diseases Risk Factors in Bangladesh ২০১৮, তথ্যানুসারে শহরে বসবাসরত ৯১.৫% মানুষ অপর্যাপ্ত শাকসবজি ও ফল গ্রহণ করেন, যেখানে গ্রামাঞ্চলে এর পরিমাণ ৮৮%; অসংক্রামক রোগ-ব্যাধি নিয়ন্ত্রণে বহুখাত-ভিত্তিক কর্ম-পরিকল্পনা, ২০১৮-২০২৫-এ উল্লেখ করা হয়, প্রতিদিন লবণ গ্রহণের পরিমাণ ৯ গ্রাম, যেখানে বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা ও জাতীয় খাদ্য গ্রহণ নির্দেশিকায় নির্ধারিত মাত্রা দৈনিক ১ চা চামচ বা ৫ গ্রাম। অতিরিক্ত এই লবণ গ্রহণ করার কারণেই উচ্চ রক্তচাপ বৃদ্ধি পায়; ঘরে তৈরি খাবারের চেয়ে বাজারের ফাস্ট ফুড বা প্রক্রিয়াজাত অথবা প্যাকেটজাত খাবারের প্রতি মানুষের আগ্রহ বেড়েছে; পরিশোধিত চিনি, মিষ্টি ও মিষ্টিজাতীয় খাবার এবং বেকারির তৈরি খাবার যেমন: বিস্কুট, কেক, জ্যাম, জেলি, চকলেট, কফি, আইসক্রিম, শীতল বা কোমল পানীয় ইত্যাদি অতিরিক্ত চিনিযুক্ত খাদ্য গ্রহণের পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে। সাদা ভাত, সাদা আটা বা ময়দা জাতীয় খাদ্য কম গ্রহণ করতে হবে; আঁশজাতীয় খাবার বেশি করে গ্রহণ করতে হবে। প্রতিদিন একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের কমপক্ষে ১০০ গ্রাম শাক এবং ২০০ গ্রাম মিশ্র সবজি খেতে হবে; প্রতিদিন একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের কমপক্ষে ১০০ গ্রাম ফল (মৌসুমি ফল) খেতে হবে।
অসংক্রামক রোগ থেকে মুক্তি পেতে হলে প্রথমেই আমাদের উচিত খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন করা। যেমন: লবণ ও চিনি বেশি না খাওয়া এবং তেল-চর্বিজাতীয় খাবার ও তামাকপণ্য পরিহার করা। দৈনিক পর্যাপ্ত পরিমাণ শাকসবজি ও ফল খেতে হবে। প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে সুষম ও বৈচিত্র্যপূর্ণ খাদ্য গ্রহণ করতে হবে, সেই সঙ্গে নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রমের মাধ্যমে আদর্শ ওজন বজায় রাখতে হবে।
তথ্যসূত্র :
World Health Organization - Noncommunicable Diseases (NCD) Country Profiles,২০২৫;
অসংক্রামক রোগব্যাধি নিয়ন্ত্রণে বহুখাতভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা, ২০১৮-২০২৫; স্বাস্থ্য সেবা বিভাগ, স্বাস্থ্য ও পরিবার মন্ত্রণালয়।
লেখক : ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, বারটান (প্রধান কার্যালয়), মোবাইল : ০১৮৩২২৭২১৪২, ই-মেইল :sso.diet@birtan.gov.bd