কনটেন্টটি শেষ হাল-নাগাদ করা হয়েছে: রবিবার, ৭ জানুয়ারী, ২০১৮ এ ০৬:৩৫ AM

নির্বিঘ্নে বোরো উৎপাদনে পার্চিং, আলোর ফাঁদ এবং অন্যান্য কৌশল...

কন্টেন্ট: কৃষি কথা মাস: পৌষ সাল: ১৪২৪ প্রকাশের তারিখ: ০২-০১-২০১৮

বাংলাদেশের অর্থনীতি ও সংস্কৃতি কৃষির সাথে ওতোপ্রোতভাবে জড়িত। কৃষির উন্নয়ন মানেই দেশের উন্নয়ন। আর সে উন্নয়ন অভিযাত্রায় বালাইয়ের আক্রমণ ও ক্ষতি মুক্ত কৃষিই আমাদের কাঙ্খিত। রোগ পোকামাকড় দমনে রাসায়নিক দমন পদ্ধতি ব্যবহারের চেয়ে জৈবিক দমন পদ্ধতি সবচেয়ে বেশি পরিবেশবান্ধব এবং গ্রহণযোগ্য। অনেক জৈবিক দমন পদ্ধতির মধ্যে পার্চিং ও আলোর ফাঁদ আমাদের দেশে বেশ জনপ্রিয়। বিষয় দুইটির গুরুত্ব অনুধাবন করে কৃষি মন্ত্রণালয় তার সহযোগী সংস্থাগুলোর মাধ্যমে সারা দেশে পরিবেশবান্ধব এ দুইটি পদ্ধতির সম্প্রসারণকল্পে একযোগে কাজ করে যাচ্ছে। ধান উৎপাদনে পার্চিং এবং আলোর ফাঁদ বেশ কার্যকর এবং লাভজনক। বিশেষ করে বোরো মৌসুমে এ দুইটি কৌশল সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করতে পারলে নির্বিঘ্নে বোরো উৎপাদনে সুবিধা পাওয়া যায়।


পার্চিং (Perching)
পার্চিং একটি ইংরেজি শব্দ, মানে ক্ষেতে ডালপালা পুঁতে দেয়া। ফসলের জমিতে ডাল, কঞ্চি, বাঁশের খুঁটি এগুলো পুঁতে পাখি বসার ব্যবস্থা করলে পাখি ক্ষতিকারক পোকার মথ, বাচ্চা, ডিম খেয়ে পোকা দমন করে। পোকা দমনের এ পদ্ধতিকে পার্চিং বলা হয়। ফসলের পোকা দমনের এ পদ্ধতি অত্যন্ত কম ব্যয়বহুল বলতে গেলে ব্যয়বিহীন এবং পরিবেশবান্ধব। পার্চিং দুই প্রকরের। ডেড পার্চিং ও লাইভ পার্চিং। মরা ডালপালা পুঁতে দিলে তা হবে ডেড পার্চিং এবং ধইঞ্চা, অড়হর এসব জীবন্ত জমিতে পুঁতে দিলে তা হবে লাইভ পার্চিং।


ডেড পার্চিং (Dead Perching)
খুঁটির গোড়ালিতে বা নিচের অংশে গিড়া রেখে ৬-৬.৫ ইঞ্চি লম্বা করে বাঁশের খ- কাটতে হবে। খণ্ডের নিচের দিকে গিড়া থাকলে কেউ সহজে খুঁটি তুলতে পারবে না। খুঁটির নিচের অংশে ২-২.৫ ইঞ্চি লম্বা বাঁশের ফালি তারকাটা দিয়ে আড়াআড়িভাবে আটকিয়ে দিতে হবে। খুঁটির নিচের অংশে সুচালো বা চোকা করা যাবে না। সুচালো করলে অন্য কেউ সহজে তুলে নিয়ে যাবে। প্রতিটি বাঁশ খ- থেকে ১২-১৮টি ফালি বা খুঁটি হবে। খুঁটি বেশি মোটা করলে চুরি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে, তাই যথাসম্ভব বাঁশের বাতার খুঁটি পাতলা করতে হবে। খুঁটি বা ফালির আগায় প্রায় ১০-১২ ইঞ্চি সেকশন করে চারটি ফালি তুলতে  হবে। ১০-১২ অংশের সেকশন সুতলির সাহায্যে নিচের দিকে এমনভাবে হেলে আনতে হবে যেন পাখি আরামে বসার উপযোগী হয়। একটি সুচালো ও শক্ত বাঁশের ফলা দিয়ে অথবা শাবলের সহায়তায় ৮-১০ ইঞ্চি গভীর করে গোড়ার আলসহ পার্চিং নরম মাটিতে পুঁতে দিতে হবে। মাটি একটু শক্ত হলে বা জমে গেলে সে পার্চিং অন্য কেহ সহজে তুলে নিতে পারবে না। এতে করে পার্চিং চুরি বন্ধ হবে।


পার্চিং টিকে চুনের দ্রবণে চুবালে অনেকটা ধবধবে সাদা দেখাবে এবং ক্ষেতের অনেক দূর থেকে দৃষ্টিগোচরে আসবে। চুনের পরিবর্তে সাদা পেইন্ট দিয়েও পার্চিংয়ের ওপরের অংশকে রঙ করা যাবে। আর মাটিতে পুতার অংশে আলকাতরা দিয়ে লেপে দিলে খুঁটির স্থায়িত্ব বেশি হয়। রঙ বা সাদা না করেও পাখি বসানোর ব্যবস্থা করা যায়। পার্চিং আইল থেকে বেশ দূরে দেয়াই ভালো এবং জমির যে অংশে চলাচলের অসুবিধা আছে সেখানে স্থাপন করা ভালো। পার্চিংয়ের খুঁটি সরাসরি মাটিতে না পুঁতে একটি শাবল বা সুচালো অন্য কোনো কিছু দিয়ে চাপা গর্ত করে সেখানে গভীরভাবে স্থাপন করে গোড়ার মাটি চেপে দিতে হবে। সুষ্ঠু ব্যবস্থার জন্য এক বিঘা জমিতে ৬-৮ টি পার্চিং দিতে হবে। আগের কৌশলের মতো খুঁটি তৈরি করে তার ওপরের অংশে ডালের আগা,  ছোট ঝোপ ঝাড়ের কর্তিত অংশ এবং শুকনা মরিচ গাছ, শুকনা বেগুন গাছ বা শাখা বা কঞ্চি বেঁধে দিতে হবে। ডাল বা কঞ্চি লম্বালম্বিভাবে না বেঁধে আড়াআড়িভাবে বেঁধে দিলে পাখি বসতে সুবিধা হবে। ডাল/কঞ্চি/ঝাড় অন্তত  ২-৩ টি স্থানে বাঁধন দিতে হবে। অনেক দূর থেকে তা দৃষ্টিগোচরে আসবে।


লাইভ পার্চিং (Live Perching) : লাইভ পার্চিং বা আফ্রিকান ধৈঞ্চা (Sesbania rostrata) দিয়ে পার্চিং এর ব্যবস্থা করা যায়। দেশি ধৈঞ্চা দিয়েও লাইভ পার্চিং করা যায় তবে দেশি ধৈঞ্চার পার্চিং বেশির ভাগ ক্ষেতে মারা যায়। তাছাড়া অড়হর দিয়ে ও লাইভ পার্চিং করা যায়। অড়হরও বেশ কয়েক বছর টিকে থাকে। ৪০-৪৫ দিন বয়সের আফ্রিকান ধৈঞ্চার গাছ থেকে প্রতি গাছে ২-৩টি প্রায় ২.৫-৩ ফুট লম্বা সাইজের কাটিং নিতে হয়।


ধান রোপণের ২-৩ দিনের মধ্যে আফ্রিকান ধৈঞ্চার কাটিং লাগাতে হয়। ৩ দিনের বেশি বিলম্ব হলে সফলতার হার ক্রমান্বয়ে কমে আসবে। রোদের সময় কাটিং না লাগিয়ে বৃষ্টির সময় লাগালে সফলতার হার বাড়বে। লাইভ পার্চিং ঝোপালো হলে পরিমিত ছাঁটাই করে দেয়া দরকার। এক বিঘা জমিতে ৬টি লাইভ পার্চিং করা দরকার। আমন ধান কাটার সময় পার্চিংয়ের আফ্রিকান ধৈঞ্চার বীজ পরিপক্ব হয়। তাই ধান কাটার সময় এবং বীজ সংগ্রহ করে ভালোভাবে শুকিয়ে পরবর্তী মৌসুমের জন্য সংরক্ষণ করতে হবে। আমন মৌসুমের মতো বোরো মৌসুমেও আফ্রিকান ধৈঞ্চা বা দেশি ধৈঞ্চা দিয়ে লাইভ পার্চিং করা সম্ভব। তবে কাটিংয়ের সফলতার হার খুবই কম। তাই এ কাজে পলিব্যাগে তৈরি ধৈঞ্চার চারা দিয়ে লাইভ পার্চিং করলে ফল বেশি ভালো হয়। বোরো মৌসুম বা শীতকালে লাইভ পার্চিং করার জন্য আফ্রিকান ধৈঞ্চা বা দেশি ধৈঞ্চার পুরনো বীজ ভালোভাবে শুকিয়ে সংরক্ষণ করতে হয়। আমন ধান ক্ষেতে স্থাপিত আফ্রিকান ধৈঞ্চার আর্লি ফ্লাস থেকে নভেম্বর মসের ১ম সপ্তাহে পরিপক্ব নতুন বীজ পাওয়া যায়।  


পলিব্যাগে পট মিক্সার ভরে প্রতি ব্যাগে ১-৩টি বীজ দিতে হবে। পলিব্যাগে বীজ দেয়ার সময় খুব গুরুত্বপূর্ণ। যে কোনো উপায়ে নভেম্বর মাসের ১০ তারিখের আগে পলিব্যাগে বীজ দিতে হবে। বীজ বুনতে দেরি করলে চারার বাড়বাড়তি থেমে থাকবে। বীজ বোনার পর পলিব্যাগ রোদে রাখতে হবে এবং পানি দেয়াসহ সব যত্নাদি যথানিয়মে নিতে হবে। ২৫ নভেম্বের থেকে ৭ ডিসেম্বরের মধ্যে চারাকে কমপক্ষে ১০-১৪ ইঞ্চি বৃদ্ধির ব্যবস্থা নিতে হবে। ডিসেম্বরে চারার বৃদ্ধি না হলেও গাছে ফুল আসবে সে ফুল ভেঙে দেয়া ভালো হবে তবে ফুল ভেঙে না দিলেও চলবে। ১০-১৪ ইঞ্চি সাইজের চারা ব্যাগসহ ব্যাগের তলা সামান্য কেটে দিয়ে বোরো ধান রোপণের পর যথা সম্ভব তাড়াতাড়ি লাগাতে হবে। শীতে চারার বৃদ্ধি কিছুটা কমে থাকলেও, শীত কমার সাথে সাথে চারার বৃদ্ধি শুরু হবে।


আলোর ফাঁদ (Light Trap)
ফসল ক্ষেতে সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন কৌশল অনুসরণ করার পাশাপাশি যদি রাতে আলোর ফাঁদ ব্যবহার করি সেক্ষেত্রে ক্ষতিকর অনেক পোকামাকড়ের উপস্থিতি সম্পর্কে আমরা নিশ্চিত হতে পারি। সেজন্য ফাঁদ হিসেবে অন্ধকারে বাতি জ্বালানো হয়। বাতি জ্বালালে পোকামাকড় সেদিকে আকৃষ্ট হয়। এরপর সেসব পোকা গিয়ে পড়ে বাতির নিচে রাখা গামলার ভেতরে। গামলায় পানির সাথে থাকে ডিটারজেন্ট বা সাবানের ফেনা। ওই ফেনায় গিয়ে বসলে বা পড়লে পোকামাকড় উঠতে পারে না। এরপর ধানের জন্য ক্ষতিকর পোকা শনাক্ত করা হয়। ফাঁদে আটকাপড়া পোকা শনাক্ত করা যায় সহজে। পরে পোকার উপস্থিতির ওপর ভিত্তি করে ধান রক্ষায় কোনো ধরনের কীটনাশক ব্যবহার করতে হবে, সে ব্যাপারে নিশ্চিত হয়ে কৃষকের পরামর্শ দেয়া সম্ভব হয়। আলোর ফাঁদ স্থাপনের মাধ্যমে মূলত পোকামাকড়ের উপস্থিতি জরিপ করা হয়। আলোর ফাঁদ বাদামি গাছফড়িং শনাক্ত ও নিধনে ভূমিকা রাখে। বাদামি গাছফড়িং ধানের জন্য অন্যতম ক্ষতিকর পোকা। এ পোকার আক্রমণে ফসলের ২০ থেকে ১০০ শতাংশ পর্যন্ত ক্ষতি হয়। ধানসহ বিভিন্ন ফসলের ক্ষেতে পোকা দমনে ‘আলোর ফাঁদ’ প্রযুক্তি ব্যাপক সফলতা পাচ্ছে। একইসাথে পোকা শনাক্ত করে প্রয়োজনীয় কীটনাশক ব্যবহার করতে পারছেন। রাতের বেলা উজ্জ্বল আলোয় ঝাঁকে ঝাঁকে উড়ে এসে জড়ো হয় বিভিন্ন ধরনের পোকামাকড়। সে পোকামাকড়ের আলোর নিচে রাখা বড় পাত্রে ভর্তি সাবান বা ডিটারজেন্ট মাখা পানিতে ডুবে আটকা পড়ে। এরপর পোকা শনাক্ত করে কৃষকদের ব্যবস্থা নেয়ার পরামর্শ দেয়া হয়। ক্ষেতের পোকামাকড় দমন ও চিহ্নিত করার জন্য কৃষক প্রয়োজনমাফিক বালাইনাশক প্রয়োগ করতে পারেন। তাছাড়া অসংখ্য পোকা ডিটারজেন্ট মাখা পানিতে ডুবে মারা যায়। ক্ষেতের পোকা দমনে আলোর ফাঁদ একটি সফল প্রযুক্তি। এটি ব্যবহারে কৃষক সহজেই ক্ষেতে পোকার আক্রমণ থেকে রক্ষা পেতে পারেন। নিশ্চিত করতে পারেন তার পরিশ্রমে অর্জিত ফসল। আর এভাবেই বাংলাদেশ একদিন জৈব কৃষিতে অনেকটুকু এগিয়ে যাবে।


জৈব পদ্ধতি (Oranganic Methods) : কালের পরিক্রমায় বর্ধিত জনগোষ্ঠীর খাদ্য চাহিদা মেটাতে কৃষিতে আধুনিকতার ছোঁয়া। আমাদের পূর্বপুরুষরা জৈব কৃষির ওপর নির্ভর করেই চালিয়েছেন তাদের চাষাবাদ। আস্তে আস্তে জৈব কৃষির স্থান দখল করে রাসায়নিক তথা আধুনিক কৃষি। জৈব কৃষি হলো কৃষি উৎপাদনে জৈব উপকরণের সর্বোচ্চ ব্যবহার করে অরাসায়নিক পদ্ধতিতে কৃষি উৎপাদন নিশ্চিত করা। অধিক উৎপাদন নিশ্চিত হলেও আমরা হারিয়েছি আমাদের প্রকৃতি নির্ভর ঐতিহ্য। প্রকৃতি নির্ভর কৃষি উৎপাদন হারানোর ফলে আমাদের অজান্তেই এসেছে মাটি দূষণ, পানি দূষণ, বায়ু দূষণ, ফসল দূষণ এবং পরিবেশ দূষণ। আমরা দূষণের মধ্যে ডুবে আছি। দূষণের দরুন জনজীবন বিপন্ন ও বিপর্যস্ত। সবুজ ও নির্মল ধরণী এখন হুমকির সম্মুখীন। যত্রতত্র অহেতুক রাসায়নিক দ্রব্য ব্যবহারের কারণে এখন সুস্থ সবল জীবন যাপন করা কঠিন। বিশ্ব এখন জৈব কৃষির সন্ধানে। জৈবকৃষিই আমাদের দুরবস্থা থেকে মুক্তি দিতে পারে। জৈব কৃষি-আমাদের পরম বন্ধু। জৈব কৃষি বাস্তবায়নে কিছু বিষয় আমাদের মনে রাখা দরকার।


জৈব সারের ব্যবহার : যতটা সম্ভব জৈব সারের ব্যবহার বাড়াতে হবে। আপনার আমার প্রত্যেকের বাড়ির ফেলনা আবর্জনা, বর্জ্য, লতাপাতা দিয়ে জৈবসার তৈরি করে জমিতে ব্যবহার করতে পারি। গোবর, খামারজাত সার, খৈল, ছাই, ভার্মি কম্পোস্ট, সবুজ সার ও জীবাণুসার ব্যবহার করে মাটির উর্বরতা বাড়ানো সম্ভব। এসব জৈব সার ব্যবহারে মাটির উপকার ছাড়া কোনো ক্ষতি হয় না। জৈব সার পরিবেশের বন্ধু ও পরিবেশবান্ধব। বসতবাড়িতে সীমিত সবজি, ফুল, ফল ও মসলা চাষে সার কম লাগে। এসব ফসল চাষে জৈব সারই যথেষ্ট হতে পারে; রাসায়নিক সারের তেমন একটা প্রয়োজন হয় না। মূলত জৈব সার অধিক সুস্বাদু, পুষ্টিকর ও উচ্চ গুণাগুণ সম্পন্ন সবজি ও ফল উপহার দিতে পারে। বিশুদ্ধ কৃষি পণ্য উৎপাদনে বর্তমান কৃষিতে জৈব কৃষি খুবই গুরুত্বপূর্ণ।


সবুজ সারের চাষ : সবুজ সার হিসেবে দেশি ধৈঞ্চার চাষ করে গাছে ফুল আসার সময় মাটিতে মিশিয়ে দিলে মাটিতে নাইট্রোজেন যোগ হয়। আফ্রিকান ধৈঞ্চার চাষ করে মাটিতে মিশিয়ে দিলে আরও বেশি নাইট্রোজেন যোগ হয়। এর ফলে মাটির উর্বরতা বাড়ে এবং ইউরিয়া সারের কাজ পাওয়া যায়। একইভাবে শন, বরবটি ও ফেলনের মত কোমল ও রসালো শস্যের চাষ করে ফুল আসার সময় মাটির সাথে মিশিয়ে সবুজ সার তৈরি করা যায়।


উর্বরতা বৃদ্ধিকারী ফসলের চাষ : শিম, ডাল বা শুঁটি জাতীয় শস্যের শিকড়ে নাইট্রোজেন গুটি থাকে যা মাটির উর্বরতা বাড়ায়। এসব ফসল বেশি চাষ করলে এবং ফসল পরিপক্ব হওয়ার পর না তুলে শুঁটি কেটে নিয়ে গাছ মাটিতে মিশিয়ে দিলে নাইট্রোজেন ও জৈব পদার্থ যোগ হয়।


ফসলের অবশিষ্টাংশ পচিয়ে সার তৈরি : ধান, গম, চীনা, কাউন ও অন্যান্য ফসল কাটার সময় মাটি বরাবর না কেটে অন্তত ৬ ইঞ্চি গোড়া রাখার পর কাটা উচিত। পরে চাষ দিয়ে মাটির সাথে মিশিয়ে দিলে জমিতে থাকা গোড়াগুলো পচে জৈব সারে পরিণত হয় এবং মাটির উর্বরতা বাড়ে।


অরাসায়নিক পদ্ধতিতে বালাই দমন : পরিবেশ দূষণের জন্য বালাইনাশকের যত্রতত্র ব্যবহারই সবচেয়ে বেশি দায়ী। সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনায় পোকামাকড় ও রোগবালাই দমনকে প্রাধান্য দেয়া হয়। যেমন-আধুনিক চাষাবাদ : সুস্থ বীজ ব্যবহার, পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন চাষাবাদ, সঠিক দূরত্বে রোপণ, সমকালীন চাষাবাদ, সুষম মাত্রায় সার ব্যবহার ও সঠিক পানি ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বালাই দমন করা যায়। যান্ত্রিক দমন : জমিতে ডালপালা পোঁতা, আলোর ফাঁদ ব্যবহার, হাতজাল দিয়ে পোকা ধরে মারা, পোকার ডিম, গাদা ও আক্রান্ত অংশ সংগ্রহ করে ধ্বংস করে বালাই দমন করা যায়। বালাইসহনশীল জাত ব্যবহার : বালাইসহনশীল বিভিন্ন জাতের ফসল চাষ করে বালাই আক্রমণ এড়ানো যায়  জৈবিক উপায়ে দমন : উপকারী বা বন্ধু পোকা, ব্যাঙ ও অন্যান্য প্রাণী সংরক্ষণ করে এদের মাধ্যমে ক্ষতিকারক পোকার ডিম, পুত্তলি, কীড়া ধ্বংস করার ব্যবস্থা করতে হবে। নিমের নির্যাস থেকে তৈরি ‘নিমবিসিডিন’ একটি উৎকৃষ্ট মানের উদ্ভিজ্জ কীটনাশক। অরাসায়নিক পদ্ধতিতে বালাই দমন করা সম্ভব না হলে রাসায়নিক কীটনাশক ব্যবহার বিরত রেখে উদ্ভিজ্জ বালাইনাশক ব্যবহার করে বেগুনের ফল ও ডগা ছিদ্রকারী পোকা, শাকসবজির বিভিন্ন পোকা এবং ধানের মাজরা, বাদামি গাছফড়িং ও পাতা মোড়ানো পোকা দমন করা যায়।


আগাছা দমন : খুব সহজেই আমরা আমাদের দেশীয় যন্ত্রপাতি নিড়ানি, খুরপি, কোদাল, উইডার দিয়ে অরাসায়নিক পদ্ধতিতে আগাছা দমন করতে পারি। তাই আগাছানাশকের মতো রাসায়নিক বিষ ব্যবহার করে পরিবেশ দূষণ করার কোনো প্রয়োজন হয় না।


জৈব পদ্ধতিতে বীজ সংরক্ষণ : বীজ কৃষির প্রধান ও মৌলিক অত্যাবশ্যকীয় উপকরণ। বীজ ১২ শতাংশ আর্দ্রতায় এলেই ঠাণ্ডা করে সংরক্ষণ পাত্রে সংরক্ষণ করতে হবে। বীজকে ভালোভাবে শুকিয়ে নিতে হবে। সংরক্ষণের জন্য প্রয়োজন অনুযায়ী মাটির পাত্র, টিন, পলিথিন বস্তা, ড্রাম ব্যবহার করা যায়। তবে মাটির পাত্র হলে অবশ্যই আলকাতরার প্রলেপ দিতে হবে। সবসময়ই সংরক্ষণ পাত্রটিকে ভালোভাবে বাযুরোধী করে মুখ বন্ধ করে দিতে হবে। পাত্রটির তলায় অবশ্যই কাঠ, খড় বা অন্য কিছু দিয়ে মাটি বা ফ্লোর থেকে আলাদা করে রাখতে হবে। বীজ সংরক্ষণে ও আলু গুদামজাতকরণে শুকনো নিম, নিসিন্দা ও বিষকাটালির পাতা একটি কার্যকর কীটনাশক পোকা দমনে উপকারী। এ পদ্ধতি অনুসরণ করা হলে বীজ নিরাপদ থাকবে। যেহেতু জৈব কৃষি আমাদের পরম বন্ধু, জৈব কৃষি হলো কৃষি উৎপাদনের আদি পদ্ধতি এবং নির্ভেজাল তাই জৈব পদ্ধতিতে কৃষি উৎপাদনের দিকে আমাদের সবাইকে মনোযোগী হতে হবে। আসুন আমাদের সবার সম্মিলিতভাবে এবং আন্তরিক প্রচেষ্টায় নির্বিঘ্নে চলতি বোরো ধান উৎপাদন কর্মসূচি সফল করি।

 

কৃষিবিদ ডক্টর মো. জাহাঙ্গীর আলম*

*পরিচালক, কৃষি তথ্য সার্ভিস, খামারবাড়ি, ঢাকা

 

ফাইল ১

এক্সেসিবিলিটি

স্ক্রিন রিডার ডাউনলোড করুন