কনটেন্টটি শেষ হাল-নাগাদ করা হয়েছে: রবিবার, ১৭ আগস্ট, ২০২৫ এ ১০:৩১ PM
কন্টেন্ট: কৃষি কথা মাস: ভাদ্র সাল: ১৪৩২ প্রকাশের তারিখ: ১৭-০৮-২০২৫
নিরাপদ ইলিশ উৎপাদন, বিপণন
এবং সংরক্ষণে করণীয়
মো: কাওছারুল ইসলাম সিকদার
ইলিশ বাংলাদেশের জাতীয় মাছ। গুণাগুণ ও স্বাদের কারণে এই মাছটি প্রায় ২৬ কোটি মানুষের পছন্দের খাবার। ইলিশ মাছ সমুদ্রে বিচরণ করলেও প্রজনন মৌসুমে ডিম ছাড়ার জন্য নদীতে প্রবেশ করে। ইলিশের তিনটি প্রজাতি রয়েছে পদ্ম, গুড়তা ও চান্দিনা। পদ্ম ইলিশই কেবল ডিম পাড়ার জন্য মিঠা পানিতে প্রবেশ করে। বাংলাদেশ পৃথিবীর ৮৫ শতাংশ ইলিশ আহরণ করে। এর পরেই ভারত ও মিয়ানমারের অবস্থান। এ খাতে প্রায় ২৫ লক্ষ লোক প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে নিয়োজিত। বাংলাদেশের জিডিপির ১% এই খাত হতে আসে। দেশের মোট মৎস্যের ১২% হলো ইলিশ। প্রতি বছর প্রায় ৫ লক্ষ টন ইলিশ নদ-নদী, উপকূল ও অগভীর সমুদ্র হতে আহরণ করা হয়। একটি পূর্ণাঙ্গ ইলিশ ষাট সেন্টিমিটার হতে আড়াই কেজি ওজনের হয়ে থাকে।
ইলিশের প্রজনন মৌসুম দুটি। একটি শীত পূর্ব অপরটি শীত পরবর্তী সময়। প্রথমটি অক্টোবর-নভেম্বর অপরটি ফেব্রুয়ারি-মার্চ মাস। পূর্ণিমা ও অমাবস্যা তিথিতে সমুদ্র হতে ঝাঁকে ঝাঁকে মা ইলিশ নদীতে প্রবেশ করে এবং ডিম পাড়ে। এক একটি মা ইলিশ এক লক্ষ হতে ২০ লক্ষ পর্যন্ত ডিম দিয়ে থাকে। এটি নির্ভর করে মাছের বয়স ও আকৃতির উপর। ডিম থেকে রেণু, রেণু থেকে পোনা, পোনা থেকে জাটকা পর্যায় পৌঁছাতে প্রায় ১০ সপ্তাহ সময় লেগে যায়। যখন পোনাসমূহ ১২ থেকে ২০ সেন্টিমিটারে উপনীত হয়, তখন সেগুলোকে জাটকা বলা হয়। সাধারণত অক্টোবর-নভেম্বর মাসে ডিম থেকে সৃষ্ট জাটকা জানুয়ারি থেকে এপ্রিল মাসের দিকে সমুদ্রে গমন করে। সে কারণে জানুয়ারি থেকে এপ্রিল মাসে জেলেদের জালে জাটকা বেশি ধরা পড়ে। একটি ইলিশ মাছ পূর্ণাঙ্গ হতে এক থেকে দুই বছর পর্যন্ত সময় লাগে। জাটকা ইলিশসমূহ সমুদ্রে বড় হয়ে আবার নদীতে ডিম পারার জন্য চলে আসে। তাই বর্ষা মৌসুমে মা ইলিশ বেশি ধরা পড়ে।
ইলিশ মাছের প্রধান খাবার হলো শেওলা। বর্তমানে নদীর পানিতে দূষণের মাত্রা বৃদ্ধি পাওয়ায় শেওলার পরিমাণ অনেক কমে গেছে। অপরদিকে হিমালয় থেকে আসা পানিতে জৈব উপাদান হ্রাস পেয়েছে। প্রাকৃতিকভাবে উৎপন্ন খাদ্যের ঘাটতি এবং পানিতে অনাকাক্সিক্ষত উপকরণের কারণে মাছের খাদ্যাভাসে পরিবর্তন এসেছে। মাছের জন্য প্রতিকূল পরিবেশ তৈরি হচ্ছে। সার্বিকভাবে মাছের উৎপাদন ও গুণগতমান দুটোই কমছে। বর্ষার স্থায়িত্ব কমে যাওয়া, উজান হতে পানি না আসা এবং নদীতে দূষণের মাত্রাবৃদ্ধি পাওয়া ইত্যাদি যদি বাড়তে থাকে তবে অদূর ভবিষ্যতে ইলিশ মাছ তার প্রজনন ক্ষেত্র পরিবর্তন করতে পারে। যেহেতু ইলিশ মাছ যেখানে জন্মায় সেখানেই প্রজননের উদ্দেশ্যে আবার ফিরে আসে। ইলিশ মাছের প্রত্যাবর্তন কমে যাওয়া বা ডিম হতে কম রেণু তৈরি হওয়া; এ উভয় কারণেই ইলিশ মাছের উৎপাদন ও বংশ বৃদ্ধি হ্রাস পেতে পারে।
ইলিশ একটি সুস্থ-সমৃদ্ধ ও রোগমুক্ত মাছ। এই মাছে সাধারণত কোন রোগ দেখা যায় না। তবে পরিবেশের প্রভাবে এবং প্রাকৃতিক খাদ্যের অপ্রাচুর্যতা বা স্বল্পতায় এ মাছের আকার ছোট-বড় হতে পারে।
ইলিশ মাছ উৎপাদন হতে ভোক্তাপর্যায়ে পৌঁছানো পর্যন্ত পুরো শৃংখলটি নিরাপদ রাখতে হবে। তবেই ইলিশ মাছ উৎপাদন ও ভোগ টেকসই হবে। ইলিশের জন্য যে সকল অভয়াশ্রম রয়েছে সেগুলোকে যথাযথভাবে সংরক্ষণ করতে হবে। জেলেরা নদীতে ইলিশ মাছ ধরে সে সব মাছ তিন চার ঘণ্টার মধ্যেই বাজারে বা আড়তে বিক্রয় করে। আড়তে মাছের আকার ও ওজন ভেদে বিভিন্ন শ্রেণীতে ভাগ করে পৃথক করা হয়। তারপর সেগুলোতে বরফ দিয়ে দেশের বিভিন্ন জায়গায় সড়ক পথ ও নৌপথে প্রেরণ করা হয়।
ইলিশ মাছের উৎপাদন এলাকায় মাছ ক্রয়-বিক্রয়ের জন্য আধুনিক ও নিরাপদ ল্যান্ডিং স্টেশন ও উপযুক্ত বাজার কাঠামো অদ্যাবধি গড়ে ওঠেনি। প্রায় সকল ইলিশ মাছের বাজার নোংরা ও অপরিষ্কার। সেখানে বিশুদ্ধ পানি ও নিরাপদ বরফের সুব্যবস্থা নেই। চাঁদপুর জেলা ইলিশ মাছ ক্রয়-বিক্রয়ের প্রধান কেন্দ্র হলেও সেখানে অদ্যাবধি কোন ল্যান্ডিং স্টেশন এবং আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সম্পন্ন নিরাপদ মৎস্য বাজার গড়ে ওঠেনি। ইলিশ মাছ সংরক্ষণের জন্য যে কয়েকটি বরফ কল রয়েছে, সেগুলো নদীর তীরবর্তী অংশ হতে অনিরাপদ পানি সংগ্রহ করে বরফ তৈরি করে। সেই বরফ ইলিশ মাছ সংরক্ষণ ও পরিবহনে ব্যবহার করা হয়। ইলিশ মাছ পরিবহনে সাধারণত বিশেষায়িত ট্রাক বা শীতলীকরণ ব্যবস্থা সমৃদ্ধ কাভার্ড ভ্যান ব্যবহার করা হয় না। নেই দীর্ঘমেয়াদি আধুনিক ও বড় পরিসরের ইলিশ মাছ সংরক্ষণাগার বা কোল্ডস্টোরেজ। বেসরকারি খাতের ২০০ মেট্রিক টনের একটি কোল্ড স্টোরেজ থাকলেও সেটি সংরক্ষণের জন্য পর্যাপ্ত নয় এবং এ সংরক্ষণাগারটি আধুনিক প্রযুক্তি সম্পন্নও নয়।
জেলেরা ইলিশ মাছ ধরার জন্য সরকার কর্তৃক নিষিদ্ধ জালসমূহ ব্যবহার করে। এতে অল্প সময়ে অনেক মাছ ধরা পড়ে। কারেন্ট জাল একটি নিষিদ্ধ জাল যা আধাঘণ্টা নদীতে রাখলেই সারাদিনের জন্য প্রয়োজনীয় উপার্জন জেলেদের উঠে আসে। সে কারণে তারা সরকার কর্তৃক অনুমোদিত জাল ব্যবহার না করে নিষিদ্ধ জালসমূহ ব্যবহার করে। এসব নিষিদ্ধ জালে মাছ যত বেশি সময় থাকে তত বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এতে মাছের গুণাগুণ হ্রাস পায় এবং বাজার দরও কমে যায়। একটি নৌকায় পাঁচ থেকে আটজন জেলে কাজ করে। নৌকার মালিক মাছ বিক্রি হতে প্রাপ্ত আয়ের ৩৫% পেয়ে থাকে। আর জেলেরা ৬৫ ভাগ পেয়ে থাকে। যদি নৌকার মালিক নিজেও জেলে হয় সেক্ষেত্রে ৬৫% হতেও শেয়ার পায়। বাংলাদেশের জেলেরা উন্নত বিশ্বের মতো মাছ ধরার জন্য লাইসেন্স ব্যবস্থার আওতায় নেই। তাই নৌকা, জাল ও জেলেদের নিয়ন্ত্রণের কাঠামো তৈরি হয়নি। ইলিশ মাছ উৎপাদন টেকসই করার লক্ষ্যে সময়োপযোগী নীতিমালা প্রণয়ন ও তা বাস্তবায়ন অত্যাবশ্যক।
ইলিশের উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে বহুমুখী প্রচেষ্টা গ্রহণ করা প্রয়োজন। সরকার কর্তৃক নির্ধারিত নিষিদ্ধ সময়ে নদীতে এবং সমুদ্রে মাছ ধরা বন্ধ কার্যক্রম যথাযথভাবে বাস্তবায়ন, নিষিদ্ধ জাল উৎপাদন ও ব্যবহার বন্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ , জাটকা নিধন সম্পূর্ণরূপে বন্ধ এবং জেলেদের নৌকার সংখ্যা সীমিত রাখা অত্যাবশ্যক। নদীতে এমোনিয়ার পরিমাণ বৃদ্ধি পাচ্ছে, যার কারণে নদীর পানি দূষিত হয়ে পড়ছে। প্রায় ৭০০০ বর্গ কিলোমিটার এলাকা ইলিশ মাছের উৎপাদন ক্ষেত্র। এই উৎপাদন ক্ষেত্র যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা না হলে অদূর ভবিষ্যতে মাছের উৎপাদন কমে যেতে পারে। তাই নদীর মোহনাসমূহ এবং উপকূলীয় অঞ্চল যথাযথভাবে সংরক্ষণ করতে হবে। যাতে মাছের খাবার পর্যাপ্ত পরিমাণে থাকে। সেজন্য পরিবেশের উপরও গুরুত্ব প্রদান করতে হবে। উজান হতে পানির প্রবাহ সারা বছর যথাযথ মাত্রায় না থাকায় পদ্মা নদীতে শুষ্ক মৌসুমে মাছ পাওয়া যায় না। ইলিশ মাছের অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত এবং মানব সৃষ্ট প্রতিকূলতা রোধ করা গেলে দেশে প্রতি বছর প্রায় ৭ লক্ষ মেট্রিক টন ইলিশ উৎপাদন সম্ভব।
বাংলাদেশ পৃথিবীর সর্বোচ্চ ইলিশ আহরণকারী দেশ হলেও এখানে অদ্যাবধি ইলিশ প্রক্রিয়াজাতকরণ প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেনি। নেই দীর্ঘমেয়াদি ইলিশ সংরক্ষণ এবং রপ্তানি অবকাঠোমো। তবে প্রচলিত ব্যবস্থায় ইলিশ মাছ কেটে তাতে লবণ মিশিয়ে লোনা ইলিশ তৈরি ও সংরক্ষণ করা হচ্ছে। নিরাপদে লোনা ইলিশ তৈরি ও সংরক্ষণ পদ্ধতি চিত্রে দ্রষ্টব্য।
নিরাপদ ইলিশ উৎপাদন বিপণন সংরক্ষণ ও ভোগে করণীয়
নৌকার মালিক ও জেলেদের জন্য লাইসেন্স ব্যবস্থা চালু; নিষিদ্ধ জাল উৎপাদন ও বিপণন বন্ধ করন; নিষিদ্ধ জাল উৎপাদনকারী প্রভাবশালী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে আইনের আওতায় আনয়ন; নিষিদ্ধ সময়ে মাছ ধরা বন্ধে এবং নিষিদ্ধ জাল ব্যবহার বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ; ইলিশের ছয়টি অভয়ারণ্য যথাযথভাবে সংরক্ষণ; পরিকল্পিতভাবে নদী হতে বালু উত্তোলনের ব্যবস্থা গ্রহণ; যাতে পানিতে বালুর পরিমাণ কম থাকে; দেশের সকল নগরবন্দর ও শহরসমূহে সৃষ্ট বর্জ্য ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন; শিল্পদূষণ হতে নদীসমূহ রক্ষা; প্লাস্টিকের দূষণ হতে এবং রাসায়নিক দূষণ হতে নদীর পানি রক্ষা করা; নিরাপদ পানি দ্বারা বরফ তৈরি নিশ্চিতকরণ; চাঁদপুর, বরিশাল ও ভোলায় একাধিক ল্যান্ডিং স্টেশন নির্মাণ ও আধুনিক সুযোগ- সুবিধা নিশ্চিতকরণ; ইলিশ মাছ ক্রয়-বিক্রয়ের প্রধান বাজার ও স্থানসমূহকে নিরাপদ অবকাঠামোতে রূপদান; ইলিশ মাছ সংরক্ষণের জন্য একাধিক মৎস্য হিমাগার প্রতিষ্ঠা; স্বাস্থ্যসম্মত উপায়ে ইলিশ মাছ উৎপাদন, পরিবহন, বিপণন, সংরক্ষণকল্পে আধুনিক ও বিজ্ঞানসম্মত উপকরণ সরবরাহ; আধুনিক প্রযুক্তি অবলম্বন করে লোনা ইলিশ তৈরি ও সংরক্ষণের জন্য প্রযুক্তিগত সহায়তা ও সংশ্লিষ্টদের প্রশিক্ষণ প্রদান; ইলিশ মাছ প্রক্রিয়াজাতকরণ করে খাবার উপযোগী পর্যায়ে এনে বিক্রয়কল্পে প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা প্রতিষ্ঠা; ইলিশ মাছ উৎপাদন সংশ্লিষ্ট জেলাসমূহে মৎস্য বিভাগের সৎ, কর্মঠ এবং নিবেদিত প্রাণ কর্মকর্তা পদায়ন; পাশর্^বর্তী দেশের জেলেদের বাংলাদেশের জলসীমায় মৎস্য আহরণ সম্পূর্ণভাবে বন্ধের ব্যবস্থা গ্রহণ; ইলিশ মাছের উৎপাদন টেকসই করে রাখার জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন এখন সময়ের দাবি।
লেখক : যুগ্মসচিব, বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ। সেক্টর ০৫, রোড ০৩, বাড়ি ৫৮, উত্তরা, ঢাকা-১২৩০। মোবাইল- ০১৭৯০১৭৭৯৪৫।