কনটেন্টটি শেষ হাল-নাগাদ করা হয়েছে: মঙ্গলবার, ২০ জানুয়ারী, ২০২৬ এ ০২:১২ PM

নাটিকা ভেলকিবাজি

কন্টেন্ট: কৃষি কথা মাস: মাঘ সাল: ১৪৩২ প্রকাশের তারিখ: ২০-০১-২০২৬

নাটিকা ভেলকিবাজি
সাবরিন সুলতানা
গ্রামের মোড়ের চায়ের দোকান। কুয়াশাঘেরা এক শীতের সকাল। একটা বেঞ্চে চানাচুরের প্যাকেট হাতে ঝিমোচ্ছে মন্টু মিয়া। এমন সময় দোকানে প্রবেশ করলেন প্রবীণ কৃষক হাশেম চাচা, চা দিতে বলে বসলেন মন্টুর পাশে।
হাশেম চাচা : কী ব্যাপার মন্টু, সাতসকালে চানাচুরের প্যাকেট নিয়ে বসে আছো? তোমার ক্ষেতে না আজকে লাউয়ের চারা লাগানোর কথা?
মন্টু মিয়া : (মুখ না তুলেই) আরে চাচা, ওসব লাউয়ের চারা-টারা দিয়ে কী হইবো? শীতে লেপের নিচ থেকে বের হইতেই ইচ্ছা করে না, আবার সবজি ফলাও। তার চেয়ে এই চানাচুরই ভালো। মচমচে আবার মজাদারও।
হাশেম চাচা : (চায়ের কাপ নিয়ে মন্টুর পাশে বসে) ওরে বোকা, এই চানাচুর তোমারে মজা দিচ্ছে ঠিকই, কিন্তু ভেতরে ভেতরে শরীরের বারোটা বাজাচ্ছে। আর শীতের সবজিকে অবহেলা করছো? এ তো সবজি না, এ হলো মাটির নিচের সোনা।
মন্টু মিয়া : (অবাক হয়ে) সোনা! কন কী? কই, আমি তো কালকে পাঁচ কেজি মুলা তুললাম, একটা নাকফুলও তো পাইলাম না? খালি মাটি আর মাটি।
হাশেম চাচা : (হেসে) আরে ধুর। আমি সেই সোনার কথা বলছি না। আমি বলছি পুষ্টির সোনার কথা। আচ্ছা, বলো তো, তোমার আজকাল কথায় কথায় মাথা ঘোরে কেন? আর অল্পতেই হাঁপিয়ে যাও কেন?
মন্টু মিয়া : আর বইলেন না চাচা। মনে হয় শরীরে তেল ফুরায় গেছে। ডাক্তার বলছে রক্ত কম।
হাশেম চাচা : এইবার আসল কথায় আসো। তোমার ক্ষেতে যে পালংশাক আর বিটরুট আছে, সেগুলো হলো ‘রক্ত তৈরির কারখানা’। নিয়মিত খেলে তোমার শরীরে আর তেলের ঘাটতি হবে না, একেবারে ডিজেল ইঞ্জিনের মতো চলবে।
মন্টু মিয়া : (চোখ গোল গোল করে) কন কী? পালংশাক রক্ত তৈরির কারখানা? তাইলে তো বউরে আর রোজ রোজ কচুর শাক রান্না করতে কইতে হইবো না। কচুশাক খাইতে খাইতে মুখে চরাট পইড়া গেছে।
হাশেম চাচা : শুধু তাই না। ওই যে গাজর, যেটা তোমার গরুও খেতে চায় না, ওইটা হলো চোখের ‘টর্চলাইট’। গাজর খেলে তোমার চোখের জ্যোতি এমন বাড়বে যে, অমাবস্যার রাতেও কোদাল খুঁজে পাবে। গাজরে রয়েছে পর্যাপ্ত ভিটামিন এ।
মন্টু মিয়া : (উত্তেজিত হয়ে) সত্যি নাকি, চাচা? তাইলে কি গাজর খাইলে আর রাতে টর্চলাইট নিয়ে বাইর হওয়া লাগবো না?
হাশেম চাচা : (হাসি চেপে) আরে না, ব্যাপারটা ঠিক তেমন না। তবে চোখ ভালো থাকবে। আর শোনো, ফুলকপি, পাতাকপি এগুলো হলো শরীরের ঝাড়–দার। শরীরের যত রোগ-জীবাণু আছে, সব ঝেঁটিয়ে বিদায় করে দেয়।
মন্টু মিয়া : (চিন্তিত মুখে) ঝাড়–দার? তার মানে ওগুলা খাইলে পেট পরিষ্কার হইবো? আমার তো তিন দিন ধইরা...
হাশেম চাচা : আরে শুধু পেট না, পুরো শরীরকে সুস্থ রাখে। আর টমেটো? ওটা খেলে তোমার গাল দুটোও টমেটোর মতো টকটকে লাল হয়ে যাবে। বউকেও খাওয়াবে, তাহলে আর মেকআপের টাকা চাইবে না। (অট্টহাসি)
মন্টু মিয়া : এই তো আসল কথা কইছেন, চাচা। এইবার বুঝছি সবজির কেরামতি। একদিকে স্বাস্থ্য, আরেকদিকে টাকা সাশ্রয়। কিন্তু এত কিছু চাষ করতে যে খরচ...
হাশেম চাচা : আরে খরচ কোথায়? তোমার নিজের জমি, নিজের শ্রম। আধুনিক পদ্ধতিতে চাষ করলে অল্প জায়গায় অনেক ফসল হয়। কৃষি অফিস থেকে এখন কত ভালো জাতের বীজ আর সার দেয়, জানো? এই শীতের তিন মাস সবজি চাষ করে যা আয় করবে, তা দিয়ে সারাবছর খেতে পারবে। তোমার ছেলেমেয়ের পড়ার খরচ, ভালো জামাকাপড় সব হয়ে যাবে। বাজারে একটা লাউয়ের যা দাম...
মন্টু মিয়া : (হিসেব করতে করতে) তাই তো। আমি তো খালি নিজের খাওয়ার কথা ভাবছি, বিক্রির কথা তো ভাবি নাই। দশ কাঠা জমিতে লাউ আর কয়ডা বেগুন লাগাইলে তো... এ তো দেখি টাকার খনি।
হাশেম চাচা : ঠিক ধরেছো। নিজের পরিবারের পুষ্টি যেমন মিটবে, তেমনি বাড়তি সবজি বাজারে বেচে পকেটও গরম হবে। স্বাস্থ্য আর সম্পদ দুটোই একসাথে। একেই বলে ‘রথ দেখা আর কলা বেচা’।
মন্টু মিয়া : (চানাচুরের প্যাকেটটা ফেলে দিয়ে) আর এক মুহূর্তও না। আমি এখনই চললাম। আমারে ‘টর্চলাইট’, ‘ঝাড়–দার’ আর ‘রক্তের কারখানা’ লাগাইতে হবে। আরেকটু বেলা হইলেই কৃষি অফিসে যামু। আপনেও কিন্তু আমার সাথে যাইবেন।
হাশেম চাচা : আচ্ছা, ঠিক আছে।
মন্টু মিয়া : এই শীতে আমি সবজি দিয়া ভেলকিবাজি দেখামু। দেখবেন, আগামী হাটে আমার সবজিই সবচেয়ে সেরা হইবো।
মন্টু মিয়া হনহন করে মাঠের দিকে ছুটতে লাগলো। হাশেম চাচা তার যাওয়ার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলেন।

লেখক : ৫৮১, গোপালগঞ্জ রোড (ঘোষালকান্দি), টেকেরহাট, রাজৈর, মাদারীপুর, মোবাইল : ০১৭৯১১৪৬৬৩১, ই-মেইল :sabrinsultana525@gmail.com

ফাইল ১

এক্সেসিবিলিটি

স্ক্রিন রিডার ডাউনলোড করুন