কনটেন্টটি শেষ হাল-নাগাদ করা হয়েছে: বুধবার, ১৬ জুলাই, ২০২৫ এ ০৪:৫৫ PM
কন্টেন্ট: কৃষি কথা মাস: শ্রাবণ সাল: ১৪৩২ প্রকাশের তারিখ: ১৬-০৭-২০২৫
ধেয়ে আসছে পার্থেনিয়াম, গ্রাস করছে ফসলি জমি
ড. হায়াত মাহমুদ১ মোঃ মহাসীন আলী২
শিরাযুক্ত, নরমকা- বিশিষ্ট একবর্ষজীবী, গুল্মজাতীয় আগাছাটির নাম পার্থেনিয়াম। পার্থেনিয়াম একটি ‘ইংরেজি শব্দ’। নামটি গ্রিকparthenos শব্দ থেকে উদ্ভূত হয়, অর্থ “কুমারী”। এটি উদ্ভিদের একটি প্রাচীন নাম। এটির অন্য নাম: কংগ্রেস ঘাস, গাজর ঘাস, চেতক চাঁদনী, র্যাগ উইড, হোয়াইট টপ, হোয়াইট হেড ও স্টার উইড প্রভৃতি। উদ্ভিদ জগতে কম্পোজিট পরিবারভুক্তের ১৬টি প্রজাতি রয়েছে। ১৬টি প্রজাতির মধ্যে এটিই সবচেয়ে বেশি বিষাক্ত। আমাদের দেশে যে পার্থেনিয়াম পাওয়া যায় তার বৈজ্ঞানিক নাম:Parthenium hysterophorus এবং পরিবার Asteraceae এটি জীববৈচিত্র্যের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর একটি আগাছা।
বিস্তারের ইতিহাস
আদি নিবাস উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকা, ওয়েস্ট ইন্ডিজ এবং উত্তর-পূর্ব মেক্সিকো। ভারতীয় উপমহাদেশ, দক্ষিণপূর্ব এশিয়া, অস্ট্রেলিয়ার গ্রীষ্মপ্রধান অঞ্চল, আফ্রিকার দক্ষিণ ও পূর্বাঞ্চলে এ আগাছার বিস্তার ঘটেছে। আফ্রিকার কেনিয়া, উগান্ডা ও তানজানিয়ার কফি উৎপাদিত ফসলি জমিতে এ আগাছাটি বিস্তৃত হচ্ছে। কিন্তু ভারত বর্ষে এ আগাছা বিস্তারের ইতিহাস রয়েছে। বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশগুলোকে খাদ্যশস্য সাহায্যের জন্যই ভারতবর্ষে গম পাঠানো হতো সেটা ১৯৪৫ সালের কথা, এদেশটি তখনো খাদ্যোৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে উঠতে পারেনি। এই আমদানিকৃত গমের মধ্যেই এদেশে প্রবেশ করে পার্থেনিয়াম। এখন বাংলাদেশসহ ভারতবর্ষে সর্বত্রই এই আগাছা দেখা যায়। ২০০৮ সালে বাংলাদেশে প্রথম এ আগাছাটি শনাক্ত করা হয়।
বৈশিষ্ট্য
পত্র খাঁজযুক্ত, অধিক শাখান্বিত, বর্ষজীবী, খাড়া, হার্বজাতীয় উদ্ভিদ, অনেকটা চন্দ্রমল্লিকা গাছের পাতার মতো। এর উচ্চতা ০.৫-১.৫ মিটার হয়, সর্বোচ্চ ২.০ মিটার বা তার অধিক হতে পারে। জন্মের মাস খানেকের মধ্যেই ফুল ধরে। বছরের যে কোন সময় ফুল ধরতে পারে, বর্ষাকালেই বেশি দেখা যায়। ফুলগুলো সাদা ও ক্ষুদ্রাকার। বীজ পরিপক্ব হলে হালকা বাদামি রং ধারণ করে। মার্চ থেকে সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত এই আগাছার বিস্তার দেখা যায়। একটি পূর্ণাঙ্গ গাছ হতে ১০-২৫ বীজ উৎপাদিত হতে পারে। পানি, বায়ু, পশুপাখি, যানবাহন, যন্ত্রপাতি ও পোশাকের সাহায্যে, এমনকি কাদামাটি, দূষিত কৃষি-পণ্যের (গোখাদ্য ও খাদ্যশস্য) মাধ্যমে বীজের বিস্তার ঘটে। বীজ হালকা ও প্যারাসুটের মতো হওয়ার কারণে বিভিন্ন অঞ্চলে দ্রুত বিস্তার ঘটা সহজতর হয়।
অর্থনৈতিক গুরুত্ব
উপকারিতা : ভারী পদার্থ ক্যাডমিয়াম (ওও) মিশ্রিত দূষিত পানি বিশুদ্ধ করতে P. hysterophorus পাউডার শোষক হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। এক গবেষণায় দেখা গেছে, পার্থেনিয়াম আগাছা ১৪ দিন যাবৎ পচিয়ে জৈবসার হিসেবে ব্যবহার করা হলে মাটিতে নাইট্রোজেন, ফসফরাস ও পটাশিয়াম সমৃদ্ধ মাটির উর্বরতা বৃদ্ধি করা যেতে পরে। যত উপকারিতার কথায় আলোচনা করি পার্থেনিয়ামের ক্ষতিকর প্রভাব মারাত্মক।
অপকারিতা : পুরো গাছটিই সম্পূর্ণ ক্ষতিকর, বিশেষ করে ফুলের রেণুতে অবস্থিত Sesquiterpene Lactones ev SQL জাতীয় বিষাক্ত পদার্থ ‘পার্থেনিন, হাইমেনিন, হাইস্টেরিন, করোনোপিলিন’। এছাড়াও এর মধ্যে থাকা বিষাক্ত রাসায়নিকগুলো হলো : ক্যাফেইক এসিড, পি-অ্যানিসিক এসিড প্রভৃতি। এ আগাছার আক্রমণে মাঠ ফসলের ৪০ ভাগ পর্যন্ত ফলন কমে যেতে পারে। মাটিতে নাইট্রোজেন আবদ্ধকরণের প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়। সবজি বিশেষ করে আলু, বেগুন, টমেটোর ক্ষেত, কলার বাগান এবং আখের ক্ষেতে এ আগাছার প্রভাব অত্যন্ত বেশি। গরু এ আগাছা খেলে তার অন্ত্রে ঘা দেখা দেয় এবং দুধ উৎপাদন কমে যায়। পার্থেনিয়াম ভক্ষণে মহিষ, ঘোড়া, গাধা, ভেড়া এবং ছাগলের মুখে ও পৌষ্টিকতন্ত্রে ঘা, যকৃতে পচন প্রভৃতি রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়। ফুলের রেণু বা বীজ নাকে প্রবেশ করলে হাঁপানি, শ্বাসকষ্ট ও জ্বর হয়। এ আগাছার বিষাক্ত পদার্থগুলো রক্তের সাথে মিশে চর্মরোগ, এলার্জি ও এক্সিমা হতে পারে।
ব্যবস্থাপনা
বাংলাদেশে মার্চ-এপ্রিল মাসে উঁচু-মাঝারি উচুঁ জমিতে দ্রুত আগাছাটির বিস্তার শুরু হয় বিশেষ করে কলার বাগান, সবজি ক্ষেত, ফলের বাগান ও খালি জায়গাগুলোতে। দ্রুত নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব না হলে স্বল্প সময়ের মধ্যেই আশেপাশের সকল জায়গা দখল করে নেয়, ফলে জীববৈচিত্র্যসহ মানুষ ও পশুপাখির মধ্যে বিরূপ প্রভাব পড়ছে। এমন কি ফসলি জমি থেকে আগাছাটির দমন করা কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ছে। বেশি মাত্রায় আক্রান্ত জমিতে আগাছা পরিষ্কার করতে গেলে শারীরিক অসুস্থতার সম্মুখিন হতে হচ্ছে। এ ছাড়াও রেল লাইনের ধারে, কবরস্থানে, ইটের ভাটায় এবং মহাসড়কের দুই পার্শ্বে এর বিস্তার যেন দ্রুতই সম্প্রসারিত হয়েছে। আগাছাটির দমন করার বিষয়ে যেমনি উচ্চ মাত্রার গবেষণা দরকার, সাথে সাথে এটির নিয়ন্ত্রণের জন্য সমন্বিত ব্যবস্থাপনা উদ্ভাবনের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। নিম্নলিখিত পদ্ধতিগুলো বিবেচনা করা হলে আগাছাটি নিয়ন্ত্রণ করা অনেকাংশেই সম্ভব।
* উঁচু এবং মাঝারি উঁচু জায়গাগুলো খালি না রেখে ফসল আবাদ করতে হবে যেন পার্থেনিয়াম আগাছা জমিতে প্রবেশ করতে না পারে। এ আগাছার সাথে কোন ফসল বা কোন আগাছা কোন অবস্থাতেই প্রতিযোগিতা করে টিকতে পারে না।
* রাসায়নিক দমন : পার্থেনিয়াম আগাছার ২-৩ পাতা অবস্থায় গ্লাইফোসেট আগাছানাশক ঔষধ প্রতি লিটার পানিতে ৫ মিলিঃ করে মিশিয়ে স্প্রে করতে হবে। অথবা গ্লাইফোসেট (২৪%) + ২, ৪-ডি (১২%) আগাছানাশক ঔষধ প্রতি লিটার পানিতে ৫ মিলিঃ করে মিশিয়ে স্প্রে করতে হবে।
* জৈবিক পদ্ধতিতে দমন : রাস্ট:Puccinia melampodii এবং Zygogramma bicolorata beetle এবং দ্বারা পার্থেনিয়াম আগাছা ধ্বংস করা যেতে পারে। পার্থেনিয়াম গাছে রাস্ট রোগ সৃষ্টির মাধ্যমে ৭০ ভাগ পাতা নষ্ট করা যায়। এ ছাড়া Zygogramma beetle পার্থেনিয়াম আক্রান্ত এলাকায় উন্মুক্ত করা হলে প্রাকৃতিক শত্রু পোকার ন্যায় আগাছার পাতা খাওয়ার মাধ্যমে ৮৫ ভাগ পার্থেনিয়াম আগাছা দমন করা যায়। জৈবিক পদ্ধতিতে এ আগাছা দমন করলে ফসলের কোন ক্ষতি হয় না।
সতর্কতা
এ আগাছা দমন করার সময় সতর্কতা অবলম্বন একান্ত জরুরি, হাতে রাবারের গ্লোবস ও মুখে মাস্ক পরে নিতে হবে, শরীরে পোশাক এবং পায়ে জুতা পরিধান করতে হবে, কোনো অবস্থাতেই ধূমপান করা যাবে না ।
(তথ্যসূত্র : Ajmal etal. 2005(11)/Dhileepan elal.2009(272-316)/Kishon et al. 2010,4(220-25)|
লেখক : ১অধ্যক্ষ (পিআরএল), কৃষি প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট, ঝিনাইদহ ২অতিরিক্ত উপপরিচালক (উদ্ভিদ সংরক্ষণ), কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, কুষ্টিয়া। মোবাইল : ০১৭২৭১৮২৬১৫ ই-মেইল :mohasindae@gmail.com