কনটেন্টটি শেষ হাল-নাগাদ করা হয়েছে: মঙ্গলবার, ১৪ অক্টোবর, ২০২৫ এ ০৫:০২ PM
কন্টেন্ট: কৃষি কথা মাস: কার্ত্তিক সাল: ১৪৩২ প্রকাশের তারিখ: ১৫-১০-২০২৫
ধানবীজ উৎপাদন ও বিপণনে সফল তরুণ উদ্যোক্তা সুলতানুর
কৃষিবিদ শারমিনা শামিম
স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের জনসংখ্যা বেড়েছে দ্বিগুণেরও বেশি। বাড়তি জনসংখ্যার প্রয়োজনে চাষাবাদের জমি বহুলাংশে হ্রাস পেয়েছে। একদিকে জনসংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি হয়ে যাওয়া, অন্যদিকে জনপ্রতি খাদ্যগ্রহণের পরিমাণ বৃদ্ধি পেলেও হেক্টরপ্রতি ধানের উৎপাদন তিনগুণের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। কৃষি খাত চারটি উপখাতের সমন্বয়ে গঠিত। এগুলো হল শস্য ও উদ্যান, পশু পালন. বন ও সংশ্লিষ্ট সেবা এবং মৎস্য। টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট অনুসারে আগামী ২০৩০ সাল নাগাদ দেশের খাদ্য ও পুষ্টি সমস্যার সমাধান করতে হলে কৃষি খাতের প্রবৃদ্ধি হতে হবে ৪ থেকে ৫ শতাংশ। গত চার বছর এই খাতে অর্জিত গড় প্রবৃদ্ধির হার ছিল বার্ষিক ৩.২ শতাংশ। দেশের কৃষিজমি ক্রমান্বয়ে হ্রাস পেলেও ধানসহ খাদ্যশস্য উৎপাদনে বাংলাদেশ চমক সৃষ্টি করেছে। সেই পশ্চাৎপদতা কাটিয়ে কৃষিতে আধুনিকায়নের ছোঁয়া লেগেছে প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে। বাংলাদেশের কৃষকরা এখন ব্যবহার করছে কলের লাঙল এবং ট্রাক্টর। ধান মাড়াইয়েও ব্যবহৃত হচ্ছে আধুনিক প্রযুক্তি। অনেক ক্ষেত্রে কম্বাইন্ড হার্ভেস্টার ব্যবহার করে মাঠ থেকেই ধান বস্তা বন্দী হচ্ছে। উন্নতমানের বীজ, সার এবং সেচ বাংলাদেশের কৃষির অনুষঙ্গে পরিণত হয়েছে।
খুলনার রূপসা উপজেলার কৃষক জনাব সুলতানুর রহমান। বাড়ি জাবুসা ইউনিয়নের হাটখোলা বাজার। তিনি একজন কৃষকের সন্তান। সুলতানের পরিবারে বাবা-মা সহ আরো চার ভাইবোন রয়েছে। অর্থাভাবে ৬ষ্ঠ শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করে এ অধ্যায়ের ইতিটানতে হয়েছে সুলতানকে, ধরতে হয়েছে সংসারের হাল। এ বয়সে তিনি খুলনার বড়বাজারে রাস্তার পাশে জুতার ব্যবসা শুরু করেন। কিন্তু এতে তার আর্থিক অনটন দূর হয় না। অন্যদিকে পৈতৃক পেশা হিসেবে কৃষিকাজ সবসময়েই তাকে হাতছানি দিয়ে ডেকেছে। হাতে জমানো পুঁজিকে কাজে লাগিয়ে তিনি প্রথমে বাংলাদেশ ইউনিলিভার কোম্পানির ৯ একর ২৮ শতক জমি লিজ নিয়ে মাছ চাষ শুরু করেন। তিনি কার্পজাতীয় মাছের চাষ করতেন। এতে তিনি লাভবানও হয়েছেন। শুকনো মৌসুমে জমিটি পতিত থাকে। পতিত জমিকে কাজে লাগাতে তিনি এখানে কৃষিকাজ শুরু করেন। ২০০৫ সালে যখন তিনি প্রথম কৃষি কাজ করেন, প্রথাগত চাষাবাদে অভ্যস্ত হয়ে ছিলেন। পরবর্তীতে ২০১৯ সালে উপজেলা কৃষি অফিসার ও উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা পরামর্শে দেন এবং তৎকালীন সময়ে চলমান “আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে কৃষক পর্যায়ে উন্নতমানের ধান, গম ও পাট বীজ উৎপাদন, সংরক্ষণ ও বিতরণ” প্রকল্পের আওতায় একটি কৃষক মাঠস্কুলে যুক্ত হন। এর পর থেকে বদলে যায় সুলতানের অর্থনীতির চাকা।
তিনি প্রথগত চাষাবাদ ছেড়ে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে কৃষিকাজ শুরু করেন। রূপসা উপজেলা কৃষি অফিসারের পরামর্শে শুরু করেন বোরো মৌসুমে বীজ ধান উৎপাদন। প্রকল্পটিতে অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় তিনি খুব সহজেই কৃষি অফিসের সহযোগিতায় বীজ উৎপাদন ও বিক্রির লাইসেন্স পান। খাওয়ার জন্য উৎপাদিত ধান যেখানে বিক্রি হয় ১২০০ টাকা মণ হিসেবে, সেখানে সুলতানের বীজ ধান বিক্রি হয় ৪০০০ টাকা প্রতি মণ। অর্থাৎ মণ প্রতি প্রায় তিনগুণের বেশি লাভ করা সম্ভব হয়। এখন তিনি প্রতি বছর ৪০০ থেকে ৫০০ কেজি বীজ ধান উৎপাদন করেন। প্রতি বছর উৎপাদিত বীজ সীড সার্টিফিকেশন এজেন্সীর মাধ্যমে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে প্যাকেট বন্দী করেন। তিনি যে কাজটি করে কৃষিক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন সেটি হলো আধুনিক জাতের ধান বীজ উৎপাদন। তিনি এ পর্যন্ত ব্রি ধান৭৪, ব্রি ধান৯৯, ব্রি ধান১০১, ব্রি ধান১০২, ব্রি ধান১০৪ ও বিনা ধান ২৪ এর বীজ উৎপাদন করেছেন।
অনেক সময় উচ্চফলনশীল ধানের ভালো বীজ প্রাপ্তির অভাবে স্থানীয় কৃষকগণ আধুনিক ধান চাষ করতে পারেন না। কৃষকের বীজ প্রাপ্তির কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এ অঞ্চলে আধুনিক ধানের বীজের চাহিদা পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে যাচ্ছেন তিনি। বর্তমানে তিনি আল নোমান বীজ ভা-ার ও সিন্থিয়া সীড নামে দু’টি প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন। প্রতি বছর শুধু ধান বীজ বিক্রি করে তিনি দুই থেকে আড়াই লাখ টাকা লাভ করে থাকেন। মৎস্য ও কৃষিকাজের পাশাপাশি বাড়িতে রয়েছে গরুর খামার যেখানে বর্তমানে ১৪টি গাভীন গরু আছে। এ কাজে সুলতানের স্ত্রী তাকে সার্বিক সহযোগিতা করেন। দক্ষিণাঞ্চলের লবণাক্ত জমিকে ফসল চাষের উপযোগী রাখতে জৈবসারের কোনো বিকল্প নেই। আর সেই বিষয়টি মাথায় রেখে বাড়িতে গড়ে তুলেছেন ১৪টি ভার্মিকম্পোস্ট চেম্বার। এখানে গরুর খামার থেকে প্রাপ্ত গোবর ব্যবহার করে প্রতিনিয়ত তৈরি হয় ভার্মিকম্পোস্ট। এখানে উৎপাদিত ভার্মিকম্পোস্ট তিনি নিজের কৃষি খামারে ব্যবহারের পাশাপাশি বিক্রি করে থাকেন। শস্য উৎপাদন, মৎস্য খামার ও গরুর খামার, এসব কিছুই সুলতান নিজে ও পরিবারের সদস্যদের শ্রমকে কাজে লাগিয়ে করে থাকেন। উপজেলা কৃষি দপ্তরের সহযোগিতায় ও তার নিজস্ব চেষ্টায় আজ তিনি একজন সফল উদ্যোক্তা।
খুলনার রূপসা গ্রামে সুলতান যে কৃষি সাফল্য দেখিয়েছেন তা শিক্ষিত তরুণসমাজের কর্মপ্রয়াসের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। আধুনিক কৃষির মূল উন্নয়ন আসে তরুণদের হাত ধরে। প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক এ জৈব কৃষিতে তাদের সক্রিয় অংশগ্রহণ আগামীর কৃষিকে দেবে সফলতার হাসি।
লেখক : আঞ্চলিক বেতার কৃষি অফিসার, খুলনা অঞ্চল, কৃষি তথ্য সার্ভিস, মোবাইল : ০১৭১৬৭৬৮৮২১,