কনটেন্টটি শেষ হাল-নাগাদ করা হয়েছে: মঙ্গলবার, ২০ জানুয়ারী, ২০২৬ এ ০২:২৬ PM

দেশের সম্ভাবনাময় সুপারফুড হতে পারে কালো সয়াবিন

কন্টেন্ট: কৃষি কথা মাস: মাঘ সাল: ১৪৩২ প্রকাশের তারিখ: ২০-০১-২০২৬

দেশের সম্ভাবনাময় সুপারফুড হতে পারে কালো সয়াবিন
ড. এম. এ. মান্নান
কালো সয়াবিন বা ব্ল্যাক সয়াবিন সুপারফুড হিসেবে বিশ্বে পরিচিত। সোনালী বা হালকা হলুদ সয়াবিন বিশ্বজুড়ে তেল ও পোল্ট্রি খাদ্য শিল্পে আধিপত্য বিস্তার করেছে তবে এতে এন্থোসায়ানিন ও অ্যান্টিঅক্সিড্যান্টের পরিমাণ কম। কালো সয়াবিনে রয়েছে প্রচুর এন্টিঅক্সিড্যান্ট, বায়োঅ্যাকটিভ যৌগ এবং রান্নার বহুমুখী ব্যবহারের জন্য বিশ্বব্যাপী এর বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে।
কালো সয়াবিনের বৈজ্ঞানিক নাম এষুপরহব সধী। এটি ডালজাতীয় ফসল। হলুদ সয়াবিনের মতো এটি বর্ষজীবী, সোজা ও হার্ব জাতীয় লিগিউম। যার ত্রিফলক বিশিষ্ট পাতা, বেগুনি ফুল এবং ২-৪টি বীজযুক্ত শুঁটি (ফল) রয়েছে। তবে প্রধান পার্থক্য বীজের খোসার রঙে। কালো সয়াবিনের বীজ চকচকে কালো। এর জীবন কাল ৮০-১০০ দিন এবং চাষাবাদের ধরন একই। যদিও কালো সয়াবিন প্রান্তিক অঞ্চলের মাটিতে সামান্য বেশি সহনশীল। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বাংলাদেশে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, লবণাক্ততা বৃদ্ধি এবং অপ্রত্যাশিত বৃষ্টি লক্ষ করা যাচ্ছে। কালো সয়াবিন জলবায়ু পরিবর্তনে অভিযোজিত ফসল। কারণ কালো সয়াবিন-
মাঝারি লবণাক্ত মাটিতে সহনশীল; নাইট্রোজেন গাছে সংযোজন করে ও মাটির উর্বরতা বৃদ্ধি করে; ধানের মৌসুমের মধ্যে স্বল্পমেয়াদি ফসল হিসেবে চাষযোগ্য; জলবায়ু চাপের সময় উচ্চ প্রোটিন খাদ্য নিরাপত্তা প্রদান করে। কেন কালো সয়াবিনকে সুপারফুড বলা হচ্ছে-
অ্যান্টিঅক্সিড্যান্ট সমৃদ্ধ : ব্ল্যাক সয়াবিনের বীজের কালো রংয়ের জন্য অ্যান্থোসায়ানিন দায়ী। এই অ্যান্টিঅক্সিড্যান্টগুলো ফ্রি র‌্যাডিক্যাল নিরপেক্ষ করে কোষের ক্ষয় ও বার্ধক্য রোধ করে। নিয়মিত গ্রহণে ক্যান্সার, স্নায়বিক রোগ এবং কার্ডিওভাসকুলার রোগের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে।
ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ : ব্ল্যাক সয়াবিনের কম গ্লাইসেমিক সূচক (জিআই) নিশ্চিত করে যে খাবারের পর রক্তের শর্করা হঠাৎ বৃদ্ধি পায় না। আইসোফ্ল্যাভোন ইনসুলিন সংবেদনশীলতা উন্নত করে এবং ফাইবার গ্লুকোজ শোষণ ধীর করে। ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য এটি আদর্শ খাদ্য।
হৃদরোগ সুরক্ষা : ব্ল্যাক সয়াবিনের আনস্যাচুরেটেড ফ্যাট এলডিএল কোলেস্টেরল কমায় এবং অ্যান্থোসায়ানিন ধমনীর প্ল্যাক গঠনে বাধা দেয়। এটি হার্ট অ্যাটাক এবং স্ট্রোকের ঝুঁকি কমায়।
অস্থিস্বাস্থ্য : ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম ও ফসফরাস সরাসরি হাড়ের ঘনত্ব বৃদ্ধি করে। আইসোফ্ল্যাভোনেস এস্ট্রোজেনের অনুকরণ করে। যা রজঃস্রাব-পরবর্তী মহিলাদের হাড়ের স্বাস্থ্য বজায় রাখতে এবং অস্টিওপোরোসিসের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে।
হরমোনাল ভারসাম্য : মহিলাদের জন্য আইসোফ্ল্যাভোনেস হট ফ্ল্যাশ এবং রজঃস্রাবজনিত অসুবিধা কমায়। পুরুষদের জন্য এটি প্রোস্টেট ক্যান্সারের বিরুদ্ধে সুরক্ষা প্রদান করে।
পাচন ও ইমিউন স্বাস্থ্য : ফাইবার হজম প্রক্রিয়া উন্নত করে এবং বায়োঅ্যাকটিভ যৌগ ইমিউন সিস্টেমকে শক্তিশালী করে।
বাংলাদেশে গবেষণা অগ্রগতি
কৃষিতত্ত্ব বিভাগ, গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় এবং জাপানি প্রতিষ্ঠান গ্রামীণ ইউগ্লেনা লিমিটেড যৌথভাবে কালো সয়াবিনের প্রাথমিক পর্যায়ে গবেষণা পরিচালনা করেছে। প্রাথমিক গবেষণায় দেখা যায়:
বাংলাদেশের উপউষ্ণম-লীয় জলবায়ুতে এ বীজের অঙ্কুরোদগম হার ভালো; গবেষণার মাঠে সন্তোষজনক বৃদ্ধি এবং ফলন; শক্তিশালী গুটি তৈরি করে, যা নাইট্রোজেন সংযোজনের সক্ষমতা বাড়ায়; খরা, লবণাক্ততা, পোকামাকড় এবং রোগ প্রতিরোধের উল্লেখযোগ্য সক্ষমতা রয়েছে। যদিও আরও গবেষণা প্রয়োজন।
তবে এই গবেষণা এখনও সীমিত পর্যায়ে। কালো সয়াবিনকে বাংলাদেশে বাণিজ্যিকভাবে চাষাবাদ করতে হলে আরও বহু অঞ্চলে ট্রায়াল অপরিহার্য।
সম্ভাব্য অঞ্চল:
দক্ষিণ উপকূল (নোয়াখালী, ভোলা ও বরিশাল) - হলুদ সয়াবিন চাষের জন্য উপযোগী; সিলেট পাহাড়ি অঞ্চল - ডালজাতীয় ফসলের জন্য অম্লীয় মাটি; মধুপুর পাহাড়ে মাঝারি উচ্চভূমি ফসল বৈচিত্র্যের জন্য ভালো; বরেন্দ্র অঞ্চল - খরা প্রবণ, তবে সয়াবিন স্বল্পমেয়াদি ফসল হিসেবে পরীক্ষা করা যেতে পারে; উপকূলীয় চরাঞ্চল - নতুন অর্জিত জমিতে প্রান্তিক কৃষকদের আয় নিশ্চিত করতে পারে; এই বহু অঞ্চলে চাষের পরীক্ষা দীর্ঘমেয়াদি অভিযোজন, রোগ প্রতিরোধ এবং বাংলাদেশের বিভিন্ন কৃষি পরিবেশগত অঞ্চলে ফলনের সম্ভাব্যতা স্পষ্ট করবে।
দেশীয় বাজার
বর্তমানে দেশীয় বাজারে প্রধানত সয়াবিন তেল আধিপত্য বিস্তার করছে কিন্তু কালো সয়াবিন দেশীয় বাজারে নতুন খাদ্যের সুযোগ তৈরি করতে পারে:
রোস্টেড স্ন্যাকস- শহুরে ভোক্তাদের জন্য ক্রাঞ্চি বীনস; সয়া ময়দা রুটি, নুডলস ও বিস্কুটে প্রোটিন বৃদ্ধির জন্য যোগ; সয়া দুধ ও টফুল্যাকটোজ অসহিষ্ণু ভোক্তাদের জন্য গরুর দুধের বিকল্প; সয়া চা-এশিয়ায় জনপ্রিয় অ্যান্টিঅক্সিড্যান্ট সমৃদ্ধ পানীয়; নিউট্রাসিউটিক্যালস-অ্যান্থোসায়ানিন ও আইসোফ্ল্যাভোন সমৃদ্ধ সাপ্লিমেন্ট।
রপ্তানি সম্ভাবনা
জাপান, কোরিয়া এবং চীনে ইতোমধ্যেই ব্ল্যাক সয়াবিনের চাহিদা অনেক । বাংলাদেশ এই বাজার লক্ষ করতে পারে। যদি মান নিয়ন্ত্রণ, নির্ভরযোগ্য সরবরাহ চেইন এবং সার্টিফিকেশন নিশ্চিত করা যায় তবে পূর্ব এশিয়ার নিকটবর্তী হওয়ায় ব্ল্যাক সয়াবিন চা, চিংড়ি ও পাট পণ্যের পাশাপাশি একটি বিশেষ রপ্তানি পণ্য হতে পারে।
বাংলাদেশে কালো সয়াবিন চাষের সমস্যাগুলো
জাত উন্নয়ন : স্থানীয় অভিযোজিত ব্ল্যাক সয়াবিনের জাত নেই।
বীজ সরবরাহ : বড় পরিসরে বীজ উৎপাদন বা বিতরণ ব্যবস্থা নেই।
প্রসেসিং অবকাঠামো : টফু, সয়া মিল্ক বা নিউট্রাসিউটিক্যালস উৎপাদনের জন্য বিশেষ সুবিধা প্রয়োজন।
ভোক্তা সচেতনতা : অধিকাংশ বাংলাদেশি ব্ল্যাক সয়াবিন সম্পর্কে জানে না।
কৃষক অনিচ্ছা : বাজারের নিশ্চয়তা ছাড়া কৃষক নতুন ফসল গ্রহণে দ্বিধাগ্রস্ত।
ঐতিহাসিক ও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট
সয়াবিন চাষের উৎপত্তি প্রাচীন চীনে, যেখানে এটি ‘পাঁচ পবিত্র শস্যের’ মধ্যে একটি হিসেবে সম্মানিত ছিল। সময়ের সাথে সাথে সয়াবিন কোরিয়া এবং জাপানে ছড়িয়ে পড়ে, যেখানে বিভিন্ন প্রজাতি, যার মধ্যে ব্ল্যাক প্রজাতিও রয়েছে। ব্ল্যাক সয়াবিন বিশেষভাবে চিকিৎসাগত গুরুত্ব বহন করত। প্রথাগত চীনা চিকিৎসায়, ব্ল্যাক সয়াবিন কিডনি শক্তিশালী করা, রক্ত সঞ্চালন উন্নত করা এবং শক্তির ভারসাম্য বজায় রাখার জন্য ব্যবহার হতো।
জাপানে, কুরোমামে নামে পরিচিত ব্ল্যাক সয়াবিন সাংস্কৃতিক উদযাপনের অংশ হয়ে ওঠে। নববর্ষ উৎসবে ব্ল্যাক সয়াবিন পরিবেশন করা হয়। যা শক্তি, স্বাস্থ্য এবং অধ্যবসায়ের প্রতীক। এটি খাওয়া বছরের জন্য শুভলাভের প্রতীক হিসেবে বিশ্বাস করা হতো। কোরিয়ায় ব্ল্যাক সয়াবিন সয়া সস রান্নায় ব্যবহৃত হয়। ভিয়েতনাম ও চীনে এটি কখনও কখনও ঔষধ তৈরিতে ব্যবহার করা হয় ।
পশ্চিমা বিশ্বে কালো সয়াবিন সাম্প্রতিক কয়েক দশকে জনপ্রিয়তা পায়, যখন স্বাস্থ্য সচেতন ভোক্তারা উদ্ভিদভিত্তিক প্রোটিন বিকল্প অন্বেষণ শুরু করেন। হলুদ সয়াবিন যেখানে মূলত তেল ও চর্বিতে রূপান্তরিত হয়, ব্ল্যাক সয়াবিন বাজারে খাদ্য হিসেবে প্রবেশ করে। আজকাল, এগুলো গ্লুটেন-মুক্ত, কম কার্বোহাইড্রেট, উচ্চ প্রোটিনযুক্ত হিসেবে বাজারে চাহিদা রয়েছে, যা ডায়াবেটিস রোগী ও নিরামিষভোজী মানুষের জন্য উপযুক্ত।
জাপান দেখায় কীভাবে কালো সয়াবিন সাংস্কৃতিক রান্নায় অন্তর্ভুক্ত করা যায়। কোরিয়া দেখায় দৈনন্দিন পার্শ্বপানীয় খাবারে ব্যবহার। এবং পশ্চিমা দেশগুলো দেখায় এটি বাজারজাত স্বাস্থ্য পণ্যের সম্ভাবনা। মিলিতভাবে এই শিক্ষা বাংলাদেশকে কালো সয়াবিনকে স্থানীয় খাদ্য উদ্ভাবন এবং রপ্তানি পণ্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার কৌশল নির্ধারণে সহায়ক হতে পারে।
সম্ভাবনা
কালো সয়াবিন বাংলাদেশের কৃষক ও ভোক্তার কাছে অজানা। বিশ্বব্যাপী কালো সয়াবিন সুপারফুড হিসেবে ব্যবহার হওয়ায় বাংলাদেশের গবেষক এবং কৃষি উদ্যোক্তাগণ এই ফসলটি নিয়ে বেশ আগ্রহ দেখাচ্ছেন। বাংলাদেশে এটি সঠিকভাবে চাষাবাদ করতে পারলে এবং বাংলাদেশের মানুষ যদি সুপার ফুড হিসেবে এটিকে খাদ্য তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করতে পারে। কৃষকদের জন্য এটি লাভজনক ফসল হতে পারে এবং জাপানসহ পূর্ব এশিয়ার বাজারে রপ্তানির নতুন সুযোগ হতে পারে।
কালো সয়াবিন বাংলাদেশের সম্ভাবনাময় ফসল। এর সমৃদ্ধ অ্যান্টিঅক্সিড্যান্ট প্রোফাইল, বহুমুখী ব্যবহার এবং বৈশ্বিক চাহিদা এটিকে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে সুপারফুড হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। গবেষণা সহায়তা, কৃষক অংশগ্রহণ, প্রসেসিং বিনিয়োগ এবং সরকারি নীতিমালার মাধ্যমে বাংলাদেশ কালো সয়াবিনকে একটি প্রধান কৃষি ও রপ্তানি পণ্য হিসেবে রূপান্তরিত করতে পারে। এই সম্ভাবনাকে পূর্ণরূপে কাজে লাগাতে, বাংলাদেশের সরকারকে কালো সয়াবিনের জন্য বিশেষ গবেষণা তহবিল সহজতর করতে হবে। বহু অঞ্চলে চাষের পরীক্ষা, জাত উন্নয়ন এবং বীজ ব্যবস্থায় বিনিয়োগ কৃষকদের গ্রহণযোগ্যতা দ্রুততর করবে এবং মান সংযোজিত প্রসেসিং সক্ষম করবে। এমন উদ্যোগকে সমর্থন দিয়ে সরকার নিশ্চিত করতে পারে যে কালো সয়াবিন শুধুমাত্র খাদ্য নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্য উন্নয়নে অবদান রাখবে না বরং বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং জলবায়ু সহিষ্ণু কৃষিতেও ভূমিকা রাখবে।

লেখক : অধ্যাপক ও সয়াবিন গবেষক, কৃষিতত্ত্ব বিভাগ, গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর । মোবাইল : ০১৮১৬০২০২৯০;

ফাইল ১

এক্সেসিবিলিটি

স্ক্রিন রিডার ডাউনলোড করুন