কনটেন্টটি শেষ হাল-নাগাদ করা হয়েছে: বুধবার, ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৫ এ ০৪:৩১ PM
কন্টেন্ট: কৃষি কথা মাস: আশ্বিন সাল: ১৪৩২ প্রকাশের তারিখ: ১৬-০৯-২০২৫
তেলবীজ ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধিতে বিনাসরিষা-১১
ড. মোঃ আব্দুল মালেক১ ড. রেজা মোহাম্মদ ইমন২ মোঃ সৈকত হোসেন ভূঁইয়া৩
সরকারের কৃষিবান্ধব নীতি ও নানামুখী প্রণোদনার ফলে দেশে তেলজাতীয় ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধি পেলেও ভোজ্যতেলের মোট চাহিদার বেশির ভাগই আমদানি নির্ভর। বাংলাদেশে বর্তমানে তেলজাতীয় ফসল উৎপাদনের সমস্যাগুলোর মধ্যে প্রধান হলো জমির স্বল্পতা। দেশের আবাদি জমির প্রায় ৭৫ শতাংশই ধান চাষে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। অন্যদিকে দেশের ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার ভোজ্যতেলের চাহিদা এবং এর ব্যবহার দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। এমতাবস্থায়, তেলজাতীয় ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধিতে প্রয়োজন উচ্চফলনশীল অথচ স্বল্প জীবনকালের আমনধান ও সরিষার জাত উদ্ভাবন করা যাতে ধানভিত্তিক আমন-পতিত-বোরো শস্যবিন্যাসটিতে তেল ফসল সরিষা অন্তর্ভুক্ত করা যায়। দেশের কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠানসমূহ ও কিছু কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় উচ্চফলনশীল অথচ স্বল্প জীবনকালের আমনধান ও সরিষার জাত উদ্ভাবনে গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছে এবং অনেকটা সফলও হয়েছে। এনএআরএসভুক্ত বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিনা) উদ্ভাবিত বিনাসরিষা-১১ একটি স্বল্প জীবনকালের উচ্চফলনশীল সরিষার জাত, যা আমন-পতিত-বোরো শস্যবিন্যাসে অন্তর্ভুক্ত করে শস্যবিন্যাসটিকে আমন-সরিষা-বোরো শস্যবিন্যাসে পরিণত করা সম্ভব হচ্ছে, ফলে ভোজ্যতেলের মোট উৎপাদন বৃদ্ধির মাধ্যমে ভোজ্যতেলের আমদানি নির্ভরতা কমানোও অনেকটা সম্ভব হচ্ছে।
জাতটির উদ্ভাবন কৌশল
চাঁপাইনবাবগঞ্জ হতে সংগৃহীত একটি স্থানীয় জাতের সরিষার বীজে গামা রশ্মি প্রয়োগের মাধ্যমে ফলনসহ অন্যান্য কৃষিতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্যে উন্নত মিউট্যান্ট লাইন (আরএম-২০) নির্বাচন করা হয়, যা অন্যান্য মিউট্যান্ট এবং বারিসরিষা-১৭ এর তুলনায় উন্নত বিবেচিত হয়। উন্নত বৈশিষ্ট্যের কারণে আরএম-২০ মিউট্যান্ট লাইনটিকে সরিষার নতুন জাত, ‘বিনাসরিষা-১১’ হিসেবে ২০২১ সালে জাতীয় বীজ বোর্ড কর্তৃক নিবন্ধিত হয়।
জাতটির বৈশিষ্ট্য
কা- ও পাতার রঙ হালকা সবুজ; গাছের উচ্চতা ১০৩-১১০ সেমি.; প্রাথমিক শাখার সংখ্যা ৩-৫টি; প্রতি গাছে ফলের সংখ্যা ৬৫-৭৫টি; প্রতি ফলে বীজের সংখ্যা ২৮-৩২টি; ১০০০ বীজের ওজন ৩.৫০-৪.২৫ গ্রাম; বীজের রঙ হলুদ; বীজে তেলের পরিমাণ ৪৪%; জীবনকাল ৭৮-৮২ দিন; গড় ফলন ১.৫ টন/হে. এবং সর্বোচ্চ ফলন ক্ষমতা ১.৯ টন/হে.।
উপযোগী মাটি ও জমি তৈরি
জাতটি বেলে দো-আঁশ হতে এটেল দো-আঁশ মাটিতে ভালো জন্মে এবং মাঝারি উঁচু জমি এ জাতের চাষের জন্য বেশি উপযোগী। সাধারণত ৩-৪টি চাষ ও মই দিয়ে মাটি ঝুরঝুরে করে জমি তৈরি করতে হবে। জমিতে যাতে বড় বড় ঢিলা না থাকে সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে এবং আগাছা থাকলে জমি থেকে সরিয়ে ফেলতে হবে।
সারের মাত্রা ও প্রয়োগ পদ্ধতি
বাংলাদেশে কৃষি পরিবেশ অঞ্চলভেদে জমির উর্বরতায় তারতম্য দেখা যায়, ফলে কৃষি পরিবেশ অঞ্চলভেদে সারের মাত্রা কম বেশি হয়ে থাকে। তবে জাতটি চাষের জন্য সাধারণভাবে একর প্রতি ১০০-১৩০ কেজি ইউরিয়া, ৭২-৮৫ কেজি টিএসপি, ৩৫-৪২ কেজি এমওপি, ৬০-৭২ কেজি জিপসাম, ০-২.০ কেজি জিংক সালফেট এবং ৩-৪ কেজি বোরাক্স সার ব্যবহার করতে হবে।
অর্ধেক ইউরিয়া এবং অন্যান্য সারের সবটুকু শেষ চাষের আগে জমিতে ছিটিয়ে প্রয়োগ করতে হবে এবং অবশিষ্ট অর্ধেক ইউরিয়া ফুল আসার আগে উপরিপ্রয়োগ করতে হবে।
বপনের সময় ও বীজ হার
সাধারণত কার্তিক মাসের প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত (মধ্য অক্টোবর থেকে মধ্য নভেম্বর) জাতটি বপন করার উপযুক্ত সময়। জাতটি চাষে একর প্রতি ২.১-২.৪ কেজি বীজ ব্যবহার করতে হবে।
বপন পদ্ধতি
সারিতে এবং ছিটিয়ে উভয় পদ্ধতিতেই বীজ বপন করা যায়। সারিতে বপন করলে সারি থেকে সারির দূরত্ব ২৫ সেমি. অথাৎ ১০ ইঞ্চি রাখতে হবে। সারিতে বপন করলে আগাছা দমন ও আন্তঃপরিচর্যা সহজ হয়। দুই থেকে তিন সেমি. গভীর করে সারি টেনে সারিতে লাগাতার বীজ বপন করে মাটি দিয়ে ঢেকে দিতে হবে। ছিটিয়ে বপন করলে শেষ চাষের পর বীজ ছিটিয়ে মই দিয়ে সমান করে নিতে হবে।
সেচ প্রয়োগ
জমিতে পরিমিত রস থাকলে সেচের প্রয়োজন হয় না। তবে বপনকালে জমিতে রসের অভাব অনুভূত হলে বপনের আগেই জমিতে সেচ দিয়ে পরবর্তীতে জমিতে জোঁ আসার পর চাষ দিয়ে বীজ বপন করতে হবে। বপনের পর জমিতে রসের অভাব অনুভূত হলে সেচ প্রয়োগ করতে হবে। তবে সেচ প্রয়োগের সময় লক্ষ্য রাখতে হবে যাতে সেচের পর জমিতে পানি আটকে না থাকে।
আন্তঃপরিচর্যা : চারা গজানোর ১৫-২০ দিনের মধ্যে নিড়ানি দিয়ে অতিরিক্ত চারা এবং আগাছা উঠিয়ে দিতে হবে। অরোবাংকি নামক এক প্রকার পরগাছা সরিষা গাছের গোড়ায় জন্মাতে দেখা যায়। সরিষার জমিতে এ পরগাছা দেখা দিলে নিড়ানি দিয়ে উঠিয়ে ফেলতে হবে।
রোগ দমন : সরিষার প্রধান রোগ অল্টারনারিয়া ব্লাইট বা পাতার দাগ পড়া রোগ। রোগটি দেখা দিলে গাছের পাতায় প্রথমে বাদামি অথবা গাঢ় রঙের চক্রাকার দাগ দেখা যায়। রোগের আক্রমণ প্রকট হলে গাছের কা-ে এমনকি শুঁটিতেও গোলাকার কালো দাগ দেখা যেতে পারে। এ রোগের আক্রমণ থেকে ফসল রক্ষা করতে হলে বীজ শোধন করে বপন করতে হবে এবং সেক্ষেত্রে প্রতি কেজি বীজ ২.৫ গ্রাম ক্যাপ্টান বা ভিটাভেক্স-২০০ ছত্রাকনাশক দিয়ে শোধন করতে হবে অথবা রোগমুক্ত বীজ ব্যবহার করতে হবে। তবে মাঠে এ রোগের আক্রমণ হলে রোভরাল-৫০ ডাব্লিউপি ছত্রাকনাশকের ২.০ গ্রাম প্রতি লিটার পানিতে মিশিয়ে এক সপ্তাহ পর পর তিনবার ¯েপ্র করতে হবে।
পোকা দমন
সরিষার প্রধান ক্ষতিকারক পোকা হলো জাবপোকা। এ পোকার আক্রমণ বেশি হলে ম্যালাথিয়ন-৫৭ ইসি প্রতি লিটার পানিতে ২.০ মিলি. হারে মিশিয়ে সম্পূর্ণ গাছ ভিজিয়ে ¯েপ্র করতে হবে। তবে আগাম চাষ করলে জাবপোকার আক্রমণ এড়ানো সম্ভব। অপরাহ্নে কীটনাশক ¯েপ্র করতে হবে যাতে জমিতে বিচরণকারী মৌমাছির ক্ষতির আশংকা কম থাকে।
ফসল কর্তন, বীজ শুকানো ও সংরক্ষণ
বিনাসরিষা-১১ বপন থেকে ফসল কাটা পর্যন্ত স্থানভেদে ৭৮ থেকে ৮২ দিন সময় লাগে। ফসল পরিপক্ব হলে গাছগুলো শুঁটিসহ খড়ের রঙ ধারণ করে। সকালে শুঁটিসহ গাছ কেটে বা উপড়িয়ে মাড়াই করার স্থানে নিতে হবে এবং দুই থেকে তিন দিন রোদে ভালোভাবে শুকিয়ে মাড়াই করতে হবে। মাড়াই করা বীজ শুকিয়ে গুদামজাত করতে হবে। ভালোভাবে বীজ সংরক্ষণের জন্য নিম্নলিখিত পদ্ধতি অনুসরণ করতে হবে-
মাড়াই করার পর বীজ বিশেষ যত্নসহকারে শুকাতে হবে। রোদের উত্তাপ খুব প্রখর হলে বীজ একটানা ৩-৪ ঘণ্টার বেশি শুকানো ঠিক নয়, কারণ কড়া রোদে অনেকক্ষণ ধরে বীজ শুকালে অংকুরোদগম ক্ষমতা নষ্ট হয়ে যায়। তাই প্রতিদিন ২-৩ ঘণ্টা করে কয়েক দিন শুকাতে হবে। শীতকালে যখন রোদের তাপ কম থাকে তখন একটানা ৪-৫ ঘণ্টা ধরে শুকালেও কোন ক্ষতি হয় না। বীজ সরাসরি সিমেন্টের তৈরি খোলায় না শুকিয়ে ত্রিপল বা চাটাইয়ের উপর শুকাতে হবে। বীজ এমনভাবে শুকাতে হবে যাতে আর্দ্রতা ৯% এর বেশি না থাকে। শুকানো বীজ দাঁত দিয়ে কামড় দিলে ‘কট’ শব্দ করে বীজ ভেঙে গেলে বুঝতে হবে যে বীজ ভালোভাবে শুকিয়েছে;
শুকানোর পর বীজ ভালোভাবে ঝেড়ে পরিষ্কার করতে হবে;
বীজ সংরক্ষণের পূর্বে অংকুরোদগম ক্ষমতা পরীক্ষা করে নিতে হবে;
বীজ রাখার জন্য মোটা ও বায়োরোধী পলিথিন ব্যাগ, টিন বা প্লাস্টিকের ড্রাম, প্লাস্টিকের কৌটা বা বিস্কুটের টিন ইত্যাদি ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে মোটা পলিথিন ব্যাগে বীজ রেখে মুখ শক্ত করে বেঁধে নিয়ে তা আবার একটি চটের বস্তায় ভরে রাখলে ভালো হয়। পলিথিনের ব্যাগ বা ধাতব পাত্র যা-ই হোক না কেন প্রত্যেক ক্ষেত্রেই এর মুখ এমনভাবে আটকিয়ে রাখতে হবে যেন ভিতরে বাতাস ঢুকতে না পারে। উল্লেখ্য, শুকানোর পর ঠা-া হলে বীজ সংরক্ষণ করতে হবে;
বীজের পাত্র অবশ্যই ঠা-া অথচ শুষ্ক জায়গায় রাখতে হবে এবং সরাসরি মেঝেতে না রেখে মাচা বা কাঠের পাটাতনের উপর রাখতে হবে।
লেখক : ১সাবেক পরিচালক (গবেষণা), ২প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, ৩ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, উদ্ভিদ প্রজনন বিভাগ, বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিনা), ময়মনসিংহ। মোবাইল নম্বর: ০১৭১২১০৬৬২০,