কনটেন্টটি শেষ হাল-নাগাদ করা হয়েছে: বুধবার, ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৫ এ ০৪:৪৩ PM

তরল জৈবসার, জৈব বালাইনাশক প্রস্তুত ও প্রয়োগ

কন্টেন্ট: কৃষি কথা মাস: আশ্বিন সাল: ১৪৩২ প্রকাশের তারিখ: ১৭-০৯-২০২৫

তরল জৈবসার, জৈব বালাইনাশক 
প্রস্তুত ও প্রয়োগ
ড. সালমা লাইজু১ সেখ জিয়াউর রহমান২
জৈব পদার্থ মাটির প্রাণ। জৈব পদার্থ মাটির ভৌত ও রাসায়নিক ধর্মের উন্নয়ন সাধন করে। জৈবসার মাটিতে উপকারী জীবাণু বৃদ্ধি করে। বায়ু ও পানি চলাচল স্বাভাবিক রাখে। আয়রণ বিনিময় ক্ষমতা বাড়ায়। মাটির অম্লত্ব ও ক্ষারত্ব নিয়ন্ত্রণ করে। জৈবসারের অভাবে মাটিতে বসবাসকারী উপকারী জীবাণুর সংখ্যা মারাত্নকভাবে কমে গেছে। যার ফলে ফসল উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি পাচ্ছে। আমরা যদি জৈবসারের ব্যবহার বৃদ্ধি করতে পারি তাহলে রাসায়নিক সারের ব্যবহার কমবে, তাতে চাষাবাদের খরচ কমবে।
তরল জৈবসার প্রস্তুত প্রণালী
১০০ লিটার মাপের একটি ড্রাম নিতে হবে। এতে ১০০ কেজি তাজা গোবর, ১০ কেজি চুনা, ১ কেজি ধানের কুঁড়া, ১ কেজি বেসন, ১ লিটার চিটাগুড়, ১ কেজি সরিষার খৈল, ১ মুঠো জঙ্গলের মাটি, ১টি ডিম ভাঙা খোসাসহ, ১ কেজি সরিষার খৈল, ১০০ গ্রাম টক দই, ৫ লিটার ন্যাচারাল পুকুর/নদীর পানি, চাল ধোওয়া পানি। সব উপকরণ একসাথে মিশিয়ে ১০০ লিটার পর্যন্ত পানি দিয়ে পূর্ণ করে ভালভাবে মিশিয়ে ৭ দিন অপেক্ষা করতে হবে। প্রতিদিন ২-৩ বার ৭ দিন পর্যন্ত নেড়ে দিতে হবে। ডান দিকে থেকে প্রতিদিন নাড়তে হবে। বাম দিকে ঘোরানো যাবে না। ৮-১২তম এই ৫ দিনে সম্পূর্ণ সার ব্যবহার করতে হবে। এই ৫ দিনে সম্পূর্ণ সার ব্যবহার করতে হবে। ১ লিটার তরল সার, ৬ লিটার পানিতে মিশিয়ে জমিতে প্রয়োগ করতে হবে।
জৈব বালাইনাশক প্রস্তুত প্রণালী 
বালাইনাশক মানুষের শরীরের জন্য অত্যন্ত বিষাক্ত। অতিরিক্ত বালাইনাশকের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় শ্বাসকষ্ট, নার্ভের সমস্যা, হজমের গোলমাল, কিডনি সমস্যা, চর্মরোগসহ ক্যান্সারের সম্ভাবনা রয়েছে। বালাইনাশকের ভয়াবহ ক্ষতি এড়াতে আমরা জৈব বালাইনাশক তৈরি করে যদি ব্যবহার করি তাহলে আমাদের স্বাস্থ্য এবং পরিবেশ নিরাপদ থাকবে।
জৈব বালাইনাশক এর উপকরণ
জৈব বালাইনাশক বানানোর জন্য ৩০ লিটার প্লাস্টিকের ড্রাম নিতে হবে। ভেতরে ৪০-৫০টি মেহগনির ফল টুকরা টুকরা করে মাড়াই করে পানিতে ভিজিয়ে রাখতে হবে। দেড় কেজি নিম ফল, দুই কেজি নিম পাতা, আতা গাছের পাতা, বিষকাঁটালি গাছ, ধুতরার পাতা, গাঁদা ফুলের পাতা, দূর্বা, গরুর চুনা ২০ লিটার ড্রামে দিতে হবে। ২১ দিন পর্যন্ত ড্রামের মুখ বন্ধ করে রাখতে হবে। মিশ্রণটি তৈরি হয়ে গেলে ৫ লিটার মিশ্রণ + ৫ লিটার পানি + ১০০ গ্রাম রসুন বাটা +৫০ গ্রাম চুন মিশিয়ে ছেকে স্প্রে করতে হবে। (সকল ফসলের জন্য প্রযোজ্য)
নিম ফল
া ২০-২৫ গ্রাম নিমের ফল গুঁড়া করে কাপড়ের পুঁটলির মধ্যে বেঁধে এক লিটার পানিতে এক রাত্রি পর্যন্ত ডুবিয়ে রাখুন। পরের দিন শাকসবজির পাতা খাওয়া, লেবু গাছের পাতা খাওয়া পোকা এবং ফড়িং নিয়ন্ত্রণের জন্যে স্প্রে করুন।
া ১ কেজি নিম ফলের শুকনো গুঁড়া কাপড়ের মধ্যে বেধে ২০ লিটার পানিতে ডুবিয়ে রাখুন। পরের দিন কাপড়ের পুটলিটা ভালভাবে চেপে তুলে নিন আর মিশ্রণের সঙ্গে ১০ গ্রাম সাবান গুঁড়া মিশিয়ে প্রয়োগ করুন।
া নিম ফলের গুঁড়া শস্যের গুদামে রাখলে রাইস উইভিল এবং অন্য পোকার আক্রমণ কম দেখা যায়।
া বেগুন গাছের ডগা ও ফল ছিদ্রকারী পোকা, টমেটো গাছের শস্য কৃমি এবং পাতার দাগ নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রতি হেক্টর ২ টন নিমের খৈল ব্যবহার করুন।
া ধান, গম, ডালজাতীয় শস্য বীজ সংরক্ষণ করার সময় নিমের পাতা দিয়ে রাখলে গন্ধে অনিষ্টকারী পোকার  বিকর্ষক হিসাবে কাজ করবে। এছাড়া নিমের পাতা     জীবাণুনাশক, পরজীবীনাশক। ধান ক্ষেতে শেষ বার চাষ দেওয়ার সময় তাজা নিমপাতা বিঘাপ্রতি ৫-১০ কেজি প্রয়োগ করলে ভাল পাওয়া যায়।
হলুদ
া হলুদ ব্যবহার করে বিভিন্ন শস্য অনিষ্টকারী পোকা যেমন- বিছা পোকা, ডাল ছিদ্রকারী পোকা, মাইট, রাইস উইভিল ইত্যাদি পোকা নিয়ন্ত্রণ করা যায়।
া পানির সঙ্গে ১০০ গ্রাম হলুদ গুঁড়া, ১ লিটার গোমূত্র, ২ লিটার পানি অনুপাতে মিশিয়ে বিছাপোকা প্রতিরোধ করার জন্য প্রয়োগ করুন ।
া হলুদের রসে একটা লম্বা পাটের দড়ি ভাল করে ডুবিয়ে দড়ির দুই মাথায় ধরে ক্ষেতের ওপরে টেনে নিয়ে গেলে অনিষ্টকারী পোকা দূর হয়ে যায়।
রসুন 
া কীটনাশক, ব্যাকটেরিয়া নাশক, কীট বিকর্ষক, শস্য কৃমিনাশক রূপে রসুন ব্যবহারে সুফল পাওয়া যায়।
া দুটো গোটা রসুন বাটা, দুই চা চামচ মরিচ গুঁড়া এবং ৫০ ডিটারজেন্ট চার লিটার পানিতে মিশিয়ে গাছে প্রয়োগ করলে বিছা পোকা নিয়ন্ত্রণ করা যায়।
া তিনটি গোটা রসুন ভালভাবে পিষে সঙ্গে ১০০ গ্রাম সাবান ১০ লিটার পানিতে মিশিয়ে শস্যে প্রয়োগ করলে ভাল ফল পাওয়া যায়।
ছাই 
া আধা কাপ ছাই, আধা কাপ চুন ৮ লিটার পানিতে ভালভাবে মিশিয়ে কয়েক ঘণ্টা রাখার পরে ছেঁকে লাউ জাতীয় ফসলে প্রয়োগ করুন।
া চুষে খাওয়া পোকা নিয়ন্ত্রণের জন্য ৬ চা চামচ কেরোসিন, ১ কেজি ছাই সঙ্গে মিশিয়ে সপ্তাহে ২ বার সকালে শাক সবজিতে ছিটিয়ে প্রয়োগ করা দরকার।
া পাতা খাওয়া পোকা দমনের জন্য শুকনো ছাই শাকসবজির ক্ষেতে প্রয়োগ করুন।
া ১ লিটার পানিতে ১ মুঠ ছাই মিশিয়ে এক রাত্রি রাখতে হবে। তারপরে এই মিশ্রণটি ১ কাপ দুধের সঙ্গে মিশিয়ে ছেকে নিয়ে আবার ৩ গুণ পানির সঙ্গে মিশিয়ে পাউডারি মিলডিউ এবং ব্লাস্ট রোগ প্রতিরোধের জন্য প্রয়োগ করুন।
তামাক পাতা
পতঙ্গ নিয়ন্ত্রণের জন্য তামাকপাতা বিশেষভাবে উপযোগী। বিভিন্ন শস্য, যেমন- লেবু, সরিষা, আলু, মরিচ, লাউ ইত্যাদিতে আক্রমণ করা পোকা, গম এবং বরবটির ব্লাস্ট, ছত্রাকজনিত রোগ, লিফকার্ল ভাইরাস, টমেটো ও বেগুন গাছের আগা আর ফল খাওয়া পোকা ইত্যাদির ক্ষেত্রে সাদা পাতার মিশ্রণ প্রয়োগ করে বিশেষ সুফল পাওয়া যায়।
১ কেজি সাদা পাতা  ১৫ লিটার পানিতে মিশিয়ে ২৪ ঘণ্টা পর্যন্ত রাখার পর ২৫০ গ্রাম সাবান (ডিটারজেন্ট) ভালভাবে মিশাতে হবে। মিশ্রণটি ছেকে স্প্রে করলে ভাল ফল পাওয়া যায়।
বেল পাতার মিশ্রণ
তাজা বেল পাতা ৩৭৫ গ্রাম ভালভাবে পিষে ১৫ লিটার পানির সঙ্গে মিশানোর পর ছেকে নেন। এই মিশ্রণ ফসলে সকাল বেলা প্রয়োগ করলে ব্লাস্ট রোগ নিয়ন্ত্রিত করা যায়।
তুলসী পাতার মিশ্রণ
তাজা তুলসী পাতা ৩৭৫ গ্রাম নিয়ে সমপরিমাণ পানির সঙ্গে ২০ মিনিট সময় পর্যন্ত ফুটান। এই মিশ্রণটি ছেকে নিয়ে ১৫ লিটার পানির সঙ্গে মিশিয়ে সকালে স্প্রে করুন। মিশ্রণটি ধান গাছের ব্লাস্ট রোগের জন্য উপকারী।
 
লেখক : ১অতিরিক্ত পরিচালক, ২কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, ময়মনসিংহ অঞ্চল, ময়মনসিংহ, সহকারী তথ্য অফিসার, কৃষি তথ্য সার্ভিস, আঞ্চলিক কার্যালয়, ময়মনসিংহ। মোবাইল : ০১৭১৬৭৮৮৭৫৫, 
ফাইল ১

এক্সেসিবিলিটি

স্ক্রিন রিডার ডাউনলোড করুন