কনটেন্টটি শেষ হাল-নাগাদ করা হয়েছে: বুধবার, ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৫ এ ০৪:৩১ PM
কন্টেন্ট: কৃষি কথা মাস: আশ্বিন সাল: ১৪৩২ প্রকাশের তারিখ: ১৬-০৯-২০২৫
টেকসই পাট চাষে আগাছা ব্যবস্থাপনা প্রযুক্তির উন্নয়ন
ক্যামেলিয়া কাদের
পাট বাংলাদেশের একটি ঐতিহ্যবাহী ও অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ফসল। বহু দশক ধরে পাট বাংলাদেশের “সোনালী আঁশ” নামে পরিচিত, যা দেশের অর্থনীতির চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। বিশেষ করে পরিবেশবান্ধব, পুনঃব্যবহারযোগ্য ও জৈব উপাদানের চাহিদা বৃদ্ধির ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে পাটের গুরুত্ব আবারও বাড়ছে। তবে টেকসই পাট উৎপাদনে অনেক চ্যালেঞ্জ রয়েছে, যার মধ্যে আগাছা একটি অন্যতম প্রধান সমস্যা। আগাছা পাট গাছের বৃদ্ধিতে সরাসরি প্রতিকূল প্রভাব ফেলে এবং ফলন মারাত্মকভাবে হ্রাস করে।
এই সমস্যার সমাধানে পরিবেশবান্ধব ও টেকসই আগাছা ব্যবস্থাপনা কৌশল গ্রহণ এখন সময়ের দাবি। আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির সাহায্যে আগাছা দমন এবং কৃষকদের প্রশিক্ষণ ও সচেতনতা বৃদ্ধি করেই টেকসই পাট চাষ নিশ্চিত করা সম্ভব।
পাট চাষে আগাছার ভূমিকা ও ক্ষতি
পাট সাধারণত খরিফ মৌসুমে চাষ হয়, যখন উষ্ণ ও আর্দ্র পরিবেশ থাকে। এই জলবায়ু আগাছার দ্রুত বিস্তার ও অঙ্কুরোদগমের জন্য উপযোগী। গবেষণা অনুযায়ী, আগাছার কারণে পাটের ফলন ৩০% থেকে ৫০% পর্যন্ত কমে যেতে পারে যদি উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ না করা হয়। আগাছা শুধু পাট গাছের সাথে পুষ্টি, পানি ও আলো নেওয়ার প্রতিযোগিতা করে না, বরং এটি রোগ ও কীটপতঙ্গের আশ্রয়স্থল হিসেবেও কাজ করে।
আগাছা থেকে সৃষ্ট সমস্যা : আগাছা মাটির পুষ্টি উপাদান ব্যবহার করে ফসলের বৃদ্ধি ব্যাহত করে। আগাছা বেশি পরিমাণে পানি ও সূর্যের আলো শোষণ করে নেয়, ফলে ফসল দুর্বল হয়। কিছু আগাছা বিভিন্ন রোগের জীবাণু ও কীটপতঙ্গের বাহক হিসেবে কাজ করে। আগাছা অধিক হলে পাট আঁশের মান নষ্ট হয়। আগাছা দমনে অতিরিক্ত শ্রম ও সময় ব্যয় করতে হয়, যা উৎপাদন ব্যয় বাড়িয়ে দেয়।
টেকসই আগাছা ব্যবস্থাপনা কৌশল ও প্রযুক্তি
পাট চাষে আগাছা দমনে বহুমুখী কৌশল প্রয়োগ করে ফলন বাড়ানো ও উৎপাদন ব্যয় কমানো সম্ভব। টেকসই ব্যবস্থাপনার মূল বৈশিষ্ট্য হলো এটি পরিবেশবান্ধব, খরচসাশ্রয়ী এবং কৃষকের জন্য ব্যবহারযোগ্য হতে হবে। নিচে বিভিন্ন কৌশল বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হলো:
আগাছানাশকের ব্যবহার : বিজ্ঞানভিত্তিক আগাছানাশক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে দ্রুত ও কার্যকরভাবে আগাছা দমন করা যায়। তবে এ ক্ষেত্রে সময় ও মাত্রা ঠিক রাখা অত্যন্ত জরুরি। Pendimethalin, Butachlor আগাছানাশক ব্যবহার করা প্রয়োজন। বীজ বপনের পর মাটিতে যেমন Post-emergence প্রয়োগ করলে আগাছার অঙ্কুরোদগম রোধ করা যায়। প্রয়োজনে চড়ংঃ-বসবৎমবহপব আগাছানাশক প্রয়োগ করতে হবে। ফসল গজানোর পর ব্যবহৃত হয় যেমন- Quizalofop-p -ethyl, Imazethapyr যা নির্বাচনযোগ্য আগাছা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর। সতর্কতা অতিরিক্ত মাত্রায় ব্যবহার করলে পাট গাছের ক্ষতি হতে পারে, তাই কৃষকদের যথাযথ প্রশিক্ষণ থাকা জরুরি।
যান্ত্রিক আগাছা দমন : এই কৌশলটি বিশেষভাবে উপযোগী যেখানে শ্রমিক পাওয়া যায় এবং খরচ কমাতে চাষিরা আগ্রহী। হাতচালিত যন্ত্র যেমন নিড়ানি বা উইডার মেশিন যা সহজে পরিচালনা করা যায়। ছোট কৃষকদের জন্য এটি অত্যন্ত উপযোগী। পাওয়ার উইডার যেমন বড় জমিতে কার্যকর, ডিজেল বা বিদ্যুৎচালিত যন্ত্র যা শ্রম খরচ কমায় এবং দ্রুত আগাছা পরিষ্কার করে।
মালচিং : মালচিং হলো জমির উপরিভাগে খড়, পাটকাঠি, পাতা বা পলিথিন বিছিয়ে রাখা। এতে আগাছার বীজ আলো না পাওয়ায় অঙ্কুরোদগম ব্যাহত হয়। জৈব মালচ যেমন- খড়, পাটকাঠি, ঘাস ইত্যাদি জমির আর্দ্রতা ধরে রাখে এবং মাটির উর্বরতা বাড়ায়। অজৈব মালচ যেমন পলিথিন শিট ইত্যাদি, তবে ব্যবহারে পরিবেশগত দিক বিবেচনা করা দরকার।
শস্য পর্যায়ক্রম ও আন্তঃফসল চাষ : পাটের সাথে অন্য ফসল যেমন- মুগ, কাউলি বা ধান চাষ করলে আগাছার বিস্তার হ্রাস পায় এবং জমির পুষ্টি ভারসাম্য রক্ষা পায়। একই জমিতে প্রতি বছর পাট চাষ না করে ঘুরিয়ে চাষ করলে নির্দিষ্ট আগাছার সংখ্যা ও ঘনত্ব কমে যায়।
জৈবিক ও প্রাকৃতিক পদ্ধতি : জৈব আগাছানাশক যেমন- নিম পাতার নির্যাস, রসুন বা রক্তচন্দনের নির্যাস ব্যবহার করে কিছু আগাছা দমন করা সম্ভব। জৈবসার ব্যবস্থাপনা ভারসাম্যপূর্ণ জৈবসার ব্যবহার করে মাটির গঠন উন্নত করা এবং কিছু আগাছার বিস্তার নিয়ন্ত্রণ করা যায়।
ম্যানুয়াল বা হাতে আগাছা দমন : এটি প্রচলিত ও কার্যকর পদ্ধতি হলেও শ্রমনির্ভর এবং সময়সাপেক্ষ। সাধারণত চারা গজানোর ১৫-২০ দিন পর প্রথম দফা এবং ৩৫-৪০ দিন পর দ্বিতীয় দফা আগাছা পরিষ্কার করা হয়।
প্রযুক্তি হস্তান্তর ও কৃষকের অংশগ্রহণ : কোনো প্রযুক্তি তখনই কার্যকর হয়, যখন তা মাঠপর্যায়ে কৃষকের হাতে পৌঁছে যায় এবং তারা তা প্রয়োগে অভ্যস্ত হন। এজন্য প্রয়োজন কৃষি প্রশিক্ষণ ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম: কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর এবং বেসরকারি সংস্থার মাধ্যমে মাঠপর্যায়ে প্রশিক্ষণ, ভিডিও প্রদর্শন, লিফলেট বিতরণ।
ডেমো প্লট তৈরি : কৃষকের চোখের সামনে উন্নত পদ্ধতি প্রয়োগ করে ফলাফল দেখানো হলে তারা সহজেই তা গ্রহণ করেন। কৃষকদের জন্য ভর্তুকিতে আগাছা দমন যন্ত্র, জৈব আগাছানাশক ইত্যাদি সরবরাহ করা।
পরিবেশগত ও অর্থনৈতিক সুবিধা : সঠিক আগাছা ব্যবস্থাপনা কেবল ফলনই বাড়ায় না, বরং পরিবেশ ও অর্থনীতির জন্যও উপকারী। আগাছা নিয়ন্ত্রণে ভারসাম্যপূর্ণ কৌশল মাটির গঠন ও জীবাণু কার্যক্রম ঠিক রাখে। আগাছা কম থাকলে পানি অপচয় কম হয়। দ্রুত আগাছা দমনে সময় ও শ্রম কম লাগে।
ফলনের গুণগত মান বৃদ্ধি পায়। ভালো মানের আঁশ পাওয়া যায়, যা রপ্তানিযোগ্য।
টেকসই পাট চাষ নিশ্চিত করতে হলে একটি সমন্বিত আগাছা ব্যবস্থাপনা কৌশল গ্রহণ অত্যন্ত জরুরি। রাসায়নিক, যান্ত্রিক, জৈব এবং প্রাকৃতিক পদ্ধতির সমন্বয়ে গঠিত একেকটি কৌশল নির্দিষ্ট পরিস্থিতি ও কৃষকের সক্ষমতা অনুযায়ী নির্বাচন করা প্রয়োজন। পাশাপাশি কৃষকের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি, প্রশিক্ষণ কার্যক্রম সম্প্রসারণ এবং গবেষণালব্ধ প্রযুক্তি মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়নের মাধ্যমে আগাছা নিয়ন্ত্রণে একটি কার্যকর ও পরিবেশবান্ধব ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব। এর মাধ্যমে পাট চাষ হবে লাভজনক, পরিবেশবান্ধব ও দীর্ঘমেয়াদি টেকসই।
লেখক : বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, কৃষিতত্ত্ব বিভাগ, বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট, মানিক মিয়া এভিনিউ, ঢাকা-১২০৭, মোবাইল : ০১৬৮৬-৯১৫৯৩০,