কনটেন্টটি শেষ হাল-নাগাদ করা হয়েছে: সোমবার, ১৬ মার্চ, ২০২৬ এ ১১:০৯ AM
কন্টেন্ট: কৃষি কথা মাস: চৈত্র সাল: ১৪৩২ প্রকাশের তারিখ: ১৬-০৩-২০২৬
টেকসই কৃষি উৎপাদন ও পরিবেশ সুরক্ষায় উপকারী পোকামাকড়ের ভূমিকা
ড. মো. আলতাফ হোসেন
উপকারী পোকামাকড়গুলো টেকসই কৃষির জন্য অতীব গুরুত্বপূর্ণ। এই পোকামাকড়গুলো কৃষি উৎপাদন ত্বরান্বিত ও বৃদ্ধি করার জন্য অত্যাবশ্যকীয় ভূমিকা পালন করে থাকে এবং ইকোসিস্টেমকে সুস্থ রাখে। টেকসই কৃষিতে উপকারী পোকামাকড়ের প্রধান ভূমিকাগুলো নি¤েœ বর্ণিত হলো
ফসলের ফুলে পরাগায়ন ঘটানো
ফুলের পরাগধানী থেকে পরাগরেণু স্থানান্তরিত হয়ে ফুলের গর্ভমু-ে পতিত হওয়াকে পরাগায়ন বলে। পরাগায়ন দুধরনের-স্ব-পরাগায়ন ও পর-পরাগায়ন। স্ব-পরাগায়নের ক্ষেত্রে পরাগরেণু একই ফুলের গর্ভমু-ে অথবা একই গাছে অন্য একটি ফুলের গর্ভমু-ে পতিত হয় কিন্তু পর-পরাগায়নের ক্ষেত্রে পরাগরেণু একই প্রজাতির অন্য একটি গাছের ফুলের গর্ভমু-ে অথবা একই গাছের অন্য একটি ফুলের গর্ভমু-ে পতিত হয়।
পরাগায়নের মাধ্যমে নিষেকের ফলশ্রুতিতেই ফুলের গর্ভাশয় ফলে পরিণত হয় এবং ডিম্বকসমূহ বীজে পরিণত হয়। সুতরাং ফল ও বীজ তৈরির জন্য পরাগায়ন অত্যাবশ্যক প্রক্রিয়া। শুধু কীটপতঙ্গ দ্বারাই পরাগায়ন নির্ভর করে পৃথিবীর তিন চতুর্থাংশের বেশি ফসলের উৎপাদন যার অধিকাংশই ফল, সবজি, তেল, আমিষ, নাট, মসলা, কফি এবং কোকো জাতীয় ফসল। কীটপতঙ্গ হচ্ছে মাঠ ও উদ্যান ফসলের জন্য সবচেয়ে সাধারণ এবং কার্যকরী পরাগায়নকারী। এদের মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন প্রজাতির মৌমাছি, মাছি, বিটল, প্রজাপতি, মথ, বোলতা ইত্যাদি।
গবেষণায় দেখা যায়, শতকরা ৮০ ভাগেরও বেশি পুষ্পধারণকারী উদ্ভিদের পরাগায়ন নির্ভর করে কীটপতঙ্গ তথা বিভিন্ন প্রজাতির মধু সংগ্রহকারী মাছির ওপর। পৃথিবীতে ২৫০০০ এর বেশি প্রজাতির মধু সংগ্রহকারী মাছি আছে, যার মধ্যে রয়েছে মৌমাছি, ভ্রমর, স্টিংলেস-বি, সলিটারী-বি ইত্যাদি। আবার এই মাছিগুলোর মধ্যে মৌমাছি পৃথিবীর ৭০% চাষাবাদকৃত ফসলকে পরাগিত (চড়ষষরহধঃব) করে থাকে। চাষাবাদকৃত ফসলের জন্য মৌমাছি হচ্ছে খুবই দক্ষ পরাগায়নকারী। গবেষণায় আরো দেখা গেছে যে, হিমালয়ান অঞ্চলে নিয়ন্ত্রিত উপায়ে মৌমাছি পালন করে তাদের দ্বারা পরাগায়ন ঘটিয়ে বিভিন্ন ধরনের ফলের ফলধারণ ও গুণগতমান বৃদ্ধি পেয়েছে এবং ফল ঝরে পড়া কমে গিয়েছে। উদাহরণস্বরূপ- আপেল, পিচ, পাম, সাইট্রাস, স্ট্রবেরি ইত্যাদি ফলের ফলধারণ বৃদ্ধি পেয়েছে যথাক্রমে- ১০%, ২২%, ১৩%, ২৪% এবং ১১২% এবং ফলের ওজন বেড়েছে যথাক্রমে- ৩৩%, ৪৪%, ৩৯%, ৩৫% এবং ৪৮%। আবার দেখা গেছে মৌমাছি পরাগায়নের দ্বারা লেবুজাতীয় ফলের রস ও মিষ্টতা বৃদ্ধি পেয়েছে।
বিভিন্ন ধরনের সবজি জাতীয় ফসল যেমন- বাঁধাকপি, ফুলকপি, মুলা, লেটুস ইত্যাদি ফসলের ফলধারণ বৃদ্ধি পেয়েছে যথাক্রমে- ২৮%, ২৪%, ২৩% এবং ১২% এবং বীজধারণ বৃদ্ধি পেয়েছে যথাক্রমে- ৪০%, ৩৭%, ৩৪% এবং ৯%। গবেষণায় আরও দেখা গেছে নিয়ন্ত্রিত মৌমাছি পরাগায়ন তেলবীজ জাতীয় ফসল যেমন- সরিষা ও রাইজাতীয় ফসল এবং সূর্যমূখীতে জাতভেদে ২০-৪০% পর্যন্ত ফলন বৃদ্ধি করে এবং এ ছাড়াও বীজে তেলের পরিমাণ ও বীজের অঙ্কুরোদগম হার উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দেয়। মসলাজাতীয় ফসল যেমন পেঁয়াজ বীজ, ধনিয়া, কালিজিরা, মৌরি, শলুক, ফিরিঙ্গি ইত্যাদি ফসলের ফলন গড়ে ২০-৩০% বেড়ে যায় এবং বীজের সজীবতা ও অঙ্কুরোদগম হারও বৃদ্ধি পায়।
সুতরাং দেখা যাচ্ছে যে, ফসলের পরাগায়নের জন্য বিভিন্ন পোকামাকড় বিশেষ করে মৌমাছি, মাছি, বিটল, প্রজাপতি, মথ, বোলতা ইত্যাদির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও অপরিহার্য। এই পরাগায়নের মাধ্যমেই ফসলের বীজ ও ফল সৃষ্টি হয়, যা ফসলের ফলন বৃদ্ধি করে এবং ফলের গুণাবলী উন্নত করে। পৃথিবীর প্রায় ৩৫% খাদ্য উৎপাদন কীটপতঙ্গ পরাগায়নের ওপর নির্ভর করে।
প্রাকৃতিকভাবে পোকামাকড় দমন
উপকারী পোকামাকড়গুলো প্রাকৃতিকভাবে ফসলের ক্ষতিকর পোকামাকড় দমন করে থাকে। পরভোজী পোকা যেমন- লেডী বিটল, লেসউইং বাগ, সিরফিড ফ্লাই, পরভোজী মাকড়, প্রেয়িং ম্যানটিড ফসলের ক্ষতিকর পোকামাকড়কে শিকার করে ভক্ষণ করে এবং পরজীবী বোলতারা পোষক পোকামাকড়ের ডিম, কীড়া, পুত্তলী বা পূর্ণ পোকার দেহের ভেতরে বা বাইরে ডিম পেড়ে দেয় এবং ডিম থেকে কীড়া বের হয়ে ঐসব দশাকে ধ্বংস করে পোকামাকড়ের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে রাখে।
লেডি বিটল : লেডি বিটল এক অতিভোজী পরভোজী পোকা। এরা ছোট ও নরম দেহবিশিষ্ট পোকামাকড় যেমন- জাবপোকা, মিলিবাগ, স্কেলপোকা, থ্রিপস এবং মাকড়কে ধরে খেয়ে ফেলে। একটি লেডি বিটল তার কীড়াধাপ থেকে পূর্ণাঙ্গ পোকা হয়ে বেঁচে থাকা জীবদ্দশায় প্রায় ৫০০০ জাবপোকা খেয়ে থাকে, যা তাদেরকে পোকামাকড় দমনের ক্ষেত্রে দক্ষ এবং স্বল্প খরচে অত্যন্ত কার্যকর সমাধান হিসেবে অভিহিত করেছে।
লেসউইং : লেসউইং এর কীড়া এবং প্রাপ্তবয়স্ক পোকা উভয়ই খুবই কার্যকরী প্রাকৃতিক পরভোজী পোকা । এরা কৃষির জন্য ক্ষতিকর পোকামাকড় দমনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। লেসউইং এর কীড়া এবং প্রাপ্তবয়স্ক পোকা উভয়ই নরমদেহী ক্ষতিকর পোকা যেমন- জাবপোকা, মাকড়, থ্রিপস, সাদামাছি, মিলিবাগ, ছোট ক্যাটারপিলার ইত্যাদিকে ভক্ষণ করে থাকে। একটি লেসউইং কীড়া প্রতি সপ্তাহে গড়ে প্রায় ২০০টি জাবপোকা ভক্ষণ করতে পারে।
সিরফিড ফ্লাই : সিরফিড ফ্লাই এর প্রাপ্তবয়স্ক পোকা ফসলের ফুল থেকে নেকটার সংগ্রহ করে এবং পরাগায়ন ঘটায়। কিন্তু এদের কীড়া বিভিন্ন ফসলের বিশেষ করে ফল, সবজি, তেল ও মসলা ফসলের ক্ষতিকর নরমদেহী ছোট ছোট পোকা যেমন- জাবপোকা, সাদামাছি, মিলিবাগ, থ্রিপস, স্কেলপোকা, লিফহপার, প্লান্টহপার ইত্যাদিকে ভক্ষণ করে থাকে এবং এসব পোকাদের প্রাকৃতিক শত্রু হিসেবে কাজ করে থাকে। একটি সিরফিড ফ্লাই কীড়া ৪০০টি পর্যন্ত জাবপোকা ভক্ষণ করতে পারে। পর্যাপ্ত পরিমাণে সিরফিড ফ্লাই এর কীড়া শস্যক্ষেতে থাকলে জাবপোকার সংখ্যা ৭০-১০০% পর্যন্ত কমিয়ে দিতে পারে।
পরভোজী মাকড় : পরভোজী মাকড় কৃষির জন্য অতিব গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক পরভোজী। এরা বিভিন্ন ধরনের ক্ষতির পোকামাকড়কে দমন করে টেকসই ফসল ব্যবস্থাপনায় অবদান রাখে। পরভোজী মাকড়গুলো স্পাইডার মাইট দমনের জন্য খুবই কার্যকরী। এরা স্পাইডার মাইটের ডিম, নিম্ফ এবং প্রাপ্ত বয়স্ক মাইট খেয়ে এদের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দেয়। এই প্রাকৃতিক দমন পদ্ধতিটি মাঠে এবং বিশেষ করে গ্রিন হাউজে খুবই উপকারী। স্পাইডার মাইট ছাড়াও এরা অন্যান্য ক্ষতিকর পোকামাকড়কেও খেয়ে থাকে।
ú্রইেং ম্যানটিড : ú্রইেং ম্যানটিড হচ্ছে দুর্দান্ত প্রাকৃতিক পরভোজী। কৃষি ফসলের ক্ষতিকর পোকামাকড় দমনে এরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। ú্রইেং ম্যানটিডের পোকামাকড় ভক্ষণের ব্যাপকতা অনেক বিস্তৃত। এরা জাবপোকা, ক্যাটারপিলার, গ্রাসহোপার, বিটল, মাছি, মথ, তেলাপোকা ইত্যাদি বিভিন্ন ধরনের পোকামাকড় ধরে খায়। এই বিচিত্র ভোজন প্রণালীর ফলে তারা বিভিন্ন ধরনের পোকামাকড়ের সংখ্যাকে কমিয়ে রাখে। উল্লেখ্য যে, স্প্রেইং ম্যানটিড শুধু ক্ষতিকর পোকামাকড়ই ভক্ষণ করে না, এরা উপকারী বন্ধু পোকাদেরও যেমন- লেসউইং, লেডিবিটল, হোবারফ্লাই, বাটারফ্লাই ইত্যাদিকেও ধার যায়।
পরজীবী বোলতা : পরজীবী বোলতারা টেকসই কৃষির জন্য অতিব গুরুত্বপূর্ণ বন্ধু। পরজীবীয় বোলতাগুলো নির্দিষ্ট পোষক পোকা যেমন- জাবপোকা, সাদামাছি ও ক্ষতিকর ক্যাটারপিলারকে লক্ষ্য করে তাদের দেহের ভিতরে অথবা দেহের বাহিরে ডিম পাড়ে। সেই ডিম ফুটে কীড়া বের হয়ে সেই পোষক পোকাকে খেয়ে ধ্বংস করে কার্যকরীভাবে ক্ষতিকর পোষক পোকাকে দমন করে। প্রাকৃতিক এই দমন ব্যবস্থা কৃষিকে টেকসই করতে নিরবে অবদান রেখে চলেছে।
পরিশেষে বলা যায়, কৃষির সমৃদ্ধি ও টেকসই উন্নয়নের জন্য পরাগায়নকারী কীটপতঙ্গকে সুরক্ষা ও সংরক্ষণের জন্য তাদের আবাসস্থল সংরক্ষণ, মাত্রাতিরিক্ত বালাইনাশকের প্রয়োগ নিরুৎসাহিতকরণ, গাছের পুষ্পায়নকালে বালাইনাশক ব্যবহার না করা, রাসায়নিক বালাইনাশকের বিকল্প হিসেবে পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি যেমন- চাষপদ্ধতিগত পরিচর্যা বা কৌশল, জৈব বালাই ব্যবস্থাপনা (যেমন-বালাইয়ের প্রাকৃতিক শত্রু, ফেরোমন ফাঁদ এবং অনুজীবিয় বালাইনাশক ইত্যাদি), বালাই প্রতিরোধী জাত এবং ট্রান্সজেনিক ফসল ইত্যাদি ব্যবহার করতে হবে।
এ ছাড়া সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা কৌশলে উল্লেখিত উপকারী পরভোজী ও পরজীবী পোকামাকড়গুলোকে অন্তর্ভুক্তিকরণ পোকামাকড় দমনের একটা প্রাকৃতিক এবং টেকসই প্রযুক্তি। উপকারী পোকামাকড়ের সাহায্যে কার্যকরীভাবে ক্ষতিকর পোকামাকড় দমন ইকোলজিক্যাল সমতা নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে এবং অধিকতর স্বাস্থ্যকর ইকোসিস্টেম তৈরি হয়। প্রাকৃতিক বন্ধু পোকামাকড় দ্বারা ক্ষতিকর পোকামাকড় দমন পদ্ধতি রাসায়নিক বালাইনাশক ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তা কমিয়ে দেয়। এতে করে শুধু ফসলের উৎপাদন খরচই কমে তা নয় বরং রাসায়নিক বালাইনাশক ব্যবহারে পরিবেশের প্রতি ক্ষতিকর প্রভাবকে কমিয়ে দিয়ে বন্ধু পোকাদের সংখ্যা বৃদ্ধি ও সংরক্ষণের ভূমিকা রাখে এবং অধিকতর স্বাস্থ্যকর ফসল উৎপাদন ব্যবস্থা উপহার দিয়ে থাকে।
সুতরাং, টেকসই কৃষি উন্নয়ন কর্মসূচিতে পরাগায়নের জন্য মৌচাষ কার্যক্রমকে অন্তর্ভুক্তিকরণ এবং সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা কর্মসূচিতে জৈব বালাইনাশকের ব্যবহার, পরভোজী ও পরজীবী প্রাকৃতিক পোকামাকড়দের অন্তর্ভুক্ত ও সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা গেলে বালাইয়ের আক্রমণের দ্বারা ফসল বিনষ্টের পরিমাণ সর্বনিম্ন পর্যায়ে থাকবে এবং টেকসই কৃষি ও এগ্রো-ইকোসিস্টেম সুনিশ্চিত হবে।
লেখক : পরিচালক কন্দাল ফসল, কৃষি গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট, গাজিপুর, মোবাইল : ০১৭২৫-০৩৪৫৯৫,