কনটেন্টটি শেষ হাল-নাগাদ করা হয়েছে: বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল, ২০২৬ এ ১২:৫৯ PM

টেকসই উন্নয়নে কৃষি ও কৃষক সমবায় সমিতির ভূমিকা

কন্টেন্ট: কৃষি কথা মাস: বৈশাখ সাল: ১৪৩৩ প্রকাশের তারিখ: ১৬-০৪-২০২৬

টেকসই উন্নয়নে কৃষি ও কৃষক সমবায় সমিতির ভূমিকা
ড. মোছা: আমেনা খাতুন
কৃষি বলতে খাদ্যজাত পণ্য, আঁশ, উদ্যানজাত ফসল, পশুপালন, মৎস্য এবং বনজ সম্পদসহ বিভিন্ন উপখাত নিয়ে গঠিত সংশ্লিষ্ট পরিষেবা উৎপাদনের জন্য প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবহার করার কৌশলকে বোঝায়। বাংলাদেশের অর্থনীতি কৃষিভিত্তিক এবং কৃষকগণ তার মূল কারিগরি অংশিদ্বার। সে প্রয়োজনীয়তাকে উপলব্ধি করে বাংলাদেশ সরকার সমবায় ভিত্তিক বিভিন্ন সেবা প্রদানের জন্য সমবায় আইন ২০০১ এ গ্রাম পর্যায়ে কৃষক সমবায় সমিতি এবং কমপক্ষে ১০টি কৃষক সমবায় সমিতি নিয়ে উপজেলা কেন্দ্রীয় সমবায় সমিতি গঠনের বিধিমালা ২০০৪ প্রনয়ণ করেন এবং বিভিন্ন সমস্যার প্রেক্ষিতে সংশোধনের জন্য সমবায় সংশোধিত আইন ২০১৩ এবং সংশোধিত বিধিমালা ২০২০ জারি হয়। কৃষক সমবায় সমিতি এমন একটি সংগঠন যা কৃষকদের একত্রিত করে তাদের কৃষি সম্পর্কিত বিভিন্ন চাহিদা পূরণ এবং অর্থনৈতিক উন্নতির জন্য কাজ করে। কৃষকরা সমবায় ভিত্তিক জমি একত্র করে যৌথভাবে যন্ত্রপাতি, বীজ, সার ক্রয়ে সাহায্য করে চাষাবাদ করে, যা উৎপাদন দ্বিগুণ করে, খরচ কমায় এবং বাজারজাতকরণে ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করে। এগুলো জলবায়ু সহনশীল, পরিবেশবান্ধব ফসল উৎপাদনে সহায়তা করে এবং পুষ্টিকর খাদ্য নিরাপত্তা বাড়ায়। তাই স্থানীয় স্তরে সমবায় শক্তি জোরদার করলে দারিদ্র্য হ্রাস ও পরিবেশগত টেকসইতা দ্রুত অর্জন সম্ভব হবে।
সমবায়ের মূলকথা একতাই বল। একতাবদ্ধ থাকলে শক্তি বৃদ্ধি পায়, মনে সাহস সৃষ্টি হয় এবং জীবনের সাফল্য অনিবার্য হয়ে উঠে। জাতীয় সংহতি বা একতা জাতিকে শক্তিশালী করে তোলে। এতে জাতীয় উন্নতির পথ সুগম হয়। সভ্যতার অগ্রগতির পেছনেও কাজ করছে একতাবোধ। তাই ‘দশে মিলে করি কাজ, হারি জিতি নাহি লাজ’ এই প্রবাদ বাক্যে একতার প্রয়োজনীয়তা স্বীকৃত হয়েছে। একতার মাঝেই জাতি তথা বিশে^র মুক্তি ও কল্যাণ নিহিত।
সমবায়ের সুবিধাগুলো : সমবায়ের মাধ্যমে সহজে নিজেদের উন্নতিসহ এলাকার উন্নয়নমূলক কাজ করা যায়; আর্থিক সচ্ছলতা আনয়ন করা যায়; শ্রমজীবী মানুষ একজনের পক্ষে যে কাজ সম্ভব নয়, সমবায়ের মাধ্যমে ১০ জনের পক্ষে সে কাজ সম্পূর্ণ করা সম্ভব হয়; সমবায়ের সদস্যদের এবং বেকার লোকদের কর্মসংস্থান হয়; সমবায়ের মাধ্যমে সমবায়ের সদস্যরা সঞ্চয়ে উৎসাহী হয়; সমবায়ের মাধ্যমে সামাজিক শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়।
আন্তর্জাতিক সমবায়ের মূলনীতিগুলো : অবাধ ও স্বতঃ সদস্যপদ গ্রহণ; গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাপনা; সমিতির তহবিলে সদস্যদের অংশগ্রহণ এবং সম অধিকার; উদ্বৃত্ত অংশেও সকল সদস্যের অধিকার; সমিতির সদস্যদের নিয়মিতভাবে সমবায় শিক্ষাদানের ব্যবস্থা; সদস্যদের পরস্পরের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতার।
টেকসই কৃষি উন্নয়নে কৃষক সমবায়ের করণীয় :
সমবায়ের নীতি অনুসারে যার জমি তারই থাকবে, কেবল সবাই একত্রে কাজ করবে ও উৎপাদিত ফসল প্রত্যেকের জমি অনুপাতে ভাগ করে নেবে। এই পদ্ধতি অনুসরণ করা হলে ভূমির খন্ডবিখন্ডতা হ্রাস পাবে এবং আধুনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা সম্ভব হওয়ায় উৎপাদনও উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাবে। এ পদ্ধতিতে কৃষকরা স্বেচ্ছায় নিজেদের জমি একত্রিত করে যৌথভাবে চাষাবাদ করেন। জমির উর্বরতা ও পরিমাণ অনুসারে কৃষক উৎপাদিত ফসলের অংশ পাবেন। সমবায়ের মাধ্যমে কৃষি যন্ত্রপাতি, সার, কীটনাশক, উত্তম বীজ প্রভৃতি সংগ্রহ এবং প্রয়োজনমতো সেচ ও নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করে উন্নত চাষাবাদের ব্যবস্থা করা যায়। কোথাও কোথাও এরই মধ্যে সমবায় খামার স্থাপনের মাধ্যমে অত্যন্ত সাফল্য অর্জন করা সম্ভব হয়েছে। তাইওয়ান এবং চীন এর উদাহরণ। বাংলাদেশের কৃষিতে সমবায় ভিত্তিক চাষাবাদের ব্যবস্থা করলে কৃষকরা আধুনিক যন্ত্রপাতি প্রয়োগ করে জমি আবাদ করতে সক্ষম হবেন। ফলে একর প্রতি ফলন বৃদ্ধি পেয়ে কৃষি সমস্যার অনেকটা সমাধান হবে। তাই বাংলাদেশের কৃষি ব্যবস্থার উন্নয়নকল্পে এ দেশের সর্বত্র সমবায়ের ভিত্তিতে জমিজমা আবাদের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।
যৌথ বিনিয়োগ, প্রশিক্ষণ, বাজার সংযোগ এবং সরকারি সমর্থন নিশ্চিত করতে উপজেলা সমবায় অফিস, পল্লী ভবন তথা উপজেলা পল্লী উন্নয়ন অফিস এবং উপজেলা কৃষি অফিসের সাথে সরাসরি সম্বনয় রাখা প্রয়োজন।
বাংলাদেশের কৃষক সমবায়গুলো বাজারে প্রবেশ ও রপ্তানির জন্য যৌথভাবে সংগঠিত হয়ে, মধ্যস্বত্বভোগী বাদ দিয়ে সরাসরি ক্রেতার সাথে যোগাযোগ গড়ে তুলতে হবে পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মানের পণ্য উৎপাদন নিশ্চিত করতে হবে। যশোরের নারী সমিতিগুলোর সবজি রপ্তানি তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ।
সমবায়গুলো যৌথভাবে গুদাম, পরিবহন এবং প্যাকেজিং ব্যবস্থা গড়ে তুলে স্থানীয় বাজারে ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করেতে ইউনিয়ন-জেলা ফেডারেশনের মাধ্যমে বৃহত্তর বাজারজাতকরণ বলয় তৈরি করতে হবে। প্রশিক্ষণ নিয়ে মানসম্মত উৎপাদন করে ব্র্যান্ডিং এবং ডিজিটাল মার্কেটিং ব্যবহার করতে হবে। ইতিমধ্যে পাট পণ্য রপ্তানিতে বাংলাদেশ পঞ্চম স্থান অধিকার করেছে।
সমবায় সমিতি সরকারি ভর্তুকি, সম্প্রসারণ সেবা ও প্রকল্পে কৃষকদের সংগঠিতভাবে যুক্ত করতে পারলে সরকারের নীতির সুফল দ্রুত মাঠপর্যায়ে পৌঁছে যাবে।
চ্যালেঞ্জ ও সীমাবদ্ধতা
যদিও কৃষক সমবায় সমিতির সম্ভাবনা ব্যাপক, তবে দুর্বল সুশাসন, দক্ষ ব্যবস্থাপনার অভাব, রাজনৈতিক প্রভাব ও অপ্রয়োজনীয় হস্তক্ষেপ, আর্থিক স্বচ্ছতার ঘাটতি, গবেষণা ও উদ্ভাবনের সঙ্গে সমবায়ের সংযোগহীনতা এবং তথ্যপ্রযুক্তি ও ডিজিটাল ব্যবস্থার সীমিত ব্যবহার এর কার্যকারিতা সীমিত করে। এসব সমস্যা সমাধানে নীতিগত সহায়তা ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার প্রয়োজন। সঠিক নীতিমালা, দক্ষ নেতৃত্ব ও সরকারি-বেসরকারি সমন্বয়ের মাধ্যমে সমবায়ভিত্তিক কৃষি উন্নয়ন দেশের খাদ্য নিরাপত্তা, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং গ্রামীণ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখতে পারে।
টেকসই উন্নয়নে কৃষক সমাজে সমবায় সমিতির বাস্তব ভূমিকা
কৃষক সমাজে সমবায়ের চেতনা না থাকার কারণে যৌথ উদ্যোগে কৃষিকাজ করা অনেকটা কঠিন। কেউ কেউ সমবায়ের প্রতি নেতিবাচক ধারণাও পোষণ করে থাকেন। দল বেঁধে কাজ করাকে অনেক সময় ভালো চোখে দেখা হয় না। বিরাজমান সামাজিক অবস্থা, আর্থিক অনটন, নিরক্ষরতা, হিংসা, অলসতা, অবহেলা, অনীহা, পারিবারিক বাধা প্রভৃতি কারণে সম্মিলিতভাবে কৃষিকাজ করা অনেক ক্ষেত্রে সম্ভব হয় না। বাংলাদেশের প্রায় সব পেশার লোকদের সমিতি/ক্লাব রয়েছে। অথচ কৃষকদের মধ্যে সমিতি/দলভিত্তিক কাজ করার চেতনা এখনো সীমিত। সরকারের সফল প্রচেষ্টায় সমবায় প্রতিষ্ঠানগুলো স্বতঃপ্রণোদিতভাবে মূলধন গঠন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে প্রশংসনীয় অবদান রেখে চলেছে। যদিও কিছু কিছু অসাধু ব্যক্তি সমবায় সমিতি নিবন্ধনের মাধ্যমে দেশের দারিদ্র্যবিমোচন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে কাজ না করে সরকারি ঋণ বা অনুদান গ্রহণ, জমি, জলমহাল ও হাটবাজার ইজারা নিয়ে ব্যক্তিগতভাবে লাভবান হচ্ছে। এতে করে দারিদ্র্যপীড়িত সমবায়ী জনগণের জীবনযাপনের মান উন্নত না হওয়ায় সমবায় অঙ্গনে বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হচ্ছে। সমবায় খামার গড়ে তোলার প্রবণতা ও মানসিকতার অভাবের কারণে কৃষির আধুনিকায়ন ও কৃষির যান্ত্রিকীকরণ করা সম্ভব হচ্ছে না। শোষণমুক্ত সমাজ গড়ে তুলতে, কৃষি সম্প্রসারণে, কৃষিজাত দ্রব্যাদির ন্যায্যমূল্য আদায়ে এবং কৃষকদের মধ্যে পারস্পরিক সৌহার্দ্য, সম্প্রীতি ও সহযোগিতার মনোভাব গড়ে তুলতে যৌথ খামার প্রবর্তন করা দরকার। স্থানীয়ভাবেই শুধু নয়, জাতীয় ভিত্তিতে সুসংগঠিত হওয়াও কৃষকদের জন্য একান্ত প্রয়োজন। তাই কৃষক, ব্জেলে, কামার, কুমার, তাঁতি, ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীসহ সকল শ্রেণি পেশার মহিলা, পুরুষ ও তৃতীয় লিঙ্গের জনগোষ্ঠিকে সমবায়ের আয়ত্তে আসতে হবে নিজেদের আর্থিক অবস্থার উন্নতির জন্য একতাবদ্ধ হয়ে কাজ করতে হবে। সবাইকে মনেপ্রাণে বুঝতে হবে সহযোগিতা এবং সমবায় হলো দেশ গড়ার বড় হাতিয়ার ও উন্নয়নের চাবিকাঠি।

লেখক : সহকারী পরিচালক, বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন বোর্ড, ঢাকা। মোবাইল : ০১৭১৪৫১৭২৪৭,

ফাইল ১

এক্সেসিবিলিটি

স্ক্রিন রিডার ডাউনলোড করুন