কনটেন্টটি শেষ হাল-নাগাদ করা হয়েছে: মঙ্গলবার, ২০ জানুয়ারী, ২০২৬ এ ০২:১৯ PM

জৈবসারভিত্তিক শীতকালীন সবজি চাষ ও প্রাণিসম্পদ উন্নয়ন : যুব উদ্যোক্তা তৈরির কৌশল

কন্টেন্ট: কৃষি কথা মাস: মাঘ সাল: ১৪৩২ প্রকাশের তারিখ: ২০-০১-২০২৬

জৈবসারভিত্তিক শীতকালীন সবজি চাষ ও প্রাণিসম্পদ উন্নয়ন : যুব উদ্যোক্তা তৈরির কৌশল
ড. মো. জোবাইদুল কবীর
স্বাস্থ্য ও টেকসই অর্থনীতির ভিত্তি
বাংলাদেশের কৃষি খাত কেবল দেশের খাদ্য নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দেয় না, বরং এটি গ্রামীণ অর্থনীতি ও জীবিকা নির্বাহের মূল চালিকাশক্তি। একবিংশ শতাব্দীর বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ও জলবায়ু পরিবর্তনের ক্রমবর্ধমান চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা, মাটির স্বাস্থ্য সংরক্ষণ এবং জনস্বাস্থ্যের জন্য নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করার তাগিদে বর্তমানে টেকসই কৃষি পদ্ধতি অবলম্বন করা অপরিহার্য। এই প্রেক্ষাপটে, গবাদি পশুপাখির বিষ্ঠা থেকে বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়ায় উৎপাদিত কম্পোস্ট, ভার্মিকম্পোস্ট এবং ট্রাইকোডার্মা সারের ব্যবহার আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত পরিবেশবান্ধব কৃষি কৌশলগুলোর সঙ্গে সম্পূর্ণ সামঞ্জস্যপূর্ণ। এই জৈবসারভিত্তিক মডেলটি মূলত ‘এক স্বাস্থ্য’ ধারণার ওপর নির্ভরশীল, যেখানে পরিবেশের স্বাস্থ্য, পশুর স্বাস্থ্য এবং মানব স্বাস্থ্যকে অবিচ্ছেদ্য হিসেবে দেখা হয়। এটি একদিকে যেমন দেশের পুষ্টি চাহিদা মেটানো ও শীতকালীন সবজির উৎপাদন ও গুণগত মান বৃদ্ধি করে, তেমনি কৃষি বর্জ্যকে ‘দায়’ না রেখে ‘সম্পদে’ পরিণত করার মাধ্যমে নতুন যুব উদ্যোক্তা তৈরির বিশাল সম্ভাবনা সৃষ্টি করে। এর মূল উদ্দেশ্য হলো বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে পরিবেশ দূষণ ও ঝুঁকি হ্রাস করা।
শীতকালীন সবজি চাষে জৈবসারের কার্যকারিতা ও আন্তর্জাতিক মানদ-
শীতকালীন সবজি যেমন-টমেটো, বাঁধাকপি, ফুলকপি, বেগুন, গাজর ইত্যাদির সফল ও বাণিজ্যিক উৎপাদনের জন্য মাটির সঠিক পুষ্টি ও স্বাস্থ্য নিশ্চিত করা অত্যাবশ্যক। রাসায়নিক সার নির্ভরতা কমিয়ে জৈবসারের প্রয়োগ বহুবিধ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মানদ- পূরণ করে, যা মাটির দীর্ঘমেয়াদী উর্বরতা নিশ্চিত করে।
রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা : কেঁচোর হজম প্রক্রিয়া থেকে প্রাপ্ত উপকারী অণুজীব সবজি গাছের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে ভূমিকা রাখে।
শীতকালীন সবজিতে ব্যবহার : বেগুন, গাজর, মটরশুঁটি ইত্যাদি সবজির জমিতে ভার্মিকম্পোস্ট ব্যবহার করে আশানুরূপ ফলন পাওয়া সম্ভব।
প্রাণিসম্পদ উন্নয়ন ও জৈবসার উৎপাদন : উদ্যোক্তা তৈরির সম্ভাবনা
গবাদি পশুপাখির বর্জ্যকে সঠিকভাবে কাজে লাগানোই হলো টেকসই প্রাণিসম্পদ উন্নয়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। জৈবসারের ক্রমবর্ধমান চাহিদা এবং সরকারি নীতিমালার কারণে এর উৎপাদন এখন একটি লাভজনক ব্যবসায়িক মডেলে পরিণত হয়েছে। গবাদি পশুপাখির বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে নতুন উদ্যোক্তা তৈরি করে দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখা সম্ভব।
বর্জ্য থেকে সম্পদে রূপান্তর
প্রাণিসম্পদ খামারগুলো প্রায়শই বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সমস্যায় ভোগে, যা পরিবেশ দূষণ ঘটায়। জৈবসার উৎপাদন এই সমস্যা সমাধানে একটি কার্যকর উপায়।
সমন্বিত কৃষি : জৈবসার উৎপাদন কৃষি ও প্রাণিসম্পদ খাতের মধ্যে একটি সুদৃঢ় সমন্বয় তৈরি করে। খামারের বর্জ্য জমিতে সার হিসেবে ফিরে আসে, যা কৃষির উৎপাদন বাড়ায় এবং পুষ্টির চক্র পূর্ণ করে।
আয়ের উৎস : গবাদি পশুর বিষ্ঠা বা পোল্ট্রি লিটার এখন আর বর্জ্য নয়, বরং তা ভার্মিকম্পোস্ট বা কম্পোস্ট বা ট্রাইকোডার্মা আকারে বিক্রি করে খামারিরা অতিরিক্ত আয় করতে পারে। এটি গ্রামীণ উদ্যোক্তা হওয়ার এক সহজ পথ।
পরিবেশগত সুরক্ষা : পশুর বর্জ্যকে খোলা জায়গায় জমা হতে না দিয়ে নিয়ন্ত্রিতভাবে সার উৎপাদনে ব্যবহার করলে তা ভূগর্ভস্থ জল দূষণ এবং এমোনিয়াজনিত রোগজীবাণু ছড়ানো রোধ করে। এটি উন্নত পরিবেশ ব্যবস্থাপনার জাতীয় নীতিমালার একটি প্রতিফলন।
যুব ও তরুণ উদ্যোক্তাদের সুযোগ
কৃষিভিত্তিক তরুণ উদ্যোক্তারা ভার্মিকম্পোস্ট ও ট্রাইকোডার্মা সারের উৎপাদনকে একটি ছোট বা মাঝারি আকারের শিল্প হিসেবে গ্রহণ করতে পারে। কেননা-
অল্প বিনিয়োগে শুরু : ট্রাইকোডার্মা সার, ভার্মিকম্পোস্ট ও কম্পোস্ট উৎপাদন শুরু করতে তুলনামূলকভাবে কম পুঁজি ও সহজ প্রযুক্তির ব্যবহার যথেষ্ট। এটি গ্রামীণ যুবকদের জন্য অত্যন্ত উপযোগী।
কাঁচামালের সহজলভ্যতা : গবাদি পশুর বিষ্ঠা এবং কৃষিজ বর্জ্য সহজলভ্য হওয়ায় কাঁচামাল নিয়ে কোনো দুশ্চিন্তা থাকে না।
বাজারের চাহিদা : নিরাপদ খাদ্য ও পরিবেশবান্ধব কৃষির প্রতি মানুষের আগ্রহ বাড়ায় স্থানীয় ও বাণিজ্যিক উভয় বাজারেই জৈবসারের চাহিদা দিন দিন বাড়ছে।
মূল্য সংযোজন : উদ্যোক্তারা কেবল সার উৎপাদন নয়, বরং উন্নত প্যাকেজিং, ব্র্যান্ডিং এবং অনলাইন মার্কেটিংয়ের মাধ্যমে তাদের পণ্যের মূল্য আরও বাড়াতে পারে।
সরকারি ও বেসরকারি সহযোগিতা
জৈব সার উৎপাদনে উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করতে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে সহযোগিতা জরুরি।
ঋণ ও অনুদান : কৃষিভিত্তিক ছোট উদ্যোগের জন্য সহজ শর্তে ঋণ এবং সরকারি অনুদানের ব্যবস্থা করা।
নীতিমালা প্রণয়ন : জৈব সার সার্টিফিকেশন ও গুণগত মান নিয়ন্ত্রণের জন্য সুনির্দিষ্ট নীতিমালা তৈরি করা, যাতে ক্রেতারা আস্থা রাখতে পারে।
বাজার সম্প্রসারণ : স্থানীয় বাজার ছাড়াও বিদেশে জৈবসার রপ্তানির সুযোগ তৈরি করতে সরকারকে উদ্যোগী হতে হবে।
প্রযুক্তিগত দক্ষতা : উদ্যোক্তাদের ভার্মিকম্পোস্ট পিট তৈরি, কেঁচো প্রতিপালন, ট্রাইকোডার্মা কালচার তৈরি ও ব্যবহারের সঠিক পদ্ধতি সম্পর্কে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া জরুরি।
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর (উখঝ) এবং গুড লাইভস্টক প্র্যাকটিসেস (এখচ)-এর মাধ্যমে উদ্যোক্তা তৈরি
টেকসই প্রাণিসম্পদ উন্নয়ন কেবল পশুর স্বাস্থ্য ও উৎপাদন বৃদ্ধির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি বর্জ্যকে সম্পদে পরিণত করার এক কার্যকর মডেল। জৈবসার উৎপাদন এই মডেলের মূল ভিত্তি। এই প্রক্রিয়ায় প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর গুরুত্বপূর্ণ নিয়ন্ত্রক ও সহায়ক ভূমিকা পালন করে।
সুসংহত প্রাণিসম্পদ ব্যবস্থাপনা ও এখচ-এ উখঝ-এর ভূমিকা : টেকসই কৃষি নিশ্চিত করতে হলে প্রাণিসম্পদ খামারে গুড লাইভস্টক প্র্যাকটিসেস অনুসরণ করা অপরিহার্য। উখঝ হলো এখচ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে প্রধান সরকারি সংস্থা।
স্বাস্থ্যকর কাঁচামাল নিশ্চিতকরণ : উখঝ খামারিদের প্রাণী স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা এবং পশুর রোগ নিয়ন্ত্রণ বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেয়। এর মাধ্যমে পশুর বিষ্ঠায় ক্ষতিকারক প্যাথোজেন বা অ্যান্টিবায়োটিকের অবশিষ্টাংশ হ্রাস নিশ্চিত করা হয়। এই উন্নত মানের গোবর বা পোল্ট্রির বিষ্ঠা জৈবসারের কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ায় ভার্মিকম্পোস্ট ও কম্পোস্টের গুণগত মান আন্তর্জাতিক মানদ-ে উন্নীত হয়।
পশুর কল্যাণে নজরদারি : এখচ-এর মাধ্যমে উখঝ পশুর জীবনযাত্রার মান ও কল্যাণ নিশ্চিত করে। এটি ‘এক স্বাস্থ্য’ নীতির বাস্তবায়নে সরাসরি প্রভাব ফেলে, কারণ সুস্থ পশুর বর্জ্য পরিবেশ ও খাদ্যের জন্য নিরাপদ হয়।
প্রশিক্ষণ ও সম্প্রসারণ : উখঝ মাঠ পর্যায়ে পশু পালনকারীদের বর্জ্য সংগ্রহের সঠিক পদ্ধতি, সংরক্ষণ এবং প্রাথমিক প্রক্রিয়াকরণের বিষয়ে কারিগরি সহায়তা প্রদান করে। এই প্রশিক্ষণ উচ্চ-মানের জৈবসার উৎপাদনের জন্য অপরিহার্য।
সমন্বিত খামার ও যুব উদ্যোক্তা তৈরি
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর এবং কৃষি তথ্য সার্ভিসের সমন্বয়ের মাধ্যমে যুব উদ্যোক্তা তৈরিকে উৎসাহিত করা হয়।
নীতি সহায়তা ও সার্টিফিকেশন : উখঝ খামারগুলোকে এখচ এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মানদ-ের ভিত্তিতে প্রত্যয়ন করে। এই প্রত্যয়ন জৈবসার উদ্যোক্তাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি তাদের উৎপাদিত সারের কাঁচামালের উৎসের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করে, যা পরবর্তীতে জৈবসার সার্টিফিকেশনের ভিত্তি তৈরি করে।
অর্থনৈতিক লাভজনকতা : উখঝ-এর তত্ত্বাবধানে এখচ অনুসরণের ফলে খামারিরা অতিরিক্ত আয় করতে পারে। এই মূল্য সংযোজন যুবকদের জৈবসার শিল্পে বিনিয়োগ করতে উৎসাহিত করে। ট্রাইকোডার্মা সার, ভার্মিকম্পোস্ট ও কম্পোস্ট সারের বাণিজ্যিক উৎপাদনে যুবকদের উৎসাহিত করা গ্রামীণ বেকারত্ব হ্রাসের গুরুত্বপূর্ণ কার্যকর কৌশল।
প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং স্মার্ট ফার্মিং
টেকসই প্রযুক্তি : উঅঊ এবং অওঝ-এর সাথে যৌথভাবে উখঝ উদ্যোক্তাদের ভার্মিকম্পোস্ট পিট তৈরি, কেঁচো প্রতিপালন, ট্রাইকোডার্মা কালচার এবং মান নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ দেয়। বিশেষ করে স্মার্ট ফার্মিং এর অংশ হিসেবে মান নিশ্চিতকরণ এবং আধুনিক বিপণন কৌশল বিষয়ে জ্ঞান দেওয়া অত্যাবশ্যক।
নীতি সহায়তা : সরকারের উচিত ছোট আকারের জৈবসার উৎপাদনকারী উদ্যোগগুলোকে সহজ শর্তে ঋণ, ভর্তুকি এবং সার্টিফিকেশন প্রক্রিয়ায় সহায়তা করা। এই সার্টিফিকেশন (যেমন- জাতীয় জৈব মান বা আন্তর্জাতিক অর্গানিক স্ট্যান্ডার্ড) নিশ্চিত করলে তাদের উৎপাদিত পণ্য জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশাধিকার পাবে, যা উদ্যোক্তা বিকাশে বিশাল উদ্দীপনা যোগাবে।
শীতকালীন সবজি চাষে গবাদি পশুপাখির বর্জ্য থেকে উৎপাদিত কম্পোস্ট, ভার্মিকম্পোস্ট ও ট্রাইকোডার্মা সারের ব্যবহার বাংলাদেশের কৃষিকে আন্তর্জাতিক মানের টেকসই, জলবায়ু সহনশীল এবং পরিবেশবান্ধব কৃষিতে রূপান্তরিত করার এক কার্যকর ও প্রমাণিত মডেল। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর (উখঝ)-এর তত্ত্বাবধানে (এখচ)-এর মাধ্যমে এই মডেলটি কৃষি, প্রাণিসম্পদ এবং পরিবেশ খাতকে একীভূত করে: নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন নিশ্চিত করে মাটির উর্বরতা ও জীববৈচিত্র্য রক্ষা করে। প্রাণিসম্পদ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে কৃষি বর্জ্যকে সম্পদে পরিণত করে। গ্রামীণ যুব উদ্যোক্তা তৈরির মাধ্যমে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে গতি সঞ্চার করে।
এই সম্মিলিত প্রচেষ্টা কেবল কৃষকের জীবনমান উন্নয়নে নয়, বরং ২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট অর্জনে এবং একটি সবুজ, সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গঠনে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখতে সক্ষম।

লেখক : পিএইচডি (পরিবেশ বিজ্ঞান), থেরিওজেনোলজিস্ট, জেলা কৃত্রিম প্রজনন কেন্দ্র (উখঝ), রংপুর। মোবাইল নং-০১৭১৫২৫০৫৮০, ই-মেইল-badhonbir@gmail.com

ফাইল ১

এক্সেসিবিলিটি

স্ক্রিন রিডার ডাউনলোড করুন