কনটেন্টটি শেষ হাল-নাগাদ করা হয়েছে: রবিবার, ১৭ আগস্ট, ২০২৫ এ ০৯:২৬ PM

জলবায়ু পরিবর্তনে প্রাণিসম্পদের প্রভাব

কন্টেন্ট: কৃষি কথা মাস: ভাদ্র সাল: ১৪৩২ প্রকাশের তারিখ: ১৭-০৮-২০২৫

জলবায়ু পরিবর্তনে প্রাণিসম্পদের  প্রভাব 
ড. মো. আব্দুল ওয়ারেছ
জলবায়ুর পরিবর্তন একটি প্রাকৃতিক ও স্বাভাবিক চলমান ঘটনা। তবে এটি একটি ধীর প্রক্রিয়া। কিন্তু যখনই এবং যতটুকু ত্বরান্বিত হবে, তখনই এবং ততটকুু ঝুঁকিপূর্ণ হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের অন্যতম কারণগুলোর মধ্যে যেমন রয়েছে পৃথিবীর গতিশীল প্রক্রিয়া, তেমন রয়েছে বহির্জগতের প্রভাব যেমন সৌর বিকিরণের মাত্রা, পৃথিবীর অক্ষরেখার দিক পরিবর্তন কিংবা সূর্যের তুলনায় পৃথিবীর অবস্থান। বর্তমান সময়ে, মনুষ্য কার্যকলাপজনিত উৎপন্ন গ্রিনহাউজ গ্যাস পৃথিবীর উষ্ণায়নকে বহুমাত্রায় প্রভাবিত করেছে। জলবায়ু পরিবর্তনের অন্যতম সংবেদনশীল সূচক হিসাবে হিমবাহের হ্রাস-বৃদ্ধিকে ধরা হয়। জলবায়ু শীতল হলে হিমবাহের আকার বাড়ে আর উষ্ণ জলবায়ুতে হিমবাহের আয়তন ও সংখ্যা কমে যায়। এ উপাদানগুলো জলবায়ু বাধ্যকরণ নামে বিশ্বব্যাপী পরিচিত। 
২০২০ সালের তথ্যানুসারে, বিশ্বে গবাদিপশুর সংখ্যা- গরু ১.৭ বিলিয়ন, ছাগল ১.৩ বিলিয়ন, ভেড়া ১ বিলিয়ন এবং মুরগি ২৫ বিলিয়ন। প্রাণিসম্পদ খাত ১ বিলিয়নেরও বেশি মানুষের জীবিকা সরবরাহ করে, যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ১৫%। এর বাণিজ্যিক মূল্য প্রায় ১ ট্রিলিয়ন ডলার। দুধ, ডিম, মাংস, চামড়া ছাড়াও নানামুখী পশুজাত ও উপজাত পণ্যের ব্যবহার মানুষের অবসান, বস্ত্র, পুষ্টি এমনকি সঙ্গী হিসেবে মানুষের অবদান রেখেছে। কিন্তু, জলবায়ু পরিবর্তনে এই অত্যবশ্যকীয় খাতটি আজ হুমকির সম্মুখীন। 
তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে খাদ্য নিরাপত্তা এবং পরিষ্কার পানির উৎস হুমকির মুখে পড়ছে। প্রাণির স্বাস্থ্যের উপর দৃশ্যমান প্রতিকূল প্রভাবগুলোর মধ্যে রয়েছে তাপমাত্রা বৃদ্ধি। প্রাণীর শরীরের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে ৩-৪০ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেট বেশি হয়ে গেলে তা অসহনীয় পর্যায়ে যায়। ফলে, তাপ ক্লান্তি, মূর্ছা যাওয়া, খিঁচুনি এবং অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের অবসাদ বা কর্মহীনতা দেখা দেয়। বছরের উষ্ণতম মাসগুলোতে বিশেষ করে তাপপ্রবাহের (হিট ওয়েভ) সময় প্রাণীর মৃত্যুর হার বেড়ে যায়। এ ছাড়াও, অন্যান্য উপসর্গ দেখা দেয় যেমন- তাপমাত্রা ৩০০ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেট -এর উপর হলে প্রাণীর খাদ্য গ্রহণ ৩-৫% কমে, দুধ উৎপাদন কমে যায়, শ্বাসযন্ত্র এবং ঘামের কারণে বিপাকীয় ব্যধি জন্ম নেয়, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট এনজাইমের কার্যকলাপ বৃদ্ধি করে, যার ফলে অক্সিডেন্ট ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্টের ভারসাম্যহীনতা দেখা দেয়, যা অক্সিডেটিভ স্ট্রেস নামে পরিচিত, রোগ প্রতিরোধের ক্ষমতা দুর্বল হয়ে যায়, টিকাদানের কার্যকারিতা কমে যায়। এ ছাড়াও, মাটির তাপমাত্রা বৃদ্ধি শ্বাস-প্রশ্বাসের হারকে প্রভাবিত করে। অতিরিক্ত গরমে প্রাণিজাত পণ্যের মান কমে যায়। সামগ্রিকভাবে, ২০৫০ সালের প্রথম দিকে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট  নানাবিধ কারণে বর্তমান বিশ্বব্যাপী উপযোগী চারণভূমির প্রায় ১০ শতাংশ হুমকির সম্মুখীন হবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। ঘাসসহ অন্যান্য প্রাণিখাদ্যের প্রাপ্যতা নিশ্চিত করতে না পারলে এই শতাব্দীর মধ্যভাগে বিশ্বব্যাপী প্রাণির সংখ্যা শুধুমাত্র এই কারণে ৭-১০ শতাংশ কমিয়ে যেতে পারে বলে বিশেষজ্ঞদের ধারণা। প্রাণিসম্পদ লালন-পালান করা হয় বিশ্বের এমন অনেক স্থান এই শতাব্দীর শেষভাগে তার উপযুক্ততা হারাবে বলেও অনুমান করা হচ্ছে। 
জলবায়ু পরিবর্তনের সাথে খাপখাওয়াতে প্রয়োজন প্রাণী আশ্রয়কেন্দ্রগুলো শীতলীকরণ এবং পশুখাদ্যের পরিবর্তন। ২০২১ সালের তথ্য মতে, বিশ্বে গ্রিন হাউজ গ্যাসের নির্গমনের ১৪-১৭.৩% ক্ষেত্রে দায়ী প্রাণিসম্পদ খাত এবং জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার তথ্য নির্দেশ করে যে, এ নির্গমন ৫% হারে বাড়ছে। ফলে, নেট জিরো ট্রানজিশন পরিকল্পনায় এখন মোট প্রাণীর সংখ্যার সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, আয়ারল্যান্ডে ইতোমধ্যেই অসামঞ্জস্যপূর্ণভাবে মজুদ হ্রাস করা শুরু হয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায়, বিশ্বব্যাপী অনেক জায়গায় প্রাণিসম্পদে প্রদত্ত ভর্তুকি পর্যায়ক্রমে কমানো হচ্ছে।
জলবায়ু পরিবর্তন প্রভাব প্রাণীর সকল রোগের বিরুদ্ধে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বহুলাংশে হ্রাস করতে পারে এমনকি নতুন নতুন রোগের প্রাদুর্ভাবও দেখা যায়। উদাহরণস্বরূপ, পূর্ব আফ্রিকায় রিফ্ট ভ্যালি জ্বর এবং ইউরোপে হেলমিন্থের উপস্থিতি। মহামারী নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থায় উল্লেখযোগ্য উন্নতি না হলে, বর্তমানে প্রতি ২০ বছরে একবার ব্লুটংয়ের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয় বলে প্রক্ষেপণ করা হচ্ছে, তা শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে পাঁচ বা সাত বছরে একবার ঘটবে। ভবিষ্যতের জলবায়ু পরিবর্তনের পরিমাণের উপর নির্ভর করে যুক্তরাজ্যের গবাদি প্রাণীর খামারগুলোতে ৫-৭% বেশি প্রাদুর্ভাব দেখা দেবে বলে পূর্বাভাস দেয়া হয়েছে। এ ছাড়াও, লেপ্টোস্পাইরোসিস, ট্রিপেনোসোমিয়াসিস, সিসি মাছি, ফ্লু টাংসহ অন্যান্য রোগ বিশেষত পরজীবী এবং বাহকনির্ভর রোগগুলো আগের তুলনায় দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে।  
সাধারণত গৃহপালিত প্রাণীর জন্য উপযুক্ত তাপমাত্রা  ১০-৩০০ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেট। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বিশ্বের শীতপ্রধান অঞ্চলে বসবাসকারী মানুষের জন্য সামগ্রিক তাপীয় আরাম বৃদ্ধি পাবে বলে আশা করা হচ্ছে এবং ঐ অঞ্চলের প্রাণিসম্পদও উষ্ণ শীত থেকে উপকৃত হবে। তবে, সমগ্র বিশ্ব জুড়ে, গ্রীষ্মকালীন তাপমাত্রা বৃদ্ধির পাশাপাশি ঘন ঘন এবং তীব্র তাপপ্রবাহ স্পষ্টতই নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। যা গবাদি প্রাণীর তাপ সংক্রান্ত ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে তুলবে। সর্বোচ্চ গ্রিন হাউজ গ্যাস নির্গমন এবং সর্বোচ্চ উষ্ণায়নের জলবায়ু পরিবর্তনের পরিস্থিতিতে, ঝঝচ ৫-৮.৫, “নিম্ন অক্ষাংশে গবাদি প্রাণী, ভেড়া, ছাগল, শূকর এবং হাঁস-মুরগি প্রতি বছর ৭২-১৩৬ দিন অতিরিক্ত উচ্চ তাপমাত্রা এবং আর্দ্রতার কারণে চরম চাপের সম্মুখীন হবে”। ঝঝচ হচ্ছে ঝযধৎবফ ঝড়পরড়বপড়হড়সরপ চধঃযধিু (ঝঝচ) যা নির্দেশ করে জীবাশ্ম জ্বালানির আধিপত্য, বিকিরণ শক্তির উচ্চ মাত্রা, সমুদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি যার ফলশ্রুতিতে উপকূলীয় নিম্নভূমিতে বাস করা ১ বিলিয়নেরও বেশি মানুষ স্থানান্তরিত হতে বাধ্য হতে পারে। ২১০০ সালের মধ্যে, উষ্ণতম পরিস্থিতিতে ঝঝচ ৫-৮.৫-এর অধীনে বর্তমান সম্মিলিত ফসল এবং প্রাণিসম্পদ এলাকার ৩০% জলবায়ুগতভাবে অনুপযুক্ত হয়ে পড়বে, যা নিম্ন-উষ্ণতা বিশিষ্ট ঝঝচ ১-২.৬-এর অধীনে মাত্র ৮%। একইভাবে, একটি পূর্ববর্তী গবেষণায় দেখা গেছে যে যদি ২০০৫ থেকে ২০৪৫ সালের মধ্যে ১.১ক্কঈ (২.০ ক্ক ঋ) হারে উষ্ণতা বৃদ্ধি পায় (যা ২০৫০ সালের মধ্যে ২ক্কঈ (৩.৬ক্কঋ), তাহলে বর্তমান প্রাণিসম্পদ ব্যবস্থাপনার দৃষ্টান্ত অনুসারে, বিশ্বব্যাপী কৃষি খরচ ৩% (আনুমানিক ১৪৫ বিলিয়ন ডলার) বৃদ্ধি পাবে, যার প্রভাব আবশ্যিকভাবে প্রাণিসম্পদ ব্যবস্থার উপর কেন্দ্রীভূত হবে। 
করণীয় জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব কাটাতে সময়োপযোগী ও বাস্তবভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা একান্ত জরুরি। কারণ জিডিপিতে প্রাণিসম্পদ খাতের অবদান ১.৮% শতাংশ হলেও গ্রিনহাউজ গ্যাস উৎপন্ন করে তুলনামূলক অনেক বেশি। এই পরিকল্পনার দুটি অংশ থাকবে- একটি হবে প্রাণিসম্পদ খাত থেকে কার্বনসহ অন্যান্য গ্রিনহাউজ গ্যাস উৎপাদন কমানো অন্যটি হবে পরিবর্তিত জলবায়ুতে টেকসই উৎপাদন ও প্রাণিজ আমিষের সরবরাহ ঠিক রাখা। অন্যতম অনুষঙ্গ হলো- আরামদায়ক শেড বা ঘর, উপযুক্ত ফডারপূর্ণ চারণভূমি, দুধ-মাংসের যৌথ কার্যক্রম, যথাযথভাবে সকল টিকা ও কৃমি নাশক প্রয়োগ,   জৈবনিরাপত্তা, আন্তঃসীমান্ত নিয়ন্ত্রণ এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনা। একই সাথে, অভিযোজনের লক্ষ্যে উপযুক্ত জাত/প্রজাতি ও ব্যবস্থাপনা  কার্যক্রম প্রয়োজন। সর্বোপরি, নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষের যথাযথ নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন জরুরি। উল্লেখ্য, ২০১৩ সাল পর্যন্ত বিশ্বব্যাপী দুধ সরবরাহের ৯০% এবং মাংস উৎপাদন ৮০% মিশ্র ফসল-প্রাণী উৎপাদন ব্যবস্থার মাধ্যমে জোগান দেয়া হয়েছে যাতে উৎপাদন খরচ উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। তাই, একক প্রাণী পালন ব্যবস্থাকে মিশ্র ফসল-প্রাণী পালনে রূপান্তরিত করলে বিশ্বব্যাপী প্রাণিসম্পদ-কৃষি খরচ ৩% থেকে ০.৩% হ্রাস পাবে। 
তাই প্রাণিসম্পদের সমৃদ্ধি, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা গড়তে পরিবেশবান্ধব প্রাণিসম্পদ পালন সময়ের একান্ত দাবি। পরিবেশ ও জলবায়ু সংক্রান্ত আইনের যথাযথ প্রয়োগ এবং টেকসই ও পরিবেশবান্ধব উত্তম ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে গ্রিন হাউজ গ্যাস (কার্বন) নিঃসরণ কমানো এবং অভিযোজন সক্ষমতা বাড়ানো প্রয়োজন। এতে করে, প্রাণীর স্বাস্থ্য ভালো থাকবে, খামারে ব্যয় কমে আয় বাড়বে, ফলে, অধিকতর প্রাণিসম্পদ উদ্যোক্তা তৈরি হবে। এমনকি ব্যবস্থাপনার অধিকতর উন্নয়নে কার্বন-ট্রেডের মাধ্যমে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা লাভের বিস্তৃত সুযোগ সৃষ্টি হবে।
তথ্য সূত্র : Kristiansen S, Painter J, Shea M. Animal Agriculture and Climate Change in the US and UK Elite Media: Volume, Responsibilities, Causes and Solutions. Environ Commun. 2021;15(2):153-172. doi:10.1080/17524032.2020.1805344. Epub 2020 Sep 7. PMID: 33688373; PMCID: PMC7929601.

লেখক : উপজেলা প্রাণীসম্পদ কর্মকর্তা, পরিকল্পনা শাখা, কৃষি খামার সড়ক, ফার্মগেট, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর ঢাকা-১২১৫। মোবাইল : ০১৭১০০৫৪৭৭৫, ই-মেইল :a.wares.bau@gmail.com

ফাইল ১

এক্সেসিবিলিটি

স্ক্রিন রিডার ডাউনলোড করুন