কনটেন্টটি শেষ হাল-নাগাদ করা হয়েছে: মঙ্গলবার, ১৫ জুলাই, ২০২৫ এ ০৯:০২ PM
কন্টেন্ট: কৃষি কথা মাস: শ্রাবণ সাল: ১৪৩২ প্রকাশের তারিখ: ১৫-০৭-২০২৫
ছাদ বাগানে বনসাইয়ের স্বর্গরাজ্য গড়ে তুলেছেন চিকিৎসক দম্পতি
সাবরিনা আফরোজ
খরতাপে পুড়ছে নগর। নগরের আনাচে কানাচে একটুকরো সবুজের ছোঁয়া পেতে মরিয়া সৌর্যপ্রাণ মানুষ। আজ হতে পঞ্চাশ বছর আগেও যেসব গাছের ছায়ায় রাজপথ প্রশান্ত হয়ে থাকত, যেই ফুলের সুবাসে মাতোয়ারা হয়ে থাকতো বাতাস, ভ্রমরেরা ফুলে ফুলে গান গেয়ে বেড়াত, সেই গাছগুলো কালের গর্ভে হারিয়ে গেছে। নতুন প্রজন্ম তাই জানে না হিজল, তমালের নাম। অশোক পারুলেরাও হারিয়ে যাওয়ার খাতায়। নতুন প্রজন্মকে এসব বিলুপ্তপ্রায় বৃক্ষের সাথে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার এক অনন্য উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন নারায়ণগঞ্জের বৃক্ষপ্রেমী ডাক্তার, ফয়েজ আহমেদ চৌধুরী। তিনি একজন মেডিসিন বিশেষজ্ঞ। পড়েছেন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে। সহধর্মিণীও একই মেডিকেলের। গাছেরপ্রতি তাদের ভালোবাসা আকাশ ছোঁয়া। কিন্তু শহুরে জীবনে এত জায়গায় বা কোথায় তাদের স্বপ্ন পূরণের। তাই তো বাড়ির ছাদটাকেই বেছে নিয়েছেন তাদের স্বপ্নপূরণের অংশ হিসেবে। বাড়ির ছাদে ছাতিম, হিজল-তমাল অশোকসহ নানা বৃক্ষরাজির বাস। তবে বিরাট বৃক্ষ নয়, এগুলোকে রাখা হয়েছে বনসাই করে। প্রায় হাজার রকম দেশি বিদেশি বিলুপ্ত প্রজাতির গাছ আছে তাদের ছাদ বাগানে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে বৃক্ষের সাথে পরিচয় করাতে এই গাছগুলো সংরক্ষণ করেছেন তারা। চিকিৎসক ফয়েজ আহমেদ চৌধুরী জানান তার গাছের ছবি সমাজিক মাধ্যমে পোস্ট করায় অনেকে তার এই গাছের সাথে পরিচিত হতে ছুটে যাচ্ছেন সিদ্ধিরগঞ্জের নিমাইকাসারী এলাকার বৃক্ষকুঞ্জ নামের পাঁচতলা বাড়ির ছাদবাগানে। ২০১৫ সালের শুরুর দিকে নিজ বাড়ির ছাদে এ বাগানটি গড়ে তোলেন দন্ত চিকিৎসক মাহফুজা আক্তার এলিজা ও তার স্বামী মেডিসিন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ফয়েজ আহমেদ।
চিকিৎসক দম্পতির সাথে কথা বলে জানা যায়, তাদের ১৮০০ বর্গফুটের ছাদে ১৮০০ এর অধিক বনসাই আছে। এর মধ্যে বিলুপ্ত প্রজাতির গাছই-বেশি। সেই সঙ্গে নানা ধরনের ফুল-ফলসহ ঔষধী গাছ সংরক্ষণ করছেন তারা। এর মধ্যে ছাতিম, হিজল-তমাল, অশোক, দুর্লভ নাগালিঙ্গম, আফ্রিকান বটবৃক্ষ, বিদেশি এডেনিয়ামসহ অন্যান্য গাছ আছে যেগুলো বেশ পুরনো। এ ছাড়া ফুলের মাঝে আছে বাগানবিলাস, কামিনী, করবী, ক্যামেলিয়া, কাঠমালতী, জুই, রঙ্গনসহ নানা প্রজাতির ফুল।
বনসাই তৈরির প্রক্রিয়া সম্পর্কে ফয়েজ আহমেদ জানান, যে গাছটির বনসাই তৈরি হবে সেটির প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য জানা জরুরি। নির্বাচিত গাছের বীজ থেকে চারা তৈরি করে নেওয়া যায় অথবা নার্সারি থেকে চারা সংগ্রহ করে সেখান থেকেও বনসাই তৈরি করা যায়। বনসাইয়ের মাটি তৈরির ক্ষেত্রে দোআঁশ বা পলিমাটির সাথে পরিমিত জৈবসার ব্যবহার করতে হবে। পানি নিষ্কাশন ও গাছের বৃদ্ধি রোধে বিশেষভাবে তৈরি টবে বনসাইয়ের চারা রোপণ করতে হবে। এই টবের নিচের দিকে পানি নিষ্কাশনের এবং কিনারা বরাবর দুই বা ততোধিক ছিদ্র থাকে, যাতে তার পেঁচিয়ে গাছের বৃদ্ধি কমিয়ে রাখা যায়। কিছুদিন বৃদ্ধির পর মাটির জন্য উপযুক্ত আকৃতি নির্ধারণ করে ডালপালায় তার পেঁচিয়ে রাখার পাশাপাশি নিয়মিত অবাঞ্জিত ডাল ছাঁটাই করতে হবে। সময়ের সাথে সাথে বনসাইটি তৈরি হয়ে যাবে।
বনসাই পরিচর্যার ক্ষেত্রে একটু বাড়তি সতর্কতার প্রয়োজন আছে বলে জানান এই চিকিৎসক দম্পতি। বনসাই গাছকে নিয়মিত খাবার দিতে হবে। জৈবসার, বালু বা ইটের চূর্ণ, সরিষার খোসা ইত্যাদি দিতে হবে। বনসাই অতিরিক্ত পানিবদ্ধতা এবং রোদ কোনটাই সহ্য করতে পারে না। এ বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে। ধুলো-ময়লা মুক্ত রাখতে পানি দিয়ে পাতা ও ডাল মুছে দিতে হবে। টবের মাটিতে পোকামাকড় বা ছত্রাকের প্রাদুর্ভাব হলে সঠিকমাত্রায় ওষুধ প্রয়োগ করতে হবে। আলো বাতাস চলাচল করে এমন জায়গায় বনসাই রাখতে হবে। কাঙ্খিত আকৃতি ঠিক রাখতে অতিরিক্ত ডালপালা ছাঁটাই করতে হবে। সঠিকমাত্রায় তরল সার প্রয়োগ করা যেতে পারে। প্রতি বছরে একবার টবের মাটি পরিবর্তন করতে হবে। গাছ ছাঁটাইসহ অন্যান্য কাজে বনসাই পরিচর্যার জন্য নির্ধারিত যন্ত্রপাতি ব্যবহার করতে হবে।
এই ছাদবাগানে এক বছর থেকে ৩৫ বছর বয়সী গাছ আছে বলে জানান এই চিকিৎসক দম্পতি। তারা বলেন এখানে ১০ হাজার টাকা থেকে ৫ লাখ টাকা দামের বনসাই আছে। বিক্রয়ের হিসাব করলে অর্ধকোটি টাকার বেশি গাছ আছে তার এ ১৮০০ স্কয়ারফিটের এই ছাদবাগানে। অবশ্য তিনি এটি বিক্রয়ের জন্য করেনি। তাদের ইচ্ছা ছিল বিলুপ্তপ্রায় গাছগুলোর সাথে সন্তানদের পরিচয় করিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি তাদের উপকারী দিকগুলো সন্তানদের জানানো। এলিজা জানান বাচ্চারা এখন বনসাইয়ের পরম বন্ধু। তারা নিজেরাই নিজেদের আগ্রহে গাছগুলো পরিচর্যা করার চেষ্টা করে। ইন্টারনেটের এ আসক্তির যুগে গাছের সাথে সন্তানদের এই বন্ধুত্ব তাকে আত্নার তৃপ্তি জোগায়। বনসাইকে তারা যে পরিমাণ সময় দিয়েছেন তাতে গাছের সাথে তাদের একটা বন্ধন তৈরি হয়ে গিয়েছে। সন্তানেরা জানছে সবুজের সম্পর্কে আদিকাল থেকেই গাছ মানবসন্তানদের পরম বন্ধু। কালের পরিক্রমায় নগরায়নের ফলে অনেক গাছ হারিয়ে গেছে। এই হারিয়ে যাওয়া গাছগুলো দেখতে বৃক্ষপ্রেমীরা যখন এই চিকিৎসক দম্পতির ছাদবাগানে ভিড় করে তখন যেন তাদের কষ্ট সার্থক হয়ে যায়। নতুন প্রজন্মের অনেকেই বইপত্রের সাথে মিলিয়ে গাছ দেখতে আসে, খাতায় লিখে নিয়ে যায়। এ আনন্দ অপার্থিব। নতুন প্রজন্মের কাছে, গাছের প্রতি ভালোবাসা ছড়িয়ে দিতে চায় তারা। পৃথিবী হয়ে উঠুক নির্মল বৃক্ষপ্রেমীদের স্বর্গরাজ্য।
লেখক : আঞ্চলিক কৃষি তথ্য অফিসার, কৃষি তথ্য সার্ভিস, আঞ্চলিক কার্যালয়, ঢাকা। মোবাইল-০১৭১৭৫২৬৮৪০, ই-মেইল- . aisdhaka2019@gmail.com