কনটেন্টটি শেষ হাল-নাগাদ করা হয়েছে: বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল, ২০২৬ এ ০১:২১ PM
কন্টেন্ট: কৃষি কথা মাস: বৈশাখ সাল: ১৪৩৩ প্রকাশের তারিখ: ১৬-০৪-২০২৬
ছাদ বাগানের হাতেখড়ি
মৃত্যুঞ্জয় রায়
বাগান করার শখ কার না আছে? নিজের বাগানে ফোটা ফুল আর সবজি! আহা কি দারুণ একটা ব্যাপার! যারা ছাদে বাগান করতে চান তাদের মাথায় প্রথমেই একটা চিন্তা ঘুরপাক খায়, কোন ছাদে বা কার ছাদে বাগান করব, বাগানের জন্য আমি কতটুকু জায়গা পাব? আর সে বাগানে কিভাবে আমি বিষমুক্ত ফল ও সবজি ফলাতে পারব? বাজার থেকে যে ফল বা সবজি কিনি, তা কি আমাদের স্বাস্থ্যের জন্য নিরাপদ? উত্তর হলো, মোটেই না। যারা গাছই চেনেন না, গাছ লাগানোর কায়দা বোঝেন না, জানেন না যে সেসব গাছের কিভাবে যত্ন নিতে হয় তাদের জন্য ছাদবাগানের এই পাঠ। বলা যায় ছাদে বাগানের হাতেখড়ি।
ছাদে বাগান শুরু করার আগে যা ভাববেন
সত্যিই কি আপনি ছাদে একটা ভালো বাগান করার জন্য প্রস্তুত? হাতে মাটি লাগাতে পারবেন? ছাদটা নোংরা হলে পরিষ্কার করতে পারবেন? ছাদের গাছগুলোয় জল দেয়ার মতো জল আছে তো? আচ্ছা, ছাদটা কি এতগুলো গাছের ভার সইতে পারবে? উত্তরগুলো হ্যাঁ হলে তাহলে আসুন, ছাদে বাগান শুরু করার আগেই আপনাকে কিছু টিপস দিই, দিনে দিনে তো আর সবকিছু হয় না, কিন্তু আপনি লেগে থাকলে একদিন দেখবেন শখ থেকে আপনি একটা দারুণ ছাদবাগান করে ফেলেছেন। টিপসগুলো মন দিয়ে শুনুন-
প্রথমে দেখুন যে ছাদে গাছ লাগানোর মতো জায়গা কতটুকু আছে। চারপাশটা ফিতা দিয়ে মেপে তার মাপ নিন। এরপর একটা কাগজে সে মাপ অনুযায়ী ছাদ বাগানের একটা নকশা করে ফেলুন।
ছাদে সেসব গাছই লাগান, যেগুলো আপনার দরকার আছে। অপছন্দের কোন গাছ লাগাবেন না। তাহলে কি করতে হবে? ঠিকই ধরেছেন, যে যে গাছ লাগাতে চান তার একটা তালিকা করে ফেলুন। এর মানে এই না যে সব গাছ আপনি একদিনেই লাগিয়ে ফেলবেন। একটা দুটো গাছ দিয়ে শুরু করুন। দেখবেন একদিন ছাদটা আপনার সব পছন্দের গাছে ভরে গেছে।
যদি আপনার হাতে সময় ও ইচ্ছে থাকে তাহলে রোজ যা করলেন সেগুলো একটা নোটবুকে টুকে রাখুন। যেমন- তারিখ, আজ কি গাছ লাগালেন, গাছ বা বীজগুলো কোথা থেকে পেলেন, গাছটার চেহারা কেমন, কিসের গাছ, কিভাবে লাগালেন, কিসে বা কোথায় লাগালেন, লাগানোর সময় মাটিতে কি কি দিলেন ইত্যাদি। এতে আপনি নিজেই দেখবেন একদিন গাছ বিশারদ হয়ে উঠবেন, হয়ে যাবেন অভিজ্ঞ ছাদবাগানী, তখন অন্যদেরও পরামর্শ দিতে পারবেন। এমনকি ভবিষ্যতে একদিন নিজের বাগান করা কাজগুলোর ভিডিও করে একটা ইউটিউব চ্যানেলও খুলতে পারবেন, হয়ে যেতে পারেন কনটেন্ট ক্রিয়েটর।
ছাদে বাগান করার জন্য কিছু জিনিসপত্র তো লাগবেই। সেগুলো বাগানের কাজ শুরু করার আগেই আপনাকে সংগ্রহ বা কিনতে হবে। সরাসরি মাটিতে হাত না লাগিয়ে একজোড়া গ্লাভস পরে কাজ করলে হাত ভালো থাকবে। বিভিন্ন সাইজের টব বা গাছ লাগানোর পাত্র, নিড়ানি, হ্যান্ড স্প্রেয়ার, ঝাঝরি, সিকেচার, চাকু, নিক্তি ইত্যাদি।
যেসব গাছ লাগাবেন সেসব গাছ সম্পর্কে সঠিক তথ্যগুলো জানার চেষ্টা করুন। যেমন- কখন লাগাতে হবে, গাছগুলো কখন ফুল-ফল দেবে, কিভাবে পরিচর্যা করতে হবে, কি কি রোগ ও পোকামাকড় সেসব গাছের ক্ষতি করে এবং সেগুলো নিয়ন্ত্রণের সহজ উপায়গুলো কি, গাছগুলো কতদিন বাঁচবে, সেসব গাছ থেকে আবার চারা তৈরি করবেন কি করে ইত্যাদি। এখন এসব তথ্য জানা খুব সহজ হয়ে গেছে। এক্ষেত্রে বইপত্র তো আছেই, ইউটিউব ও গুগলে খুঁজলে অনেক কিছু পেয়ে যাবেন। পড়া, শোনা, জানা, করা থেকেই বাড়বে আপনার অভিজ্ঞতা।
আসুন, শুরু করি
ছাদের কোথায়, কোন অংশে বাগান করার সিদ্ধান্ত নিলেন? খোলা ছাদে? সিঁড়িঘরের ছাদে? ছাদের রেলিঙে? যেখানেই বাগান করুন না কেন, দিনে অন্তত দুই থেকে তিন ঘন্টা রোদ পড়ে এমন জায়গা বা অংশ বেছে নেবেন। এটুক রোদ না হলে আপনি অনেক গাছই ছাদে লাগাতে পারবেন না। যেখানে করবেন সেখানে কি ছাদের উপর সমতল বেড করে করবেন না বড় পাত্রে বা টবে? কয়েকভাবে বেড করা যায়। এগুলোর মধ্যে প্লান্টার বেড হলো স্থায়ী বেড। এটা হলো ছাদ থেকে কিছুটা উঁচু করে ফলস ছাদের মতো ঢালাই দিয়ে তার উপর চৌবাচ্চার মতো করে বেড করতে পারেন। চৌবাচ্চার চারপাশের দেয়াল অন্তত দুই ফুট উঁচু করতে হবে যদি ফলগাছ লাগান। সবজি লাগালে ৮ থেকে ১০ ইঞ্চি উঁচু করলেই চলবে। এ ধরনের স্থায়ী কাঠামো ছাদের চারপাশে রেলিঙের ধারে হলে ভালো হয়। সমতল বেডগুলো অস্থায়ী, বছর বছর তা সরানো বা বদলানো যায়।
এগুলো করতে হলে ছাদের উপর ৩ ফুট বাই ৫ ফুট মাপের একটা কেরোসিন কাঠের ফ্রেম তৈরি করে তার ভিতরে বিছিযে দিতে পারেন পানিরোধী পুরু পলিথিন শীট। যে রকমের বেডই করুন না কেন, দুই ভাগ মাটির সাথে এক ভাগ জৈব সার মিশিযে দিলে ভালো হয়। রাসায়নিক সার এক্ষেত্রে না দিলেও চলবে। পরে গাছের চেহারা দেখে সেসব সার লাগলে দেবেন। টবের মধ্যেও একইভাবে জৈব সার ও মাটি মিশিয়ে ভরবেন। টবে রাসায়নিক সার না দেওয়া ভালো। টবে সার-মাটি ভরার আগেই নকশা অনুযায়ী টবগুলোকে বসিয়ে নেবেন। ছোট ফুলগাছের জন্য ছোট টব, বড় ফুল ও বাহারি গাছের জন্য বড় টব, শক্ত কাঠের গাছের বেলায় হাফ ড্রাম বাব ড় পাত্র নেবেন, জলবাগানের জন্য নেবেন বড় চাড়ি (সিমেন্ট বা মাটির গামলার মতো বড় পাত্রবিশেষ)। এসব পাত্রে আপনি হাইব্রিড পদ্ম, জলগোলাপ, শাপলা, অ্যারোহেড বা তীরফলা ইত্যাদি গাছ লাগাতে পারবেন। পানি নিকাশের ব্যবস্থাও রাখতে হবে যাতে অতিরিক্ত পানি ও বৃষ্টির পানি জমতে না পারে। শুরুটা তো হলো। এরপর আসবে গাছপালা লাগানোর পালা।
হাত পাকাই সবজিতে
এই প্রথম ছাদে বাগান করছেন, তাই নিজেকে একটু ঝালিয়ে নেয়া দরকার, হাতটা পাকানো দরকার। কথা বলে কচুগাছ কাটতে কাটতে হয় খুনি। যারা অবলীলায় গাছ কাটতে পারে সে অস্ত্র দিয়ে খুন বা প্রাণী হত্যা করতেও নাকি তাদের হাত কাঁপে না। আর যারা গাছকে পরম মমতা দিয়ে বড় করে তোলে তাদের সে পূণ্যফল সেসব গাছদের কাছ থেকে আশীর্বাদ হয়ে যেন তাদের সন্তানদের ওপর নেমে আসে। কোনো ঝুঁকি নেয়ার দরকার নেই, হাত পাকানোর জন্য গাছের চেয়ে বীজ ভালো। সহজে পাওয়া যায়, দামে কম, বোনাও কোন ব্যাপার না। তাই যে বেডগুলো করলেন সেসব বেডে নানারকম সবজির বীজ ছিটিয়ে বুনে আগে নিজের ভেতর আস্থা তৈরি করুন। সার-মাটি বিছানো বেডের ওপর সারি করে বুনে দিন লালশাক, ডাটা, পুঁইশাক, পালংশাক, ঢেঁড়শ, গিমাকলমি, ধনিয়া (পাতার জন্য), গাজর, মূলা, সরিষা (শাক), পাটশাক ইত্যাদির বীজ।
আপনার হাতে বোনা বীজগুলো কয়েকদিন পর যখন গজিয়ে দু চার পাতা বের করে আপনাকে খুঁজবে, দেখবেন মনটা কেমন আনন্দে ভরে যাবে। তাড়াতাড়ি ওদের খাওয়ানোর জন্য আপনিই জলপাত্র হাতে নিছে ছুটবেন। গাছগুলো কিছুটা বড় হওয়ার পর একটু সাহস তো হলো। এবার হাত দিন টবগুলোয়। কিছু টবে বীজও বুনতে পারেন। যেমন একটা টবে দিলেন চারটে মিষ্টি কুমড়ো, চালকুমড়ো, করলা, চিচিঙ্গার বীজ। রাতে জলে ভিজিয়ে রেখে সকালে বুনবেন, দেখবেন কেমন তরতর করে গজিয়ে যায়। এসব টব রাখবেন ছাদের রেলিঙের কোলে যেখানে খাড়া করে মাচা বানিযে তাতে লতানো গাছগুলো তুলে দেয়া যায়। না হলে যেখানে এ টবগুলো থাকবে তার উপরেই জিআই তার টেনে মাচা করে দিন। বীজের চেয়ে চারা কিনে সেগুলো লাগানোও ভালো। এতে গজানোর ঝুঁকি কমে যায়। বিশেষ করে মরিচ, টমেটো, চেরি টমেটো, ক্যাপসিকাম, বেগুন, ফুলকপি, বাঁধাকপি, ওলকপি, শালগম, লাউ ইত্যাদির ছোট চারা টবে বা বেডে লাগাতে পারেন। মিষ্টি আলু, আলু, পিঁয়াজ, রসুন, আদা- এগুলো লাগানো তো কোন ব্যাপারই না। ঘরে রাখা এসব যদি গজানো অবস্থায় পাওয়া যায় তো সেটাই টব বা বেডের মাটিতে পুঁতে দিলে তার গাছ হয়ে যাবে। সজিনার ডাল কেটে পুঁতে দিলে তা থেকে গাছ হয়। ছাদে একটা সজিনাগাছ থাকা ভালো। সজিনা বসন্তকালে বসন্ত রোগের মহা প্রতিষেধক। ঠিকমত যত্ন নিলে ও কোনো রাসায়নিক সার এবং বিষাক্ত বালাইনাশক ব্যবহার না করে পরিবেশবান্ধব কিছু ব্যবস্থাপনা নিলে দেখবেন এসব বিষমুক্ত সবজিতেই আপনার পরিবারের চাহিদা অনেকটাই মিটে যাচ্ছে। টাটকা সবজির পুষ্টি যেমন থাকে প্রচুর তেমনি স্বাদও হয় ভালো।
এবার নজর দিন ফলগাছে
হাত আশা করি এতে অনেকটাই পেকে যাবে। এবার বড় পাকা স্থায়ী প্লান্টার বেড ও হাফ ড্রামে লাগান পছন্দের কিছু ফলের চারা-কলম। জায়গা থাকলে ১২-২৪ টি, জায়গা কম থাকলে অন্তত ৬টি ফলের গাছ লাগান। ফলের গাছগুলো নির্বাচনের ক্ষেত্রে মৌসুমকে গুরুত্ব দিন। যেমন গ্রীষ্মকালে ফলের জন্য লাগান আম ও লিচু, বর্ষাকালের জন্য পেয়ারা ও লংগান, শরতকালের জন্য আমলকি, হেমন্তের জন্য কদবেল ও ড্রাগন ফল; শীতের জন্য কুল, কমলা ও মালটা, বসন্তের জন্য লাগান সফেদা। একই গাছ কয়েকটা বা প্রত্যেকটি ভিন্ন ভিন্ন গাছ লাগাতে পারেন।
মনের প্রশান্তির জন্য ফুলগাছ
আগে তো বাঁচতে হবে, সেজন্য খেতে হবে। এখন আবার শুধু বাঁচলেই চলছে না। বাঁচতে হবে সুস্থভাবে। এজন্য এখন সবাই জোর দিচ্ছেন নিরাপদ খাদ্যের দিকে। সবজি আর ফলই এখন এ দেশে সবচেয়ে বেশি অনিরাপদ খাদ্য। সেগুলো যখন ছাদে ফলিয়েছেন, নিরাপদ খাদ্যের সংস্থান তো খানিকটা হলো। এবার মনের শান্তিটাও দরকার। সে শান্তি দিতে পারে ফুল ও বাহারি গাছ। ছাদে বাহারিগাছের চেয়ে ফুলগাছ লাগানো ভালো। এজন্য শীতের সময় টবে লাগাতে পারেন গাঁদা, চন্দ্রমল্লিকা, ডালিয়া, পিটুনিয়া, ডেইজি, অ্যাস্টার ইত্যাদি মৌসুমী ফুলের গাছ। গ্রীষ্ম-বর্ষার জন্য লাগাতে পারেন জবা, মোরগঝুঁটি, নয়নতারা, কলাবতী, দোলনচাঁপা ইত্যাদি। বড় টব বা হাফ ড্রামে লাগাতে পারেন অনেক বছর বাঁচে এমন কিছু ফুলগাছ যেমন কামিনি, টগর, হা¯œাহেনা, গন্ধরাজ, চন্দ্রপ্রভা বা টেকোমা, বাগানবিলাস, গোলাপ, কাঠগোলাপ, কুরচি ইত্যাদি গাছ। লতিয়ে দেয়ার জন্য বাউনির ব্যবস্থা থাকলে দু চারটা টবে লাগাতে পারেন ঝুমকোলতা, মাধবীলতা, মধুমঞ্জরি, অলকানন্দা, সোনাঝুরিলতা, ট্রামপেট লতা, রেললতা ইত্যাদি।
মনে করিয়ে দিই
সব গাছই যে আপনি চেনেন তা না, কিন্তু গাছের খোঁজে কয়েকটা নার্সারিতে কয়েকদিন ঘুরলেই দেখবেন আপনার অনেক গাছ চেনা হয়ে গেছে। তখন তালিকার বাইরেও অনেক পছন্দের গাছ আপনি সংগ্রহ করতে পারবেন। আর শুরুতে যেসব কথা বলেছিলাম, সবকিছুর নোট রাখবেন। ধীরে ধীরে দেখবেন, সত্যিই আপনি একজন পাক্কা ছাদবাগানী হয়ে উঠেছেন। কখন কিভাবে কেমন করে তা হলো তা আপনি নিজেই বুঝতে পারবেন না।
লেখক : পরিবেশ ও সামাজিক সুরক্ষা বিশেষজ্ঞ, পার্টনার, ডিএই, খামারবাড়ি, ঢাকা। মোবাইল : ০১৭১৮২০৯১০৭