গ্রীষ্মকালে মাশরুম চাষ ও বিপণনে করণীয়
ড. মোছা: আখতার জাহান কাঁকন
আমাদের অনেকেরই ধারণা বাংলাদেশের আবহাওয়ায় গরমকালে মাশরুম হয় না। কিন্তু ধারণাটি ঠিক নয়। আমাদের দেশে যে সব জাত রয়েছে বেশির ভাগই শীতকালে ভালো ফলন দেয় এবং শীতকালে অপেক্ষাকৃত কম পরিশ্র্রমে মাশরুম ফলানো যায়। তাই চাষিরা এই সময়ে মাশরুম চাষে বেশি আগ্রহ প্রকাশ করেন। তবে জাত নির্বাচন ও পরিচর্যা সংক্রান্ত পরিবর্তন আনার মাধ্যমে নিম্নলিখিত পদ্ধতি অনুসরণ করে গরমকালে মাশরুম উৎপাদন করা সম্ভব।
জাত নির্বাচন : গ্রীষ্মকালে মাশরুম চাষের জন্য জাত নির্বাচন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আমাদের দেশে মে থেকে জুলাই মাসে খুব গরম পরে। এ সময় সাধারণত চাষিরা চড়২ এর পাশাপাশি পিংক ওয়েস্টার, চড়১০ ও কান/ব্লাক মাশরুম চাষ করতে পারেন। শীতকালে যারা খড়ের প্যাকেট তৈরি করেন তারা গরমকালে মিল্কি মাশরুম চাষ করবেন। তাছাড়া ঋষি ও স্ট্র মাশরুম চাষ করতে পারেন।
বাণিজ্যিক স্পন তৈরির পদ্ধতি : গরমকালে স্পন প্যাকেট সাইজে ছোট ও সিলিন্ডার আকৃতির হলে ভালো। পাটকাঠি/বাঁশের কাঠি/কাসাভা পিল দিয়ে তৈরি মাদার কালচার ব্যবহার করে ইনোকুলেশন করলে কন্টামিনেশনের হার কম হয়। গরমকালের জন্য পাস্তুরাইজেশন পদ্ধতি উত্তম।
ক্রপিং প্যাটার্ন অনুসরণ : নির্বাচিত জাতগুলো দিয়ে মাশরুমের ক্রপিং প্যাটার্ন অনুসরণ করলে গরমে ভালো ফলন পাওয়া সম্ভব।
ইনকিউবেশন কক্ষের ব্যবস্থাপনা : ইনকিউবেশন কক্ষের পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা অতিগুরুত্বপূর্ণ। এক্ষেত্রে নি¤েœাক্ত বিষয়গুলো বিবেচনায় রাখতে হবে-
ইনকিউবেশনের জন্য যদি শীততাপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষ না থাকে তবে প্রকল্প কর্তৃক তৈরিকৃত মডেল ইনকিউবেশন কক্ষে মাদার/স্পন রাখলে ভালো হয়। এক্ষেত্রে কন্টামিনেশনের হার ও কম হবে; স্পন/মাদার রাখার তাক বা র্যাক যথাযথ পরিষ্কার রাখতে হবে; ইনকিউবেশন কক্ষের সঠিক তাপমাত্রা বজায় রাখতে হবে ও বায়ু চলাচলের ব্যবস্থা করতে হবে; ইনকিউবেশন কক্ষে ব্যক্তিগত হাইজিন (যেমন : হ্যান্ড গ্লাভস, মাস্ক, হেয়ার ক্যাপ, অ্যাপ্রোন) মেনে চলতে হবে; ইনকিউবেশন কক্ষ মাসে ১-২ বার ফিউমিগেশন করতে হবে; ইনকিউবেশন কক্ষ থেকে প্রতিদিন নষ্ট প্যাকেট বাছাই করে নিয়মিত কক্ষ পরিষ্কার রাখা; সর্বোপরি শীতকালের তুলনায় গরমকালে ইনকিউবেশন কক্ষের পরিচ্ছন্নতার প্রতি বেশি খেয়াল রাখতে হবে।
চাষঘরের ব্যবস্থাপনা : মাশরুমর উৎপাদন চাষঘরের তাপমাত্রা ও আর্র্দ্রতার ওপর নির্ভর করে। চাষঘরের নিম্নোক্ত বিষয়গুলো খেয়াল রাখতে হবে।
মাশরুম চাষঘর এবং আশেপাশের এলাকায় পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন পরিবেশ বজায় রাখতে হবে; চাষঘরে অটো পানি স্প্রে সিস্টেম ব্যবস্থা করতে হবে যাতে দিনে চাহিদামতো (৭-৮ বার) পানি স্প্রে করা যায়। এতে ঘর ঠা-া থাকবে ও ফলন ভালো পাওয়া যাবে; সর্বোপরি চাষঘরের জন্য প্রকল্প কর্তৃক তৈরিকৃত মডেল চাষঘর মাশরুম চাষের জন্য উত্তম।
এ ছাড়াও গরমকালে নিম্নলিখিত বিষয়গুলো খুব সতর্কতার সাথে দেখা দরকার-
বীজ সঠিকভাবে জীবাণুমুক্ত হয়েছে কি না; সাবস্ট্রেটে পানির মিশ্রণ সঠিক আছে কি না; ওয়ার্কসপ/প্যাকেট বানানোর জায়গায় ফ্যান লাগানোর ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করা যাতে সাবস্ট্রেটে মিশ্রণের পানি শুকিয়ে না যায় ; ফার্মের মনিটরিং কার্যক্রম জোরদারকরণ যাতে সকল নিয়মাবলি সঠিকভাবে মানা হচ্ছে কি না তা পর্যবেক্ষণ করা যায়।
মাশরুম একটি সবজি তা সাধারণ মানুষ এখনো জানেন না। যদি জানতে পারেন এবং হাতের কাছে পান তাহলে অবশ্যই তারা মাশরুম খাবেন। এদেশে ১৭ কোটি মানুষের বাস; এরা প্রতিদিন মাত্র ২৫ গ্রাম করে মাশরুম খেলেও বছরে ১৫৫৫১২৫০ মে. টন মাশরুমের প্রয়োজন হবে। আর ১০% মানুষও যদি মাশরুম খান তাহলে প্রতিদিন ৪৫০ মে. টন মাশরুম প্রয়োজন হবে। বিভিন্ন পরীক্ষায় প্রমাণিত হয়েছে যে মাশরুম টিউমার নিরাময় করে, উচ্চ রক্তচাপ কমায় এবং ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ করে। শুধুমাত্র এসব রোগীরাই যদি নিয়মিত ৫০ গ্রাম করে মাশরুম খান তাহলেও বিপুল পরিমাণ মাশরুম প্রয়োজন হবে। সেই মাশরুমের জোগান দেয়ার মতো উৎপাদন আমাদের দেশে নেই। তাহলে দেখা যাচ্ছে মাশরুমের চাহিদা থাকা সত্ত্বেও মাশরুম বিপণন একটি সমস্যা হিসেবেই চাষিদের কাছে প্রতীয়মান হচ্ছে। এ সমস্যার সমাধানে কতিপয় পরামর্শ এখানে সন্নিবেশিত হলো।
মাশরুম গুণাগুণ প্রচার করা : যিনিই মাশরুম ব্যবসায়ী হবেন তিনি অবশ্যই মাশরুমের গুণাগুণ প্রচার করবেন। এজন্য অবশ্যই তার মাশরুমের গুণাগুণ সম্পর্কে সম্যক ধারণা থাকতে হবে। মাশরুমের গুণাগুণ প্রচারের জন্য ব্যবসায়ীকে গুণাগুণ সম্বলিত লিফলেট বা প্রচারপত্র প্রকাশ করতে হবে অথবা সরকারিভাবে প্রকাশিত প্রচারপত্র মানুষের গোচরে আনতে হবে।
মাশরুমের মান ভালো করা : যেকোন ভালো পণ্য নিজেই নিজের বিজ্ঞাপণ। মাশরুমের মান ভালো হলে ভোক্তারা প্রথমত দেখেই আকৃষ্ট হবেন। তারপর খাওয়ার সময় যখন ভালো লাগবে এবং যখন তিনি উপকৃত হবেন তখন তিনি পরবর্তীতে অবশ্যই মাশরুম খোঁজ করবেন এবং মাশরুম খাবেন।
মাশরুমের উপস্থিতি নিশ্চিত করা : মাশরুমকে মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছাতে হবে। অনেক মানুষ আছেন যিনি মাশরুম সম্পর্কে জানেন এবং খেতে চান কিন্তু হাতের কাছে না পাওয়ার কারণে কিনতে পারেননা। সেক্ষেত্রে সর্বত্র মাশরুমের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে।
মাশরুম দিয়ে মুখরোচক খাবার তৈরি করা : শুধুমাত্র মাশরুম উৎপাদন ও বিপণন করলেই হবে না। মাশরুমকে ভ্যালু এডেড প্রডাক্টে রূপান্তর করতে হবে। কারণ মাশরুম একটি দ্রুত পচনশীল পণ্য। কোন কারণে যদি তাজা মাশরুম বিক্রি না হয় তবে তা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। আর যদি ভ্যালুএডেড প্রডাক্টে রূপান্তর করা যায় তাহলে মাশরুম একদিকে নষ্টের হাত থেকে রক্ষা পাবে, অন্যদিকে মানুষ বিকল্প খাবার পাবে। মাশরুমের তৈরি জ্যাম, আচার বিস্কুট, কাটলেট, চপ, ফ্রাই ইত্যাদি খুবই সুস্বাদু খাবার। এগুলো তৈরি করে বিক্রির ব্যবস্থা করতে হবে।
প্রাতঃভ্রমণকারীদের নিকট মাশরুম বিক্রি : স্বাস্থ্যসচেতন মানুষ নিয়মিত প্রাতঃভ্রমণ করেন। তাছাড়া দেশের একটি বিরাট সংখ্যক মানুষ ডায়াবেটিস আক্রান্ত; তারাও প্রাত:ভ্রমণ করেন। এ মানুষদের কাছে মাশরুম পৌঁছে দেয়ার ব্যবস্থা করলে মাশরুম বিক্রি বেড়ে যাবে।
ফ্রাইশপে মাশরুম বিক্রি : ফ্রাইশপ বর্তমান সময়ের একটি পরিচিত নাম ও সাধারণ মানুষের হালকা খাবার গ্রহণের একটি উত্তম জায়গা। ফ্রাইশপগুলোতে নিয়মিত মাশরুম সরবরাহ করলে এবং এ শপগুলোকে মাশরুমের গুণাগুণ সম্বলিত পোস্টার, ব্যানার ও ফেস্টুন দিয়ে সাজিয়ে দিলে মাশরুম বিক্রি বেড়ে যাবে।
ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়ায় মাশরুমের গুণাগুণ প্রচারিত হওয়ায় সাধারণ মানুষ মাশরুম খেতে চাচ্ছেন। সেক্ষেত্রে ছোট রেস্তোরাঁগুলোতে মাশরুমের খাবার তৈরি করলে তা অবশ্যই বিক্রি হবে। তবে এজন্য রেস্তোরাঁ মালিক এবং বাবুর্চিকে মাশরুম সম্পর্কে একটি সম্যক ধারণা দিতে হবে এবং রেস্তোরাঁটি মাশরুমের গুণাগুণ সম্বলিত পোস্টার, ব্যানার ও ফেস্টুন দিয়ে সাজিয়ে দিতে হবে।
কাঁচাবাজার, বাসস্ট্যান্ড ও গলির মুখে মাশরুম বিক্রি :কাঁচাবাজারে শাকসবজির সাথে মাশরুম রাখলে বিক্রি হবে। এসব দোকানে প্রথম দিকে অল্প পরিমাণে মাশরুম সরবরাহ করতে হবে এবং পরবর্তীতে চাহিদা বৃদ্ধির সাথে সাথে সরবরাহ বৃদ্ধি করতে হবে। ঢাকা শহরের একটি বড় সংখ্যক মানুষকে বড় রাস্তার বাস, টেক্সি বা ম্যাক্সি থেকে নেমে হেঁটে নিজ বাসস্থানে পৌঁছাতে হয়। এ মানুষদের অনেকেই বড় যান থেকে নেমে বাস স্ট্যান্ডের বা গলির মুখের দোকান থেকে কেনাকাটা করেন। এসব স্থানের যেসব দোকানে ফ্রিজ আছে তাদেরকে বলে যদি মাশরুম বিক্রি করানো যায় তবে অবশ্যই মাশরুম বিক্রি বৃদ্ধি পাবে। এসব দোকানে “এখানে মাশরুম পাওয়া যায়” প্ল্যাকার্ড ঝুলিয়ে রাখতে হবে।
অনলাইনে মাশরুম বিক্রি : বর্তমানে অনেক উদ্যোক্তা অনলাইনে মাশরুম বিক্রি করছেন।
মাশরুম মার্কেটিং চ্যানেল
মাশরুম বিপণনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের উৎপাদক থেকে ভোক্তা পর্যায়ে যে সব ধাপ রয়েছে তা নিম্নে দেখানো হলো-
মাশরুম উৎপাদক : বাংলাদেশে বর্তমানে ছোট বড় মিলিয়ে প্রায় লক্ষাধিক মাশরুম উৎপাদক উৎপাদন ও বিপণন কাজে যুক্ত আছেন। যারা বছরে অন্তত ৪০০০০ মে.টন মাশরুম উৎপাদন করে থাকেন। এ উৎপাদকদের নিকট থেকে পাইকারগণ মাশরুম সংগ্রহ করে থাকেন। উৎপাদকগণ খুচরা বিক্রেতা, মাশরুম প্রক্রিয়াজাতকরণ প্রতিষ্ঠান এবং ভোক্তাদের নিকট সরাসরি মাশরুম বিপণন করে থাকেন। মাশরুম উৎপাদকগণ সাধারণত তাজা মাশরুম শুকনা এবং পাউডার মাশরুম বিক্রি করে থাকেন।
পাইকার : পাইকার/মধ্যস্বত্বভোগীগণ মাশরুম চাষিদের কাছ থেকে মাশরুম সংগ্রহ করে খুচরা ব্যবসায়ী যেমন- বিভিন্ন ফ্রাইসপ, ফ্রাইভ্যান, ছোট রেস্তোরাঁ, কাঁচা বাজারে মাশরুম সরবরাহ করে থাকে। তারা বড় হোটেলের রেস্তোরাঁ এবং চেইনশপেও মাশরুম সরবরাহ করে থাকে।
খুচরা ব্যবসায়ী : কাঁচা বাজারের সব্জি বিক্রেতা থেকে শুরু করে ফ্রাইসপ, ফ্রাইভ্যান, ছোট/বড় রেস্তোরাঁর মালিক হলেন মাশরুমের খুচরা ব্যবসায়ী। ফাস্ট ফুডের দোকানেও বিক্রি হচ্ছে মাশরুমের তৈরি খাবার। তাছাড়া, মাশরুমের প্রক্রিয়াজাতকৃত পণ্যের দোকানও গড়ে উঠেছে। ঔষধের দোকানেও বিক্রি হচ্ছে মাশরুম পাউডার ও মাশরুম ক্যাপসুল।
মাশরুম প্রক্রিয়াজাতকরণ প্রতিষ্ঠান : মাশরুম প্রক্রিয়াজাতকরণ প্রতিষ্ঠানে মাশরুমের ক্যাপসুল, জ্যাম, আচার, ইত্যাদি তৈরি হচ্ছে। এসব প্রতিষ্ঠানে মাশরুম শুকানো ও পাউডার তৈরির কাজও হচ্ছে। এসব প্রতিষ্ঠান সরাসরি চাষি বা পাইকারদের কাছ থেকে মাশরুম কিনছে। কোন কোন প্রক্রিয়াজাতকরণ প্রতিষ্ঠান মাশরুম উৎপাদন ও করছে।
মাশরুম ভোক্তা : সাধারণ মানুষ এখন মাশরুম খাওয়া শুরু করেছেন। উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিসের রোগীরা তুলনামূলকভাবে বেশি মাশরুম খাচ্ছেন। চপ ও ফ্রাই সপের দোকানের ভিড় নির্দেশনা দেয় যে সকল শ্রেণিপেশার মানুষ মাশরুম পছন্দ করছেন।
মাশরুম চাষ সম্প্রসারণের মাধ্যমে পুষ্টি উন্নয়ন ও দারিদ্র্য হ্রাসকরণ প্রকল্প, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, কৃষি মন্ত্রণালয় মাশরুম চাষিদের বিপণনে সহায়তা করছে। মাশরুম উন্নয়ন ইনস্টিটিটে স্থানীয় চাষিদের অনেকে মাশরুম নিয়ে আসছেন, অন্যপক্ষে ভোক্তা ও পাইকারগণও মাশরুম সংগ্রহ করতে এখানে আসছেন; এক্ষেত্রে মাশরুম ইনস্টিটিউট উভয়ের সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করছে।
ঋতুভিত্তিক মাশরুম চাষ না করে প্রযুক্তি ও জাতগুলো কাজে লাগিয়ে সারাবছর মাশরুম চাষ অব্যাহত রাখলে মার্কেট লিংকেজটা শক্তিশালী হবে।
লেখক : প্রকল্প পরিচালক, মাশরুম চাষ সম্প্রসারণের মাধ্যমে পুষ্টি উন্নয়ন ও দারিদ্র্য হ্রাসকরণ প্রকল্প, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, কৃষি মন্ত্রণালয়; মোবাইল : ০১৭১২১২৮৫৯৫, ই-মেইল : kakon.smdp@gmail.com