কনটেন্টটি শেষ হাল-নাগাদ করা হয়েছে: বুধবার, ১৬ জুলাই, ২০২৫ এ ০৫:২৮ PM

খামারি মোবাইল অ্যাপ : সার সাশ্রয় এবং অধিক ফলন প্রাপ্তির আধুনিক প্রযুক্তি

কন্টেন্ট: কৃষি কথা মাস: শ্রাবণ সাল: ১৪৩২ প্রকাশের তারিখ: ১৬-০৭-২০২৫

 খামারি মোবাইল অ্যাপ : সার সাশ্রয় এবং 
অধিক ফলন প্রাপ্তির আধুনিক প্রযুক্তি
হাসান মোঃ হামিদুর রহমান
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে কৃষির গুরুত্ব অপরিসীম। তবে ক্রমহ্রাসমান কৃষি জমি, মাটির উর্বরতা হ্রাস ও ক্রমবর্ধিষ্ণু জনসংখ্যার পরিপ্রেক্ষিতে বিভিন্ন ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধি অব্যাহত রাখা ইত্যাদি বহুবিধ চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন বর্তমান  কৃষি। এ অবস্থার টেকসই উত্তরণে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (বিএআরসি) ক্রপ জোনিং সিস্টেম তৈরির কার্যক্রম বাস্তবায়ন করছে। এর মূল লক্ষ্য জমির উপযোগী ফসল আবাদ এবং মাটির উর্বরতামান অনুযায়ী পরিমিত সার ব্যবহারের মাধ্যমে ফলন বৃদ্ধি, সার খরচ কমানো এবং মাটির স্বাস্থ্য ভালো রাখা।
ক্রপ জোনিং সিস্টেম মূলত ক্রপ জোনিং ইনফরমেশন সিস্টেম, খামারি মোবাইল অ্যাপ, ক্রপ জোনিং ড্যাশবোর্ড ও কৃষি পরামর্শক বাতায়নের সমন্বিত সিস্টেম। ফসল উৎপাদন সম্পর্কিত বিভিন্ন সেবা/পরামর্শ কৃষকসহ অন্যান্য উপকারভোগির দোরগোড়ায় পৌঁছে দেয়ার লক্ষ্যে ফসল উৎপাদন পরামর্শক হিসাবে ‘খামারি’ মোবাইল অ্যাপ তৈরি করা হয়েছে। খামারি অ্যাপটি জিওস্পেশাল প্রযুক্তিনির্ভর একটি স্মার্ট কৃষি অ্যাপ। ফলে এই অ্যাপটি চালু করে কৃষক নিজ জমিতে দাঁড়িয়ে নির্দিষ্ট মেনু নির্বাচন করে সেই জমিতে কোন ফসল ভালো হবে অর্থাৎ অধিক ফলন পাওয়া যাবে, কোন ফসলে কি পরিমাণ সার দেয়া লাগবে, অধিক অম্লত্ব মাটি হলে ডলোচুন ব্যবহার ইত্যাদি তথ্য সহজেই জানতে পারবে। এ ছাড়াও ফসল উৎপাদন কৌশল, ফসল জাতের তথ্য, ফসলের মুনাফা সম্পর্কে ধারণা, মাটির বৈশিষ্ট্য ও গুণাগুণ, ফসল বিন্যাস, উপজেলা অনুসারে ফসলভিত্তিক উপযোগী এলাকার পরিমাণ ও মানচিত্র ইত্যাদি বিষয়েও জানা যাবে। 
খামারি অ্যাপটি বাংলায় তৈরি হওয়ায় এটি সহজেই বোধগম্য এবং এর ব্যবহার পদ্ধতি কৃষক বান্ধব। এটি ট্যাব এবং মোবাইল ফোনে (অ্যান্ড্রয়েড ও আইফোন) ব্যবহারের জন্য গুগল       প্লে-স্টোর এবং অ্যাপ স্টোর হতে সহজেই ডাউনলোড করা যাবে। খামারি অ্যাপটি টেকসই কৃষি উন্নয়ন ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করতে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে কাজ করে, যা কৃষকদের আর্থিকভাবে লাভবান হতে বিজ্ঞানভিত্তিক কৃষি চর্চা গ্রহণে সক্ষম করে তুলবে।
খামারি অ্যাপ ব্যবহারের মাধ্যমে কৃষক খুব সহজেই যে সকল গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের সমাধান পাবে এবং লাভবান হবে তা নি¤েœ সংক্ষেপে বর্ণনা করা হলো।
জমির উপযোগী সঠিক ফসল আবাদ : প্রথমে ফসল উপযোগিতা মেনুতে যেতে হবে অতঃপর অবস্থানভিত্তিক ফসল উপযোগীতা অপশন নির্বাচন করে ফসল মৌসুম অনুযায়ী জমির উপযুক্ত ফসল নির্বাচন/আবাদ সম্পর্কিত পরামর্শ গ্রহণ। এক্ষেত্রে জমিতে খুবই উপযোগী এবং উপযোগী ফসল আবাদ করা হলে অধিক ফলন পাওয়া যাবে।
ফসল আবাদে পরিমিত সার ব্যবহার
প্রথমে সার সুপারিশ মেনুতে যেতে হবে অতঃপর অবস্থানভিত্তিক ফসল অনুসারে অপশন নির্বাচন করে মাটির উর্বরতামান অনুযায়ী সুপারিশকৃত সারের মাত্রা সম্পর্কিত পরামর্শ গ্রহণ। ফসল আবাদে সুপারিশকৃত সারের মাত্রা ব্যবহার ও প্রয়োগ পদ্ধতি অনুসরণ করা হলে অধিক ফলনের পাশাপাশি মাটির স্বাস্থ্য রক্ষা পাবে।
অধিক অম্লত্ব মাটির ক্ষেত্রে সুপারিশকৃত ডলোচুন ব্যবহারের মাত্রা অনুসরণ করা হলে ফসল আবাদে সারের কার্যকারিতা নিশ্চিত হবে, ফলে অধিক ফলন পাওয়া যাবে।
দুই/তিন/চার ফসলি জমিতে ফসল বিন্যাস অনুযায়ী পরিমিত সার ব্যবহার : প্রথমে সার সুপারিশ মেনুতে যেতে হবে অতঃপর অবস্থানভিত্তিক ফসল বিন্যাস অনুসারে অপশন নির্বাচন করে মাটির উর্বরতামান অনুযায়ী সুপারিশকৃত সারের মাত্রা সম্পর্কিত পরামর্শ গ্রহণ। ফসল আবাদে সুপারিশকৃত সারের মাত্রা ব্যবহার ও প্রয়োগ পদ্ধতি অনুসরণ করা হলে অধিক ফলন নিশ্চিত হবে এবং মাটির স্বাস্থ্য রক্ষা পাবে।
ফসল জোন অনুযায়ী উৎপাদন পরিকল্পনা : প্রথমে ফসল জোন মেনুতে  যেতে হবে অতঃপর বিভাগ, জেলা এবং উপজেলা নির্বাচন করে সে অনুযায়ী ফসল উৎপাদন পরিকল্পনা গ্রহণ। ফসল জোন অর্থাৎ যে এলাকায় যে ফসল ভালো উৎপাদিত হবে, সেটি অনুসরণ করে ফসল আবাদ করা হলে উৎপাদনশীলতা উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাবে। কৃষি পরিবেশগত প্রতিকূল এলাকার পরিকল্পনা প্রণয়ন এবং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় ক্রপ জোনিং সহায়ক ভূমিকা রাখে। 
খামারি অ্যাপ ব্যবহারে মাঠপর্যায়ে সফলতা : খামারি অ্যাপ প্রদত্ত সার সুপারিশের কার্যকারিতা যাচাইয়ে মাঠপর্যায়ে ইতোমধ্যে ১১টি ফসলের ১১৭টি প্রদর্শনী ট্রায়াল সম্পন্ন করা হয়েছে, তন্মধ্যে জাতীয় কৃষি গবেষণা সিস্টেমের (নার্স) অধিভুক্ত প্রতিষ্ঠানসমূহ ৩৯টি (আমন ধান-১২টি, বোরো ধান-৬টি, গম-৩টি, ভুট্টা-২টি, পাট-৪টি, আলু-২টি, সরিষা-৩টি, তিল-২টি, মসুর ডাল-২টি, মুগ ডাল-১টি, পেঁয়াজ-২টি) এবং কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই) ৮২টি উপজেলায় (আমন ধান-২২টি, বোরো ধান-৬০টি) প্রদর্শনী ট্রায়াল বাস্তবায়ন করে। প্রাপ্ত ফলাফলে দেখা যায়, ২০২২-২৩ সালে খামারি অ্যাপ প্রদত্ত সার সুপারিশ ব্যবহারে রবি মৌসুমের বোরো ধান, গম, ভুট্টা, আলু, সরিষা, মসুর ডাল ও পেঁয়াজের ১৬টি প্রদর্শনী ট্রায়ালের গড় ফলাফলে কৃষক চর্চার তুলনায় সার খরচ ১৩.২২% কম ও ফলন বৃদ্ধি ১০.৮৩% এবং ২০২৩ সালে খরিফ-১ মৌসুমের পাট, তিল এবং মুগ ডালের ৭টি প্রদর্শনী ট্রায়ালে ২৭.৩৪% কম সার খরচ ও ১০.০৪% ফলন বৃদ্ধি হয়েছে। খরিফ-২ মৌসুম ২০২৩ সালে আমন ধানের ৩৪টি প্রদর্শনী ট্রায়ালের গড় ফলাফলে সারের খরচ ৩৩.৯৯% কম ও ৬.৮৩% ফলন বৃদ্ধি হয়েছে এবং ২০২৩-২৪ সালের রবি মৌসুমে বোরো ধানের ৬০টি প্রদর্শনী ট্রায়ালে ১৮.২১% কম সার খরচ ও ৫.৫৯% ফলন বৃদ্ধি হয়েছে।
আমন ধানের ৩৪টি প্রদর্শনী ট্রায়ালের প্রাপ্ত ফলাফল পর্যালোচনায় দেখা যায়, খামারি অ্যাপ প্রদত্ত সার সুপারিশ ব্যবহারে কৃষক চর্চার তুলনায় সার খরচ প্রতি হেক্টরে ৪,৭৩৫ টাকা সাশ্রয় এবং ৩৪০ কেজি ফলন বৃদ্ধি যার মূল্য ৩২ টাকা কেজি হিসেবে ১০,৮৮০ টাকা অর্থাৎ হেক্টরপ্রতি মোট আর্থিক লাভ ১৫,৬১৫ টাকা হবে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর কর্তৃক বাস্তবায়িত বোরো ধানের ৬০টি প্রদর্শনী ট্রায়ালের প্রাপ্ত ফলাফলে প্রতীয়মান হয়, খামারি অ্যাপ প্রদত্ত সার সুপারিশ ব্যবহারে কৃষক চর্চার তুলনায় প্রতি হেক্টরে সার খরচ ৩,৭৪২ টাকা সাশ্রয় এবং ৩৯০ কেজি ফলন বৃদ্ধি যার মূল্য ৩২ টাকা কেজি হিসেবে ১২,৪৮০ টাকা অর্থাৎ হেক্টরপ্রতি মোট আর্থিক লাভ ১৬,২২২ টাকা হবে।
প্রদর্শনী ট্রায়ালের ফলাফল পর্যালোচনায় এটি স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, ফসল আবাদে কৃষকের প্রচলিত সার ব্যবহারের তুলনায় খামারি অ্যাপ প্রদত্ত সার সুপারিশ ব্যবহারে উল্লেখযোগ্য হারে সারের ব্যয় সাশ্রয় ও ফলন বৃদ্ধি করা সম্ভব। খামারি অ্যাপ সঠিক মাত্রায় সার প্রয়োগ নিশ্চিত করার মাধ্যমে ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধি এবং অপ্রয়োজনীয় সার ব্যবহার হ্রাস করে খরচ সাশ্রয় করে, যা কৃষকের আর্থিক লাভ বৃদ্ধি নিশ্চিত করবে। তবে এটিকে ওয়ান-স্টপ কৃষি সার্ভিসে রূপান্তরের লক্ষ্যে রোগ ও পোকামাকড় দমন, কৃষি আবহাওয়া ও দুর্যোগ পূর্বাভাস, কৃষি পণ্যের বাজারদর, ফসলি জমির পরিমাণ, কৃষি উপকরণ, সেচ ইত্যাদি খামারি অ্যাপে অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। উল্লেখ্য, বাংলাদেশের সকল অঞ্চলে ‘খামারি’ অ্যাপের মাধ্যমে কৃষি তথ্য সেবাপ্রাপ্তি নিশ্চিতকরণে ৪৯৫টি উপজেলার মধ্যে অবশিষ্ট ৪০টি উপজেলায় ক্রপ জোনিং সম্পন্নকরণে কার্যক্রম চলছে।
জিওস্পেশাল প্রযুক্তিনির্ভর ‘খামারি’ অ্যাপ কৃষিক্ষেত্রে চতুর্থ শিল্পবিপ্লব (৪ওজ) প্রযুক্তির একটি স্মার্ট তথ্যসেবা অ্যাপ, যা বাংলাদেশে কৃষির চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এ পরিপ্রেক্ষিতে, ‘খামারি’ অ্যাপটির ব্যবহার কৃষকের মাঝে সম্প্রসারণ ও প্রচারের জন্য যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণে নীতিনির্ধারকসহ সকল পর্যায়ে উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন, যাতে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়। খামারি মোবাইল অ্যাপ ভবিষ্যতে টেকসই  কৃষি চর্চা অব্যাহত রাখার লক্ষ্যে কৃষক ও নীতিনির্ধারকদের জন্য একটি মূল্যবান সম্পদ হয়ে উঠবে বলে আশা করা যায়।

লেখক : পরিচালক, কম্পিউটার ও জিআইএস ইউনিট পিআই, ক্রপ জোনিং প্রকল্প, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (বিএআরসি), ফার্মগেট, ঢাকা-১২১৫। মোবাইল : ০১৭৮৪৩৬৬৯০০, ই-মেইল : ধষযবষধষ.রঁশ.পংব@মসধরষ.পড়স 

ফাইল ১

এক্সেসিবিলিটি

স্ক্রিন রিডার ডাউনলোড করুন