কনটেন্টটি শেষ হাল-নাগাদ করা হয়েছে: মঙ্গলবার, ১৪ অক্টোবর, ২০২৫ এ ০৮:৫০ PM
কন্টেন্ট: কৃষি কথা মাস: কার্ত্তিক সাল: ১৪৩২ প্রকাশের তারিখ: ১৫-১০-২০২৫
খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তায় বিনার ভ‚মিকা
ড. মো: আবুল কালাম আজাদ
বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট যা বিনা (ইওঘঅ) নামে সমধিক পরিচিত। বিনা প্রতিষ্ঠার মূল উদ্দেশ্য বাংলাদেশে টেকসই ও উৎপাদনশীল কৃষি নিশ্চিতকরণের জন্য পরমাণু শক্তি ব্যবহার করে (১) ফসলের গুণগত মানসম্পন্ন ও অধিক ফলনশীল নতুন নতুন জাত উদ্ভাবন করা (২) মাটি ও পানি ব্যবস্থাপনা প্রযুক্তি উদ্ভাবন করা ও (৩) রোগ ও পোকামাকড়ের দমন ব্যবস্থা উদ্ভাবন করা। বিনা পরমাণু শক্তির শান্তিপূর্ণ ব্যবহারের মাধ্যমে কৃষি গবেষণা করে থাকে। বিনা ইনডিউসড মিউটেশন (ওহফঁপবফ সঁঃধঃরড়হ) পদ্ধতি ব্যবহার করে। গতানুগতিক পদ্ধতি (ঈড়হাবহঃরড়হধষ) ও জিন প্রকৌশল ব্যবহার করে জাত উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে দু’টি মাতৃজাতের প্রয়োজন হয়, একটি গ্রহণকারী জাত আর অন্যটি প্রদানকারী জাত। ইনডিউসড মিউটেশন পদ্ধতিতে শুধু একটি মাতৃজাত প্রয়োজন হয় অর্থাৎ যে জাতটি উন্নত/রূপান্তর করা প্রয়োজন সে জাতটি হলেই চলে। ইনডিউসড মিউটেশনের ক্ষেত্রে যে জাতটি উন্নত/রূপান্তর করা প্রয়োজন সেটিকে পরমাণু শক্তি প্রয়োগ করলেই কাক্সিক্ষত বৈশিষ্ট্যটি উক্ত জাতে সৃষ্টি (ওহফঁপব) করা সম্ভব হয়। এ ছাড়াও অন্যান্য কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠান কর্তৃক উদ্ভাবিত জাত বা স্থানীয় জাত (খধহফ ৎধপব) এর দোষত্রæটি দূরীকরণের ক্ষেত্রে ইনডিউসড মিউটেশন একটি খুবই কার্যকর পদ্ধতি। বাংলাদেশের কৃষি উন্নয়ন যখনই কোনো উপযুক্ত জাতের অনুপস্থিতির কারণে বাধাগ্রস্ত হয়েছে তখনই বিনা পরমাণু শক্তি ব্যবহার করে উপযুক্ত জাত উদ্ভাবনের মাধ্যমে সে বাধা দূর করেছে।
ইরাটম-২৪
আন্তর্জাতিক ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ওজজও), ফিলিপাইন কর্তৃক উদ্ভাবিত ধানের জাত আইআর-৮ (ওজ-৮)। জাতটি প্রতি হেক্টরে ৬.০-৯.০ টন পর্যন্ত ফলন দিতে সক্ষম ছিল। কিন্তু জীবনকাল (১৬০-১৭০ দিন) বেশি হওয়ায় যে জমিতে এ জাতটি চাষ করা হতো সে জমিতে বোরো মৌসুমে একটি ফসল ছাড়া অন্য কোনো ফসল উৎপাদন ছিল অসম্ভব; সেচ, শ্রমিক খরচ ও অন্যান্য ব্যবস্থাপনা ব্যয় বেশি প্রয়োজন হওয়ায় ফসলের মোট উৎপাদন খরচও বেশি লাগত। আইআর-৮ জাতের ধানের বীজে গামা রশ্মি প্রয়োগ করে ইরাটম-২৪ নামে স্বল্প জীবনকাল (১৪০-১৪৫ দিন) ও উচ্চফলনশীল (হেক্টরপ্রতি ৬.০- ৮.০ টন) মিউট্যান্ট ধানের জাত উদ্ভাবন করা হয়, যা জাতীয় বীজ বোর্ড কর্তৃক ১৯৭৪ সালে সারা দেশে বাণিজ্যিকভাবে চাষাবাদের জন্য অবমুক্ত করা হয়। ইরাটম-২৪ এর জীবনকাল বোরো মৌসুমে মাতৃজাত আইআর-৮ হতে ২৫-৩০ দিন কম। আউশ মৌসুমে জাতটির জীবনকাল ১২৫-১৩০ দিন ও ফলন হেক্টরপ্রতি ৩.৫-৪.০ টন। ফলে জাতটি বোরো মৌসুমে ফসল কর্তনের সময় আকস্মিক বন্যা ও শিলাবৃষ্টি এড়াতে সক্ষম হয়। এ ছাড়াও জীবনকাল কম হওয়ায় সেচ, শ্রমিক ও অন্যান্য ব্যবস্থাপনা ব্যয় কম হওয়ায় উৎপাদন খরচও কমে যায় এবং বাংলাদেশে ফসলের নিবিড়তা অবমুক্তির বছরের ১৪৬% থেকে ১৯৯৪-৯৫ সালে ১৭৫% দাঁড়ায়।
বিনাধান-৭
বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলে মঙ্গা দূরীকরণে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট ১৯৯৭ সালে ব্রি ধান৩৩ নামে একটি স্বল্পজীবনকাল সম্পন্ন জাত ছাড় করে যার জীবনকাল ছিল ১১৮ দিন ও গড় ফলন ছিল ৪.৫ টন/হে.। জাতটি উক্ত এলাকায় স¤প্রসারণের মাধ্যমে ২০০৭-০৮ সাল পর্যন্ত কৃষকের ঘরে খাবারের অভাব, শ্রমিকের কাজের অভাব ও গবাদিপশুর খাদ্যাভাব দূর করা সম্ভব হয়নি। বিনা টিএনডিবি-১০০ জাতের ধান বীজে গামা রশ্মি প্রয়োগ করে বিনাধান-৭ জাতটি উদ্ভাবন করে। জাতটির জীবনকাল ১১০-১২০ দিন, গড় ফলন ৪.৮ টন/হে. ও সর্বোচ্চ ফলন ৫.৫ টন/হে.। জাতটি ছাড়করণের পরপরই উত্তরাঞ্চলের “মঙ্গা” দূরীকরণের জন্য ব্যাপকভাবে উক্ত এলাকায় স¤প্রসারণের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয় এবং স্বল্পসময়ের ব্যবধানে জাতটি “মঙ্গা” এলাকায় কৃষক পর্যায়ে দারুণ জনপ্রিয়তা অর্জন করে। কারণ জাতটির ধান কর্তন শুরু হয় আশ্বিন-কার্তিক মাসে। ফলে কৃষকের ঘরে “মঙ্গা”র সময় খাবারের নিশ্চয়তা আসে, শ্রমিক তার কাজের নিশ্চয়তা পায় ও ধানের খড়ের মাধ্যমে গবাদিপশুর খাবারেরও ব্যবস্থা হয়। ফলে বৃহত্তর রংপুর অঞ্চলের “মঙ্গা” দূরীভ‚ত হওয়াসহ সারাদেশের ফসলের নিবিড়তা ২০০৯-১০ বছরের ১৮০% তুলনায় ২০১৮-১৯ এ দাঁড়িয়েছে ১৯৮%। কৃষি স¤প্রসারণ অধিদপ্তরের হিসাব মোতাবেক শুধু আমন মৌসুমে জাতটির স¤প্রসারণ পাঁচ লক্ষ থেকে ছয় লক্ষ হেক্টর পর্যন্ত পৌঁছে ছিল যা আমন ধানের আওতায় মোট জমির প্রায় ১০-১২%। অর্থাৎ বিনাধান-৭ একটি মেগা ভ্যারাইটি হিসেবে বাংলাদেশের কৃষিতে স্থান করে নিয়েছিল।
বিনাধান-১৪
বিনাধান-১৪ জাতটি একটি নাবীতে রোপণোপযোগী বোরো ধানের জাত যা ফুল আসা পর্যায়ে উচ্চ তাপমাত্রা (৩৮ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড) সহনশীল, স্বল্প জীবনকাল সম্পন্ন (১০০-১১০ দিন) বোরো ধানের জাত। এটি হেক্টরপ্রতি ৭-৮ টন পর্যন্ত ফলন দিতে পারে। বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের আমন মৌসুমের উপযোগী উচ্চ আলোক সংবেদনশীল (ঐরমযষু ঢ়যড়ঃড়ঢ়বৎরড়ফ ংবহংরঃরাব) ও লম্বা গাছ বিশিষ্ট জাত, আঁশফলের বীজে কার্বন আয়ন বিম প্রয়োগ করে উদ্ভাবন করা হয় বিনাধান-১৪ জাতটি। এটির বীজতলায় বীজ ফেলতে হবে শীত চলে যাওয়ার পরে অর্থাৎ অঞ্চলভেদে ফেব্রæয়ারি মাসের শেষ সপ্তাহ হতে মার্চ মাসের প্রথম সপ্তাহে (ফাল্গুন মাসের ২য় হতে ৩য় সপ্তাহ পর্যন্ত)। ১৫-২০ দিনের চারা রোপণ করলে জুন মাসের ১ম বা ২য় সপ্তাহে কর্তন করে বিঘাপ্রতি ২৬-২৮ মণ ফলন পাওয়া সম্ভব। জাতটি দেরিতে রোপণের কারণে ফুল আসে এপ্রিল-মে মাসে যখন বাতাসের তাপমাত্রা কখনও কখনও ৩৫-৪০ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড পর্যন্ত উঠে তা সত্তে¡ও এ পর্যন্ত বিনাধান-১৪ তে চিটা হওয়ার কোনো খবর মাঠপর্যায় হতে পাওয়া যায়নি।
জাতটি খরাপ্রবণ বরেন্দ্র অঞ্চলে সরাসরি বপনোপযোগী একটি ধানের জাত (উরৎবপঃ ংববফবফ ৎরপব) নাবী বোরো ধানের জাত হিসেবে ক্রমান্বয়ে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। সরাসরি বপনের ক্ষেত্রে জমি কাদাকরণের (চঁফফষরহম) প্রয়োজন হয় না এবং মে-জুন মাসে প্রচুর বৃষ্টিপাত হওয়ায় সেচের তেমন প্রয়োজন পড়ে না, ২-৩টি সেচ দিলেই চলে। ফলে একদিকে যেমন ভ‚গর্ভস্থ পানির ব্যবহার কম হচ্ছে এবং উৎপাদন খরচ কমে প্রায় অর্ধেক হচ্ছে। বিনাধান-১৪ এর চালে প্রায় ১০% আমিষ থাকায় এটা বাংলাদেশের পুষ্টি নিরাপত্তায় ভ‚মিকা রাখছে।
বিনাধান-১৯
ঘঊজওঈঅ জাতগুলোর স্বল্পজীবনকাল ও খরা সহিষ্ণু বৈশিষ্ট্যের কারণে বাংলাদেশে আউশ মৌসুমে বৃষ্টিনির্ভর অবস্থায় চাষাবাদের জন্য প্রবর্তন করা হয়। ঘঊজওঈঅ-১০ জাতটির বিষমজাতীয়তা ) দূর করার জন্য এর বীজে কার্বন আয়ন বিম প্রয়োগে উদ্ভাবন করা হয় বিনাধান-১৯।বিনাধান-১৯ এ উক্ত বিষমজাতীয়তা দূর হয়ে একেবারে সমসত্ত বৈশিষ্ট্য লাভ করেছে। জাতটি খরা সহিষ্ণু, সেচের পানি সাশ্রয়ী এবং আউশ মৌসুমে চাষ উপযোগী। বরেন্দ্র ও পাহাড়ি এলাকাসহ সারা দেশে বৃষ্টি নির্ভর অবস্থায় ছিটিয়ে, ডিবলিং ও রোপা পদ্ধতিতে চাষ উপযোগী। পূর্ণবয়স্ক গাছের উচ্চতা ৮০-৯০ সেমি., জীবনকাল ৯৫-১০৫ দিন। চাল সাদা রঙের, সরু ও লম্বা, ১০০০ ধানের ওজন ২৩ গ্রাম। গড় ফলন ৪.৫ টন/হে. ও সর্বোচ্চ ফলন ৫.০ টন/হে.। কৃষি স¤প্রসারণ অধিদপ্তরের হিসেব মোতাবেক শুধু আউশ মৌসুমে জাতটি এক লক্ষ হেক্টরেরও বেশি বা আউশের আওতায় মোট জমির ৯-১০% ভাগ জমিতে চাষ হচ্ছে। অর্থাৎ বিনাধান-১৯ আউশ মৌসুমের জন্য একটি মেগা ভ্যারাইটি হিসেবে স্থান করে নিয়েছে।
বিনাধান-২০
বিনাধান-২০ হলো বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিনা) উদ্ভাবিত একমাত্র আমন ধানের মিউট্যান্ট জাত যা একদিকে উচ্চ আয়রন ও জিঙ্ক সমৃদ্ধ ও অন্যদিকে নাবী রোপণোপযোগী। গত আমন মৌসুমে দেশের পূর্বাঞ্চলে বিশেষ করে ফেনী, নোয়াখালী, কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, চাঁদপুরে ব্যাপক বন্যার পরে অক্টোবর মাসের প্রথম সপ্তাহের রোপণ করেও মাত্র ১২০-১৩০ দিনে হেক্টরপ্রতি ৫.০ টন/হে. ফলন পাওয়া গেছে। বিনাধান-২০ এর চাল লাল রঙের, লম্বা ও চিকন, অ্যামাইলোজের পরিমাণ বেশি থাকায় ভাত রান্না করে দীর্ঘক্ষণ রাখলেও ভাত নষ্ট হয় না। বিনাধান-২০ এর চাল চালকলে পলিশিং করার প্রয়োজন হয় না, ফলে কোনো পুষ্টি উপাদান নষ্ট হয় না।
বিনাশাইল
বাংলাদেশে জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত সময়ে দেশের ১৮% এলাকা বন্যায় প্লাবিত হয়। স্থানীয় জনপ্রিয় নাবী রোপণোপযোগী ও নি¤œফলনশীল জাত নাইজারশাইলের বীজে গামা রশ্মি প্রয়োগ করে বিনাশাইল জাতটি উদ্ভাবন করে, যা ১৯৮৭ সালে জাতীয় বীজ বোর্ড কর্তৃক কৃষকপর্যায়ে বাণিজ্যিকভাবে চাষাবাদের জন্য অবমুক্ত করা হয়। জাতটি আমন মৌসুমে সেপ্টেম্বর মাসের তৃতীয় সপ্তাহ পর্যন্ত রোপণ করেও ৩.৫-৪.০ টন/হে. ফলন পাওয়া সম্ভব, যা নাইজারশাইল অপেক্ষা অনেক বেশি। জাতটির জীবনকালও মাতৃজাত অপেক্ষা ১০-১৫ দিন কম। বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএডিসি) আপৎকালীন মজুদ হিসেবে প্রতি বছর বিনাশাইলের বীজ উৎপাদন করে থাকে। বিনাশাইল জাতটি আংশিক আলোক সংবেদনশীল এর চাল চিকন ও লম্বা ও ভাত খেতে খুব সুস্বাদু।
বিনা ধান২৫
ব্রি ধান২৯ বোরো মৌসুমে বাংলাদেশে একটি মেগা ভ্যারাইটি কিন্তু এর জীবনকাল ১৬০ দিন, চাল লম্বা কিন্তু মাঝারি মোটা। লম্বা জীবনকাল হওয়ায় ফুল আসার সময় বাতাসের তাপমাত্রা ৩৫ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড বা তার উপরে হলে ধান চিটা হয়ে যায়, এর চাল মোটা হওয়ায় চালকলে এটাকে পলিশ করে বিভিন্ন নামে বাজারজাত করা হয়। ব্রি ধান২৯ এর বীজে কার্বন আয়ন বিম প্রয়োগ করে বিনা উদ্ভাবন করে বিনা ধান২৫ জাতটি। বিনা ধান২৫ এর জীবনকাল ব্রি ধান২৯ অপেক্ষা ২ সপ্তাহ কম, ফলন ব্রি ধান২৯ অপেক্ষা বেশি, চাল অত্যন্ত চিকন ও লম্বা অর্থাৎ প্রিমিয়াম কোয়ালিটির। ফলে বিনা ধান২৫ চালকলে পলিশিং করার প্রয়োজন হয় না বলে কোন পুষ্টি উপাদান নষ্ট হয়না, জীবনকাল কম হওয়ায় অকস্মিক বন্যা এড়াতে পারে। এ ছাড়াও একই জমিতে ধান কর্তনের পর আর একটি ফসল চাষ করা সম্ভব হয়।
বিনাচিনাবাদাম-৪
বিনা ঢাকা-১ জাতেরই বীজে গামা রশ্মি প্রয়োগ করে উদ্ভাবন করে বিনাচিনাবাদাম-৪ জাতটি। বিনাচিনাবাদাম-৪ জাতটি উচ্চফলনশীল, স্বল্পমেয়াদি, রোগ-মাকড় সহনশীল, উচ্চ আমিষ ও সুস্বাদু বিনাচিনাবাদামের জাত। চিনাবাদামের খোসা পাতলা এবং বীজের আকার বড় হওয়ায় এটি বাজারে ভালো দাম পায়। সব মিলিয়ে চিনাবাদামের দেশের কৃষি উৎপাদনে বৈচিত্র্য আনয়ন, পুষ্টি ঘাটতি পূরণ ও কৃষকের জীবনমান উন্নয়নের জন্য একটি পরীক্ষিত প্রযুক্তি। কৃষি স¤প্রসারণ অধিদপ্তরের হিসাব মোতাবেক বর্তমানে জাতটি বাংলাদেশে চীনাবাদামের আওতাধীন মোট জমির প্রায় ৪০-৫০% ভাগ জমিতে চাষ হচ্ছে। বিনাচিনাবাদাম-৪ এর বীজে শতকরা ৪৮ ভাগের বেশি তেল, ২৮% ভাগের বেশি আমিষ, ভিটামিন ডি, ভিটামিন ই ইত্যাদি থাকে ফলে বাংলাদেশের মানুষের পুষ্টি চাহিদা পূরণে বিনাচিনাবাদাম-৪ গুরুত্বপূর্ণ ভ‚মিকা রাখছে।
বিনাচিনাবাদাম-৬
চিনাবাদামের স্থানীয় জনপ্রিয় জাত ঢাকা-১ এর ক্ষেত্রে অঙ্গজ বৃদ্ধি পর্যায়ে মাটির লবণাক্ততা ৪ ডিএস/মি. এর বেশি হলে অঙ্কুরোদগমের পর গাছগুলো আস্তে আস্তে মারা যায়। ফলে লবণাক্ত এলাকায় জাতটি চাষের অনুপোযোগী। বিষয়টি বিবেচনা করে ঢাকা-১ জাতের এর বীজে পুনঃপুনঃ গামা রশ্মি প্রয়োগ করে (জব-রৎৎধফরধঃরড়হ) উদ্ভাবন করা হয় বিনাচিনাবাদাম-৬ জাতটি। বিনাচিনাবাদাম-৬ জাতটি অঙ্গজ বৃদ্ধি পর্যায়ে ৬ ডিএস/মি. লবণাক্ততা ও ফুল ফোটা পর্যায়ে ৯-১০ ডিএস/মি. লবণাক্ততা সহ্য করতে পারে। ফলে এজাতটি লবণাক্ত এলাকায় দারুণ জনপ্রিয়তা পেয়েছে। চর এলাকায়ও এজাতটি সর্বোচ্চ অর্থাৎ ৪.০ টন/হে. ফলন দিতে সক্ষম। জাতটির বীজে ৪৮.৫১% তেল ও ২৮.৬৮% আমিষ আছে।
বিনাসরিষা-৯
বাংলাদেশে সরিষা বপনের উপযুক্ত সময় অক্টোবরের ১৫ তারিখ হতে নভেম্বরের ১৫ তারিখ। প্রতি বছর এ সময়ে বপনকৃত সরিষার জমিতে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয় ফলে জমির বপনকৃত সরিষা কখনও কখনও সম্পূর্ণ বা আংশিক নষ্ট হয়ে যায়। জলাবদ্ধতা সহ্য ক্ষমতাসম্পন্ন সরিষার জাত উদ্ভাবনের লক্ষ্যে বিনাসরিষা-৪ এর বীজে গামা রশ্মি প্রয়োগ করে বিনা সরিষা-৯ জাতটি উদ্ভাবন করে। বিনাসরিষা-৯ জাতটি চারা অবস্থায় ৫-৭ দিন পর্যন্ত জলাবদ্ধতা সহ্য করতে পারে, ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত বপন করলেও মোটামুটি ভাল ফলন পাওয়া যায়। জাতটি শূন্য চাষে বা সাথী ফসল হিসেবেও খুবই উপযোগী। জীবনকাল ৮০-৮৪ দিন ও ফলন ১.৬ টন/হে.। জাতটি দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় উপক‚লীয় এলাকায় খুবই জনপ্রিয় ও সরিষা চাষের আওতাধীন জমির প্রায় ৭% জমিতে চাষ হচ্ছে। বিনাসরিষা-৯ এর বীজে ৪৩% তেল থাকে তাই এ জাতটি বাংলাদেশের মানুষের পুষ্টি নিরাপত্তায় ভ‚মিকা রাখছে।
বিনা তিল৬
বাংলাদেশে তিল সাধারণত খরিফ-১ মৌসুমে (ফাল্গুনের প্রথম সপ্তাহ হতে শেষ সপ্তাহ পর্যন্ত) বপন করা হয় তবে কোনো কোনো এলাকায় খরিফ-২ মৌসুমেও চাষ করা হয়ে থাকে। বিষয়টি বিচেনায় নিয়ে সাময়িক জলাবদ্ধতা সহনশীল তিলের জাত উদ্ভাবনের লক্ষ্যে বিনাতিল-১ এর বীজে গামা রশ্মি প্রয়োগ করে উদ্ভাবন করা হয় বিনাতিল৬ জাতটি। বিনা তিল৬ জাতটি ২-৩ দিনের সাময়িক জলাবদ্ধতা সহ্য করতে পারে, গাছ শাখাবিহীন, বীজের রং সাদা, জীবনকাল ৮০-৮৪ দিন ও ফলন ১.৪টন/হে.। তিলে মেডিসিনাল, এন্টি অক্সিড্যান্ট ও এন্টি ইনফ্ল্যামেটরি বৈশিষ্ট্যসহ ওমেগা-৩ ফ্যাটি এসিডের কারণে এটা মানব স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী।
বিনাপাটশাক-১
বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট কর্তৃক উদ্ভাবিত সিভিএল-১ জাতের দেশি পাটের বীজে গামা রশ্মি প্রয়োগ করে বিনাপাটশাক-১ জাতটি উদ্ভাবন করা হয়। ২০০৩ সালে জাতীয় বীজ বোর্ড জাতটিকে শুধু শাক হিসেবে ব্যবহারের জন্য নিবন্ধন প্রদান করে। এটির গাছ খাট, পাতা লম্বা ও চ্যাপ্টা। প্রতি হেক্টর জমি হতে মাত্র ৩০-৪০ দিনে ৩.৫ টন শাক পাওয়া সম্ভব। পাটশাকে প্রতি ১০০ গ্রামে ১০,৭০০ মাইক্রোগ্রাম ভিটামিন এ প্রচুর পরিমাণে আয়রন ও ২টি ক্যানসার প্রতিরোধী সাবস্ট্যান্স রয়েছে। এ জাতটি ময়মনসিংহ, গাজীপুর, রংপুরসহ অন্যান্য এলাকায় চাষ হচ্ছে। তাই এ জাতটি বাংলাদেশের মানুষের সুস্বাস্থ্য বজায় রাখাসহ ক্যান্সার, রাতকানা রোগ ও রক্তশূন্যতা দূরীকরণে ভ‚মিকা রাখছে।
উপর্যুক্ত আলোচনা হতে দেখা যায় যে, গতানুগতিক প্রজনন পদ্ধতি ব্যবহার করে যখনই কোনো কাক্সিক্ষত জাতের সংশোধন, রূপান্তর বা উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয়েছে তখনই ইনডিউসড মিউটেশন পদ্ধতি ব্যবহার করে উক্ত বাধা অতিক্রম (ইৎবধশ ঃযৎড়ঁময) করা সম্ভব হয়েছে। ভবিষ্যতেও এ ধারা অব্যাহত রেখে বিনা বাংলাদেশের খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তায় ভ‚মিকা রাখবে এটাই আমাদের প্রত্যাশা।
লেখক : মহাপরিচালক (প্রাক্তন), বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিনা), ময়মনসিংহ, মোবাইল : ০১৭১০৭৬৩০০৩। ই-মেইল :makazad.pbdbina@gmail.com