কনটেন্টটি শেষ হাল-নাগাদ করা হয়েছে: মঙ্গলবার, ১৪ অক্টোবর, ২০২৫ এ ০৯:২৩ PM

খাদ্যে স্বনির্ভর বাংলাদেশ গড়তে ঐক্যবদ্ধ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর

কন্টেন্ট: কৃষি কথা মাস: কার্ত্তিক সাল: ১৪৩২ প্রকাশের তারিখ: ১৫-১০-২০২৫

খাদ্যে স্বনির্ভর বাংলাদেশ গড়তে ঐক্যবদ্ধ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর
কৃষিবিদ মো: ছাইফুল আলম
প্রতি বছর ১৬ অক্টোবর বিশ্বব্যাপী পালিত হয় বিশ্ব খাদ্য দিবস। ১৯৭৯ সালে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (FAO) এই দিবসের সূচনা করে, যার মাধ্যমে খাদ্য নিরাপত্তা, দারিদ্র্য নিরসন এবং সুষম পুষ্টি নিশ্চিতকরণে বিশ্বব্যাপী সচেতনতা ও এই সংক্রান্ত বিভিন্ন উদ্যোগ বৃদ্ধি পেয়ে থাকে। এবারের প্রতিপাদ্য- ‘হাত রেখে হাতে, উত্তম খাদ্য ও উন্নত আগামীর পথে’।
বাংলাদেশের জন্যও এ দিবসের গুরুত্ব বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। কৃষিনির্ভর এ দেশ খাদ্য উৎপাদনে আত্মনির্ভর হয়েছে কিন্তু এখনও খাদ্য নিরাপত্তা ও পুষ্টিহীনতা বাংলাদেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে। বাংলাদেশ ধান, মাছ, মাংস ও শাকসবজি উৎপাদনে এখন বেশ এগিয়ে গিয়েছে সেইসাথে প্রযুক্তিনির্ভর কৃষি, জলবায়ু সহনশীল চাষাবাদ ও উদ্ভাবনী কৃষি পদ্ধতিতে (যেমন : ভাসমান চাষাবাদ) উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করেছে। তবে জনসংখ্যা বৃদ্ধি, জলবায়ু পরিবর্তন, বাজার অস্থিতিশীলতা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ খাদ্য নিরাপত্তায় নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।
বাংলাদেশ একসময় খাদ্য ঘাটতির দেশ হিসেবে পরিচিত হলেও, আজ আমরা খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতার দোরগোড়ায় পৌঁছে গেছি। এটি সম্ভব হয়েছে আমাদের পরিশ্রমী কৃষক, উদ্ভাবনী প্রযুক্তি, সরকারি নীতি সহায়তা এবং কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মাঠপর্যায়ের অক্লান্ত সেবার কারণে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ১৯৭২-২০২৫ এই সময়কালে নগরায়ণ, শিল্পায়ন ও অবকাঠামো সম্প্রসারণের কারণে কৃষি জমি ১০.৪৮ লাখ হেক্টর কমলেও ফসল উৎপাদনে ব্যাপক সাফল্য অর্জন করেছে। ১৯৮৯ সালে ৮০.২২৬%  কৃষিজমি ২০২২ সালে ৭২.৩৫২% এ নেমেছে, কিন্তু ধান উৎপাদন ৩.৫ গুণ বেড়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে উৎপাদন ৫.৬৪ মিলিয়ন টন (২১% বৃদ্ধি) ও সরিষা ১.৪৩ মিলিয়ন টন (৪৩% বৃদ্ধি) রেকর্ড করা হয়। যথাসময়ে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার, উচ্চফলনশীল বীজ সহজলভ্যকরণ, গুণগত মানের সার নিশ্চিতকরণ ও কৃষক প্রশিক্ষণ এই সাফল্যের মূল চালিকাশক্তি (তথ্য সূত্র: বিবিএস)। তবে শুধু উৎপাদন বাড়ালেই হবে না; আমাদের খাদ্য হতে হবে নিরাপদ, পুষ্টিকর ও মানসম্পন্ন। বর্তমানে ভেজাল, রাসায়নিকের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এবং  কৃষিজমির হ্রাস এই চ্যালেঞ্জগুলোর মুখোমুখি হতে হচ্ছে। উন্নত ভবিষ্যতের জন্য আমাদের কৃষিকে হতে হবে আরও প্রযুক্তিনির্ভর, পরিবেশবান্ধব এবং বাজারকেন্দ্রিক। 
এ বছর বিশ্ব খাদ্য দিবস উপলক্ষ্যে আমরা দেশের প্রত্যেক উপজেলায় আলোচনা সভা, কৃষক সমাবেশ, কৃষি মেলা, নিরাপদ খাদ্য প্রশিক্ষণ এবং সচেতনতামূলক প্রচার কার্যক্রম হাতে নিয়েছি। আমাদের লক্ষ্য কৃষকের ঘরে ঘরে নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাদ্য উৎপাদনের বার্তা পৌঁছে দেয়া। সে লক্ষ্যে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কার্যক্রম নি¤œরূপ- 
জনপুষ্টি উন্নয়ন : বায়োফর্টিফায়েড ফসল (যেমন: ভিটামিন-এ সমৃদ্ধ গোল্ডেন রাইস, জিঙ্ক-সমৃদ্ধ ধান ও উচ্চ আয়োডিনযুক্ত সবজি) চাষে প্রশিক্ষণ এবং তথ্য ও কারিগরি সহযোগিতা দেয়া হচ্ছে। এতে ১৫% কৃষক পরিবারে ভিটামিন-এ ঘাটতি কমেছে। ১২ লাখ গ্রামীণ বাড়ির আঙিনায় পুষ্টি বাগান প্রকল্প চলমান রয়েছে, যা ৩৫ লাখ মানুষের দৈনিক পুষ্টি চাহিদার ৪০% পূরণ করছে। নারীরা ৭০% বাগান ব্যবস্থাপনায় নেতৃত্ব দিচ্ছেন। ৫০ হাজারের বেশি উঠান বৈঠক ও পুষ্টিমেলার মাধ্যমে ২ কোটি মানুষকে সচেতন করা হয়েছে, (যা পরবর্তীতে সরকারের অন্যান্য মন্ত্রণালয়/বিভাগের মাধ্যমে স্কুল পুষ্টি প্রোগ্রাম হিসেবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে চালু হয়ে ২৫ লাখ শিশুর খাদ্যাভ্যাসে পুষ্টি সংযোজন করেছে)। জলবায়ু সহনশীল ফসল যেমন লবণাক্ততা-সহিষ্ণু ধান (ব্রি ধান১০৮) ও বন্যা সহনশীল ডাল চাষে ৫ লাখ হেক্টর জমিতে উৎপাদন ১৮% বেড়েছে, যা ২০ লাখ মানুষের পুষ্টি জোগাচ্ছে। ২০১০-২০২৩ সময়ে বাংলাদেশে শিশু স্টান্টিং ৪২% থেকে ২৪.৬%-এ হ্রাস (ইউঐঝ ২০২২) ও মাতৃস্বাস্থ্যে রক্তস্বল্পতা ২৬% কমেছে (বাংলাদেশ ডেমোগ্রাফিক হেলথ সার্ভে, ২০২৩)। পুষ্টিসমৃদ্ধ কৃষিজাত পণ্যের উৎপাদন ৬০% বৃদ্ধি পেয়ে দেশের খাদ্য বৈচিত্র্য সূচক ৭.৫ থেকে ৮.৯ এ উন্নীত হয়েছে।
জনশক্তিকে সম্পদে রূপান্তর : কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর উচ্চফলনশীল জাতের ব্যবহার ও সম্প্রসারণে উৎপাদনশীলতা ৩০% বৃদ্ধি পেয়েছে। নারীর অংশগ্রহণে কৃষি শ্রমশক্তির ৩৬% নারী অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। আইসিটিভিত্তিক সেবার মাধ্যমে কৃষকের কাছে বীজ, সারের মাত্রা ও বাজারমূল্যের তথ্য সরবরাহ করা হয়। এ সময়ে অসংখ্য ক্ষুদ্র        কৃষিভিত্তিক উদ্যোক্তা গড়ে উঠেছে, যা কৃষি-ব্যবসায় ২৫% প্রবৃদ্ধি এনেছে। এসব উদ্যোগে বাংলাদেশের কৃষিজ জিডিপিতে বার্ষিক ৩.৫% প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে, যা অর্থনীতিতে ১১.৫% অবদান রাখে। (তথ্য সূত্র: ইইঝ খঋঝ ২০২২) 
কৃষিতে বালাইনাশক ব্যবহার হ্রাস : বালাইনাশকের অপরিকল্পিত ব্যবহার বৃদ্ধির কারণে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ২০১৫-২০ সালে সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা (ওচগ) পদ্ধতি চালু করে, যার মাধ্যমে ৫০ হাজার কৃষককে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনার শেষ ধাপ হলো রাসায়নিক দমন। তাই সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা ব্যবহারের ফলে রাসায়নিক বালাইনাশক ব্যবহার ৩৫% হ্রাস পায়। ২০২০ নাগাদ ২০-২৫% কৃষক জৈব বা প্রাকৃতিক কীটনাশক ব্যবহার শুরু করে। এখন কৃষকপর্যায়ে সচেতনতা বাড়ায় বালাইনাশক ব্যবহার প্রতি বছর ৩-৫% কমেছে। ফলে মাটির গুণাগুণ ও পরিবেশের উন্নয়নসহ টেকসই কৃষি ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। 
নিরাপদ ফসল উৎপাদনে উত্তম কৃষি চর্চা (এঅচ) বাস্তবায়ন : ২০১৫ সালে ঋঅঙ, টঘউচ ও ঝধভব ঋড়ড়ফ অঁঃযড়ৎরঃু-এর সহায়তায় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর বাংলাদেশ এঅচ ফ্রেমওয়ার্ক চালু করে, যা মাটি, পানি, সার ব্যবস্থাপনা, শ্রমিক স্বাস্থ্য ও ফসল সংরক্ষণে মানদÐ নির্ধারণ করে ও  ২০১৮ থেকে মাঠপর্যায়ে কার্যক্রম শুরু হয়। ২০২০ সালে ১০০টি নিরাপদ ফসল উৎপাদন এলাকা গঠিত হয়। লক্ষ্যভুক্ত ফসলগুলো হলো  টমেটো, শসা, লিচু পেয়ারা, আম ও ধান। ২০২৫ সালে এঅচ-অনুগত ফসল মোট কৃষি উৎপাদনের ৮-১০% বৃদ্ধি পেয়েছে।
ডিএইর এই উদ্যোগে কৃষকের দক্ষতা বৃদ্ধি, ফসলের গুণগত মান উন্নয়ন ও রপ্তানি সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে এবং  টেকসই  কৃষি ও আন্তর্জাতিক বাজারসংযোগ ত্বরান্বিত করছে।
মাটির স্বাস্থ্য রক্ষায় জৈবসারের উৎপাদন ও ব্যবহার বৃদ্ধি : কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই) টেকসই কৃষি নিশ্চিত করতে জৈবসার উৎপাদন ও ব্যবহারে  বিশেষ অগ্রণী  ভ‚মিকা পালন করছে। ২০১০ সালে ১০ লাখ টন থেকে বেড়ে ২০২৩ সালে ২৫ লাখ টন জৈবসার উৎপাদন হয়েছে (ভার্মিকম্পোস্ট : ৮ লাখ টন)। এ ছাড়া ৮০০টি কমিউনিটি বেজড জৈবসার উৎপাদন কেন্দ্র স্থাপন হয়েছে। জৈবসার ব্যবহার ৩০% কৃষিজমিতে পৌঁছেছে, আগে যা ছিল ৫-৭%। বিশেষ করে সবজি চাষে ৪৫% কৃষক জৈবসার ব্যবহার করেন। এর ফলে রাসায়নিক সারের ব্যবহার ২০% হ্রাস (২০১৫-২০২৩) ও মাটিতে জৈব পদার্থের ব্যবহার ১.২% থেকে ২.৫% বৃদ্ধি পেয়েছে।
২০১৫-২০২৩ সময়ে ১৫ লাখ কৃষককে ভার্মিকম্পোস্ট, সবুজ সার ও কম্পোস্ট তৈরির প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে। ২০০৮ সালের ‘জৈবসার নীতিমালা’ অনুযায়ী উৎপাদন কেন্দ্রে ভর্তুকি ও প্রণোদনা প্রদান করা হয়েছে। পাঁচ হাজারেরও বেশি প্রদর্শনী প্লটের মাধ্যমে জৈবসারের কার্যকারিতা দেখানো হয়েছে। মাটির উর্বরতা, পানি ধারণক্ষমতা ও ফসলের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি পেয়েছে। রাসায়নিক সারের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে পরিবেশবান্ধব চাষাবাদ নিয়ে এসেছে টেকসই  কৃষির অপার সম্ভাবনা। এরই ফলশ্রæতিতে কৃষক আয়  জৈবসার উৎপাদন ও বিক্রিতে ৩০-৩৫% বৃদ্ধি করা সম্ভব হয়েছে। ২০২৩ সালের তথ্য  অনুযায়ী, জৈবসার খাতে ১২% বার্ষিক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করে বাংলাদেশ টেকসই কৃষির দিকে এগিয়ে চলেছে। ই-কৃষির উন্নয়নে ডিএই কর্তৃক উদ্ভাবিত  কৃষকের জানালা, ডিজিটাল  বালাইনাশক নির্দেশিকা, কৃষকের ডিজিটাল ঠিকানা ইত্যাদি উদ্যোগ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সমাদৃত হয়েছে।
আগামীর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ঞৎধহংভড়ৎসরহম ইধহমষধফবংয অমৎরপঁষঃঁৎব: ঙঁঃষড়ড়শ ২০৫০ এর মাধ্যমে বাংলাদেশের কৃষির সম্ভাবনা, চ্যালেঞ্জ এবং রূপান্তরের পথনির্দেশ তুলে ধরা হয়েছে। এখানে টেকসই কৃষি, জলবায়ু সহনশীল প্রযুক্তি,  প্রযুক্তিনির্ভর  কৃষি স্মার্ট যন্ত্রপাতি, ড্রোন, স্যাটেলাইট ডেটা ও অও ভিত্তিক সেচ ও ফসল ব্যবস্থাপনা, কৃষি তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, কৃষি জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ,খাদ্য নিরাপত্তা ও পুষ্টি সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং পুষ্টিকর ফসলের চাষ বাড়ানো, কৃষি উদ্যোক্তা সৃষ্টি ও কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াকরণ, নতুন বাজার সৃষ্টি ও আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশ, কৃষকদের ন্যায্যমূল্য ও বিনিয়োগ সুবিধা নিশ্চিত করা ইত্যাদি ক্ষেত্রসমূহ বাছাই করে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর নিরলসভাবে কাজ চলমান রাখছে।
বিশ্ব খাদ্য দিবস ২০২৫ সফল হোক। সচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি কৃষি ক্ষেত্রে সরকারি কার্যক্রমের সুষ্ঠু বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা গেলেই বিশ্ব খাদ্য দিবসের প্রতিপাদ্য অনুযায়ী   পুষ্টিকর খাদ্য উৎপাদন ও জোগানের মাধ্যমে ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত জনপদ গড়ে তোলা সম্ভব হবে।

লেখক : মহাপরিচালক, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, খামারবাড়ি, ঢাকা। মোবাইল : ০১৭১১২০৮৮৪৩, ই-মেইল :dg@dae.gov.bd                                                

ফাইল ১

এক্সেসিবিলিটি

স্ক্রিন রিডার ডাউনলোড করুন