কনটেন্টটি শেষ হাল-নাগাদ করা হয়েছে: রবিবার, ১৫ মার্চ, ২০২৬ এ ০১:১৪ PM
কন্টেন্ট: কৃষি কথা মাস: চৈত্র সাল: ১৪৩২ প্রকাশের তারিখ: ১৫-০৩-২০২৬
ক্যানোলা তেলের পুষ্টিগুণ ব্যবহার ও চাষের সম্ভাবনা
ড. মোঃ আব্দুল লতিফ আকন্দ
ক্যানোলা হলো সরিষার বিশেষ জাত। আমাদের দেশের অধিকাংশ মানুষের ধারণা ক্যানোলা একটি নির্দিষ্ট উদ্ভিদ বা ফসল। প্রকৃতপক্ষে ক্যানোলা কোন প্রাকৃতিক উদ্ভিদ বা বীজের নাম নয়। সত্তরের দশকে কানাডার বিজ্ঞানীরা সরিষার ক্রসব্রিডিং-এর মাধ্যমে সরিষার ক্যানোলা জাত উদ্ভাবন করেন। এ জাতের বীজের তেলে কম পরিমাণ ইউরিক এসিড ও গ্লুকোসিলোনেট থাকে। এই নতুন ও উন্নত সরিষার বীজের তেলকে কানাডিয়ানরা নামকরণ করেছে ‘ঈঅঘঙখঅ’। ‘ঈধহধফরধহ ঙরষ খড়ি অপরফ’ থেকে ঈঅঘঙখঅ শব্দের উদ্ভব। ক্যানোলা সরিষার তেলে শতকরা ২ ভাগের কম ইউরিক এসিড এবং খৈলে প্রতি গ্রামে ৩০ মাইক্রোমোলের কম পরিমাণে গ্লুকোসিলোনেট থাকে। ক্যানোলা তেলে গ্লুকোসিলোনেটের পরিমাণ কম থাকায় সাধারণ সরিষা তেলের মতো ঝাঁঝালো ভাব থাকে না। তাই ক্যানোলা তেল সারা বিশে^ই ভোজ্য তেল হিসেবে রন্ধন কাজে ব্যবহৃত হয়।
সরিষার ক্যানোলা জাত উদ্ভাবনের ইতিহাস
১৯৫৬ সালের শুরুর দিকে সরিষার তেলে উচ্চ মাত্রায় ইউরিক এসিড বিদ্যমান থাকায় তেলের পুষ্টিগুণ নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপিত হয়। কানাডার উদ্ভিদ প্রজননবিদরা সরিষার ইউরিক এসিড নিয়ে গবেষণা শুরু করেন। তারা সর্ব প্রথম সরিষার ইৎধংংরপধ হধঢ়ঁং প্রজাতিতে ১৯৬০ সালে এবং ইৎধংংরপধ ৎধঢ়ধ প্রজাতিতে ১৯৬৪ সালে স্বল্প পরিমাণ ইরুসিক এসিড সম্পন্ন গাছ সনাক্ত করেন। ঘঁমমবঃ ও বন্যজাত খরযড় এর মধ্যে সংকরায়নের মাধ্যমে ১৯৬৮ সালে সর্বপ্রথম ‘ঙৎড়’ নামে ইৎধংংরপধ হধঢ়ঁং প্রজাতির কম ইউরিক এসিড সম্পন্ন সরিষার জাত উদ্ভাবন করা হয়। ১৯৭১ ও ১৯৭৩ সালে আরো কয়েকটি কম ইরুসিক এসিড সম্পন্ন জাত উদ্ভাবিত হয়।
সরিষার খৈল আমিষের একটি উৎকৃষ্ট উৎস যা গরু-ছাগল, হাঁস-মুরগীর খাবার হিসাবে ব্যবহৃত হয়। খৈলে বিদ্যমান গ্লুকোসিনোলেটের পরিমাণ বেশি থাকলে তা গরু-ছাগল বা হাঁস মুরগীকে খাওয়ালে গলগন্ড রোগ হতে পারে। তাই উদ্ভিদ প্রজননবিদরা চেষ্টা করে ১৯৬৭ সালে চড়ষরংয পঁষঃরাধৎ ‘ইৎড়হড়ংিশর’-এর বীজে কম পরিমাণে গ্লুকোসিলোনেট সনাক্ত করেন।
ক্যানোলা তেলের পুষ্টিগুণ
তেল থেকে আমরা শরীরের কর্মক্ষমতার জন্য প্রয়োজনীয় শক্তি, অত্যাবশ্যকীয় ফ্যাটি এসিড যেমন- ওমেগা-৩ ও ওমেগা-৬ পেয়ে থাকি। সম্পৃক্ত ও অসম্পৃক্ত এ দুই ধরনের চর্বিই শক্তি উৎপাদন, ভিটামিন গ্রহণ ও কোষ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। অসম্পৃক্ত চর্বিকে সম্পৃক্ত চর্র্বির তুলনায় ভালো চর্বি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। অনেক খাদ্য বিশেষজ্ঞ বিশ্বাস করেন যে, ভোজ্য তেল হিসাবে ক্যানোলা তেল অধিক স্বাস্থ্যসম্মত। ক্যানোলা তেল ভাল চর্বি সমৃদ্ধ। ফ্যাটি এসিড গঠন এবং এন্টি-অক্সিডেন্ট ঃড়পড়ঢ়যবৎড়ষং, ঢ়যুঃড়ংঃবৎড়ষং ও চড়ষুঢ়যবহড়ষং এর মাত্রা বিবেচনায় ক্যানোলা তেল অনন্য বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন। ক্যানোলা তেলে প্রায় ১০% ওমেগা-৩ এবং প্রায় ৬৫% অলিক এসিড (ওমেগা-৯) বিদ্যমান। অন্যান্য সাধারণ উদ্ভিজ্জ্ব তেলের তুলনায় সম্পৃক্ত ফ্যাটি এসিডের পরিমাণও কম। এ তেলে সম্পৃক্ত চর্বি কম থাকায় বেশি ঘনত্বের লাইপো প্রোটিনের পরিমাণ কমিয়ে হৃদরোগের ঝুঁকি কমায়।
ক্যানোলা তেলে আছে : সম্পৃক্ত চর্বি মাত্র শতকরা ৭ ভাগ; কোন ট্রান্স চর্বি থাকে না; যে কোন সাধারণ রন্ধন তেলের তুলনায় বেশি পরিমাণে উদ্ভিজ্জ্ব ওমেগা-৩ চর্বি বিদ্যমান; উচ্চমাত্রার মনো অসম্পৃক্ত চর্বি ওমেগা-৯ (অলিক এসিড) বিদ্যমান; ওমেগা-৬ চর্বির ভালো উৎস।
ক্যানোলা তেলে বিদ্যমান এন্টিঅক্সিডেন্ট
ক্যানোলা তেলে বিভিন্ন ধরনের প্রাকৃতিক এন্টিঅক্সিডেন্ট থাকে। এগুলো হলো ভিটামিন-ই, ফেনোলিক যৌগ যেমন ক্যানোলা ও ক্যারোটিনয়েড। এ সমস্থ এন্টিঅক্সিডেন্ট শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায় ও ক্যান্সার প্রতিরোধ করে।
ক্যানোলা উৎপাদনকারী দেশ
কানাডা বিশ্বে প্রধান ক্যানোলা উৎপাদনকারি ও রপ্তানিকারি দেশ। ক্যানোলা উৎপাদনকারি অন্যান্য দেশ হলো ইউরোপিয়ান ইউনিয়নভুক্ত দেশ সমূহ, চীন, ভারত, জাপান, অস্ট্রেলিয়া ও রাশিয়া। উৎপাদনের দিক থেকে বিশ্বে সয়াবিন ও পাম তেলের পরেই ক্যানোলা তেলের স্থান। কানাডা হলো প্রথম দেশ যেখানে প্রচুর পরিমাণে ক্যানোলা সরিষা উৎপন্ন হয়। কানাডায় সর্বপ্রথম ১৯৭৪ সালে ক্যানোলা তেল উৎপন্ন করে। বিশ্বের প্রায় ২২% ক্যানোলা তেল উৎপন্ন হয় কানাডায়।
বাংলাদেশে ক্যানোলা তেলের ব্যবহার
ভোজ্য তেল হিসাবে ক্যানোলা তেল বাংলাদেশের সচেতন ভোক্তারা ইতোমধ্যে ব্যবহার শুরু করেছেন। বর্তমানে অনেক সুপারমল গুলোতে বোতলজাত ক্যানোলা তেল বিক্রি হচ্ছে। এসব তেল বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করে সরাসরি আমদানি করা হয়। এ ছাড়াও কোন কোন আমদানিকারক বিদেশ থেকে ক্যানোলা বীজ আমদানি করে দেশে ভেঙ্গে বোতলজাত করে বিক্রি করছে। বিদেশ থেকে কি পরিমাণ ক্যানোলা তেল বা ক্যানোলা বীজ আমদানি হচ্ছে তার কোন পরিসংখ্যান নেই। তাই বাংলাদেশে সরিষার ক্যানোলা জাত উদ্ভাবন ও আবাদের মাধ্যমে পুষ্টি সমৃদ্ধ ক্যানোলা তেল উৎপাদন করে ভোজ্য তেলের চাহিদা পূরণের পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় করা সম্ভব।
বাংলাদেশে সরিষার ক্যানোলা জাত উদ্ভাবন
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনষ্টিটিউট, গাজীপুরে অষ্ট্রেলিয়া থেকে সংগৃহীত ১৫টি ক্যানোলা সরিষা নিয়ে সর্ব প্রথম গবেষণা শুরু করি। আমার নেতৃত্বে ২০১৮ সালে বারি সরিষা-১৮ নামে সরিষার ক্যানোলা জাত উদ্ভাবন করি এবং জাতীয় বীজ বোর্ড কর্তৃক বাংলাদেশের সর্বত্র চাষাবাদের জন্য অনুমোদিত হয়। জাতটির বীজের তেলে ইরুসিক এসিডের পরিমাণ মাত্র ১.০৬% এবং খৈলে গ্লুকোসিনোলেটের পরিমাণ প্রায় ১৪ মাইক্রোমোল/ গ্রাম। অত্যাবশ্যকীয় ফ্যাটি এসিড ওমেগা-৬ প্রায় ২৪% ও ওমেগা-৩ প্রায় ৯%। এ ছাড়াও ওমেগা-৯ (অলিক এসিড) প্রায় ৫৮%। জাতটির জীবনকাল ৯৫-১০০ দিন এবং হেক্টর প্রতি ফলন ২.০-২.৫ টন। জাতটি আমন-সরিষা-পাট/ডাল ফসল শস্য বিন্যাসে চাষের উপযোগী। এ ক্যানোলা জাতটি কৃষক পর্যায়ে সফলতার সাথে চাষাবাদ হচ্ছে। আমার জানামতে শেরেবাংলা কৃষি বিশ^বিদ্যালয়, ঢাকা থেকে আরো একটি সরিষার ক্যানোলা জাত এবং বাংলাাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিিিটউট, গাজীপুর থেকে আরো দুটি সরিষার ক্যানোলা জাত উদ্ভাবন করা হয়েছে। কিন্তু এ জাত গুলো এখন পর্যন্ত কৃষক পর্যায়ে চাষাবাদ শুরু হয়নি। বর্তমানে ব্র্যাক সীড এন্ড এগ্রো এন্টারপ্রাইজ এর আওতায় আরো উন্নত জাতের সরিষার ক্যানোলা জাত উদ্ভাবনের লক্ষ্যে আমার তত্ত্বাবধানে গবেষণা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
বাংলাদেশে সরিষার ক্যানোলা জাত চাষের সম্ভাবনা
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট কর্তৃক উদ্ভাবিত সরিষার ক্যানোলা জাত বারি সরিষা-১৮ উচ্চফলনশীল (ফলন ২.০-২.৫ টন/হেক্টর)। জাতটির জীবনকাল ৯৫-১০০ দিন হওয়ায় আমন-সরিষা- পাট/আউশ শস্য বিন্যাসে ইতোমধ্যে কৃষক পর্যায়ে সফলভাবে চাষাবাদ হচ্ছে। কোন কোন জমিতে আমন ধান কর্তনের পর জমিটি প্রায় ১১০-১২০ দিন পতিত থাকার পরে পাট/আউশ ধানের চাষ করা হয়। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে যে, বছরে প্রায় ৭ লক্ষ হেক্টরের অধিক জমিতে পাট এবং দশ লক্ষ হেক্টরের অধিক জমিতে আউশ ধানের চাষ হয় (বিবিএস, ২০২৫)। উক্ত পাট ও আউশ ধানের জমিতে আমন ধান কর্তনের পর উচ্চ ফলনশীল সরিষার ক্যানোলা জাত চাষ করে কৃষকরা আর্থিকভাবে লাভবান হওয়ার পাশাপাশি ভোজ্য তেলের চাহিদাও পূরণ হবে। এ ছাড়াও যেসব জমিতে আমন ধান কর্তনের পর বোরো ধান না করে ডাল বা অন্য ফসল করা হয় সেসব জমিতেও সরিষার ক্যানোলা জাত চাষ করা সম্ভব। চরাঞ্চলের জমিতে উচ্চ ফলনশীল সরিষার ক্যানোলা জাতের চাষ করার যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। এভাবে সরিষার ক্যানোলা জাত আবাদ করে পুষ্টি সমৃদ্ধ ক্যানোলা তেল উৎপাদনের মাধ্যমে ভোজ্য তেলের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব।
লেখক : সাবেক পরিচালক, তৈলবীজ গবেষণা কেন্দ্র, বারি, গাজীপুর, এডভাইজর, তৈল ফসল, ব্র্যাক সীড এন্ড এগ্রো এন্টারপ্রাইজ, মোবাইল : ০১৭১৬৩৩৫৬২৬;