কনটেন্টটি শেষ হাল-নাগাদ করা হয়েছে: মঙ্গলবার, ১৭ জুন, ২০২৫ এ ০৪:৩৫ PM
কন্টেন্ট: কৃষি কথা মাস: আষাঢ় সাল: ১৪৩২ প্রকাশের তারিখ: ১৫-০৬-২০২৫
কৃষিতে জলবায়ু পরিবর্তনে পলিনেটেড
হাউজ : একটি সফল প্রযুক্তি
কৃষিবিদ ড. এস এম আতিকুল্লাহ
কৃষি বাংলাদেশের চালিকাশক্তি। গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধি, বৃষ্টিপাতে অসমতা, দিবা দৈর্ঘের পরিবর্তন কৃষি ব্যবস্থা তথা শস্য আবর্ত পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। প্রতিকূল আবহাওয়ায় কৃষি উৎপাদন বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। তাই জলবায়ু পরিবর্তন কৃষি ভাবনায় প্রধান উপজীব্য বিষয় হওয়া দরকার। আমাদের কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তা অনেক সমস্যার অন্তরালে, চালের উৎপাদনে অগ্রগতি হলেও এখনও ডাল, মসলা ফসলসহ বহু কৃষি পণ্য আমদানি নির্ভর। মাথাপিছু চাষযোগ্য জমির স্বল্পতা, অনেক চাষযোগ্য জমির স্বরূপ পরিবর্তন এবং জনসংখ্যার ঘনত্ব পৃথিবীর দেশগুলোর মধ্যে সর্বাধিক। বলা হয় দারিদ্র্যের একটি কেন্দ্রীয় চরিত্র হচ্ছে পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন। জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশ বিপর্যয় মোকাবিলায় আধুনিক প্রযুক্তি উন্নয়ন ও তার প্রয়োগ সময়ের দাবী। তাই পরিবেশবান্ধব ও লাভজনক পলিনেটেড হাউজ প্রযুক্তি ব্যবহার কৃষিতে একটি নতুন প্রযুক্তি সংযোজন। এ প্রযুক্তি নিয়ন্ত্রিত আলো ও পরিমিত সেচ প্রদানের মাধ্যমে বছরজুরে ফসল উৎপাদন করতে সহায়তা করছে; কৃষি উন্নয়নের বিস্ময় এই পলিনেটেড হাউজ; সাড়া বছর একাধিক উচ্চমূল্যের সবজি ও ফলফসল চাষ করে স্থায়ীত্বশীল কৃষির পথচলা বেগবান করছে; মূলত বৃষ্টিনির্ভর খরিপ-১ এবং খরিপ-২ মৌসুমে উচ্চমূল্যের ফলসহ বহুবিধ ফসল চাষের পথ সুগম করছে।
পলিনেটেড হাউজ
পলিনেটেড হাউজ কৃষককের জন্য ব্যবহার উপযোগী একটি নিয়ন্ত্রিত ঘর। সেখানে ফসলের ইকোলজী তথা পরিবেশ-প্রকৃতির ওপর ভিত্তি করে আলো, পানি, তাপ নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে ফসল উৎপাদনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং প্রযুক্তির প্রয়োগ করে। যা কৃষকের ক্ষমতায়নের উৎকৃষ্ট উদাহরণ।
প্রযুক্তির প্রয়োগ
নিয়ন্ত্রিত সূর্যালোক : আলট্রা ভায়োলেট পলিনেটেড পলিসিট, ৫০% সূর্যালোক নিয়ন্ত্রণ করা যায়।
নিয়ন্ত্রিত সারফেস সেচ : ফোঁটায়-ফোঁটায় স্প্রিংকাল-সেচ। ১-২ ঘোড়ার মোটর দিয়ে সেচের দু’টি পথ (চ্যানেল) দিয়ে: (ক) গাছের গোড়ায় (মূলের চারিদিকে) সেচ প্রদান (১ফুট দূরত্বে পাইপ, অ্যানকেল, নজেল ও ছিদ্র)। খ) পাইপলাইনের মাধ্যমে (স্প্রিংকলার-সেচ) হেডার ইরিগেশন।
নিয়ন্ত্রিত তরল সার প্রয়োগ : সময়মতো বাড়তি সার উপরিপ্রয়োগ করার উত্তম প্রযুক্তি। সারের অপচয়রোধ এবং দ্রুত সার প্রযোগ করা সম্ভব।
পলিনেটেড হাউজ অবকাঠামো : সিমেন্টের খুটি, আরএফএল পাইপ, লোহার ফ্রেম, ছাদে পলিথিন, ফোলডিং নেট (ইউপিভি), প্রফাইল, জিগজ্যাগ স্প্রিরিং ইত্যাদি।
পলিনেটেড হাউজ তৈরি করার অঞ্চল সমূহ
দেশের সবত্রই পলিনেটেড হাউজ তৈরি করা সম্ভব। তবে যে সকল অঞ্চলে বৈকি উষœতার কারনে ফসল ফলানো যায় না এবং সময়মতো বীজ সরবরাহ করা সম্ভব হয় না এমন অঞ্চল। বন্যা প্রবণ ফরিদপুর এবং হাওর/বিল অঞ্চল, লবণাক্ত প্রবণ খুলনা, সাতক্ষীরা, বরগুনা, পটুয়াখালী অঞ্চল এবং খড়া প্রবণ রাজশাহী, দিনাজপুর এবং টাঙ্গাইল অঞ্চল ইত্যাদি।
পলিনেটেড হাউজ ও ফসল বিন্যাস
মৌসুমভিত্তিক কৃষি এবং প্রকৃতিনির্ভর সিদ্ধান্ত থেকে কৃষক আধুনিক কৃষি ব্যবস্থায় স্বল্প সেচ ও কম খরচে পরিকল্পনা গ্রহণ করতে পারবে। মূলত বৃষ্টিনির্ভর খরিপ-১ এবং খরিপ-২ ও রবি মৌসুমে নিবিড়ভাবে উচ্চমূল্যের ফলনসহ বহুবিধ ফসল চাষ করা সম্ভব, যেমন: মরিচ/ক্যাপসিকাম-গ্রীষ্মকালীন টমেটো-বেগুন, বেগুন- গ্রীষ্মকালীনটশসা-ধনেপাতা/পুদিনাপাতাসহ অন্যান্য সবজি। আগাম রবি ফসল চাষ করে চার বার ফসল উৎপাদনের নতুন মডেল তৈরি করা সম্ভব।
উচ্চমূল্যের ফসলের জন্য উপযোগী
পলিনেটেড হাউজ তৈরিতে খরচ
এটি তৈরির খরচ নির্ভর করে এর আয়তন এবং উপকরণের উপর। প্রতি শতক জমিতে ৫০-৬০ হাজার টাকা হিসেবে পাঁচ শতক জমির উপর ১টি পলিনেটেড হাউজ তৈরিতে ২-২.৫ লাখ টাকা প্রয়েজন হয়। উপযুক্ত মেরামত রক্ষণাবেক্ষণ এর স্থায়ীত্ব¡ ২০ বছর ধরে ব্যবহার করা সম্ভব।
একটি ফসল চাষে আয়-ব্যয় : পরিক্ষণ ও গবেষণায় দেখা যায় ১০ শতক জমিতে গ্রীস্মকালীন টমেটো চাষ করে ৬০০ চারাগাছ উৎপন্ন করা যায়। একই জমিতে টমেটো চাষে ৩০ হাজার টাকা খরচ হয়। প্রতিটি গাছ থেকে ২.৫ কেজি ফল উৎপন্ন হলে মোট ১৫০০ কেজি টমেটো পাওয়া যায়। প্রতি কেজি টমেটোর মূল্য ৭৫-১০০ টাকা হলে ১১২৫০০-১৫০০০০ হাজার টাকার টমেটো বিক্রি হতে পারে। ১০ শতক জমিতে টমেটো চাষ করে তিন মাসে ১২০হাজার টাকা মুনাফা হয়ে থাকে। মরিচ, ধনেপাতা এবং পুদিনাপাতায় এই লাভ আরো বেশি হয়ে থাকে। পলিনেটেড হাউজে ৩-ফসল এবং ৪-ফসল মডেল ব্যবহার করে বছরে বড় অংকের টাকা আয় করা সম্ভব।
স্থায়িত্ব : একটি পলিনেটেড হাউজ তৈরি করে তার স্থায়িত্ব¡ ১২-১৫ বছর ধরা যায়। হিসেব অনুযায়ী একটি পলিনেটেড হাউজ তৈরি করে ১২-১৫ বছরে কোটি টাকা আয় করা সম্ভব। উপযুক্ত মেরামত রক্ষণাবেক্ষণ এর স্থায়িত্ব¡ ২০ বছর ধরে ব্যবহার করা সম্ভব। এলাকার অগ্রগামী কৃষক এই প্রযুক্তি সম্প্রসারণ করতে পারে। এমনকি কৃষক সহজে স্থানীয় সম্পদ হিসেবে কাঠ, বাঁশ, সুতা ব্যবহার করে এই প্রযুক্তি সম্প্রসাণ করতে পারে। গবেষণায় দেখা যায়, পলিনেটেড হাউজ তৈরি করে ৩-৪টি ফসল নিবিড়ভাবে চাষ করা সম্ভব। প্রতি হেক্টরে গড়ে ৮-১০ টন সবজি উৎপন্ন হলে এবং প্রতি কেজি সবজির মূল্য ৩০ টাকা হলে ৩০০০০০.০ লক্ষ টাকা এবং প্রতি মৌসুমে ন্যূনতম ৯ লক্ষ টাকা আয় হতে পারে। একটি পলিনেটেড হাউজ থেকে কোটি টাকার নেট মুনাফা তৈরি করা সম্ভব।
১৭ কোটি মানুষের খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তার এখন সময়ের দাবি। জাতিসংঘের এসডিজি কর্মসূচি ১৭টি এজেন্ডা এবং ১৬৯টি লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে কাজ করছে। এর ১ম এজেন্ডা পৃথিবীর সর্বত্র সব ধরনের দারিদ্র্যের অবসানসহ খাদ্য, পুষ্টি নিরাপত্তা ও উন্নত জীবনমান অর্জন এবং টেকসই উৎপাদনের প্রসার। দেশে আগামীর খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তায় দিতে হচ্ছে অভিযোজন ও সহনশীলতা বৃদ্ধির দিকে। যা টেকসই পানি ব্যবস্থাপনা, জমির সঠিক ব্যবহার, আধুনিক জাতের সমন্বয় এবং প্রকৌশলগত বুদ্ধিমত্তার উপর নির্ভর করে। বলা হয় ফসল চাষে আধুনিক সেচ প্রয়োগের ধারা চালু হয়েছে। নিয়ন্ত্রিত আলো ও পরিমিত সেচ প্রদানের কৃষি প্রযুক্তি এবং উন্নয়নের বিস্ময় এই পলিনেটেড হাউজ। সাড়া বছর একাধিক উচ্চমূল্যের সবজি ও ফলফসল চাষ করে স্থায়িত্বশীল কৃষির পথচলা বেগবান করবে। মূলত ভঙ্গুর বৃষ্টিনির্ভর খরিপ-১ এবং খরিপ-২ মৌসুমে উচ্চমূল্যের ফলসহ বহুবিধ ফসল চাষের পথ সুগম করে কৃষকের আয় ও কর্মসংস্থান তৈরি করবে। বৈশ্বিক পরিবর্তনে পুষ্টি ও সুরক্ষিত জীবনব্যবস্থায় পলিনেটেড হাউজ কৃষির একটি আধুনিক সংযোজন।
লেখক : কৃষি বিশেষজ্ঞ, হাসনাহেনা ২০১/এ রাজউক উত্তরা মডেল টাউন, সেক্টর ১৮ উত্তরা। মোবাইল : ০১৭১২৮৮৯৯২৭, ই-মেইল : mdatikullah@yahoo.com