কনটেন্টটি শেষ হাল-নাগাদ করা হয়েছে: বুধবার, ১৭ আগস্ট, ২০১৬ এ ০৮:০৩ PM
কন্টেন্ট: কৃষি কথা মাস: শ্রাবণ সাল: ১৪২৩ প্রকাশের তারিখ: ১১-০৮-২০১৬
কৃষক সংগঠন কি? কেন সংগঠিত হওয়া প্রয়োজন?
সংগঠন হচ্ছে ‘কোন নির্দিষ্ট লক্ষ্য অর্জনে কিছু সাধারণ উদ্দেশ্যে গড়া সঙ্কল্পবদ্ধ ব্যক্তিগোষ্ঠীর দল।’ সংগঠন তখনই হয় যখন সমশ্রেণীর ব্যক্তিগণ তাদের পছন্দসই লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য একসঙ্গে, একমতে, একই উদ্দেশ্যে ও ছন্দে কাজ করে। প্রাগৈতিহাসিক যুগের আদিম অবস্থা হতে শুরু করে সভ্যতার এ আধুনিক সময়ে নানা পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে সংগঠনের রূপ পাল্টেছে কিন্তু লক্ষ্য একই অর্থাৎ সমস্বার্থে যেসব কাজ একা করা যায় না, যা দুরূহ ও প্রতিকূল তা সম্পাদনের নিমিত্তেই সংগঠন। আদিম সমাজের কথাই ধরি- পাথর ছিল একমাত্র হাতিয়ার, যা দ্বারা পশুপাখি শিকার করা হতো। কিন্তু শিকার করতে হলে যেতে হবে জঙ্গলে; একা যাওয়ার উপায় নেই, দলবেঁধে, সবাই মিলে যেতে হয়। নচেৎ নিজেই শিকার হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা।
বেঁচে থাকার লড়াইয়ে টিকে থাকার প্রশ্নেই আদিম গোষ্ঠীকেন্দ্রিক সংগঠনের উত্থান
আবার শিকার সহজলভ্য ছিল না, পাওয়া যেত কম। তাই দলের সবাই মিলে সমানভাবে শিকারের অংশ ভাগাভাগী করে নিত। আর তাছাড়া হিংস্র বন্যজন্তুর আক্রমণ থেকে সুরক্ষার উদ্দেশ্যে আবাস বা ঘরবাড়িও ছিল একসঙ্গে গুহায় বা সুড়ঙ্গে বা উঁচু কোনো স্থানে। সভ্যতার শুরুতে আদিম গোষ্ঠীবদ্ধ সংগঠনের লক্ষ্য ছিল মূলত ‘খাবার’ ও ‘নিরাপদ আবাসন’; আর খাবার শিকারের জন্য বা হিংস্র বন্যজন্তুর আক্রমণ থেকে নিজেদের ও শিশুদের সুরক্ষার উদ্দেশ্যে একত্রে দলবেঁধে শিকার বা একত্রে বসবাস করা থেকেই মানুষের সংগঠিত হওয়ার প্রাথমিক ধারণার শুরু। ধীরে ধীরে আদিম মানুষ যখন কৃষিকাজ করতে আরম্ভ করল তখনও জমি তৈরি করতে জঙ্গল পরিষ্কার করা, কঠিন শিলা অপসারণ ইত্যাদি দলবেঁধে যেমন করত, ফসলও নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগী করে নিত। এভাবে আদিম সমাজের শুরুর দিকে কৃষির গোড়াপত্তনে গোষ্ঠীবদ্ধভাবে কৃষি কাজ করা ও উৎপাদন ভাগাভাগী করার মধ্য দিয়েই সভ্যতার প্রথম সংগঠনের যাত্রা।
এ থেকে প্রতীয়মান হয় যূথবদ্ধতা বা সংগঠিত থাকা মানুষের প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য
ক্রমে ক্রমে মানুষ আগুনের বহুবিধ ব্যবহার শিখল, সঙ্গে পাথর ও লৌহ দিয়ে হাতিয়ার তৈরি করে কৃষি জমি চাষাবাদে অভিজ্ঞ হওয়া শুরু করল। প্রয়োজনের থেকে একটু বেশি উৎপাদন করতে শিখল, সম্পত্তি ও উত্তরাধিকার প্রথা চালু হলো। সম্ভবত তখনই গোষ্ঠীকেন্দ্রিক কৃষি পারিবারিক কৃষির রূপ পরিগ্রহ করল। অর্থাৎ চাষাবাদটা যার যার মতো শুরু করল। বহুদিন এভাবেই চলছিল। মানুষ প্রকৃতির সন্তান। প্রকৃতি তাকে যা দিতো তা নিয়ে আর মানুষের কায়িক পরিশ্রম ও মেধার সমন্বয়ে খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান ইত্যাদি মৌলিক চাহিদা পূরণের প্রতিযোগিতা চলছিল। দিন যায় মানুষ বাড়ে, উৎপাদন বাড়াতে উপকরণের চাহিদা বাড়ে, পাল্লা দিয়ে বাড়ে প্রাকৃতিক উপকরণের স্থলে রাসায়নিক সার ও কীটনাশক তৈরির শিল্প স্থাপন, কৃষির অন্যতম উপকরণ বীজ উৎপাদনেও শিল্প খাতের বিনিয়োগ বাড়তে থাকে। কৃষকরা পারিবারিক কৃষির গণ্ডি পেরিয়ে বাণিজ্যিক কৃষির দিকে ধাবিত হয়। ধীরে ধীরে কৃষি তার প্রাকৃতিক উপকরণ নির্ভরতা হারাতে থাকে। বীজ, সার, কীটনাশক ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ উৎপাদন উপকরণ এমনকি প্রাকৃতিক সম্পদ- জমি, জলা, বনও চলে যেতে থাকল বড় বড় পুঁজিপতি ও একশ্রেণীর সমাজপতিদের হাতে। কৃষির উৎপাদনশীলতা বাড়াতে বাজারে আসে হাইব্রিড জাতের বীজ, যা থেকে কৃষক পরবর্তী বছরের জন্য কোনো বীজ রাখতে পারে না। অন্যদিকে সঠিক ফসল বিন্যাস মেনে না চলায় এ বীজের জমিতে প্রয়োগ করতে হয় অতিমাত্রায় রাসায়নিক সার। সঙ্গে আছে নতুন নতুন পোকামাকড়ের উপদ্রব, পাল্লা দিয়ে ব্যবহার করতে হয় বহুজাতিক কোম্পানির আবিষ্কার করা কীটনাশক। আর বহুজাতিক কোম্পানির বাজারকৃত এসব উপকরণ বড় ও মাঝারি কৃষকরা নাগালের মধ্যে পেলেও ছোট জোতের বর্গা, প্রান্তিক কৃষকরা এগুলোকে নাগালের মধ্যে পেতে একটি অসম-প্রতিযোগিতার সম্মুখীন হয়। এ অসম প্রতিযোগিতা শুধু উপকরণ জোগানেই নয়, এমনকি উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য প্রাপ্তিতেও ক্ষুদ্র, প্রান্তিক ও বর্গা কৃষকরা পদে পদে ঠকে। প্রাকৃতিক সম্পদেও ক্ষুদ কৃষকদের অধিকার বিঘ্নিত হচ্ছে। অর্থাৎ বাণিজ্যিক কৃষির তীব্র প্রতিযোগিতাপূর্ণ বাজারে ক্ষুদ্র, প্রান্তিক, ভূমিহীন, বর্গা ‘একক কৃষক’ বড় অসহায়। আর এ অসহায়ত্ব হতে পরিত্রাণের জন্যই আবারও প্রয়োজন হয়ে পড়ে ক্ষুদ্র কৃষকদের সংগঠিত হওয়ার। এভাবে দেখা যায়, যখনই কোন প্রতিকূলতা সামনে আসে যা কৃষকদের একার পক্ষে মোকাবিলা করা সম্ভব নয়, তখনই সমশ্রেণীর কৃষকরা সংগঠিত হয়। সেসব সংগঠন নানা রকম হয়: কোনোটা হয়তো কোনো ইস্যুভিত্তিক, সাময়িকভাবে গড়ে উঠে, ইস্যু আদায়ের পর বা ইস্যু আদায়ে বিফল হবার পর সেটা বিলুপ্ত হয়; কোনো কোনোটি হয়তো উৎপাদন ও বিপণনকারী দল হিসেবে গড়ে উঠে, আবার কোনোটি হয়তোবা আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃত সংগঠন যেটি রাষ্ট্রের কোনো সংস্থা হতে নিবন্ধন নিয়ে কৃষকদের স্বার্থে কাজ করে। উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি ও প্রযুক্তি সম্প্রসারণের জন্যও সরকারি সম্প্রসারণ সংস্থা কর্তৃক জনে জনে প্রশিক্ষিত করা দুরূহ বলে কৃষক দল গড়ে তোলা হয়। ধারণা আসে কৃষক সমবায়ের যেখানে যুথবদ্ধভাবে উৎপাদন ও বিপণনের ব্যবস্থায় ক্ষুদ্র, প্রান্তিক, বর্গা কৃষকদের স্বার্থ রক্ষা করা হয়।
বাংলাদেশের কৃষিতে ক্ষুদ্র, প্রান্তিক ও বর্গা/ভূমিহীন কৃষকদের প্রাধান্য সবচেয়ে বেশি। বিভিন্ন তথ্য উপাত্ত বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে বাংলাদেশে মাথাপিছু জমির পরিমাণ কমে এখন দাঁড়িয়েছে প্রায় ৭০ শতাংশ (০.২৮ হেক্টর)। ভূমিহীন কৃষক যাদের জমির পরিমাণ ৪৯ শতাংশের নিচে তারাই এ দেশের কৃষিতে সংখ্যাধিক্য প্রায় ৫৩ ভাগ। তারপর শতকরা ২৪ ভাগ প্রান্তিক কৃষক- যাদের জমির পরিমাণ ৫০-১৪৯ শতাংশ। শতকরা ১১ ভাগ ক্ষুদ্র কৃষক যাদের জমির পরিমাণ ১৫০-২৪৯ শতাংশ এবং ১১ ভাগ মাঝারি কৃষক যাদের জমির পরিমাণ ২৫০-৭৪৯ শতাংশ, আর মাত্র ১ ভাগ হলো বড় কৃষক কৃষক যাদের জমির পরিমাণ ৭৫০ শতাংশের ঊর্ধ্বে। জমির মালিকানার ওপর ভিত্তি করে গ্রামের সব কৃষক পরিবারের শ্রেণীকরণ যার মাধ্যমে বাংলাদেশের কৃষিতে যাদের সবচেয়ে বেশি অবদান (শতকরা ৮৫ ভাগ ক্ষুদ্র, প্রান্তিক ও বর্গা/ভূমিহীন কৃষক) অথচ সবচেয়ে বেশি ভুক্তভোগী সে কৃষকদের চিহ্নিত করা যায়। কৃষির সব সংকটে এরা সংবেদনশীল অর্থাৎ জলবায়ুগত প্রতিকূলতা, উপকরণ সংকট, উৎপাদিত পণ্যের অস্বাভাবিক দরপতন ইত্যাদি যে কোন সমস্যায় এরাই সবচেয়ে বেশি বিপদাপন্ন। যেহেতু বড় ও মাঝারি কৃষকরা খুব সহজেই এসব প্রতিকূলতা কাটিয়ে উঠতে পারে ফলে যে কোন সম্প্রসারণ সেবার প্রথমটা ক্ষুদ্র, প্রান্তিক ও ভূমিহীন কৃষকদের কেন্দ্র করেই হওয়া উচিত। তাদেরকে সঠিকভাবে চিহ্নিত করা গেলে এসব সমস্যা মোকাবিলায় সমষ্টিগত উদ্যোগ হিসেবে কৃষক সংগঠন গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা বোঝানো সহজ হয়।
কেন সংগঠিত হওয়া প্রয়োজন?
মানুষ সভ্য হওয়ার শুরুর পদক্ষেপটা ছিল সংগঠন। সংগঠন ভয়কে জয় করার শক্তি দেয়। আবার জ্ঞানের সমাবেশ ঘটে বলে সৃষ্টিশীলতার সুযোগও সৃষ্টি হয়। সমাজের সব জ্ঞানের সমাবেশ ঘটে সংগঠনে। তাই এটি সামাজিক মূলধনও বটে। সংগঠিত হবার সুবিধা নানাবিধ। ছোটবেলা থেকেই আমরা শুনে আসছি ‘দশে মিলি করি কাজ হারি জিতি নাহি লাজ’। অর্থাৎ কোনো কাজ সঙ্ঘবদ্ধ হয়ে করলে কাজটা সহজ হয় এবং এতে হারলেও হতাশ হতে হয় না। কিন্তু তারপরও আমরা সংগঠিত হচ্ছি না। অনেক ক্ষেত্রেই প্রকল্প আসলে কিছু পাওয়ার আশায় ২০-২৫ মিলে কাগজে পত্রে একটা দল করছি। এখন বিভাগীয় সব কাজই হয় প্রকল্পভিত্তিক। দেখা গেলো প্রকল্প থেকে একজন দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা তার পছন্দমতো গ্রামের একজনকে দায়িত্ব দিলো ২০-২৫ জন কৃষককে নিয়ে একটা দল গড়তে। সেই কৃষক তার পছন্দমতো ভাই, স্ত্রী, বোন, আশপাশের আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী নিয়ে বেশ ঘটা করে একটা দল গড়ল যেখানে ধনী, গরিব, প্রান্তিক, বর্গা সব কৃষকই থাকে। প্রকল্পের উদ্দেশ্য কি, কৃষকের চাহিদাই বা কি- কোনো কিছু এতে বিবেচনা করা হয় না। আবার দেখা যায়, মাঠ সম্প্রসারণ কর্মী সঠিকভাবে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত না হওয়ার কারণে তার মতো করে কিছু কৃষককে নিয়ে একটি দল করে বসে; যেখানে সমশ্রেণীর কৃষক থাকে না, বড় কৃষকরাই প্রকল্পের বেশি বেশি সুবিধা ভোগ করে এবং ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকরা বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই নিগৃহীত হয়। ফলে এভাবে গড়া দল প্রকল্প সহায়তা বিদ্যমান থাকা পর্যন্ত টিকে থাকে, প্রকল্প শেষ হলে দলের প্রয়োজনীয়তাও শেষ হয়।
এজন্য সংগঠন গড়ে তুলতে হলে সমশ্রেণীর কৃষকদের (ক্ষুদ্র, প্রান্তিক ও বর্গা/ভূমিহীন) এক হতে হবে। ব্যক্তি কৃষকের নানাবিধ সমস্যা থাকতে পারে কিন্তু কতগুলো বিষয়ে তাদের সবার সমস্যা এক। যেমন- বাজার, তথ্য, সম্পদে প্রবেশাধিকার, সহজশর্তে কৃষি ঋণ নাগালের মধ্যে পাওয়া, অত্যধিক উৎপাদন ব্যয় ইত্যাদি। এসব সমস্যা সমাধানে একক কৃষকের প্রচেষ্টা কোনো কাজেই আসবে না যদি না সংগঠিত হয়। কাজেই ক্ষুদ্র, প্রান্তিক ও বর্গা/ভূমিহীন কৃষকদের সংগঠিত হওয়ার সুবিধাগুলো খুব ভালোভাবে বুঝতে হলে বর্তমান বাজার ব্যবস্থাটি খুব সহজ করে বুঝতে হবে। পত্রপত্রিকায় আমরা নিয়মিত দেখতে পাই এ শ্রেণীর কৃষকরা উপকরণে ঠকে, উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য পান না, সরকারি ক্রয় অভিযানে নিজেদের উৎপাদিত পণ্য বিক্রি করতে পারেন না, সরকারি ভর্তুকি সঠিকভাবে পান না, উৎপাদনের ও বাজারজাতকরণের তথ্য সঠিকভাবে পান না, ইত্যাদি বহুবিধ সমস্যা। এসব বিপর্যয় থেকে উদ্ধার পাওয়ার উপায় হলো সংগঠন। নিচে সংগঠিত হওয়ার কিছু সুবিধা দেয়া হলো-
১. গুণগতমানের উপকরণ নিশ্চিতকরণে সংগঠন : ধরুন আপনার দলে ৫০ জন সদস্য আছে। তারা আলাদা আলাদাভাবেই কৃষিকাজ করছে। ধান হয়তো তাদের প্রধান ফসল। সঙ্গে সবজি, সরিষা, আলুও করে। সদস্যরা প্রায়ই অভিযোগ করেন যে ধান বা সবজির বীজ, যা তারা বাজার থেকে কিনেন তা প্রায়ই ভালোমানের হয় না। দেখা গেল ৫০ জনই টমেটো, বাঁধাকপি, মরিচ ও পেঁপে করেন। আমরা জানি এক বিঘা জমির জন্য টমেটো বীজ লাগে ৩০ গ্রাম, বাঁধাকপি বীজ লাগে ৬০ গ্রাম, মরিচ বীজ লাগে ৩০ গ্রাম আর পেপের জন্য লাগে মাত্র ১০ গ্রাম। একই সংগঠনের ৫০ জন কৃষক এ স্বল্প পরিমাণ বীজের জন্য পঞ্চাশবার পঞ্চাশভাবে বাজারে যান, আসা-যাওয়া বাবদ পরিবহন খরচ জনপ্রতি গড়ে ৫০ টাকা হলে সকলে মিলে খরচ ২৫০০/- টাকা; জনপ্রতি ৩-৪ ঘণ্টা সময় ব্যয় করলে সকলে মিলে ব্যয় করছেন ১৫০-২০০ ঘণ্টা অর্থাৎ ১৮-২৫ শ্রমদিন; টাকায় হিসাব করলে এর পরিমাণ দাঁড়ায় ৯০০০-১২৫০০ টাকা। আবার খুচরা বিক্রেতারা একক কৃষকের চাহিদা বিবেচনা করে কোম্পানির বড় প্যাকেট ভেঙে ছোট ছোট প্যাকেট করেন। এ ছোট প্যাকেট বা মিনিপ্যাক করার সময়ই ভেজালটা শুরু হয়। কৃষক জনপ্রতি অল্প পরিমাণ বীজ সংগ্রহ করতে গিয়ে মিনিপ্যাক কিনেন এবং দামে ও গুণগতমানে দুইভাবেই ঠকেন। এখন আপনারাই নির্ধারণ করুন এ সমস্যা থেকে পরিত্রাণের উপায়গুলো কী কী হতে পারে। অর্থনীতির সহজ কড়চায় যদি বুঝেন যে ৫০ জন যেহেতু একই ফসল করেন। হিসাবের সুবিধার্থে ধরে নিই এই ৫০ জনই এক বিঘা করে জমিতে টমেটো, বাঁধাকপি, মরিচ ও পেঁপে করেন। তাহলে সবার বীজের চাহিদাটি কি হতে পারে তা নিচের সারণিতে দেখানো হলো:
ওপরের হিসাব বিশ্লেষণ করলেই বুঝা যাবে শুধু সবজি বীজের জন্যই একটি সংগঠনে বীজের চাহিদা আছে অর্থমূল্যে ৬৭৫০০০ টাকার। আর যে কোনো উপকরণের জন্য যখন এ পরিমাণ বাজার চাহিদা তৈরি হয় তা যে কোনো কোম্পানিকে আকৃষ্ট করে। বাজার সংযোগের অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায় বেসরকারি উপকরণ কোম্পানি এ ধরনের আদেশ পেলে তাদের প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা থেকে প্যাকেট করে সরাসরি সরবরাহ করে থাকে যার গুণগতমান অনেক ভালো হয় আর দামেও হয় সাশ্রয়ী। অন্যান্য খরচ যেমনÑ যাতায়াত (৫০ টাকা) সময় (আধাবেলা-২৫০ টাকা) ব্যয় হচ্ছে না। বাড়ি বসেই আপনি বীজটা পাচ্ছেন। একা একা কিনলে ৩০ গ্রাম টমেটো বীজের খরচ হতো ২৪০০+৫০+২৫০=২৭০০ টাকা। সংগঠন থেকে আপনার খরচ পড়ছে ২৪০০ টাকা বা তারও কম (যেহেতু বেশি পরিমাণে কিনলে কিছুটা কমিশন পাওয়া যায়) প্রায় ৩০০ টাকা সাশ্রয়। এতে উৎপাদন ব্যয়ও কমছে, যা লাভ আপনার বাজারে টিকে থাকার জন্য জরুরি।
উপরের উদাহরণটি যে কোনো উপকরণের বেলায় প্রযোজ্য। হোক না সেটা সার, উন্নত চারা, কৃষি যন্ত্রপাতি, মাছের পোনা, খাবার, প্রাণী খাদ্য, ঔষধ, টিকা ইত্যাদিসহ এমনকি মাচার জন্য বাঁশ, জাল, পলিথিন। শুধু প্রয়োজন সংগঠনে নিজেদের মধ্যে সহমত। সহমতের পর একটি সহজ সদস্য জরিপ। সদস্যদের কী পরিমাণ জমিতে কোন মৌসুমে কী আবাদ করে, কতটুকু উপকরণের প্রয়োজন হয়, বর্তমানে কিভাবে ও কোথা হতে উপকরণ ক্রয় করে ইত্যাদি তথ্য। যখন সব সদস্যর তথ্য একটি সারণিতে বিশ্লেষণ করা হবে তখন মোট কি পরিমাণ উপকরণ লাগবে, অর্থ সংস্থান কিভাবে হবে এসব বিষয়ে একসঙ্গে সিদ্ধান্ত নেয়া যায়।
তাই জনে জনে আলাদাভাবে উপকরণ না কিনে সদস্যদের সহমতে একসঙ্গে কেনার সুবিধাটির অনুধাবন করার মাঝেই সংগঠনের সার্থকতা নিহিত। এ ধরনের ক্রয়কে বলা হয় ‘বাল্ক বাইং (bulk buying)’। অর্থনীতির ভাষায় এ ধরনের সংগঠিত ক্রয়ের যে লাভ হয় তাকে বলে ‘ইকোনমি অব স্কেল (economy of scale)’ বা অর্থনৈতিক সুবিধা অর্জন। কারণ এতে উৎপাদন ব্যয় কমে এবং লাভটা বেশি হয়।
২. উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য প্রাপ্তিতে সংগঠন : এখানেও আমরা অর্থনীতির সহজ সূত্রের প্রয়োগ দেখি। বাংলাদেশে ফসলের ভরা মৌসুমে যখন বাজারে পণ্যের সরবরাহ বেশি তখনই অস্বাভাবিক দরপতন ঘটে। এ ভরা মৌসুমে ছোট কৃষক ও প্রান্তিক কৃষককে ফসল বিক্রি করে দিতে হয়। কেউ কেউ আবার বেশি অভাবে ফসল তোলার আগেই জমিতেই বিক্রি করে দেয়। কারণ ফসল কাটার আগে বা তোলার পরপরই সময়টায় তার টাকার প্রয়োজন পড়ে; হয়তো সে উপকরণ বাকিতে কিনেছিল বা অন্য কোথাও লগ্নী করেছিল অথবা সামাজিক কোনো কারণে। তাই ফসল ধরে রাখতে পারে না বা চায় না। বাংলাদেশের কৃষিতে ছোট কৃষকের আধিক্য বেশি হওয়ায় ভরা মৌসুমে সব পণ্য বাজারে একসঙ্গে চলে আসে। চাহিদার চেয়ে সরবরাহ তখন বেড়ে যায়। ফলে দাম কমে যায়। ফসলের ন্যায্যমূল্য না পাওয়ার এটি হলো একটি বড় কারণ এবং এটি বেশির ভাগ বিচ্ছিন্ন কৃষকদের সমস্যা। এ সমস্যা হতে পরিত্রাণের জন্য সংগঠিত হলে কৃষকদের কী সুবিধা?
উপকরণ যেমন জনে জনে না কিনে সাংগঠনিকভাবে একত্রে কিনলে দামে ও গুণগতমানে লাভবান হওয়া যায় তেমনি উৎপাদিত পণ্য জনে জনে আলাদাভাবে বিক্রি না করে একত্রে বিক্রি করলেও কিছুটা দাম বেশি পাওয়া যায়। আবার ভরা মৌসুমে বিক্রি না করে যদি কিছুটা সময় উৎপাদিত পণ্য ধরে রাখা যায় তাতে দাম আরও বেশি পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। দেখা গেছে ফসল তোলার ১ মাসের মধ্যে দরিদ্র খামার মোট ফসলের দুই-তৃতীয়াংশ বাজারে ছাড়তে বাধ্য হয়। ছোট, মাঝারি ও বড় খামারের বেলায় এই অনুপাত ৫০, ৪০ এবং ২৭ শতাংশ। এটি করে জরুরি অভাব পূরণের জন্য। এর নাম ‘অসহায়ত্বের পানির দরে বিক্রি’। এ বিক্রিতে আবার তারা সারা বছরের গড় দামের চেয়ে ৬ শতাংশ কম পায়। নাজুক খামারের মধ্যে ৪৯ ভাগ এবং দরিদ্রদের বেলায় ৩৪ ভাগ অসহায়ত্বের বিক্রি করে যাচ্ছে।
কাজেই উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য প্রাপ্তিতে বর্তমান প্রতিযোগিতামূলক বাজারে সংগঠন তিনটি উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করতে পারেÑ ক. ঋণের ব্যবস্থা করে সদস্যদের সাময়িক অভাবপূরণে কাজ করে এবং ভরা মৌসুমে বিক্রি করে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি রোধে; খ. ভরা মৌসুমে প্রাথমিক প্রক্রিয়াজাত ও গুদামজাতকরণের ব্যবস্থা করে ন্যায্যমূল্য প্রাপ্তিতে সহায়তায়; গ. উচ্চমূল্যের পণ্যগুলোর প্রক্রিয়াজাতকরণের জন্য সহজলভ্য প্রযুক্তিতে (সর্টিং, গ্রেডিং, প্যাকিং, ইত্যাদি বা ডালের মিল, চালের মিল ইত্যাদি) বিনিয়োগ করে অধিকমূল্য নিশ্চিতে।
৩. সম্প্রসারণ সংস্থার সেবা প্রাপ্তিতে সংগঠন : দরিদ্র কৃষকদের যদি প্রযুক্তি বা সম্প্রসারণ সেবা প্রাপ্তি নিশ্চিত করা যায় তারা অধিকতর দক্ষ ও উৎপাদনশীল হয়। হিসাব করে দেখা গেছে, প্রায় ১৩০০টি কৃষক পরিবারকে সম্প্রসারণ সেবা প্রদানের জন্য কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর কর্তৃক একজন করে উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা নিযুক্ত আছেন। আর প্রাণিসম্পদ ও মৎস্য অধিদপ্তরের মাঠ সম্প্রসারণ কর্মীর সংখ্যা প্রতি উপজেলায় ১ থেকে ৩ জন। এত স্বল্পসংখ্যক মাঠ সম্প্রসারণ কর্মী দিয়ে বিশালসংখ্যক কৃষককে সার্থকভাবে সম্প্রসারণ সেবা (প্রযুক্তি, কৃষি খামার ব্যবস্থাপনা, আধুনিক চাষাবাদসহ অতি দরকারী তথ্য ইত্যাদি) দান করা অসম্ভব। জনে জনে এ ধরনের সেবা দান মানবিকভাবে সম্ভবও নয়। সেজন্যই সম্প্রসারণ সংস্থাগুলো সব সম্প্রসারণ সেবা প্রদানে কৃষকদের সংগঠিত হওয়ার প্রতি তাগাদা দিয়ে আসছে। যেমন ধরুন গবাদি প্রাণির টিকার ক্ষেত্রে। কোনো টিকার একটি অ্যাম্পুল ভেঙে একসঙ্গে অনেকগুলো গরুকে টিকা দেয়া যায়, সংগঠিত হলে এ ধরনের সেবা প্রাপ্তি সহজ হয়। তেমনি কৃষি সম্প্রসারণ অফিস হতে পরামর্শ সেবা সংগঠিত হলে সহজেই পাওয়া যায়।
৪. ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের অধিকার আদায়ে সংগঠন : একা একা মানুষ শক্তিহীন ভাষাহীন। তেমনি একক কৃষক নিজের ন্যায্য অধিকারটুকুও বুঝেন না, বুঝলেও ভয়ে তা চাইতে জানেন না। সঠিক সদস্যভিত্তিতে গড়ে ওঠা একটি কৃষক সংগঠন ক্ষুদ্র, প্রান্তিক, বর্গা ও ভূমিহীন কৃষকদের জন্য বলিষ্ঠ সামাজিক মূলধন হিসেবে কাজ করে। যদিও বাংলাদেশের কৃষিবিষয়ক নীতিমালা ও সরকারি সম্প্রসারণ সেবা সংস্থাসমূহের নাগরিক সনদগুলো এ শ্রেণীর কৃষকদের জন্য অনেকাংশেই বান্ধব কিন্তু অধিকাংশ কৃষকদের এসব সরকারি নীতিমালা ও নাগরিক সনদ সম্পর্কে কোনো ধারণা নেই বা ওয়াকিবহাল নয়। কোনো পক্ষ থেকেই এ ব্যাপারে কোনো উচ্চবাচ্য নেই আর এখানেই নীতিমালা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে যত বিপত্তি। কৃষকরা হচ্ছেন এ দেশের উন্নয়নের প্রধান নায়ক। অথচ কৃষকরা জানেই না যে সরকারের উন্নয়ন কাজে তারা উপকারভোগী বা কাঙাল নয় বরঞ্চ অংশীদার। কৃষকরা যেমন এ ব্যাপারে অচেতন, তাদের টাকায় বেতনভোগীরাও তাদের বেনিফিসিয়ারি হিসেবে দূরে রাখতেই অভ্যস্থ ও স্বাচ্ছন্দ্য অনুভব করেন। একদিকে যেমন কৃষকদের চেতনার জায়গাটা নাড়িয়ে দিয়ে সচেতন করা দরকার। অন্যদিকে সুবিধাভোগী বেতনভোগীদের ভাবনার জগৎটাও পাল্টানো প্রয়োজন।
এসব তখনই সম্ভব যখন কৃষকরা সংগঠিত হবে এবং তাদের অধিকার ও সম্মানবোধ সম্পর্কে সচেতন হয়ে উঠবে। ক্ষুদ্র, প্রান্তিক, বর্গা ও ভূমিহীন কৃষকদের সঠিকভাবে সংগঠিত করে এবং অধিকার বিষয়ে চেতনায়ন ঘটিয়ে মর্যাদাবোধ জাগ্রত করতে পারলে সবাই তাদের শক্তি হিসেবে মেনে নেবে। তখনই কেবল সরকারি উন্নয়নে সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়নে সত্যিকারের অংশীদার হিসেবে কৃষক সংগঠগুলো কাজ করতে পারবেন। যেহেতু কৃষকের প্রতিনিধিত্ব মানে স্থানীয় কৃষির সংখ্যাধিক্যের মতামতের প্রতিফলন সেহেতু আশা করা যায় সরকারি প্রকল্প বা কর্মসূচি প্রণয়ন হবে সঠিক এর বাস্তবায়ন হবে সুচারু। এতে সরকারি ব্যয়ের অপচয় রোধ হবে ও অধিকাংশ কৃষককে সেবার আওতায় আনা যাবে। একটি ছোট উদাহরণ দেয়া যায়Ñ বর্ষার সময় শ্রীমন্ত নদীর পানির সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার জন্য বরিশালের বাকেরগঞ্জ উপজেলার পাদ্রী শিবপুর ইউনিয়নের মাদুরাখালি খালে সেচ ও নিষ্কাশনের একটি অবকাঠামো তৈরি করার সিদ্ধান্ত হয়। সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থা উপজেলার কয়েকজন প্রভাবশালীর পরামর্শক্রমে প্রথমে একটি কালভার্ট নির্মাণ করার উদ্যোগ নেয়, যা ওই প্রভাবশালীদের জমি ও মাছ চাষের জন্য প্রয়োজন ছিল। কিন্তু কালভার্ট নির্মিত হলে অধিকাংশ কৃষকের প্রায় ৩০ হেক্টর জমিতে পলি পড়ে চাষাবাদের অনুপযুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা ছিল এবং এতে অধিকাংশ কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হতেন। অন্যদিকে স্থানীয় কৃষকরা একটি স্লুইস গেটের দাবি জানিয়েছিল যেটি তারা কপাট খুলে ও বন্ধ করে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে। বিষয়টি নিয়ে যখন স্থানীয়ভাবে কাজ হচ্ছিল না তখন পাদ্রী শিবপুরের ছোট কৃষকদের গড়া ‘কৃষক বন্ধু সংগঠন’ সংশ্লিষ্ট সংস্থার জেলা পর্যায়ের কর্মকর্তার নিকট স্লুইস গেট নির্মাণের জন্য স্থানীয় কৃষকদের স্বাক্ষরে স্মারকলিপি পেশ করেন। কৃষক সংগঠনটি সরকারি সংস্থাটিকে স্লুইস নির্মাণ পরিকল্পনা, কোন পয়েন্টে এটা হলে সবচেয়ে ভালো হবে, কখন পানির প্রবাহ বেশি হয়, কপাট কত উঁচু হবে ইত্যাদি বিষয়ে সর্বোতভাবে সহযোগিতা করে। যদিও প্রভাবশালীরা হুমকিধামকি দিয়েছিল তথাপি সংগঠনে সদস্যদের অংশগ্রহণ সক্রিয় ছিল বলে কোনো বাধাই তাদের টলাতে পারেনি। যদি ওই এলাকায় ছোট কৃষকদের সংগঠন না থাকত তবে সরকার যেমন একটি ভুল পদক্ষেপ গ্রহণ করত তেমনি অধিকাংশ কৃষক এতে ক্ষতিগ্রস্ত হতো।
আবার সরকারের তথ্যমালায় কৃষকদের প্রবেশ নিশ্চিত করতে পারলে সংগঠিত কৃষকরা কিভাবে উপকৃত হয় তার একটি উদাহরণ দেয়া যাক: সরকার কৃষকদের জন্য ১০ টাকার ব্যাংক হিসাব খোলার যে সুবিধা দিয়েছে তা ব্যাংকগুলো সঠিকভাবে মানছে না। অধিকাংশ ব্যাংক কৃষকদের এ হিসাবটিকে শুধুমাত্র ভর্তুকি প্রদানের মাধ্যম হিসেবেই ব্যবহার সীমাবদ্ধ রাখেন। ম্যানেজারগণ কৃষকদের অন্যান্য প্রাত্যহিক লেনদেনে এ হিসাবটি ব্যবহার করতে নিরুৎসাহিত করেন। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা কর্তৃক একটি আঞ্চলিক পাঠচক্রে কৃষক নেতার বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০১৪-২০১৫ অর্থবছরের কৃষি ও পল্লী ঋণ নীতিমালা থেকে জানতে পারল যে ১০ টাকার হিসাবটি সব স্বাভাবিক লেনদেনে ব্যবহার করা যাবে। তখন কৃষকরা স্থানীয় ব্যাংকগুলোতে ওই নীতিমালার কপিটিসহ দেখা করল ও তাদের সংগঠনের সদস্যদের জন্য সরকার কর্তৃক প্রদেয় এ ন্যায্য অধিকার আদায় করল। সরকারের উচ্চমহলে বিষয়টি জানাজানি হলে সরকার এসংক্রান্ত একটি সাধারণ প্রজ্ঞাপনও জারি করে।
৫. প্রাকৃতিক সম্পদ নাগালের মধ্যে পাওয়ার ক্ষেত্রে সংগঠন : প্রাকৃতিক সম্পদ বলতে জল, জমি, বন, বায়ু, সূর্যে আলো, খনিজ সম্পদকে বুঝায়। বাংলাদেশে অধিক জনসংখ্যার চাপে কৃষির প্রধান তিন প্রাকৃতিক সম্পদÑ জল, জমি ও বন দিন দিন কমে আসছে। সীমিত এ প্রাকৃতিক সম্পদ নাগালের মধ্যে পেতে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা। জলাভূমি যেমন- হাওর, বাঁওড়, বিল, নদীনালার ওপর যেমন মৎস্যজীবীদের অধিকার নেই আবার কৃষি খাসজমিতেও নেই কৃষকের অধিকার। এ ক্ষেত্রে জোট বাঁধার কোনো বিকল্প নেই। সংগঠিত হলেই শুধু যেটুকু প্রাকৃতিক সম্পদ আছে তা সামাজিকভাবে ভাগাভাগী করে কৃষির চাহিদা মেটানো যাবে। যখন সংগঠিত কৃষকরা ভূমি ব্যবহার বিষয়ক সব সরকারি নীতিমালা, প্রজ্ঞাপন, স্থানীয় কমিটি ইত্যাদি সম্পর্কে সম্যক জ্ঞানলাভ করে সরকারি সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করতে পারে তখন প্রাকৃতিক সম্পদ নাগালের মধ্যে পেতে সুবিধা হয়। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, বাংলাদেশের কিছু কিছু কৃষক সংগঠন তাদের বলিষ্ঠ সদস্যভিত্তি ও নেতৃত্বের গুণে সরকারি খাসজমি লিজ নিয়ে সদস্যদের জন্য ব্যবহার করছে। তদ্রুপ খাস জলাশয়, খাসজমিতে বাজার ইত্যাদি সংগঠন দ্বারা ব্যবস্থাপনার কথাও বলা যেতে পারে।
এভাবেই সদস্যভিত্তিতে গড়া কৃষক সংগঠন তার সদস্য ও আশপাশের কৃষকদের অধিকার আদায়ে একটি বলিষ্ঠ সামাজিক মূলধন হয়ে উঠে। উপরিউক্ত আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায় একটি বলিষ্ঠ কৃষক সংগঠন- ক্ষুদ্র কৃষকদের সব সমস্যার জবাব।
মাহমুদ হোসেন* ড. ইমানুন নবী খান**
* ন্যাশনাল টিম লিডার, আইএপিপি-টিএ, জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা। ** প্রতিষ্ঠান উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ, আইএপিপি-টিএ, জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা