কলাগাছের পানামা রোগ ও প্রতিকার কৌশল
ড. হায়াত মাহমুদ
কলাগাছের পানামা রোগ বা ফিউজারিয়াম উইল্ট একটি মারাত্নক ক্ষতিকর রোগ। পানামা রোগটি ১৯০৫ সনে পানামায় আবিষ্কৃত হয়। এই রোগটি ফিউজারিয়াম অক্সিস্পোরাম Fusarium oxysporum f.sp. cubense নামক ছত্রাকের আক্রমণে হয়। ছত্রাকের এই উপপ্রজাতিটি মাটিবাহিত এবং মাটির ভেতর এটি কয়েক দশক ধরে টিকে থাকতে পারে।
রোগের বিস্তার
এ ছত্রাক কলাগাছের শিকড়ের ক্ষুদ্র রোমের মাধ্যমে প্রবেশ করে এবং কম ও হালকা নিকাশী ব্যবস্থা সম্পন্ন মাটিতে অনুকূল হয়। এ ছত্রাক মাটির কণার পানি, যানবাহন, কৃষি যন্ত্রপাতি, মানুষের পায়ের জুতার মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। অন্যদিকে রোগাক্রান্ত উদ্ভিদ অংশ বা তেউড়ের মাধ্যমে বেশি দূরত্বে এ রোগ ছড়িয়ে পড়ে। তাপমাত্রা বৃদ্ধিতে রোগ সংক্রমণ বেশি দেখা যায়। পরিবেশ অনুকূলে থাকলে পানামা রোগটি কলা উৎপাদনের ক্ষেত্রে খুবই ধ্বংসাত্মক হয়ে উৎপাদন পুরোপুরি ব্যাহত করতে পারে।
রোগের লক্ষণ
প্রথমে বয়স্ক পাতার কিনারা হলুদ বর্ণ ধারণ করে এবং পরে গাছের কচি পাতাও হলুদ বর্ণ ধারণ করা শুরু করে। পরে আক্রান্ত পাতা বোঁটার কাছে ভেঙে নিচের দিকে ঝুলে পড়ে এবং কোন কোন সময় গাছের পাতা লম্বালম্বিভাবে ফেটে যায়। এভাবে সমস্ত পাতা আক্রান্ত হয়। আক্রান্ত গাছের গোড়ায় সিউডো কা- ফেটে যায়। আক্রান্ত গাছের রাইজোম আড়াআড়িভাবে কাটলে হলুদাভ লাল বা বাদামি বিন্দু ও দাগ দেখা যায়। পাতার ক্লোরোসিসের কারণে গাছের জীবনী শক্তি কমে যায় এবং পরিবহন কলা ক্ষয়ের কারণে পানি এবং পুষ্টি উপাদানের পরিবহনে বাধাপ্রাপ্ত হয়। বেশি মাত্রায় এ রোগ দ্বারা আক্রান্ত হলে পাতা ভেঙে পড়ে এবং ভেতরের অংশ হতে মাছের আঁশটের মতো গন্ধ বের হয়।
প্রতিকার
কলা গাছ পানামা রোগে আক্রান্ত হলে প্রতিকার পাওয়া কঠিন। তবে এ ক্ষেত্রে
প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধ ব্যবস্থা গ্রহণ করা উত্তম। গাছ ৫০% আক্রান্ত হলে প্রতিরোধ ও প্রতিকার দুরূহ হয়ে পড়ে। নিম্নলিখিত ব্যবস্থাপনা অনুসরণ করা হলে কলার পানামা রোগ নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।
প্রত্যয়িত উৎস থেকে সুস্থ চারা সংগ্রহ করতে হবে। টিস্যু কালচারের মাধ্যমে উৎপাদিত চারা উত্তম।
আক্রান্ত স্থানের মাটি যাতে রোগমুক্ত এলাকায় না যেতে পারে সে ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে।
চাষের কাজে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি, সরঞ্জাম এবং খামারে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি পরিষ্কার পানি দ্বারা ধৌত করে নতুন কলা গাছের ক্ষেতে ব্যবহার করতে হবে।
আক্রান্ত জায়গায় ৩-৪ বছর কলাচাষ করা থেকে বিরত থাকতে হবে এবং দীর্ঘ (৪-৬ বছর) শস্যপর্যায় অনুসরণ করতে হবে। রোগে আক্রান্ত এলাকায় আখ, ধান, সরিষা, পাট, ফুলকপি, বাঁধাকপি, সূর্যমুখী ইত্যাদি ফসলের চাষ করতে হবে।
বৃষ্টির পানি বের হওয়ার জন্য ভালো নিকাশ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
রোগাক্রান্ত গাছ মূলসহ উপড়ে পুড়িয়ে ফেলতে হবে এবং আক্রান্ত গাছের গোড়ার মাটি অটোস্টিন-২ গ্রাম/লিটার পানি মিশিয়ে শোধন করতে হবে।
মাটির অম্লতা দূর করতে হেক্টর প্রতি ১ টন চুন প্রয়োগ করা যেতে পারে। এ ছাড়াও কৃমিনাশক যেমন রিজেন্ট ৩ জি প্রতি গর্তে ৫ গ্রাম হারে প্রয়োগ করা হলে কৃমির আক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করা যাবে।
মাটিতে প্রচুর জৈবসার প্রয়োগ করার মাধ্যমে অনুজৈবিক ভারসাম্য বজায় রাখা সম্ভব।
ট্রাইকোডার্মা সম্বলিত ছত্রাকনাশক প্রয়োগ করলে মাটিবাহিত জীবাণুর সংক্রমণ প্রতিরোধ করা যায়।
চারা অবশ্যই ডাইনামিক ১ গ্রাম/লি. দ্রবণে ৩০ মিনিট ভিজিয়ে শোধন করে নিতে হবে। এ ছাড়াও চারা লাগানোর আগে গর্তে ডাইনামিক ১ গ্রাম/লি. হিসেবে মাটিতে স্প্রে করে মাটি ভিজিয়ে দিতে হবে। এরপর যেহেতু ডাইনামিক একটি বায়োলজিক্যাল ফানজিসাইড, প্রাথমিকভাবে আক্রান্ত ক্ষেতে ডাইনামিক ১ গ্রাম/লিটার হিসেবে পানির সাথে মিশিয়ে ১০ দিন পর পর ধারাবাহিকভাবে ৪ বার গাছের গোড়া এবং পাতায় প্রয়োগ পরা হলেও এ রোগটির নিয়ন্ত্রণ করা অনেকাংশেই সম্ভব।
সর্বদায় কলার বাগান পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে।
উল্লেখ্য মাঠে কলার পানামা ও সিগাটোকা রোগ একই সাথে পরিলক্ষিত হয় সে ক্ষেত্রে রোগ দু’টি নিয়ন্ত্রণের জন্য নিম্নলিখিত সমন্বিত দমন ব্যবস্থাপনা গ্রহণ করা যায়
কলার চারা লাগানোর পূর্বে জমি ভালভাবে চাষ দিতে হবে।
চারা লাগানোর সময় প্রতি গর্তে ৫০০ গ্রাম থেকে ১ কেজি পরিমাণ সরিষার খৈল অথবা ৬-৮ কেজি অর্ধ-পঁচা মুরগীর বিষ্ঠা মাটির সাথে ভালোভাবে মিশিয়ে কমপক্ষে ২১ দিন পর্যন্ত ভালোভাবে পঁচাতে হবে।
সুস্থ সবল রোগমুক্ত চারা ব্যবহার করতে হবে।
কলার চারা শোধন করা প্রয়োজন। কলার চারা লাগানোর পূর্বে অবশ্যই ডাইনামিক ১ গ্রাম/লি. দ্রবণে ৩০ মিনিট ভিজিয়ে শোধন নিতে হবে অতঃপর ছায়াযুক্ত স্থানে রেখে গোড়া শুকানোর পর চারা লাগাতে হবে।
চারা লাগানোর পূর্বে প্রতি গর্তে রিজেন্ট ৩ জি ৫ গ্রাম প্রয়োগ করে চারা রোপণ করতে হবে।
চারা লাগানোর পর প্রতি বছর বর্ষার আগে ২-৩ বার (১০-১২ দিন অন্তর) এবং বর্ষার পরে ২-৩ বার কার্বেন্ডাজিম গ্রুপের ছত্রাকনাশক যেমন অটোস্টিন ২ গ্রাম/লিটার পানি মিশিয়ে কলাগাছে গোড়ার মাটি ভালোভাবে ভিজিয়ে দিতে হবে।
া বাগানে পানাম রোগের লক্ষণ দেখা দেওয়ার সাথে সাথে আক্রান্ত গাছ সমূলে উঠিয়ে পুড়িয়ে ফেলতে হবে এবং আক্রান্ত গাছের গোড়ার মাটি অটোস্টিন ২ গ্রাম/লিটার পানি মিশিয়ে শোধন করতে হবে। এ ছাড়াও আক্রান্ত গাছের গোড়ার চারিদিকে উঁচু করে আইল করে দিতে হবে যেন সেচের পানি আক্রান্ত গাছ হয়ে সুস্থ গাছে না যায়। প্রাথমিকভাবে আক্রান্ত ক্ষেতে ডাইনামিক ১ গ্রাম/লিটার হিসেবে পানির সাথে মিশিয়ে ১০ দিন পরপর ধারাবাহিকভাবে ৪ বার গাছের গোড়া এবং পাতায় প্রয়োগ করে এ রোগটির নিয়ন্ত্রণ করা যায়।
পাতার দাগ রোগ/সিগাটোকা রোগ দমনের জন্য আক্রান্ত ডালপালা কেটে পুড়িয়ে ফেলতে হবে অতঃপর প্রপিকোনাজল গ্রুপের ছত্রাকনাশক যেমন টিল্ট ০.০৫ মিলি/লিটার পানির সাথে মিশিয়ে ১০-১২ দিন অন্তর কমপক্ষে ২ বার কলার পাতা ভালোভাবে ভিজিয়ে দিতে হবে।
কলার বাগান অবশ্যই পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে।
লেখক : অধ্যক্ষ (অব:), কৃষি প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট, ঝিনাইদহ, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, মোবাইল : ০১৭২৭১৮২৬১৫,