কনটেন্টটি শেষ হাল-নাগাদ করা হয়েছে: বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল, ২০২৬ এ ১২:৩৬ PM
কন্টেন্ট: কৃষি কথা মাস: বৈশাখ সাল: ১৪৩৩ প্রকাশের তারিখ: ১৬-০৪-২০২৬
কলমিশাকের দেশে
মামুন চাকলাদার
জ্যৈষ্ঠ মাসের তপ্ত সূর্যটা উঁকি দিয়েছে মাত্র। গ্রামের একটি বিলের ধারে আইয়ুব আলী তার সতেজ কলমিশাকের জমিতে কাজ করছেন। আব্দাল কাঁচুমাচু মুখে তার ক্ষেতের দিকেই আসছিলেন।
আব্দাল : (দীর্ঘশ্বাস ফেলে) আর পারলাম না আইয়ুব ভাই! সার-বিষ আর কামলার যে দাম, ধানের পেছনে টাকা ঢালতে ঢালতে পকেট তো এখন ফুটো হয়ে গেছে। ঋণের দায়ে রাতে আর চোখ বুজতে পারি না। সপ্তাহ যাইতে না যাইতেই কিস্তি আইসা পড়ে। জানটা কয়লা হইয়া গেল, কিন্তু লাভ তো দূরে থাক, আসল ওঠানোই দায়।
আইয়ুব আলী : (মুচকি হেসে) আরে আব্দাল ভাই, ধানের চিন্তা ছাইড়া একটু আমার এই সবুজ ক্ষেতের দিকে তাকাও তো! দেখো তো চোখটা জুড়ায় কি না? ধান খালি খাওয়ার বুঝ করলেই পারো।
আব্দাল : (অবাক হয়ে) কলমিশাক? আরে ভাই, এ তো খালের ধারে এমনিতেই হয়। এটার আবার চাষ কী? আর এই লতা-পাতা বেচে কি আস্ত একটা সংসার চলে?
আইয়ুব আলী : চলে মানে? দৌড়ায় মিয়া! শোনো আব্দাল ভাই -জ্যৈষ্ঠ মাস হইলো কলমিশাক চাষের সেরা সময়। আমার এই মাত্র ৩ শতক নিচু জমিতে আমি কলমি শাক বুনেছিলাম। ২০-২৫ দিনেই ফসলের মুখ দেখতে পাইলাম।
আব্দাল : (অবাক হয়ে) মাত্র ২০-২৫ দিনেই ফসল? বলেন কী!
আইয়ুব আলী : একদম সত্যি! আর একবার কাটলে আবারও লতা গজায়। সারা বছর বারবার কাটা যায়। এই জ্যৈষ্ঠের তপ্ত রোদে যখন অন্য ফসল মরে যায়, আমার এই গিমাকলমি তখন আরও বেশি সতেজ থাকে। প্রতিদিন সকালে কয়েক বোঝা শাক তুলে বাজারে নিয়া যাই, নগদ টাকা হাতে নিয়া হাসিমুখে ঘরে ফিরি। এতে রাসায়নিক সার লাগে না বললেই চলে, আর বিষাক্ত কীটনাশকের তো নাম-গন্ধও নাই। বিষমুক্ত সতেজ সবজি দেইখা মানুষ কাড়াকাড়ি কইরা কিনে।
আব্দাল : বলেন কী! এই সামান্য কলমির এত কদর বাজারে? মানুষ কেন খাবে এটা?
কথা বলতে বলতে দুজনে বাড়িতে উঠল। সুজিনা বারান্দায় বসে শাক বাছছিল।
সুজিনা : (কথায় যোগ দিয়ে) আমি বলি কী আব্দাল ভাই। চাহিদা হইবো না কেন? এই কলমি শাক হইলো শরীর গড়ার আসল কারিগর। এখনকার মায়েরা অনেক সচেতন। তারা জানে, কলমি শাকে আছে প্রচুর ভিটামিন ‘এ’, যা শিশুদের চোখের জ্যোতি বাড়ায় আর রাতকানা রোগ দূর করে।
আব্দাল : বলেন কী ভাবি! চোখের জ্যোতিও বাড়ায়?
সুজিনা : শুধু কি তাই? এতে থাকা ভিটামিন ‘সি’ আর আয়রন শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায় আর রক্তশূন্যতা দূর করে। বিশেষ কইরা আমাদের মতো প্রসূতি মায়েদের জন্য কলমিশাক তো ওষুধের মতো কাজ করে। এ ছাড়া যাদের পেটে গোলমাল বা কোষ্ঠকাঠিন্য আছে, তাদের জন্য কলমিশাকের ফাইবার বা আঁশ আশীর্বাদ স্বরূপ। এটা হজম শক্তিও বাড়ায় অনেক।
আব্দাল : (বিস্মিত হয়ে) আগে তো জানতাম না ভাবি! আমি তো ভাবতাম এটা কেবল গরিবের খাবার।
আইয়ুব আলী : ঠিক তাই আব্দাল ভাই। ক্যালসিয়াম আর ম্যাগনেসিয়ামে ভরপুর এই শাক হাড় আর দাঁত মজবুত করে। চাষের খরচও একদম নগণ্য। এই জ্যৈষ্ঠের রোদে যখন অন্য ফসল পুড়ে ছারখার হয়, এই কলমি তখন পানির ওপর নিজের রাজত্ব চালায়। বাড়ির কোণে, ডোবা বা পতিত নিচু জমিতে একটু যত্ন করলেই ‘সবুজ সোনা’ ফলবে।
আব্দাল : (উৎসাহিত হয়ে) আমার ওই পচা জমিটার তো কোনো কাজে আসছিল না। ভাবছিলাম ফেলেই রাখব। ওখানে কি কলমি হইব আইয়ুব ভাই?
আইয়ুব আলী : অবশ্যই হইব!
জ্যৈষ্ঠের আর্দ্র আবহাওয়ায় আর্দ্র মাটি বা জলাভূমি কলমি চাষের জন্য স্বর্গ। অভাব আপনার ঘর থেকে পালাবে মিয়া। পরিশ্রম আর সঠিক ফসল বেছে নিলে মাটি কখনও আমাদের ঠকায় না।
সুজিনা : ঠিক কইছেন। কলমি শুধু শাক না, এটা বিষমুক্ত পুষ্টির গ্যারান্টি। আপনিও শুরু করেন, দেখবেন শরীর আর পকেট-দুইটাই চাঙ্গা থাকব।
আব্দাল : (দৃঢ়তার সাথে) ঠিক বলছেন ভাবী। আইয়ুব ভাই, কাল থেকেই আমি আপনার কাছে পরামর্শ নেব। আমি ওই পতিত জমিতে কলমির চারা লাগাবই। জ্যৈষ্ঠের রোদে পোড়া কপাল এবার সবুজে ফিরাবো ইনশা-আল্লাহ।
আইয়ুব আলী : (কাঁধে হাত দিয়ে) এই তো চাই! এসো ভাই, আগে নাশতাটা সেরে নিই, তারপর সব হাতে-কলমে বুঝিয়ে দিচ্ছি।
সবাই হাসিমুখে বাড়ির ভেতরে ঢোকে। সবুজ কলমিশাকের এত গুণাগুণ আর আয়ের উৎস জেনে আব্দাল যেন খুবই উচ্ছ্বসিত হয়েছে। বাড়ির হাসির শব্দ ছড়িয়ে পড়ছে আজ বিলের পাড়ে।
লেখক : মামুন চাকলাদার, শিক্ষার্থী, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়। ঠিকানা : শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ হল, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, সাভার, ঢাকা। মোবাইল : ০১৬৩৬৯০১৭৮০