কনটেন্টটি শেষ হাল-নাগাদ করা হয়েছে: মঙ্গলবার, ১৪ অক্টোবর, ২০২৫ এ ০৫:৪৪ PM
কন্টেন্ট: কৃষি কথা মাস: কার্ত্তিক সাল: ১৪৩২ প্রকাশের তারিখ: ১৫-১০-২০২৫
উপকূলীয় পোল্ডার এলাকায় পানি ব্যবস্থাপনা
ও লাগসই উন্নত চাষাবাদ কৌশল
মনোরঞ্জন ম-ল১ জয়ন্ত ভট্টাচার্য২ মো: হুমায়ুন কবির৩
উন্নত কৃষি প্রযুক্তির মাধ্যমে সারা দেশে কৃষি বিপ্লব সাধিত হলেও দেশের দক্ষিণাঞ্চলের সমুদ্র উপকূলবর্তী এলাকার মানুষ আধুনিক বা উন্নত কৃষির সুবিধা থেকে আজও বঞ্চিত। তার প্রধান কারণ দক্ষিণাঞ্চলের পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা দেশের অন্যান্য এলাকা হতে সম্পূর্ণ ভিন্ন। এ এলাকায় জোয়ার-ভাটাপ্রবণ নদীবিধৌত নিম্নাঞ্চলকে চাষাবাদ ও বসবাসের উপযোগী করার লক্ষ্যে সরকার ১৯৬০ থেকে ১৯৭০ সালের মধ্যে মাটির উঁচু বাঁধ দিয়ে ১৩৯টি পোল্ডার নির্মাণ করে। উপকূলের সর্বমোট ২.৮৫ মিলিয়ন হেক্টর জমির মধ্যে প্রায় ১.২ মিলিয়ন হেক্টর কৃষি জমি এসব পোল্ডারগুলোর আওতাভুক্ত। পোল্ডার নির্মাণের উদ্দেশ্য ছিল বর্ষাকালে জলাবদ্ধতা রোধ করে দেশি জাতের আমন ধান চাষ করা এবং শুষ্ক মৌসুমে লবণাক্ত পানির অনুপ্রবেশ রোধ করা। পোল্ডারের ভেতরে ছোট বড় অনেক খাল আছে। এসব খালগুলোর মধ্যে কিছু কিছু বড় খাল পোল্ডারের বাঁধে স্থাপিত স্লুইসগেট দ্বারা আশেপাশের নদীর সাথে সংযুক্ত। যার মাধ্যমে জোয়ারের সময় পানি পোল্ডারের অভ্যন্তরে নেয়া এবং ভাটার সময় পানি নিষ্কাশনও করা যায়। সুতরাং পোল্ডার অভ্যন্তরে পানি ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে চাষাবাদ করার জন্য স্লুইস গেট বা রেগুলেটর নিয়ন্ত্রণ ও এর ব্যবস্থাপনা গুরুত্বপূর্ণ।
পোল্ডার এলাকায় প্রচলিত পানি ব্যবস্থাপনা ও শস্য উৎপাদন
পোল্ডারের অভ্যন্তরে জুলাই থেকে ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত অধিকাংশ সময়ে উঁচু-নিচু ভেদে কৃষি জমিতে সাধারণত ১০ সেন্টিমিটার থেকে ৭০ সেন্টিমিটার পানি থাকে। সনাতনী পানি ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে আমন মৌসুমে উচ্চফলনশীল ধান চাষাবাদ সম্ভব নয়। তাই ঐতিহাসিকভাবে পোল্ডার এলাকার কৃষকেরা পানি পরিবেশের সাথে খাপখাইয়ে দেশি আমন ধান চাষ করে আসছেন। সাধারণত বৃষ্টি ও অলবণাক্ত নদীর পানি ব্যবহার করে জুলাই মাস থেকে কৃষকেরা আমন মৌসুমে ধান চাষাবাদ শুরু করেন। এ মৌসুমে অধিকাংশ সময় স্লুইসগেট খোলা থাকে। ফলে জোয়ারের সময় নদীর পানি অনায়াসে পোল্ডারের ভেতরে প্রবেশ করে আবার ভাটার সময় পানি নদীতে বের হয়ে যায়। তবে অতিরিক্ত বৃষ্টির ফলে ধান গাছ ডুবে গেলে ভাটার সময় পানি নদীতে বের করে দিয়ে জোয়ারের সময় স্লুইসগেট বন্ধ রাখা হয়।
দক্ষিণাঞ্চলের কৃষকেরা সাধারণত দেশি আমন ধান চাষে তেমন সার প্রয়োগ করে না বিধায় পানি ব্যবস্থাপনা তাদের কাছে তেমন গুরুত্ব বহন করে না। তবে আগস্ট মাসে ধান লাগানোর সময় এবং ধান পাকলে ডিসেম্বর মাসের প্রথমার্ধে স্লুইস গেট খুলে তারা জমির পানি নদীতে বের করে দেয় এবং জমি মোটামুটি শুকালে ডিসেম্বর-জানুয়ারি মাসে আমন ধান কেটে ঘরে তোলে। সে কারণে ফেব্রুয়ারি মাসের আগে রবিশস্য চাষের জন্য জমি প্রস্তুত করা তথা রবিশস্য বপন করা সম্ভব হয় না। ফলশ্রুতিতে, রবিশস্য মে মাসের আগে কর্তনোপযোগীও হয় না। আবার মে মাসের দ্বিতীয়ার্ধ হতে দক্ষিণাঞ্চলে ঝড়-ঝঞ্চা ও বৃষ্টিপাত শুরু হয়ে যায়। ফলে ঘরে তোলার আগেই অনেক সময় বৃষ্টিতে ফসল নষ্ট হয়ে যায়।
সুষ্ঠু পানি ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে পোল্ডার এলাকায় সারাবছর শস্য উৎপাদন
গবেষণায় দেখা গেছে যে, স্লুইসগেট নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে পানি ব্যবস্থাপনা করলে পোল্ডারের অভ্যন্তরে সারা বছরব্যাপী ভালোভাবে দুটি ফসল ফলানো যায়। উচ্চফলনশীল ধান দেশি ধানের জাতের থেকে অনেক খাটো তাই আমন মৌসুমে জমিতে কখনও ৫০ সেন্টিমিটারের বেশি পানি রাখা যাবে না। তা ছাড়া উচ্চফলনশীল ধান চাষে কাক্সিক্ষত ফলন পেতে হলে সার প্রয়োগ করতেই হবে।
আমন ধান চাষে ইউরিয়া বাদে অন্যান্য সার জমি চাষের সময় প্রয়োগ করতে হয়। পোল্ডার এলাকায় জমি চাষ ও ধানের চারা রোপণের সময় কৃষকেরা স্লুইসগেট খুলে ভাটায় সময় নদীতে জমির অতিরিক্ত পানি বের করে দেয় বিধায় শেষ চাষের সময় সার প্রয়োগে তেমন সমস্যা হয় না। কিন্তু উফশী ধানের কুশি বৃদ্ধির সময় ও কাইচ থোড় আসার আগে ইউরিয়া সার উপরিপ্রয়োগ না করলে কাক্সিক্ষত ফলন পাওয়া যাবে না। গবেষণায় দেখা গেছে, ধান গাছের বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে পোল্ডার এলাকার জমিতে ১০ সেন্টিমিটার থেকে ৭০ সেন্টিমিটার দাঁড়ানো পানি থাকে। ইউরিয়া সার উপরিপ্রয়োগের সময় জমি থেকে পানি বের করে না দিলে সারের কার্যকারিতা হ্রাস পায়। নদীতে ভাটার সময় স্লুইসগেট খুলে পানি বের করে দিয়ে ইউরিয়া সার উপরিপ্রয়োগ করার সপ্তাহ খানেক পরে পুনরায় জোয়ারের সময় ধান ক্ষেতে পানি প্রবেশ করালে আমন মৌসুমে হেক্টরপ্রতি গড়ে ৫.০ টনের মতো ফলন পাওয়া যায়।
দেশি আমন ধান চাষাবাদে প্রায় পাঁচ মাস সময় লাগে। কিন্তু উফশী জাতের ধানের জীবনকাল দেশি ধানের চেয়ে কমপক্ষে এক মাস কম এবং এর ফলনও প্রায় দ্বিগুণ। অর্থাৎ উচ্চফলনশীল আমন ধান চাষের ফলে শুধু উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে না, কৃষক মাসখানেক আগে রবিশস্য চাষ করতে সক্ষম হবেন। ফলশ্রুতিতে, বৃষ্টিপাত বা ঝড়-ঝঞ্চার কবল থেকে রবি ফসল রক্ষা করা সম্ভব হবে।
বিগত ২০১৫ সাল থেকে শুরু করে ২০২৪ সাল পর্যন্ত আন্তর্জাতিক ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট কর্তৃক বাংলাদেশের সরকারি-বেসরকারি সংস্থা ও কৃষকদের অংশগ্রহণে খুলনা জেলার পাইকগাছা, ডুমুরিয়া ও বটিয়াঘাটা উপজেলার ৪টি পোল্ডারের স্লুইসগেট নিয়ন্ত্রণ ও পানি ব্যবস্থাপনা করে উন্নত কৃষি প্রযুক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে ফসল উৎপাদন বৃদ্ধির গবেষণা করা হয়। এ গবেষণায় আমন ও রবি মৌসুমে বিভিন্ন পোল্ডার এলাকার ৩৪০০ জন এ অংশগ্রহণ করেন।
অংশগ্রহণকারী কৃষকেরা, গবেষক ও সম্প্রসারণ কর্মীদের পরামর্শে আমন মৌসুমে উফশী ধান এবং রবি মৌসুমে তিল, মুগডাল, সূর্যমুখী ও ভুট্টা ফসল চাষ করেন। তারা আমন মৌসুমে ব্রি ধান৪৯, ব্রি ধান৫১, ব্রি ধান৫২, ব্রি ধান৫৩, ব্রি ধান৫৪, ব্রি ধান৬২, ব্রি ধান৭২, ব্রি ধান৭৬, ব্রি ধান৭৯, ব্রি ধান৮৭, ব্রি ধান১০৩, বিনাধান-৭, বিনাধান-১১, বিনাধান-১৭ ও বিনাধান-২৩ চাষ করেছিলেন। আমন ধান কাটার পর কৃষকেরা রবি মৌসুমে হাইসান ৩৩, হাইসান ৩৬ ও বারি সূর্যমুখী-৩ জাতের সূর্যমুখী; প্যাসিফিক ১৩৯, প্যাসিফিক ৯৮৪, ডন ১১১, ডিসকভার ৭৭৭ ও বারি হাইব্রিড ভুট্টা-৭ জাতের ভুট্টা; বারি মুগ-৫, বারি মুগ-৬, বারি মুগ-৮, বিনামুগ-৬ ও বিনামুগ-৮ জাতের মুগডাল এবং বারি তিল-৩ ও বিনা তিল-৩ জাতের তিল ফসলের চাষ করেছিলেন। রবিশস্য ছাড়াও বরিশাল অঞ্চলের কৃষকেরা শুষ্ক মৌসুমে ব্রি ধান৬৭, ব্রি ধান৭৪, ব্রি ধান৮৯, ব্রি ধান৯২, ব্রি ধান৯৯, ব্রি ধান১০০, ব্রি ধান১০২, ব্রি ধান১০৪, ব্রি হাইব্রিড ধান৩, ব্রি হাইব্রিড ধান৫ ও ব্রি হাইব্রিড ধান৮ জাতের বোরো ধান চাষ করে ছিলেন।
খুলনা ও বরিশাল অঞ্চলের ৬টি পোল্ডারের ২৫টি গ্রামের অংশগ্রহণকারী প্রায় সাড়ে তিন হাজার কৃষক গড়ে প্রতি হেক্টরে ৪.০-৫.৪ টন আমন ধান, ১.২-২.৬ টন সূর্যমুখী, ৩.০-৯.০ টন ভুট্টা, ৬৮৫-৯৩৮ কেজি মুগডাল এবং ৮৬৫-১০২০ কেজি তিল ফসলের ফলন পেয়েছেন। এ ছাড়া বরিশাল অঞ্চলের কৃষকেরা বোরো মৌসুমে হেক্টরপ্রতি ৫.৬-৮.৮ টন ধানের ফলন পেয়েছেন। উভয় এলাকার কৃষকেরা আমন মৌসুমে ব্রি ধান৫২, ব্রি ধান৭২, ব্রি ধান৭৬, ব্রি ধান৮৭ এবং বিনা ধান-১৭ জাতগুলো থেকে সবসময়ে ভালো ফলন পেয়েছেন। উল্লেখ্য, খুলনা ও বরিশাল উভয় অঞ্চলে আমন ধানের ফলন প্রায় সমান ছিল। কিন্তু রবি মৌসুমে সেচ সুবিধা থাকায় বরিশাল অঞ্চলের কৃষকেরা খুলনা অঞ্চলের চেয়ে বেশি ফলন পেয়েছেন। শুষ্ক মৌসুমে খুলনা অঞ্চলের নদী ও খালের পানি লবণাক্ত থাকে বিধায় রবিশস্য চাষে সেচ প্রদান করা সম্ভব হয়নি। খুলনা অঞ্চলের কৃষকেরা মাটির আর্দ্রতা বা রস ব্যবহার করে রবিশস্য চাষ করেছেন বিধায় তাদের ফলন কম হয়েছে। অর্থাৎ সুষ্ঠু পানি ব্যবস্থাপনা করার ফলে দক্ষিণাঞ্চলের পোল্ডার এলাকার কৃষকেরা এক হেক্টর জমিতে বছরে ১০-১২ টন ফলন (ধানের সমতুল্য ফলন) পেয়েছেন যা তাদের প্রচলিত চাষাবাদ পদ্ধতির ফলনের চেয়ে ২-৩ গুণ বেশি।
পোল্ডার এলাকায় উন্নত কৃষি প্রযুক্তি সম্প্রসারণ
কৃষক মাঠ স্কুলের মাধ্যমে বাঁধ এলাকার কৃষি প্রযুক্তি সম্প্রসারণ করা দুষ্কর। এক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট উদ্ভাবিত ক্লাস্টার কৃষক মাঠ স্কুল (সমলয় চাষের মতো) সহায়ক হতে পারে। ক্লাস্টার কৃষক মাঠস্কুল মডেলে একটা এলাকার সকল কৃষকদের সাথে পানি ব্যবহারকারী সংগঠন বা যারা স্লুইসগেট পরিচালনার সাথে জড়িত তাদেরকে সম্পৃক্ত করা হয় বিধায় উপকূলীয় পানি পরিবেশের প্রতিকূলতাকে মোকাবিলা করে সহজেই উন্নত কৃষি প্রযুক্তি সম্প্রসারণ করা সম্ভব হবে।
ইদানীং খুলনা ও বরিশাল অঞ্চলের কৃষকেরা ব্যাপকভাবে পোল্ডার অভ্যন্তরে তরমুজ চাষাবাদ শুরু করেছেন। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলে প্রাক-মৌসুম বৃষ্টির প্রবণতা বেড়ে যাওয়ায় তরমুজ ফসল নষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা বৃদ্ধি পাচ্ছে। কারণ তরমুজ ফসল একদম জলাবদ্ধতা সহ্য করতে পারে না। অন্যদিকে পানি ব্যবস্থাপনা করলে সূর্যমুখী ও ভুট্টা যেহেতু ডিসেম্বর মাসে বপন করে এপ্রিল মাসের মধ্যেই ফসল কাটা যায়, তাই প্রাক-মৌসুম বৃষ্টিতে এসব ফসল নষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা অপেক্ষাকৃত কম। তা ছাড়া সূর্যমুখী ও ভুট্টা ফসল তরমুজ অপেক্ষা অধিকতর লবণ ও জলাবদ্ধতা সহিঞ্চু। তাই জলবায়ু পরিবর্তনের ঘাতসহিঞ্চু ফসলের চাষাবাদই উপকূলীয় অঞ্চলের কৃষির জন্য একান্ত অপরিহার্য। এ ছাড়া বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের অর্ধেক জমিতে রবি মৌসুমে সূর্যমুখী চাষ করলে দেশের প্রায় ৪০ ভাগ ভোজ্যতেলের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হবে। তাই কৃষক তথা কৃষির সাথে সম্পৃক্ত নীতি নির্ধারকদের এ ব্যাপারে যথোপযুক্ত উদ্যোগ গ্রহণ করা অপরিহার্য। এতে দক্ষিণাঞ্চলের স্বল্প ব্যবহৃত জমি ও পানি সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে দেশের জনগোষ্ঠীর খাদ্য চাহিদা সহজেই পূরণ করা ও জীবন-মান উন্নয়ন করা সম্ভব হবে।
পরিশেষে স্লুইসগেট নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে পানি ব্যবস্থাপনা করলে পোল্ডার অভ্যন্তরে বছরব্যাপী উন্নত জাতের ধান ও রবিশস্য চাষাবাদ করে খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি করা সম্ভব।
লেখক : ১কনসালট্যান্ট, পানি ব্যবস্থাপনা; ২সহকারী বিজ্ঞানী, আন্তর্জাতিক ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট, ঢাকা, ৩প্রকল্প পরিচালক (বাংলাশেপ), ডিএই, মোবাইল : ০১৭১৭৯৫২০৯৫, খামারবাড়ি, ঢাকা