কনটেন্টটি শেষ হাল-নাগাদ করা হয়েছে: বুধবার, ২২ জানুয়ারী, ২০২৫ এ ০৫:১৯ PM

উপকূলীয়-জনগোষ্ঠীর-আর্থসামাজিক-উন্নয়নে-গুরুত্বপূর্ণ-অবদান-রাখবে-‘নাপ্পি’

কন্টেন্ট: কৃষি কথা মাস: মাঘ সাল: ১৪৩১ প্রকাশের তারিখ: ১২-০১-২০২৫

উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর আর্থসামাজিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে ‘নাপ্পি’
মোঃ মাসুদ রানা (পলাশ)

আমরা মাছে ভাতে বাঙালি, আমাদের  প্রাণিজ আমিষের প্রায় ৭০% আসে মাছ থেকে। মাছে আমিষের পাশাপাশি রয়েছে অনন্য কিছু পুষ্টি উপাদান যা মানব শরীরে দৈহিক বৃদ্ধি ও শারীরবৃত্তীয় কর্মকা-ে সহায়ক ভূমিকা রাখে। এসব গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টি উপাদানের মধ্যে চর্বি, শর্করা, আঁশ ও মিনারেলস অন্যতম। আমাদের দেশে প্রায় ২৬০ প্রজাতির মিঠাপানির মাছ ও ৪৭৫ প্রজাতির লোনাপানির বা সামুদ্রিক মাছ রয়েছে (সূত্র: মৎস্য অধিদতপ্তর)।  আমরা মাছকে বিভিন্নভাবে প্রক্রিয়াজাতকরণ করে সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণ করে থাকি। আমাদের দেশে উপকূলীয় অঞ্চলের মাছ সংরক্ষণের প্রচলিত পদ্ধতিগুলোর মধ্যে শুঁটকি সর্বাধিক পরিচিত। উপকূলীয় অঞ্চল যেমন চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, নোয়াখালী, মহেষখালী, দুবলার চর, সোনাদিয়া, টেকনাফসহ বিভিন্ন এলাকায় যেসব মাছ শুঁটকি উৎপাদনে ব্যবহার করা হয় তার মধ্যে চিংড়ি, লইট্যা, ছুরি, ফাঁইশা, রুপচান্দা, কোরাল, লাক্ষা, কামিলা, লাল পোয়া, সুন্দরী ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। দেশের সর্ববৃহৎ শুঁটকি পল্লীখ্যাত কক্সবাজারস্থ নাজিরারটেক হতে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ শুঁটকি উৎপাদন ও বাজারজাতকরণ করা হয়ে থাকে, এসব এলাকার মানুষের জীবিকা নির্বাহের একমাত্র মাধ্যম হলো শুঁটকি মাছ উৎপাদন ও বিপণন। সাম্প্রতিক সময়ে কক্সবাজারের নাজিরারটেক, চৌফলদ-ী, মহেষখালীসহ বিভিন্ন এলাকায় ‘নাপ্পি’ নামক একটি মূল্য সংযোজিত পণ্য উৎপাদিত হচ্ছে, যা পার্বত্য এলাকায় বসবাসকারী জনগোষ্ঠীর চাহিদা মিটিয়ে রপ্তানিও করা হচ্ছে। ‘নাপ্পি’ পাহাড়ি আধিবাসীদের একটি জনপ্রিয় খাবার। বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকার বাসিন্দা বিশেষ করে চাকমাদের খাবারের মেনুতে ‘নাপ্পি’ না থাকলে যেন চলেই না। বর্তমানে পণ্যটি দেশের গ-ি পেরিয়ে বিভিন্নভাবে দেশের বাইরে যাচ্ছে এবং দেখা দিয়েছে রপ্তানি সম্ভাবনা। ‘নাপ্পি’ উৎপাদনের জন্য যে সকল কাঁচামাল (গুঁড়া চিংড়ি মাছ, সামুদ্রিক অন্যান্য ছোট মাছ যেগুলো সাধারণত বাজারে বিক্রি যোগ্য নয় ও লবন) প্রয়োজন তার প্রত্যেকটি উপকূলীয় অঞ্চলে খুবই সস্তায় পাওয়া যায়। আমাদের জেলেরা যে সকল গুঁড়া মাছ জাল থেকে ফেলে দেয় সেগুলো ব্যবহার করেও নাপ্পি উৎপাদন করা সম্ভব। 

নাপ্পির পুষ্টিমান : পুষ্টিগুণে ভরপুর ‘নাপ্পি’ দেশের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী তথা চাকমা, মারমা, গরো সমাজের মানুষের পুষ্টি চাহিদা পূরণে আদিকাল থেকে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। নাপ্পিতে বিভিন্ন পুষ্টি উপাদান রয়েছে, যেমন-আমিষ শতকরা ৩৫-৪০; চর্বি শতকরা ০৮-১০; শর্করা শতকরা ০৩-০৫; অ্যাশ শতকরা ১৫-১৮; মিনারেলস শতকরা         ০১-০২। (সধংঁফবঃধষ-২০১৬)
নাপ্পি উৎপাদন ও সংরক্ষণ প্রক্রিয়া : নাপ্পি একটি মূল্য সংযোজিত মৎস্য পণ্য যার উৎপাদন প্রক্রিয়া একেবারেই সহজ, নাপ্পি উৎপাদনের জন্য তেমন কোন যন্ত্রপাতি বা মিল প্রয়োজন হয় না। নাপ্পি তৈরিতে সাধারণত বাড়ির মহিলারাই বেশি যুক্ত থাকেন অথবা তুলনামূলক কম মূল্যের লেবার দিয়ে নাপ্পি উৎপাদন করা হয়। প্রথমে নাপ্পি উৎপাদনের জন্য গুঁড়া চিংড়ি ও অনান্য ছোট মাছ যেগুলোর বাজারমূল্য খুবই কম সেগুলো সংগ্রহ করা হয়। গুঁড়া চিংড়ি/গুঁড়া মাছগুলোকে ফারমেন্টেশন করেই মূলত নাপ্পি উৎপাদন করা হয়। নাপ্পি তৈরি করার জন্য প্রথমে গুঁড়া চিংড়িগুলোকে নির্দিষ্ট পরিমাণ লবণ দিয়ে স্তূপ করে কালো বা রঙিন মোটা পলিথিন দিয়ে মুড়িয়ে ১৮-২৫ ঘণ্টা রাখা হয় জো আসার জন্য। এরপর লবণ মেশানো মাছগুলোকে রোদে শুকানো হয় ৮-১০ ঘণ্টা রোদে শুকানোর পর মাছগুলোকে দুই উপায়ে পেস্ট বানানো হয়। প্রচলিতভাবে মাছ গুলোকে চাটাইয়ের উপর নিয়ে বুট জুতা পরে ২-৩ জন খুঁচিয়ে পেস্ট বা মিহি করে থাকেন, আবার অনেকে কাঠের গুলি দিয়ে তৈরি এক ধরনের হামান দিস্তা যা স্থানীয় আধিবাসিদের নিকট চ্যাং নামে পরিচিত তা ব্যবহার করে এই পেস্ট বা মিহিকরণের কাজটি করে থাকেন। এভাবে ৭-৮ দিন সারাদিন রোদে শুকানো হয় আবার পেস্ট করা হয়। পুরো প্রক্রিয়াজাতকরণের সময়টা পেস্টগুলোকে রাতের বেলা পলিথিনে মুড়িয়ে রাখা হয়। প্রক্রিয়াটি ৭-৮ বার পুনরাবৃত্তির পর একটি ঘন আঠাঁলো পেস্ট তৈরি হয় যা দেখতে কিছুটা কালচে-বাদামি রংয়ের হয়ে থাকে। পরবর্তীতে ঘন আঁঠালো মাছের পেস্টগুলোকে নেওয়া হয় উঠানে সেখানে ভোক্তার চাহিদা অনুযায়ী বিভিন্ন প্রকার আকৃতি দেওয়া হয়, কিছু করা হয় বল, কিছু করা হয় বিস্কিট সেইপ আবার কিছু করা হয় বাটির মত। কাঁচা নাপ্পি সাধারণত কলাপাতায় মুড়িয়েও রাখা হয় এবং বাজারজাতকরণের জন্য উপযুক্ত বলে মনে করা হয় অন্যদিকে কিছু নাপ্পি ছোট ছোট বিস্কিট আকৃতির করে কড়া রোদে শুকানো হয় যেন দীর্ঘদিন সংরক্ষণ করা যায়। নাপ্পির গুণগত মান ঠিক রাখার জন্য তারা পরবর্তীতে প্রস্তুতকৃত নাপ্পিকে বাঁশের খাঁচায় একটির পর আরেকটি করে সাজিয়ে উপরটা পলিথিন দিয়ে মুড়িয়ে রাখেন বাজারজাত করার আগ অবধি। সাধারণত প্রক্রিয়াজাতকারকদের মতে এক থেকে দেড় মাস সংরক্ষণ করলে ভাল মানের নাপ্পি উৎপাদন করা সম্ভব তবে তারা কাঁচা নাপ্পিই বেশি বাজারজাতকরণ করে থাকেন।
নাপ্পির বাজার ব্যবস্থাপনা : নাপ্পি একটি অপ্রচলিত মৎস্য পণ্য, যা আমাদের দেশে সাধারণত পার্বত্য চট্টগ্রাম, খাগড়াছড়ি, কক্সবাজার ও সিলেট এলাকায় বসবাসরত চাকমা, মারমা, গারো ও অনান্য আধিবাসী সম্প্রদায়ের কাছে একটি প্রসিদ্ধ খাবার হিসেবে প্রচলিত। পার্বত্য এলাকার বাজারগুলোতে এবং চাকমা, মারমা ও গারো অধ্যুষিত এলাকার বাজারগুলোতে নাপ্পির ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। কাঁচা নাপ্পি প্রতি কেজি গুণগত মান বিবেচনায় ৩০০-৩৫০ টাকায় বিক্রি হয়ে থাকে তবে শুকনো নাপ্পির বাজার কয়েকগুণ বেশি। নাপ্পি বাংলাদেশের আধিবাসী জনগোষ্ঠীর খাবার হলেও এটি এখন দেশের গ-ি পেরিয়ে যাচ্ছে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে। ভারত, মিয়ানমার, ভিয়েতনাম, চীনসহ বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের এই নাপ্পির চাহিদা বাড়ছে প্রতিনিয়ত, কিন্তু সঠিক উৎপাদন প্রক্রিয়া, গুণগত মান নিয়ন্ত্রণ ও সংরক্ষণ ব্যবস্থা না থাকায় আমাদের দেশের উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের উৎপাদিত এই পণ্যটি বিদেশে রপ্তানি করতে পারছি না। অপ্রচলিত এই মৎস্য পণ্যটি যদি সঠিকভাবে উৎপাদন ও সংরক্ষণ করা যায় তাহলে এটি দেশের রপ্তানি বাজারে বৃহৎ অবদান রাখার সম্ভাবনা আছে। 
পরিশেষে সরকারি-বেসরকারিভাবে উদ্যোক্তা তৈরি করে সঠিক প্রশিক্ষণ প্রদান ও বাজার ব্যবস্থাপনায় নজর দিলে পরিবেশে নাপ্পি অপ্রচলিত মৎস্য পণ্যটি  আধিবাসীদের পুষ্টি চাহিদা চাহিদা পূরণের পাশাপাশি উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর বেকারত্ব দূরীকরণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও জীবনমান উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে। যেহেতু দেশের বাইরে নাপ্পির ব্যাপক চাহিদা রয়েছে সেহেতু পণ্যটির রপ্তানি করার পদক্ষেপ গ্রহণ করলে মৎস্য পণ্য রপ্তানি বৃদ্ধি করে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখবে।

লেখক : সহকারী অধ্যাপক, ফিশিং এন্ড পোস্ট হারভেস্ট টেকনোলজি বিভাগ, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা-১২০৭ , মোবাইল: ০১৭৪৫-৬২৬১৫৩। ই-মেইল:ranadof.bd@gmail.com

ফাইল ১

এক্সেসিবিলিটি

স্ক্রিন রিডার ডাউনলোড করুন