কনটেন্টটি শেষ হাল-নাগাদ করা হয়েছে: সোমবার, ১৫ ডিসেম্বর, ২০২৫ এ ০৬:১৬ PM

উপকূলীয় অঞ্চলে ফসলের নিবিড়তা বৃদ্ধি এবং বৈচিত্র্যকরণের সমস্যা এবং সমাধান

কন্টেন্ট: কৃষি কথা মাস: পৌষ সাল: ১৪৩২ প্রকাশের তারিখ: ১৪-১২-২০২৫

উপকূলীয় অঞ্চলে ফসলের নিবিড়তা বৃদ্ধি এবং বৈচিত্র্যকরণের সমস্যা এবং সমাধান
শরীফ আহমেদ১ হুমনাথ ভান্ডারী২ মানিক দেবনাথ৩ 
বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চল গাঙ্গেয় বদ্বীপের নিম্ন প্লাবনভূমিতে গড় সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে মাত্র ২-৩ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত হওয়ায় সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা  বৃদ্ধির পাশাপাশি, এই অঞ্চলটি ঘূর্ণিঝড়, ঝড়ো হাওয়া এবং বন্যার জন্য বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ। ৪ কোটিরও বেশি লোকের আবাসস্থল এবং বাংলাদেশের মোট আবাদযোগ্য জমির প্রায় ৩২% উপকূলীয় অঞ্চলে অবস্থিত। ১.২ মিলিয়ন হেক্টরের বেশি উপকূলীয় জমি বিভিন্ন মাত্রার লবণাক্ততায় আক্রান্ত ও ফসলের নিবিড়তা কম (১৫০% এরও কম) কারণ কৃষকরা বর্ষা মৌসুমে মূলত কম ফলনশীল দীর্ঘমেয়াদি স্থানীয় জাতের আমন ধান চাষ করেন এবং শুষ্ক মৌসুমে বিশাল এলাকা অনাবাদি থাকে। প্রাকৃতিক দুর্যোগপ্রবণ অঞ্চলে টেকসই কৃষির জন্য উদ্ভাবনী সমাধান এবং উপযুক্ত নীতিগত পদক্ষেপ অপরিহার্য।
বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে ফসলের নিবিড়তা বৃদ্ধি এবং বৈচিত্র্যকরণ এর সমস্যা 
পানি এবং মাটির লবণাক্ততা  : কৃষি জমির লবণাক্ততা ফসল উৎপাদনের জন্য বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে একটি গুরুতর সমস্যা। শুষ্ক মৌসুমে  প্র্রায় ০.২৭ মিলিয়ন হেক্টর জমির লবণাক্ততার মাত্রা ৪.১ থেকে ৮.০ ডিএস/মিটারের বেশি থাকে, যেখানে  প্রায় ০.৩৫ মিলিয়ন হেক্টরে ৮.১ থেকে ১২.০ ডিএস/মিটারের মধ্যে থাকে। যা ফসলের সহনশীলতার সীমার চেয়ে উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। কিছু উপকূলীয় জেলায়, লবণাক্ত মাটি এবং পানির অভাবে রবি মৌসুমে ৩৫% এরও বেশি        কৃষিজমি পতিত থাকে। এমনকি বর্ষা মৌসুমেও, আকস্মিক বন্যা প্রায়শই লবণের অবশিষ্টাংশ রেখে যায়, যার ফলে আমন ধানের উৎপাদন ১০-২৫% বা তার বেশি হ্রাস পায়।
বৃষ্টিপাতের পরিবর্তনশীলতা : কৃষকরা অতিবৃষ্টি ও অপ্রত্যাশিত বন্যার ফলে বীজতলা এবং রোপণকৃত চারা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া এড়াতে আমন ধান রোপণে বিলম্ব করে। এই বিলম্ব রবি মৌসুমকে প্রভাবিত করে, ফলে গম, ডাল, তৈলবীজ এবং    শাকসবজির মতো শুষ্ক মৌসুমের ফসল রোপণের জন্য পর্যাপ্ত সময় থাকে না। এমনকি রবি ফসল রোপণের সময়ও, অনিয়মিত দেরিতে বর্ষা বা জলাবদ্ধতা ফসল নষ্ট করতে পারে। অতিরিক্ত বৃষ্টিপাতের ফলে দাঁড়িয়ে থাকা আমন ধানও ডুবে যেতে পারে ফলে প্রায়শই বন্যাপ্রবণ এলাকায় ফলন হ্রাস পায়।
জলাবদ্ধতা এবং দুর্বল নিষ্কাশন ব্যবস্থা : বৃষ্টিপাত এবং জোয়ারের সম্মিলিত প্রভাবে উপকূলীয় অঞ্চলের অনেক জমি মৌসুমী বন্যার সম্মুখীন হয় এবং প্রায়শই দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা দেখা দেয়। নদীতে পলি জমে থাকা, পানি কম অনুপ্রবেশের হার এবং অগভীর পানিস্তর জলাবদ্ধতা আরও বাড়ায়। উপরন্তু, বর্ষাকালে এবং পরে যখন অতিরিক্ত পানি জমা হয়, দুর্বল নিষ্কাশন রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থা এই সমস্যা আরও বাড়িয়ে তোলে।  
শুষ্ক মৌসুমে স্বাদু পানির অপ্রাপ্যতা :  নদী ও খালগুলোতে লবণাক্ততার অনুপ্রবেশ, ভূপৃষ্ঠের পানির সীমিত উৎস এবং ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহারের সুযোগ সীমিত হওয়ায় শুষ্ক মৌসুমে উপকূলীয় অঞ্চলে স্বাদু পানির উল্লেখযোগ্য সংকট হয়। দুর্ভাগ্যবশত, এই অঞ্চলের ভূগর্ভস্থ পানিও লবণাক্ততার অনুপ্রবেশের জন্য দূষিত হয়, যা অগভীর কূপগুলোর পানির গুণমানকে হ্রাস করে। গভীর কূপগুলি কিছুটা স্বাদু পানি  প্রদান করতে পারে, তবে এক্ষেত্রে পরিবেশগত ভারসাম্যের ঝুঁকি রয়েছে।
আর্থ-সামাজিক এবং পরিবেশগত সমস্যা : ঘন ঘন প্রাকৃতিক দুর্যোগ যেমন ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, উচ্চ লবণাক্ততার মাত্রা এবং শুষ্ক মৌসুমে পানির ঘাটতি, ফসল উৎপাদনে অনিশ্চয়তা তৈরি করে ফলে কৃষকরা তাদের জমিতে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ করতে নিরুৎসাহিত হয়। ফলস্বরূপ, অনেকে বেসরকারি সংস্থাগুলোর (ঘএঙ) দানের উপর নির্ভর করে, যা দীর্ঘমেয়াদী টেকসই কৃষির পরিবর্তে নির্ভরশীলতা বৃদ্ধি করে। এ অঞ্চলে ভারী এঁটেল মাটি চাষাবাদকে আরও কঠিন করে তোলে। নতুন প্রযুক্তি গ্রহণে কৃষকরা ধীরগতির প্রবণতা পোষণ করে, যা তাদের উক্ত সমস্যাগুলো কার্যকরভাবে মোকাবিলা করার সক্ষমতা কমিয়ে দেয়।
বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে ফসলের নিবিড়তা বৃদ্ধি এবং বৈচিত্র্যকরণ এর কৌশল 
শুষ্ক মৌসুমে ভূ-পৃষ্ঠের পানির প্রাপ্যতা বৃদ্ধি : উপকূলীয় অঞ্চলে শুষ্ক মৌসুমে কার্যকর ব্যবস্থাপনা কৌশলের মাধ্যমে ভূ-পৃষ্ঠের পানির প্রাপ্যতা বাড়ানো ফসলের নিবিড়তা বৃদ্ধি এবং শস্য বৈচিত্র্যকরণের জন্য অপরিহার্য। খালের পানির গুণমান বজায় রাখার জন্য লবণাক্ত পানির অনুপ্রবেশ রোধে নিয়ন্ত্রিত স্লুইস গেট ব্যবহার ও রক্ষণাবেক্ষণসহ নদী এবং খালগুলোর সঠিক ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অধিকন্তু, দল ভিত্তিক ও মাঠ-কেন্দ্রিক সংরক্ষিত স্বাদু পানিসম্পদের দক্ষ বিতরণ, ব্যবহার ও ব্যবস্থাপনা কৌশল প্রয়োজন। একটি টেকসই সমাধান হলো বর্ষা মৌসুমে বৃষ্টির পানি সংগ্রহ করে জলাধার বা খালে অতিরিক্ত পানি সংরক্ষণ করা। এই পদ্ধতি শুষ্ক মাসগুলোতে স্বাদু পানির একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস হবে। ভূ-পৃষ্ঠের পানির প্রাপ্যতা বৃদ্ধি করে ভূগর্ভস্থ পানির উপর নির্ভরতা কমে এবং লবণাক্ততার সমস্যা  হ্রাস পায়। স্বাদুপানিসম্পদ বৃদ্ধি এবং রক্ষণাবেক্ষণের জন্য স্থানীয় জনগোষ্ঠি এবং নীতিনির্ধারকদের মধ্যে সহযোগিতামূলক সমন্বয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বর্ষাকালীন (আমন) ধানের বিচক্ষণ চাষাবাদ : কৃষকরা গতানুগতিকভাবে দীর্ঘমেয়াদী জাত পছন্দ করেন কারণ রোপণের সময় জমিতে বেশি পানি এবং বন্যার সম্ভাবনা থাকে, যার জন্য লম্বা, বয়স্ক চারা প্রয়োজন হয়। স্বল্পমেয়াদী জাতগুলোর একটি প্রধান সুবিধা হলো এগুলো দেরিতে রোপণ করলেও সময়মতো ভালো ফলন নিশ্চিত করতে পারে। এই জাতগুলোর দেরিতে রোপণের জন্য একটি দল-ভিত্তিক সমন্বিত রোপন পদ্ধতি গ্রহণ করলে বন্যার ঝুঁকি এড়ানো যায় এবং তাড়াতাড়ি ফসল কাটা সম্ভব হয়। 
শুষ্ক মৌসুমের (রবি) ফসলের বৈচিত্র্যকরণ : উপকূলীয় অঞ্চলে স্বাদু পানির অভাবে শুষ্ক মৌসুমের (বোরো) ধান চাষ প্রায়শই অসম্ভব হয়ে পড়ে ফলে বিশাল এলাকা পতিত থাকে। সঠিক বপনের সময় নিশ্চিত করে এবং ২-৩টি সেচ প্রদানের মাধ্যমে, ভুট্টা, চীনাবাদাম, সূর্যমুখী, সরিষা এবং মুগের মতো লাভজনক রবি ফসলের সফলভাবে চাষ করা যেতে পারে। এই ফসলগুলো কেবল কৃষকদের আয় বৃদ্ধি করে না বরং শস্যের বৈচিত্র্যকরণে মাধ্যমে একক ফসলের উপর নির্ভরতা হ্রাস করে। 
বসতবাড়িতে চাষাবাদ : মিশ্র কৃষি ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে পরিবারগুলো সারা বছর শাকসবজি, ফলমূল, মাছ এবং  হাঁস-মুরগি উৎপাদন করে পারিবারিক আয় এবং খাদ্যতালিকাগত বৈচিত্র্যকরণ উভয়ই উন্নত করতে পারে। ছোট আকারের বসতবাড়িভিত্তিক যন্ত্রপাতি, যেমন গবাদিপশু ঘাস/খড় কাটার যন্ত্র, ছোট ধান ভাঙ্গানো মিল, ভুট্টা মাড়াই এবং তেল নিষ্কাশন যন্ত্র ইত্যাদি কৃষি উৎপাদনে আরও মূল্য সংযোগ করতে পারে। বসতবাড়ির আশেপাশের পতিত জমি উন্নতজাতের ঘাস চাষ করার জন্য ব্যবহার করা যেতে পারে, অন্যদিকে পুকুরের পাড়গুলোতে লতাজাতীয় শাকসবজির সাথে চালতা, বড়ই এবং সজিনার মতো ফলের গাছ থাকতে পারে। বিশেষ করে নারীরা ছোট আকারের কৃষি-প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং বাজার সংযোগের মাধ্যমে বসতবাড়িতে চাষাবাদ থেকে লাভবান ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন অর্জন করতে পারেন।
জলবায়ু পরিবর্তন সহনশীল জাত এবং উৎপাদন ব্যবস্থা : জলাবদ্ধতা সহনশীল আমন ধান এবং খরা সহনশীল রবি ফসলের মতো জলবায়ু সহনশীল ফসলের জাত গ্রহণ করলে প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও ফলন উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেতে পারে। সর্জান (পর্যায়ক্রমে উঁচু বেড এবং নালা) পদ্ধতির মতো উদ্ভাবনী কৃষি কৌশল জলাবদ্ধ এবং লবণাক্ত অঞ্চলে ফসল এবং মাছের যুগপৎ চাষের মাধ্যমে জমির সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করে। ডিবলিং, শূন্য চাষ এবং মালচিংয়ের মতো জৈব পদ্ধতি মাটির আর্দ্রতা ধরে রাখতে, ক্ষয় কমাতে এবং জৈব পদার্থ উন্নত করতে সহায়তা করে। শুকনো জমিতে সরাসরি বীজ বপনের মাধ্যমে আউশ ধান চাষ পানির চাহিদা এবং শ্রমিক খরচ হ্রাস করে এই বাধা কাটিয়ে উঠতে পারে।
মাটির স্বাস্থ্য এবং উর্বরতা ব্যবস্থাপনা : মাটির উর্বরতা পুনরুদ্ধারের জন্য, জৈব পদার্থের কার্যকর ব্যবস্থাপনা অপরিহার্য। ফসলের বৈচিত্র্যকরণ যেমন মুগ ডালসহ অন্যান্য ডাল জাতীয় ফসল মাটিতে নাইট্রোজেন বৃদ্ধি করে। উপরন্তু, জমিতে ধৈঞ্চা এবং শনপাট সবুজ সার হিসেবে মিশিয়ে মাটির জৈব পদার্থ এবং মাটির গঠন উন্নত করা যায়। কৃষকরা কম্পোস্ট এবং ভার্মিকম্পোস্ট প্রয়োাগ করে জৈব পদার্থের মাত্রা আরও বাড়াতে পারেন।
উপকূলীয় অঞ্চলে যেসব নীতিগত পদক্ষেপের উপর দৃষ্টিপাত করা উচিত 
া কার্যকর পানি ব্যবস্থাপনা বাস্তবায়ন, যেমন নিয়ন্ত্রিত সøুইস গেট, দলভিত্তিক মাঠ কেন্দ্রিক কৌশল, বিদ্যমান খাল মেরামত এবং নতুন খাল খনন এবং বর্ষাকালে বৃষ্টির পানি সংগ্রহ।
া স্বল্প/মাঝারি জীবনকালের আমন ধানের জাত সম্প্রসারণ করা, বন্যা এড়াতে রোপণ সময় সমন্বয় করা এবং সময়মতো রবি ফসল বপন নিশ্চিত করা।
া পতিত জমি হ্রাস করে কৃষকদের আয় বৃদ্ধি করতে ভুট্টা, চীনাবাদাম, মুগ এবং সূর্যমুখীর মতো রবি ফসলের চাষকে উৎসাহিত করা।
খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তায়  জলবায়ু পরিবর্তন সহনশীল ফসলের জাত গ্রহণ, সর্জান পদ্ধতি এবং আর্দ্রতা সংরক্ষণ পদ্ধতির মতো উদ্ভাবনী কৌশল গ্রহণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে সর্জান পদ্ধতি উপকূলীয় অঞ্চলের জন্য উল্লেখযোগ্য সম্ভাবনাময়। উপকূলীয় অঞ্চলে খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা বৃদ্ধির জন্য সরকারের এই আধুনিক স্মার্ট কৃষি নির্ভর উদ্যোগ উৎপাদন ব্যবস্থা ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে।
 
লেখক : ১পোস্ট ডক্টরাল ফেলো, কৃষি ও খাদ্য ব্যবস্থা, ইরি ২কান্ট্রি রিপ্রোজেনন্টেটিভ, ইরি ৩কর্মকর্তা কৃষি গবেষণা ও উন্নয়ন, ইরি, বাংলাদেশ, মোবাইল : ০১৭২৩৯১৬৬৭৪, ই- মেইল :sharif.ahmed@cgiar.org
ফাইল ১

এক্সেসিবিলিটি

স্ক্রিন রিডার ডাউনলোড করুন