কনটেন্টটি শেষ হাল-নাগাদ করা হয়েছে: মঙ্গলবার, ১৪ অক্টোবর, ২০২৫ এ ০৮:৪৫ PM

উত্তম খাদ্যে গড়ব উন্নত আগামী

কন্টেন্ট: কৃষি কথা মাস: কার্ত্তিক সাল: ১৪৩২ প্রকাশের তারিখ: ১৫-১০-২০২৫

উত্তম খাদ্যে গড়ব উন্নত আগামী
প্রফেসর নোমান ফারুক১ সমীরণ বিশ্বাস২
বিশ্ব খাদ্য দিবস প্রতি বছর ১৬ অক্টোবর সারা বিশ্বে পালিত হয়। ১৯৭৯ সালে ঋঅঙ-এর ২০তম সম্মেলনে দিবসটি আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষিত হয়। এর মূল উদ্দেশ্য হলো বিশ্বের মানুষের মধ্যে খাদ্যের গুরুত্ব তুলে ধরা, ক্ষুধা, অপুষ্টি ও খাদ্য নিরাপত্তা বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি করা। বিশ্বে আজও কোটি কোটি মানুষ পর্যাপ্ত ও পুষ্টিকর খাবার পায় না। অন্যদিকে খাদ্যের অপচয়, জলবায়ু পরিবর্তন এবং বৈষম্য সমস্যাকে আরও গভীর করছে। খাদ্য শুধু মৌলিক অধিকার নয়, এটি একটি টেকসই ভবিষ্যতের ভিত্তি। প্রতি বছর দিবসটিতে একটি নির্দিষ্ট প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়। এর মাধ্যমে জলবায়ু পরিবর্তন,          কৃষি প্রযুক্তি, টেকসই কৃষি, গ্রামীণ উন্নয়ন, দারিদ্র্য হ্রাস ও স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস নিয়ে সচেতনতা গড়ে তোলা হয়। বিশ্বের সব দেশে দিবসটি বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে পালিত হয়,          সেমিনার, আলোচনাসভা, প্রদর্শনী, কৃষক সম্মেলন এবং জনসচেতনতামূলক প্রচারণা এর অংশ। ক্ষুধামুক্ত, পুষ্টিসমৃদ্ধ ও টেকসই পৃথিবী গড়তে বিশ্ব খাদ্য দিবস একটি অনুপ্রেরণার উৎস।
আসছে বিশ্ব খাদ্য দিবস। এবারের প্রতিপাদ্য- ‘হাত রেখে হাতে, উত্তম খাদ্য ও উন্নত আগামীর পথে’। এই অঙ্গীকার কেবল একটি ¯েøাগান নয়, এটি পৃথিবীর প্রতিটি মানুষের টিকে থাকার প্রতিজ্ঞা। খাদ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত না করলে সুস্থ জীবন, সুন্দর পৃথিবী কিংবা মানবতার অগ্রযাত্রা সম্ভব নয়। তাই আসুন, আমরা সকলে মিলে উত্তম খাদ্যের চর্চা করি, মানব ও প্রাণিজগতের জন্য গড়ে তুলি নিরাপদ আগামী। 
উত্তম কৃষি চর্চা 
মানবজীবনের অস্তিত্বের মূলভিত্তি খাদ্য, আর সেই খাদ্যের গুণগত মান নির্ধারণ আজকের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। আধুনিক পৃথিবীতে শুধু পেট ভরানোই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন নিরাপদ, পুষ্টিকর এবং গুণগত মানসম্পন্ন খাদ্য। 
বাংলাদেশও উন্নত বিশ্বের সাথে তালমিলিয়ে এগিয়ে এসেছে উত্তম খাদ্য উৎপাদনের পথে। ইতোমধ্যেই সরকার প্রণয়ন করেছে “বাংলাদেশ-এঅচ” (বাংলাদেশ উত্তম কৃষি চর্চা) নীতিমালা, যার মাধ্যমে কৃষিকে শুধু উৎপাদনশীলতার সীমায় নয়, বরং নিরাপত্তা, গুণগত মান, পরিবেশ এবং সামাজিক মূল্যবোধের আলোকে সাজানো হয়েছে। 
এই নীতিমালার চারটি স্তম্ভ। খাদ্য নিরাপত্তা ও উন্নত মান, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, টেকসই পরিবেশ এবং সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা কৃষিকে দিয়েছে নতুন দিগন্ত। একইসাথে মানদÐ নির্ধারণ করা হয়েছে যাতে কৃষকের ঘাম আর শ্রম থেকে উঠে আসা ফল ও সবজি হয় নিরাপদ, গুণগত মানসম্পন্ন, পরিবেশবান্ধব এবং কৃষি শ্রমিকের স্বাস্থ্য ও কল্যাণনির্ভর। এর মধ্য দিয়েই ফুটে ওঠে একটি টেকসই কৃষির স্বপ্ন, যেখানে মানুষের পাশাপাশি প্রকৃতিও সমান মর্যাদায় রক্ষা পায়।
উত্তম খাদ্য উৎপাদন 
সুস্থ ও সুষম জীবনযাপনের জন্য নিরাপদ, পুষ্টিকর এবং পর্যাপ্ত খাদ্যের কোনো বিকল্প নেই। কিন্তু বর্তমান বিশ্বে দ্রæত জনসংখ্যা বৃদ্ধি, জলবায়ু পরিবর্তন, জমির ক্রমহ্রাস, ফসল উৎপাদনে রাসায়নিকের মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহার এবং বাজার ব্যবস্থার অসামঞ্জস্য আমাদের খাদ্য নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলেছে। 
খাদ্য উৎপাদন কেবল কৃষকের একার দায়িত্ব নয়। কৃষক বীজ বপন করেন, জমি প্রস্তুত করেন, শ্রম দেন, কিন্তু সঠিক প্রযুক্তি, আর্থিক সহায়তা, বিপণন ব্যবস্থা ও ন্যায্যমূল্য না পেলে তিনি টেকসই উৎপাদনে আগ্রহ হারান। অপরদিকে, ভোক্তারাও নিরাপদ খাদ্য পেতে চান, যাতে বিষাক্ত কীটনাশক বা ভেজাল না থাকে। উভয়পক্ষকে সংযুক্ত করার জন্য প্রয়োজন সরকার, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, বেসরকারি উদ্যোগ এবং সাধারণ মানুষের সম্মিলিত সহযোগিতা। 
যেমন- প্রথমত, কৃষি ক্ষেত্রে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারকে        উৎসাহিত করতে হবে। ড্রিপ ইরিগেশন, স্মার্ট ফার্মিং, জৈব সার, বায়োপেস্টিসাইড, জলবায়ু সহনশীল জাতের বীজ ইত্যাদি আধুনিক প্রযুক্তি কৃষকপর্যায়ে পৌঁছে দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে সরকার এবং এনজিওদের ভ‚মিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দ্বিতীয়ত, খাদ্য উৎপাদনে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা জরুরি। উৎপাদন থেকে ভোক্তার হাতে পৌঁছানো পর্যন্ত পুরো সাপ্লাই চেইনকে ডিজিটালাইজেশন ও নজরদারির আওতায় আনলে ভেজাল ও অপচয় অনেকাংশে কমে যাবে। তৃতীয়ত, কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে হবে। কৃষি পণ্য বাজারজাতকরণে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য রোধ না করলে কৃষকের প্রাপ্য অংশ সে কখনোই পাবে না। এজন্য সমবায়ভিত্তিক বাজার ব্যবস্থা, কৃষি ব্যাংকের সহজ ঋণ এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের ব্যবহার কৃষকদের আয়ের নিরাপত্তা বাড়াতে পারে। চতুর্থত, ভোক্তাপর্যায়ে সচেতনতা তৈরি করাও সমান জরুরি। নিরাপদ খাদ্যের চাহিদা বাড়লে কৃষকও জৈব ও টেকসই উৎপাদনে আগ্রহী হবেন। পরিবার ও সমাজ যদি একত্রে নিরাপদ খাদ্যের দাবিতে এগিয়ে আসে, তবে কৃষি নীতি ও বাজার ব্যবস্থায় ইতিবাচক পরিবর্তন আসবেই। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, খাদ্য উৎপাদন কেবল অর্থনৈতিক বা প্রযুক্তিগত বিষয় নয়, এটি সামাজিক ও নৈতিক দায়িত্বও বটে। একজন কৃষকের পরিশ্রমকে সম্মান করা,            প্রকৃতিকে রক্ষা করা এবং ভোক্তার স্বাস্থ্যকে অগ্রাধিকার দেওয়া এই তিনটির সমন্বয় ঘটাতে পারলেই বিশ্ব খাদ্য দিবস সফল হবে। 
উন্নত আগামীর পথ  
মানুষের মৌলিক চাহিদার মধ্যে খাদ্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তবে কেবল পেট ভরানোই যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন স্বাস্থ্যকর, নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাদ্য গ্রহণ। উত্তম খাদ্য শুধু ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য রক্ষায় নয়, বরং সমাজ ও রাষ্ট্রের অগ্রগতিতেও বড় ভ‚মিকা রাখে। তাই বলা যায়, “উত্তম খাদ্যই উন্নত আগামীর পথ”।
প্রথমেই আসি ব্যক্তিগত দিক নিয়ে। একজন মানুষ যদি প্রতিদিন প্রয়োজনীয় ভিটামিন, খনিজ, প্রোটিন, কার্বোহাইড্রেট ও চর্বি সমৃদ্ধ খাবার গ্রহণ করেন, তবে তার শরীর শক্তিশালী হবে, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে এবং মানসিক সতেজতাও বজায় থাকবে। অপরদিকে, নি¤œমানের বা ভেজালযুক্ত খাদ্য দীর্ঘমেয়াদে নানা ধরনের অসুখ, যেমন, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, অপুষ্টি কিংবা ক্যানসারের মতো জটিল রোগ সৃষ্টি করতে পারে। তাই সঠিক খাদ্যাভ্যাসই ব্যক্তির কর্মক্ষমতা ও সুস্থ জীবনের ভিত্তি।
সমাজের ক্ষেত্রে উত্তম খাদ্যের গুরুত্ব আরও স্পষ্ট। শিশুদের সঠিক বিকাশের জন্য পুষ্টিকর খাদ্যের বিকল্প নেই। একটি শিশু যদি শৈশবেই পর্যাপ্ত ভিটামিন ও খনিজ না পায়, তবে তার শারীরিক ও মানসিক বৃদ্ধি ব্যাহত হয়। ফলস্বরূপ, ভবিষ্যতে সে কর্মক্ষম নাগরিক হয়ে উঠতে পারে না। তাই শিক্ষা ও স্বাস্থ্যখাতের উন্নয়নের পাশাপাশি খাদ্যের মান নিশ্চিত করাও সমান জরুরি।
অর্থনীতির দিক থেকেও উত্তম খাদ্যের গুরুত্ব অপরিসীম। সুস্থ কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীই একটি দেশের অর্থনীতিকে এগিয়ে নেয়।        কৃষক যদি নিরাপদ ও মানসম্পন্ন খাদ্য উৎপাদনে সচেষ্ট হন এবং জনগণ যদি সচেতনভাবে সেসব গ্রহণ করে, তবে দেশীয় খাদ্যশিল্পও সমৃদ্ধ হবে। এতে আমদানি নির্ভরতা কমে যাবে, রপ্তানি বাড়বে এবং জাতীয় অর্থনীতি আরও শক্তিশালী হবে।
অন্যদিকে খাদ্যে ভেজাল একটি বড় সমস্যা। রাসায়নিক পদার্থ, কৃত্রিম রং ও কীটনাশকের অবাধ ব্যবহার মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য হুমকিস্বরূপ। শুধু ভোক্তাই নয়, উৎপাদক কৃষকরাও এতে ক্ষতিগ্রস্ত হন। তাই খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে সরকার, উৎপাদক ও ভোক্তা তিন পক্ষকেই দায়িত্বশীল হতে হবে।
উত্তম খাদ্য নিশ্চিত করার জন্য কিছু বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, জৈব ও প্রাকৃতিক উপায়ে খাদ্য উৎপাদন বাড়াতে হবে। অর্থাৎ উত্তম কৃষি চর্চার মাধ্যমে কৃষি পণ্য  উৎপাদন নিশ্চিত  করা। দ্বিতীয়ত, খাদ্য সংরক্ষণ ও পরিবহন প্রক্রিয়ায় আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করতে হবে। তৃতীয়ত, জনসচেতনতা বাড়াতে গণমাধ্যম, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও স্বাস্থ্যকর্মীদের একসঙ্গে কাজ করতে হবে। একইসাথে আমাদের খাদ্যাভ্যাসেও পরিবর্তন আনতে হবে। জাঙ্কফুডের প্রতি আসক্তি না বাড়িয়ে দেশীয় শাকসবজি, ফলমূল, মাছ ও দুধকে খাদ্য তালিকায় রাখতে হবে। স্থানীয় খাদ্যের প্রতি আস্থা বৃদ্ধি পেলে কৃষকরাও লাভবান হবেন এবং গ্রামীণ অর্থনীতি শক্তিশালী হবে।
সবশেষে বলা যায়, উত্তম খাদ্য কেবল সুস্থ শরীর গঠনে নয়, বরং একটি উন্নত, সচেতন ও সমৃদ্ধ জাতি গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভ‚মিকা রাখে। বর্তমান প্রজন্ম যদি স্বাস্থ্যকর খাদ্য গ্রহণে মনোযোগী হয়, তবে আগামী প্রজন্ম পাবে একটি সুস্থ ও কর্মক্ষম সমাজ। তাই, আজই আমাদের শপথ নিতে হবে, উত্তম খাদ্যের মাধ্যমে গড়ব উন্নত আগামীর পথ।

লেখক : ১অধ্যাপক, শেরেবাংলা কৃষি বিশ^বিদ্যালয় ও রেজিস্টার্ড ট্রেইনার - গেøাবালগ্যাপ; ২কৃষি ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ, ঢাকা। মোবাইল : ০১৭০০৭২৯৩০২

ফাইল ১

এক্সেসিবিলিটি

স্ক্রিন রিডার ডাউনলোড করুন