উচ্চমূল্যের ফসল চাষ : কৃষিতে সমৃদ্ধির নতুন সম্ভাবনা
মো: ইউসুফ আলী১ তানভীর মাহমুদ২
বাংলাদেশ কৃষিপ্রধান দেশ, যার অর্থনীতির ভিত্তি এবং গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর জীবিকা বহুলাংশে কৃষির ওপর নির্ভরশীল। প্রচলিত কৃষি ব্যবস্থার রূপান্তর আজ সময়ের দাবি। শুধু খাদ্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ থাকাই এখন যথেষ্ট নয়, বরং কৃষিকে একটি লাভজনক, বাণিজ্যিক ও টেকসই খাতে পরিণত করা অপরিহার্য। এই সন্ধিক্ষণে, প্রচলিত ফসলের পাশাপাশি শস্য বহুমুখীকরণের মাধ্যমে ‘উচ্চমূল্যের ফসল’ চাষাবাদ এক অপার সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করতে পারে। ধান বা গমের মতো প্রধান ফসলের উৎপাদন ঠিক রেখে, জমির আইলে, পতিত জমিতে অথবা শস্য আবর্তনের মাধ্যমে এসব ফসলকে অন্তর্ভুক্ত করে কৃষক তার জমির সর্বোচ্চ ব্যবহার এবং আয় বহুগুণে বৃদ্ধি করতে পারে। পাশাপাশি দেশের সামগ্রিক কৃষি অর্থনীতিতে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনার ক্ষমতা রাখে।
উচ্চমূল্যের ফসল
যেসব ফসল প্রচলিত ফসলের তুলনায় একক জমি থেকে অধিক আর্থিক মুনাফা এনে দেয়, যাদের বাজার চাহিদা শহর ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিস্তৃত এবং চাষাবাদের জন্য কিছুটা বিশেষায়িত জ্ঞান বা প্রযুক্তির প্রয়োজন হয়, তাদেরকেই উচ্চমূল্যের ফসল বলা হয়। এই ফসলগুলোর কিছু সাধারণ বৈশিষ্ট্য হলো: প্রচলিত ফসলের চেয়ে কেজিপ্রতি বা একক প্রতি দাম অনেক বেশি; আন্তর্জাতিক বাজারে এদের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে; প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে (যেমন: জ্যাম, জেলি, সস, শুকনো ফল) মূল্য আরও বৃদ্ধি করা যায়। নগরায়ণের ফলে মানুষের খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন হওয়ায় সুপারশপ, হোটেল ও রেস্তোরাঁয় এদের চাহিদা বাড়ছে।
বাংলাদেশের জন্য সম্ভাবনাময় উচ্চমূল্যের ফসল
বাংলাদেশের উর্বর মাটি ও বৈচিত্র্যময় আবহাওয়া বিভিন্ন ধরনের উচ্চমূল্যের ফসল চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। নিচে কয়েকটি সম্ভাবনাময় ফসলের বিস্তারিত বিবরণ তুলে ধরা হলো: প্রচলিত ভুট্টার নতুন রূপ : বেবিকর্ন ও মিষ্টি ভুট্টা। প্রচলিত ভুট্টা মূলত পশুখাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হলেও, এর বিশেষায়িত জাত যেমন বেবিকর্ন এবং মিষ্টি ভুট্টা বিশ্বজুড়ে মানুষের খাদ্যতালিকায় গুরুত্বপূর্ণ স্থান করে নিয়েছে। সঠিক প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এই দুটি ফসল বাংলাদেশের কৃষকদের জন্য অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির নতুন দ্বার উন্মোচন করতে পারে।
বেবিকর্ন
বেবিকর্ন হলো ভুট্টার কচি মোচা, যা পরাগায়ণের আগেই সংগ্রহ করা হয়। এর নরম গঠন এবং মিষ্টি স্বাদের জন্য এটি অত্যন্ত জনপ্রিয়। স্বাভাবিকভাবে বপনের ৯৫-১০০ দিন পর মোচা সংগ্রহ করা যায়। এটি মুলত সবজি হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
প্রক্রিয়াজাতকরণ
বেবিকর্ন যেহেতু খুব দ্রুত নষ্ট হয়ে যায়, তাই ফসল তোলার পর দ্রুত এর প্রক্রিয়াজাতকরণ জরুরি। প্রধান ধাপগুলো নিম্নরূপ:
খোসা ছাড়ানো : মোচা থেকে সাবধানে বাইরের সবুজ খোসা ও ভেতরের সিল্ক বা সুতা সরানো হয়।
বাছাই ও পরিষ্কার : আকার, রঙ এবং গুণমান অনুযায়ী মোচাগুলোকে বাছাই করা হয় এবং পরিষ্কার পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলা হয়।
ব্লাঞ্চিং : ফুটন্ত পানিতে বা স্টিমে ২-৩ মিনিট রেখে দ্রুত ঠা-া পানিতে ডুবিয়ে দেওয়া হয়। এর ফলে বেবিকর্নের রঙ, গঠন এবং পুষ্টিগুণ অটুট থাকে এবং এটি সংরক্ষণের জন্য প্রস্তুত হয়।
সংরক্ষণ :
া ক্যানিং : লবণ বা সাইট্রিক অ্যাসিডের হালকা দ্রবণে (নৎরহব) বেবিকর্ন ডুবিয়ে টিনের কৌটায় সংরক্ষণ করা হয়। এটি সবচেয়ে প্রচলিত বাণিজ্যিক পদ্ধতি।
া ভিনেগারে সংরক্ষণ : ভিনেগার, লবণ এবং মসলার মিশ্রণে ডুবিয়ে আচার বা পিকেলস তৈরি করা হয়।
া হিমায়িতকরণ : হারভেস্ট করার পর মোচাগুলোকে হিমায়িত করে সংরক্ষণ করা যায়, যা এর সতেজ ভাব ধরে রাখে।
বেবিকর্ন দিয়ে তৈরি বিভিন্ন খাবার
বেবিকর্ন এশীয় এবং পশ্চিমা খাবারে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। বিভিন্ন ধরনের স্যুপ ও সালাদে এর ব্যবহার বেশ জনপ্রিয়। উদাহরণস্বরূপ: মিনেস্ট্রোনে স্যুপ, চিকেন ও বেবিকর্ন ক্রিম স্যুপ; থাই স্টাইল বেবিকর্ন সালাদ, গ্রিলড ভেজিটেবল সালাদ; চাইনিজ বা থাই রান্নায় সবজি ও মাংসের সাথে স্টার-ফ্রাই করে পরিবেশন করা হয়, যেমন- বেবিকর্ন মাঞ্চুরিয়ান, চিলি বেবিকর্ন; থাই গ্রিন কারি বা ভারতীয় বিভিন্ন তরকারিতে এটি ব্যবহৃত হয়; বেসনে ডুবিয়ে ভেজে ক্রিসপি বেবিকর্ন বা বেবিকর্ন পকোড়া তৈরি করা হয়। এছাড়া পিজা টপিং হিসেবে এর ব্যবহার বাড়ছে।
বাংলাদেশ প্রেক্ষাপট : বাংলাদেশে বেবিকর্নের চাষাবাদ এখনো সীমিত পরিসরে রয়েছে। তবে স্বল্পমেয়াদী ফসল হওয়ায় এবং এর সবুজ গাছ গো-খাদ্য হিসেবে ব্যবহারযোগ্য হওয়ায় কৃষকদের জন্য এটি অত্যন্ত লাভজনক হতে পারে।
মিষ্টি ভুট্টা
এটি ভুট্টার একটি বিশেষ জাত যা দানায় চিনির পরিমাণ বেশি থাকায় কাঁচা বা রান্না উভয় অবস্থাতেই খেতে মিষ্টি লাগে। সাধারণ ভুট্টার তুলনায় এর দানা বেশ নরম ও রসালো হয়। এর পুষ্টিগুণ ও স্বাদের জন্য বিশ্বজুড়ে এটি অত্যন্ত জনপ্রিয়।
প্রক্রিয়াজাতকরণ ও সংরক্ষণ
মিষ্টি ভুট্টার প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো এর মিষ্টতা ধরে রাখা। ফসল তোলার পর এর চিনি দ্রুত শ্বেতসারে পরিণত হতে শুরু করে, ফলে এর স্বাদ নষ্ট হয়ে যায়। এ কারণে এর জন্য কোল্ড চেইন বা শীতলীকরণ ব্যবস্থা অপরিহার্য। ফসল তোলার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই এর তাপমাত্রা কমিয়ে আনতে হয়। এর জন্য বরফ-ঠা-া পানিতে ডুবানো বা শীতল বাতাস ব্যবহার করা হয়। এছাড়া কোল্ড চেইন ব্যবস্থাপনা অনুসরণ করে। শীতলীকরণের পর থেকে ভোক্তা পর্যন্ত পৌঁছানোর সকল ধাপে (পরিবহন, গুদামজাতকরণ, বিপণন) নির্দিষ্ট তাপমাত্রা (সাধারণত ০-২ ডিগ্রি সেলসিয়াস) বজায় রাখা হয়।
শিল্প প্রক্রিয়াজাতকরণ
হিমায়িতকরণ : ভুট্টার দানা ছাড়িয়ে দ্রুত হিমায়িত করা হয়। এটি এর মিষ্টতা ও পুষ্টিগুণ সবচেয়ে ভালোভাবে ধরে রাখে।
ক্যানিং : দানাকে কৌটায় ভরে লবণ ও চিনির হালকা দ্রবণে সংরক্ষণ করা হয়। এটি বিশ্বজুড়ে অত্যন্ত জনপ্রিয়।
ভ্যাকুয়াম প্যাকিং : রান্না করা বা অর্ধেক সেদ্ধ করা ভুট্টার মোচা বায়ুরোধী প্যাকেটে ভরে বাজারজাত করা হয়।
মিষ্টি ভুট্টার ব্যবহার অত্যন্ত বৈচিত্র্যময় : এটি সেদ্ধ করে বা কয়লার আগুনে পুড়িয়ে খাওয়া বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয়। এছাড়া কর্ন স্যুপ একটি বহুল প্রচলিত খাবার। উদাহরণস্বরূপ: ক্লাসিক সুইট কর্ন ক্রিম স্যুপ, চিকেন ও সুইট কর্ন স্যুপ; বিভিন্ন সালাদে এর ব্যবহার সতেজতা ও মিষ্টি স্বাদ যোগ করে। উদাহরণস্বরূপ: সুইট কর্ন ও বেল পেপার সালাদ, গ্রিলড ভেজিটেবল ও সুইট কর্ন সালাদ; সাইড ডিশ হিসেবে মাখন দিয়ে রান্না করে মাংস বা অন্যান্য প্রধান খাবারের সাথে পরিবেশন করা হয়; কর্ন ব্রেড, মাফিন, পনিরের সাথে মিশিয়ে কর্ন চিজ বল বা প্যাটিস তৈরি করা হয়; পিজা, স্যান্ডউইচ এবং বিভিন্ন ফাস্ট ফুডে এর ব্যবহার বাড়ছে।
চ্যালেঞ্জ ও উত্তরণের কৌশলগত পথ
বাজারজাতকরণ ও সরবরাহ শৃঙ্খল : প্রধান চ্যালেঞ্জ, মোকাবেলায় সংগ্রহ ও শীতলীকরণ কেন্দ্র স্থাপন, রেফ্রিজারেটেড পরিবহন এবং কৃষক সমবায় গঠন জরুরি। এছাড়া আধুনিক চাষাবাদ পদ্ধতি বিষয়ে কৃষকদের হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের ব্যবহার বাড়াতে হবে। গবেষণা প্রতিষ্ঠানকে দেশের আবহাওয়া উপযোগী নতুন জাত উদ্ভাবন করতে হবে এবং মানসম্মত বীজ সহজলভ্য করতে হবে। ক্ষুদ্র কৃষকদের জন্য সহজ শর্তে ও স্বল্প সুদে বিশেষায়িত কৃষি ঋণের ব্যবস্থা করতে হবে।
লাভ-ব্যয় অনুপাত দ্বারা বোঝায়, কোনো নির্দিষ্ট ফসল উৎপাদনে প্রতি ১ টাকা খরচ বা বিনিয়োগের বিপরীতে মোট কত টাকা আয় হয়। উদাহরণস্বরূপ, মিষ্টি ভুট্টার ইঈজ ২.৮:১ হওয়ার অর্থ হলো, মিষ্টি ভুট্টা চাষে প্রতি ১ টাকা খরচ করলে মোট ২.৮০ টাকা আয় হয়, যেখানে নিট লাভ হলো (২.৮০ - ১.০০) = ১.৮০ টাকা।
বাংলাদেশের কৃষি এখন একটি রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। কৃষিকে একটি লাভজনক, সম্মানজনক ও বাণিজ্যিক পেশায় পরিণত করার সময় এসেছে। উচ্চমূল্যের ফসল সেই লক্ষ্য অর্জনের পথে একটি শক্তিশালী হাতিয়ার। সঠিক পরিকল্পনা, সমন্বিত উদ্যোগ, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং কৃষকদের কঠোর পরিশ্রমে ভর করে এই অপার সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দেওয়া সম্ভব, যা বাংলাদেশের কৃষি অর্থনীতিতে এক নতুন ও সমৃদ্ধ দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে।
লেখক : ১বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ((ভুট্টা প্রজনন), ২বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, বাংলাদেশ গম ও ভুট্টা গবেষণা ইনস্টিটিউট, নশিপুর, দিনাজপুর, মোবাইল : ০১৭৭০২৭৬১৬৩, মোবাইল : ০১৭২৩৮২৫৮১৪, ই-মেইল :tanvirbwmri@gmail.com