কনটেন্টটি শেষ হাল-নাগাদ করা হয়েছে: বুধবার, ১৯ মার্চ, ২০২৫ এ ০৫:২১ PM
কন্টেন্ট: কৃষি কথা মাস: চৈত্র সাল: ১৪৩১ প্রকাশের তারিখ: ১৯-০৩-২০২৫
আর্থিক সচ্ছলতা নয় বরং কৃষি ও কৃষকের সেবাই আমিনুলের সফলতা
কৃষিবিদ মোছা: ফরিদা ইয়াছমিন১ ডা: কারি মো: রমজান আলী২
‘ভোর না হতেই লাঙ্গল কাঁধে, মাঠ পানে কে যায়?
সে আমাদের গাঁয়ের কৃষক বাস আমাদের গায়।’
কৃষির নিয়ন্ত্রক হচ্ছে কৃষক। বাংলাদেশের প্রতিটি গ্রামে এমনই কৃষকের বাস। ১৯৭৯ সাল। দিনাজপুর সদর উপজেলার সুন্দরবন গ্রামের কৃষক আজিজুল ইসলাম ও নুর নেহার বেগমের ঘর আলো করে আসে আমিনুল ইসলাম। একাধারে কৃষি, প্রাণিসম্পদ ও মৎস্য সম্পদ এর সার্বিক উন্নয়নে পরিবেশবান্ধব জৈব প্রযুক্তির ব্যবহার, রোগবালাই ও পোকামাকড় দমনে ভেষজ উপাদানে প্রাথমিক চিকিৎসা প্রদান এবং প্রসারে অসামান্য ভূমিকা রেখে আসছেন এই কৃষি প্রেমী। আর্থিক সচ্ছলতার চেয়ে কৃষির সার্বিক উন্নয়ন ও সম্প্রসারণে কৃষি ও কৃষকের সেবাই তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ, অদম্য সাধনায় হয়ে উঠেন ‘দক্ষ কৃষি ডাক্তার’। কৃষি অনুরাগী সেই আমিনুলের নাম আজ সবার মুখে মুখে। কৃষি সেবক আমিনুলের কৃষি ডাক্তার হয়ে ওঠার এই গল্প অনেককেই কৃষিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে অনুপ্রেরণা জোগাবে।
আমিনুলের জরাজীর্ণ সেই পৈতৃক ভিটা আজ পাকা বাড়িতে উন্নত। গোয়ালের শোভা বাড়াচ্ছে গোটা ছয়েক গরু। বাড়ির উঠানে ছাগল ও হাঁস-মুরগির বিচরণ। বাড়ির পাশেই রয়েছে মাছে ভরা পুকুর। এরই মাঝে নিজ লাইব্রেরিতে শিম, বরবটির ভাইরাস রোগের চিকিৎসা প্রদানকালে দেখা মিলে আমিনুলের, কথা হয় তার সাথে।
কৃষির প্রতি আগ্রহ শুরু হওয়ার পেছনের গল্প বলতে গিয়ে আমিনুল জানান, শৈশবে বাবার হাত ধরেই কৃষিতে আমার হাতেখড়ি। পড়াশোনা করার ইচ্ছে থাকলেও ছিল না সামর্থ্য। এটা ১৯৯৫ সালের কথা, নবম শ্রেণিতে পড়ালেখার পাট চুকিয়ে সংসারের প্রয়োজনে কাজ নেই রাসায়নিক সার ও বালাইনাশক এর দোকানে, সম্মুখীন হই নতুন নতুন অভিজ্ঞতার। এ সময় আমার কাছে কৃষকরা ফসলের রোগবালাই, পোকামাকড় সম্পর্কিত বিভিন্ন ধরনের সমস্যা নিয়ে আসত। কিন্তু এসব সমস্যা সমাধানের জ্ঞান না থাকায় আমি তখন বিভিন্ন বালাইনাশক কোম্পানির অফিসারদের সাথে কথা বলে কৃষকদরকে পরামর্শ দেওয়ার চেষ্টা করি তবে তা যথার্থ ছিল না। আর সেই ব্যর্থতা থেকেই কৃষির প্রতি আমার ভালোলাগা আর কৃষি সমস্যা সমাধানের আগ্রহ তৈরি হয় ।
কৃষিতে দক্ষতা অর্জনের কথা উল্লেখ করে আমিনুল বলেন, ১৯৯৯ সাল থেকে এ পর্যন্ত বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে সমন্বিত কৃষির উপর বিভিন্ন মেয়াদি ভিন্ন ভিন্ন বিষয়ে প্রায় শতাধিক প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছেন তিনি। তিনি প্রথমে ‘মেসার্স কৃষি রকমারি বিতান এন্ড সীড ফার্ম’ এবং পরে ‘লাইভস্টক অ্যান্ড ফিসারিজ মেডিসিন শপ’ নামে প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। তিনি জ্ঞান অর্জনের লক্ষ্যে নিজ আগ্রহে গড়ে তুলেছেন কৃষি বিষয়ক লাইব্র্রেরি, তার সংগ্রহে রয়েছে প্রায় হাজারেরও বেশি দেশী-বিদেশী কৃষি, প্রাণী ও মৎস্য বিষয়ক বই, আর্টিকেল, ভিডিও ডকুমেন্টারি প্রভৃৃতি। জ্ঞানের নেশায় তিনি পারি জমান দেশের বিভিন্ন জেলা উপজেলাসহ বিদেশেও। বিভিন্ন সময়ে ভারত, নেপাল ভ্রমণকালে তিনি বিভিন্ন ধরনের স্থানীয় কৃষি বিষয়ক প্রযুক্তি, তথ্য সংগ্রহ করে নিয়ে আসতেন এবং সেগুলো বিশেষজ্ঞদের সাথে পরামর্শ করে নিজ খামারে প্রয়োগ করতেন, এতে তিনি ভালো ফলাফল পেতেন। তারই ধারাবাহিকতায় তিনি ২০১৪ সালে তার বসতবাড়ি সংলগ্ন স্থানে একটি “সমন্বিত কৃষি ক্লিনিক” স্থাপন করেন। এখানে নানা রোগবালাই ও পোকামাকড় সনাক্ত করে ব্যবস্থাপত্রের মাধ্যমে রোগ দমনের রাসায়নিক ও ভেষজ চিকিৎসা এবং উপযুক্ত টেকনোলজি (গরম পানিতে বীজ শোধন যন্ত্র, রসুনের ট্যাবলেট, এলামান্ডা ট্যাবলেট, ট্রাইকো-সাসপেনশন, আইপিএম বায়োপেস্টিসাইড) কৃষকদের মাঝে প্রেসক্রিপসন করে আসছেন তিনি। এ ছাড়াও তিনি কৃষকদের ফসল, প্রাণী, মৎস্য চাষের আধুনিক প্রযুক্তি, মাটি ও পানি পরীক্ষা, জৈবিক প্রযুক্তি (ঘনজীব আমরুত, ঘনবীজ আমরুত, ভার্মি কম্পোস্ট, ট্রাইকো কম্পোস্ট) প্রভৃতি বিষয়ে পরামর্শ প্রদান করেন। অবশেষে আমিনুল ২০১৭ সালে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০ জন প্রফেসর এবং ৩০ জন মাস্টার্স এ অধ্যায়নরত শিক্ষার্থীর উপস্থিতিতে বিভিন্ন ফসলের বালাই নির্ণয়, মাঠ পর্যায়ে সরেজমিন আগাছা, পোকামাকড়, রোগবালাই ও পুষ্টিগত সমস্যা শনাক্তকরণ এবং আইপিএম ও রাসায়নিক ব্যবস্থাপনার উপর তিন দিনব্যাপী সাক্ষাৎকার ও নিবিড় পর্যবেক্ষণের পর “দক্ষ কৃষি ডাক্তার” হিসেবে স্বীকৃতি অর্জন করেন। এরপর থেকে তিনি প্রাণী, মৎস্য ও কৃষি বিষয়ক সমস্যার সম্ভাব্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের সাথে মোবাইলে ও ইন্টারনেটের মাধ্যমে নিয়মিত পরামর্শ গ্রহণ করেন এবং জটিল ও কঠিন সমস্যা সমাধানের জন্য প্রয়োজনে সরেজমিনে তাদের নিয়ে এসে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করেন। এছাড়া তিনি কৃষি সম্পর্কিত বিভিন্ন “এ্যাপস” অনুসরণ করে কৃষকদের সমন্বিত কৃষিতে সেবা প্রদান করছেন। তার নিকট ফসলের উৎপাদন প্রযুক্তি বিষয়ে আধুনিক পরামর্শ ও চিকিৎসা সেবা গ্রহণ করে হাজার হাজার কৃষক এবং খামারি উপকৃত হচ্ছেন।
আমিনুল তার অভিজ্ঞতার আলোকে বলেন, রাসায়নিক ব্যবস্থাপনায় উৎপাদনের তুলনায় প্রাকৃতিক ব্যবস্থাপনায় উৎপাদনের ক্ষেত্রে সমস্যা অনেক কম। তিনি ২০২৩ সালে নিরাপদ ও পুষ্টিযুক্ত খাদ্য চর্চার জন্য বাংলাদেশ উত্তম কৃষিচর্চা খামার ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্র নামে একটি খামার ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্র (বিজিএএসএফ) স্থাপন করেন। সেখানে তিনি গুড এগ্রিকালচার প্রাক্টিস্টশনার হিসাবে নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনের জন্য চর্চা শুরু করেন ও আশেপাশের কৃষকদেরকে উৎসাহিত করেন এবং স্বেচ্ছায় আগ্রহীদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেন। বর্তমানে তিনি অত্র এলাকার ও তার প্রতিষ্ঠানে পরিবেশ বান্ধব ফসল চাষাবাদ ও প্রাণী, মৎস্য খামার সম্প্রসারণের জন্য ‘দক্ষ প্রশিক্ষক ও উত্তম কৃষিচর্চার সমন্বয়ক এর দায়িত্ব পালন করছেন। আগে রাসায়নিক সার ব্যবহার করে চাষাবাদ করলেও তাকে দেখে অনুপ্রাাণিত হয়ে এবং তার পরামর্শে ইতোমধ্যে উপজেলার অনেক কৃষক এখন চাষাবাদ করছেন জৈব পদ্ধতিতে। তাই স¦প্রণোদিতভাবে এই জৈব পদ্ধতিতে চাষাবাদে উদ্বুদ্ধ হয়ে জৈব কৃষির প্রসারে সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন আমিনুল।
বছরে আয়ের পরিমাণ জানতে চাইলে আমিনুল বলেন, আমি ব্যবসাকে কেবলমাত্র আমার জীবিকা হিসাবে বেছে নিয়েছি। কৃষি আর কৃষকের সেবা করাই আমার মূল লক্ষ্য। আমার সময়ে কালের ব্যবসায়ী এমনকি আমার সহকারীরাও আজ ব্যবসা করে আর্থিক সফলতার দিক দিয়ে আমাকে ছাড়িয়ে গিয়েছে কিন্তু আমি সবসময় সেবাকে প্রাধান্য দিয়েছি। এতে আমি সুধীজনদের কাছে, আমার এলাকাবাসীর কাছে যে সম্মান আর ভালোবাসা পেয়েছি তাই আমার কাছে সবচেয়ে বড় পাওয়া। তিনি আরও বলেন, এক সময় আমার কিছুই ছিলনা, এখন আমি চারটা প্রতিষ্ঠান দিয়েছি। এই প্রতিষ্ঠানগুলোতে ৮-১০ জন কর্মচারী সার্বক্ষনিক শ্রম দেয়। আমার প্রতিষ্ঠানে উৎপাদিত ‘মাটির জীবন (ভার্মি ও ট্রাইকোডার্ম সমৃদ্ধ কম্পোষ্ট)’ নামক জৈবসার এলাকায় এবং এলাকার বাহিরে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। আমার খামারে উৎপাদিত বিষমুক্ত সবজি বা ফসলাদি এলাকার চাহিদা মিটিয়ে এলাকার বাহিরেও সরবরাহ করছি। আমার ছেলে গবাদিপশুর উপর ডিপ্লোমা করে কলকাতার একটি দুই বছর মেয়াদি কোর্স সম্পূর্ণ করে এখন আমার সাথেই কৃষকদের পাশে থাকার চেষ্টা করছে। মেয়েকে বিয়ে দিয়েছি। মেয়ে জামাইও কৃষি কর্মকা-ের সাথে জড়িত। এখন আমার মনে হয় আমার মতো সুখী আর সফল মানুষ খুবই কম আছে।
সেই অতীতের মতো আজও বাংলাদেশ মানে কৃষকের দেশ। আপন সুখ-শান্তি ও নির্মোহভাবে বিসর্জন দিয়ে কৃষকের স্বার্থে প্রতিদানহীন, নীরব নিঃস্বার্থ ভূমিকায় অবতীর্ণ আমিনুল ইসলাম। প্রান্তিক পর্যায়ের কৃষকদেরকে উৎসাহিত করার মাধ্যমে পরিবেশবান্ধব চিন্তাকে জাগ্রত করার জন্য টেকসই সমন্বিত কৃষির উন্নয়নে তার এই মহতি উদ্যোগ সত্যিই প্রশংসার দাবি রাখে। তার সৃজনশীলতা অব্যাহত রাখতে এবং উৎসাহ জোগাতে রাষ্ট্রীয়ভাবে পুরস্কৃত ও সম্মানিত করা সময়ের দাবি বলে আমি মনে করি।
লেখক : ১আঞ্চলিক কৃষি তথ্য অফিসার, কৃষি তথ্য সার্ভিস, খামারবাড়ি, ঢাকা; ২সহকারী কৃষি সম্প্রসারণ অফিসার (অব:), কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, দিনাজপুর সদর, দিনাজপুর। মোবাইল: ০১৭৬২৩৪৮৫২৭