কনটেন্টটি শেষ হাল-নাগাদ করা হয়েছে: সোমবার, ১৯ অক্টোবর, ২০২০ এ ১০:০২ AM

আমাদের কর্মই আমাদের ভবিষ্যৎ

কন্টেন্ট: কৃষি কথা মাস: কার্ত্তিক সাল: ১৪২৭ প্রকাশের তারিখ: ০৪-১০-২০২০

ড. মোঃ নাজিরুল ইসলাম১ ড. মোঃ ওমর আলী২

বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট-এর জন্মলগ্ন থেকেই এদেশের আবহাওয়া উপযোগী এবং কৃষকের আর্থসামাজিক অবস্থার সাথে সংগতিপূর্ণ প্রযুক্তি উদ্ভাবনের মাধ্যমে জাতীয় কৃষি উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করে আসছে। শরীর সুস্থ রাখতে হলে সুষম খাদ্যের যোগান অত্যাবশ্যক। একটি বহু ফসল ভিত্তিক গবেষণা- প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিএআরআই ২১১টি ফসল নিয়ে গবেষণা করে এ পর্যন্ত বিভিন্ন ফসলের ৫৭৯টি উচ্চফলনশীল আধুনিক জাত এবং ৫৫১টি বিভিন্ন প্রযুক্তিসহ মোট ১১৩০টিরও অধিক প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছে। আর আমাদের কর্মই আমাদের ভবিষ্যৎ যা আমাদের  জীবন যাত্রার মান উন্নয়নে এক অনন্য ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে। বিএআরআই সেই সুষম ও নিরাপদ খাদ্যের যোগান দিতেই এই প্রতিপাদ্যকে পরিপূর্ণ রূপ দিতে বিএআরআই নিবিড় গবেষণার মাধ্যমে যে সাফল্য লাভ করেছে এবং যে সমস্ত প্রযুক্তি উদ্ভাবন করে চলেছে তার উল্লেখযোগ্য কিছুকার্যক্রম উপস্থাপন করা হলো।
কন্দাল ফসল
বিএআরআই-এর কন্দাল ফসল গবেষণা কেন্দ্র থেকে আজ পর্যন্ত উদ্ভাবিত আলুর ৯১টি উচ্চফলনশীল জাত অনুমোদন লাভ করেছে। এছাড়া বারি টিপিএস-১ এবং বারি টিপিএস-২ নামে ২টি হাইব্রিড আলুর জাত প্রকৃত আলুবীজ থেকে উদ্ভাবন করা হয়েছে। মিষ্টি আলুর ১৬টি, পানি কচুর ৬টি, মুখীকচুর ২টি জাত উদ্ভাবন করা হয়েছে এবং এ জাতগুলোর অধিকাংশই পুষ্টি সমৃদ্ধ এবং অধিক উৎপাদনশীল।
ডাল
ডাল বাংলাদেশের ফসল ধারায় প্রকৃতির দান এক অনন্য নিয়ামক, যা শুধু ডালই উৎপাদন করে পুষ্টি চাহিদা পূরণ করে না অধিকন্তু, মাটির ঊর্বরতা বৃদ্ধি করে এক পরিবেশবান্ধব কৃষি উপহার দেয়। ডালে জাতভেদে বিদ্যমান আমিষ      (২০-২৮%) এবং পর্যাপ্ত অ্যামাইনো এসিডসহ নানাবিধ পুষ্টি উপাদানের কারণেই আমাদের দৈনন্দিন খাদ্য সংস্কৃতিতে ডাল এক গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। ডালে বিদ্যমান আমিষের পরিমাণ গমের চেয়ে দ্বিগুণ এবং ভাতের চেয়ে তিন গুণ বেশি। ডালের পুষ্টিসহজেই হজমযোগ্য। এজন্য ডালকে গরিবের মাংস বলা হয়। বর্তমানে করোনা মহামারীর সময়ে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি করোনা ভাইরাসসহ নানাবিধ সংক্রামক রোগের বিরুদ্ধে শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে তুলতে ডালের রয়েছে অনন্য ভূমিকা। তবে প্রয়োজন অনুযায়ী ডালের উৎপাদন বৃদ্ধি। লক্ষ্যেই  বিএআরআই-এর ডাল গবেষণা কেন্দ্র ডালের ৪৩টি উন্নতজাত ও সংশ্লিষ্ট উৎপাদন প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছে। এখানে উল্লেখ্য যে, আমরা যদি প্রতিদিন পুষ্টি সমৃদ্ধ ডাল বিশেষ করে আয়রন, জিংক ও সেলেনিয়াম সমৃদ্ধ মসুর ডাল খাই তাহলে আলাদা করে আয়রন ও জিংক ট্যাবলেট খাওয়া প্রয়োজন হবে না।
তেলবীজ
বাংলাদেশের কৃষিতে বিভিন্ন প্রকারের তেলবীজ ফসলের মধ্যে সরিষা এদেশে প্রধান যা তেল ফসলের আবাদি এলাকার শতকরা প্রায় ৬০ ভাগ জমিতে চাষ করা হয়। তেলবীজ গবেষণা কেন্দ্র এ পর্যন্ত সরিষা, তিল, চীনাবাদাম, সয়াবিন, সূর্যমুখী, তিসি ইত্যাদি বিভিন্ন তেল ফসলের মোট ৪৩টি জাতসহ বেশ কিছু অন্যান্য উৎপাদন প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছে। উদ্ভাবিত জাতের উৎপাদন ক্ষমতা আগের প্রচলিত জাতসমূহের চেয়ে অনেক বেশি। সরিষার উদ্ভাবিত জাতগুলোর মধ্যে বারি সরিষা-১৪, বারি সরিষা-১৭ জাতটির ফলন ক্ষমতা প্রচলিত জাত টরি-৭ এর চেয়ে শতকরা ১৫-২০ ভাগ বেশি। এ জাতটি স্বল্পমেয়াদি (৮০-৮৫ দিনে পাকে) বিধায় রোপা আমন ও বোরো ধান চাষের মধ্যবর্তী সময় আবাদ করা সম্ভব। বারি সরিষা-১৮ খুবই উচ্চফলনশীল। তেলের এ সমস্তজাতসমূহ আমাদের দৈনন্দিন জীবনে তেলের চাহিদা পূরণপূর্বক পুষ্টি চাহিদা মেটাতে সক্ষম হচ্ছে।
সবজি
সুস্থ সবল জীবনের জন্য প্রতিদিন পরিমিত পরিমাণ বিভিন্ন ধরনের সবজি খাওয়া অপরিহার্য। কারণ জীবনধারণের জন্য অত্যাবশ্যক ভিটামিন ও খনিজের অন্যতম উৎস হল সবজি। বাংলাদেশে বর্তমানে দৈনিক মাথাপিছু সবজি গ্রহণের পরিমাণ প্রায় ৭০ গ্রাম (বিবিএস ২০১৮) যা অনুমোদিত মাত্রার চেয়ে প্রায় সাড়ে তিন ভাগের ১ ভাগ। পুষ্টিবিদগণ দৈনিক মাথাপিছু ২২০ গ্রাম সবজি খাওয়ার পরামর্শ দেন। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট সবজির চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে এ পর্যন্ত মোট ৩৫টি সবজির ১৩২টি উন্নত জাতসহ (ওপি-১০৫, হাইব্রিড-২৩ ও বিটি-৪) উন্নত উৎপাদন প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছে। গ্রীষ্ম মৌসুমে সবজির আবাদ এবং বীজ উৎপাদনের প্রযুক্তিও উদ্ভাবিত হয়েছে। এসব উন্নত সবজির জাত ও প্রযুক্তি দেশে সবজির চাহিদা পূরণে ব্যাপক ভূমিকা রাখছে এবং ভবিষ্যতেও রাখবে একথা নিশ্চিত করে বলা যায়।
বসতবাড়ির আঙ্গিনায় সবজিচাষ
বাংলাদেশের কৃষিতে বসতবাড়ির আঙ্গিনায় সবজি চাষ উৎপাদন পদ্ধতি একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। এদেশে মোট কৃষি পরিবারভুক্ত বসতবাড়ির সংখ্যা ১ কোটি ৩৫ লক্ষ ১২ হাজার ৫৮০ লাখ, যার গড় আয়তন ৩৫০ বর্গ মিটার। পরিকল্পিত নিবিড় চাষ প্রবর্তনের মাধ্যমে বাড়ির আঙ্গিনায় সবজি উৎপাদন বহুলাংশে বৃদ্ধি করা যেতে পারে। অধিক সবজি উৎপাদনের উদ্দেশ্যে বিএআরআই এর সরেজমিন গবেষণা বিভাগ বিভিন্ন অঞ্চলের জন্য সবজি চাষের ৯টি মডেল উদ্ভাবন করেছেন। এ প্রযুক্তির ব্যাপক ব্যবহারের মাধ্যমে দেশের প্রকট পুষ্টি সমস্যার সমাধান এবং পুষ্টি সমস্যাজনিত রোগ-বালাই থেকে নিষ্কৃতি পাওয়া অতিসহজে সম্ভব।  বর্তমানে সরকার এ কার্যক্রমকে আরো গতিশীল করতে ‘আমার বাড়ী আমার খামার’ শিরোনামে প্রকল্প গ্রহণ করেছেন, যা এ দেশের মানুষের পুষ্টি চাহিদা মিটিয়ে সুস্থ শরীর গঠনে সহায়ক ভূমিকা রাখবে।
ফুল ও ফল
মানুষের পেটের ক্ষুধানিবারণের পাশাপাশি মনের ক্ষুধানিবারণ একটি বড় বিষয়। আর ফুলও তেমনই একটি মাধ্যম, যা মনের ক্ষুধানিবারণ করে। আর সেই বিষয়টি মাথায় রেখেই সাম্প্রতিককালে বিএআরআই ফুল বিভাগ ১২টি ফুলের ২১টি জাত উদ্ভাবন করেছেন। আশা করা হচ্ছে বাংলাদেশ আগামীতে ফুল রপ্তানি করে উল্লেখযোগ্য হারে বৈদেশিক মুদ্রা আয় করতে সক্ষম হবে।
মানুষের দৈনন্দিন খাদ্য তালিকায় ফল একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। পুষ্টি বিজ্ঞানীদের মতে একজন মানুষের দৈনিক ২০০ গ্রাম ফল খাওয়া প্রয়োজন কিন্তু আমরা খাই মাত্র ৮২ গ্রাম। ফল ওষধি গুণাগুণে সমৃদ্ধ বিধায় একে ’রোগ প্রতিরোধী খাদ্যও’ বলা হয়। এসমস্ত বিষয়ের প্রতি খেয়াল রেখেই ফল বিভাগ, উদ্যানতত্ত¡ গবেষণা কেন্দ্র, বিএআরআই ৩৫ প্রজাতির ফলের ৮৬টি জাত উদ্ভাবন করেছে, যার অধিকাংশই মাঠ পর্যায়ের ফলের উৎপাদন বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। নিয়মিত ও পরিমিত পরিমাণে এ সকল ফল গ্রহণে দেহের ভাইরাস যেমন কোভিড-১৯ সহঅন্যান্য রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে, যা সুস্থ সবল ও মেধাবী জাতি বিনির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে।
মসলা
মসলা গবেষণা কেন্দ্র গবেষণার মাধ্যমে বিভিন্ন মসলার মোট ৪৪টি জাতও উৎপাদন প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছে। উল্লেখ্য যে, মসলা শুধু খাবারের স¦াদ বৃদ্ধিতেই নয়, সুস্থতার জন্য ও জরুরী।
বালাই ব্যবস্থাপনা
শস্য উৎপাদনে বিএআরআই প্রায় ২১১টির মতো ফসলকে রোগ এবং পোকামাকড় মুক্ত রাখার জন্য গবেষণার কাজ পরিচালনা করে আসছে। বাংলাদেশে বিভিন্ন ফসলের প্রায় ১০০০টি রোগ আজ পর্যন্ত শনাক্ত করা হয়েছে। এ দেশে ধানসহ অন্যান্য ফসলে ৭০০-এর বেশি পোকামাকড় শনাক্ত করা হয়েছে। সমনি¦তবালাই ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনে বিএআরআই কাজ করে চলেছে।
কৃষি যন্ত্রপাতি
কৃষি যান্ত্রিকীকরণের ফলে কৃষি উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন সাধিত হয়েছে যান্ত্রিক চাষাবাদ প্রচলনের ফলে অল্পসময়ে জমি চাষ করে সময়মতো পরবর্তী ফসল বপন করা সম্ভব হয়েছে। ফলশ্রæতিতে, মোট উৎপাদন বৃদ্ধি পাচ্ছে পাশাপাশি পুষ্টির প্রাপ্যতাও বাড়ছে।
সেচ ও পানি ব্যবস্থাপনা
বর্তমানে মোট আবাদযোগ্য জমির ৭০ শতাংশ সেচের  আওতাধীন রয়েছে। সেচ দক্ষতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে বাংলাদশে কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের সেচ ও পানি ব্যবস্থাপনা বিভাগ সেচসম্পর্কিত বেশ  কিছু তথ্য গবেষণার মাধ্যমে উদ্ভাবন করতে সক্ষম হয়েছে।
খামার পদ্ধতি গবেষণা
দেশের বিভিন্ন কৃষি পরিবেশ অঞ্চলে মোট ৯টি খামার পদ্ধতি গবেষণা এবং ৭২টি বহুস্থানিক গবেষণা এলাকা আছে। খামার পদ্ধতি গবেষণার মাধ্যমে কৃষি পরিবেশ অঞ্চলের ভিত্তিতে উন্নত শস্যবিন্যাস, শস্যভিত্তিক সার ব্যবস্থাপনা এবং স্থানীয় সমস্যার ভিত্তিতে প্রযুক্তি উদ্ভাবন করা হয়।
জৈব প্রযুক্তি
জৈব প্রযুক্তি বর্তমান সময়ে ফসলের জাত উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। উন্নতবিশে^ এর মাধ্যমে জিন প্রতিস্থাপন করে উন্নত উচ্চফলনশীল জাত, রোগমুক্ত ও পোকামাকড়রোধী জাত উদ্ভাবন করা যায়। এ পদ্ধতিতে জীব বৈচিত্র্যের মলিকুলার চরিত্রায়ন করা হয়ে থাকে, যা নতুন জাত উন্নয়নে প্রধান ভূমিকা পালন করে। তাছাড়া অল্পসময়ে অধিক পরিমাণে রোগমুক্ত চারা উৎপাদনের মুখ্য ভূমিকা রাখে।
শস্য সংগ্রহোত্তর প্রযুক্তি
শস্য সংগ্রহোত্তর উদ্ভাবিত প্রযুক্তির মাধ্যমে খাদ্যশস্য, সবজি ও ফলমূলের অপচয় রোধ এবং পুষ্টি গুণাগুণ অক্ষুণ রাখবে।  ফল ও সবজি প্রক্রিয়াজাতকরণের প্রযুক্তিসমূহ উদ্ভাবনে দরিদ্র মানুষের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হবে।
সর্বোপরি, বলা যায় এ দেশের কৃষির সার্বিক উন্নয়নে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট বিজ্ঞানীবৃন্দের দেশের প্রয়োজনে ও সমস্যাসম্পর্কে সচেতন তাদের পেশাগতজ্ঞান, অভিজ্ঞতা এবং প্রচেষ্টা আর আমাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় বর্তমানে নির্মিত আগামী দিনের কৃষি উন্নয়ন। য়

১মহাপরিচালক, বিএআরআই, গাজীপুর, ২মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, ডাল গবেষণা উপকেন্দ্র, বিএআরআই, গাজীপুর, মোবাইল : ০১৭১২৫৪৩৭২০, ই-মেইল : omaraliprc@gmail.com

 

ফাইল ১

এক্সেসিবিলিটি

স্ক্রিন রিডার ডাউনলোড করুন