কনটেন্টটি শেষ হাল-নাগাদ করা হয়েছে: রবিবার, ১৩ এপ্রিল, ২০২৫ এ ০৬:৪৯ PM

আদা চাষ পদ্ধতি

কন্টেন্ট: কৃষি কথা মাস: বৈশাখ সাল: ১৪৩২ প্রকাশের তারিখ: ১৩-০৪-২০২৫

আদা চাষ পদ্ধতি
কৃষিবিদ মো. ইমরান হোসেন
আদা বাংলাদেশে একটি গুরুত্বপূর্ণ মসলা ফসল হিসাবে পরিচিত। ঔষধি গুণসম্পন্ন এই মসলা অন্ত্রের রোগ, রক্তের কোলেস্টরেল, বহুমূত্র রোগ, খিচুনি রোগ প্রতিরোধ, বাতের ব্যথা কমাতে ও সর্দি-কাশি নিরাময়ে ব্যবহৃত হয়। বাংলাদেশে ২০২২-২৩ অর্থবছরে ১৭ হাজার হেক্টর জমিতে ২.৮৮ লাখ মেট্রিক টন আদা উৎপন্ন হয়, যা চাহিদার তুলনায় ১.৯৩ লাখ মেট্রিক টন কম। এই ঘাটতি পূরণের জন্য প্রতি বছর দেড় লাখ টনের বেশি আমদানি করা হয় যার আর্থিক মূল্য আনুমানিক দেড় থেকে দুই হাজার কোটি টাকা। প্রতি বছর জনসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে বৃদ্ধি পাচ্ছে রাস্তাঘাট, ঘরবাড়ি, কলকারখানা। একইসাথে হ্রাস পাচ্ছে আবাদি জমি। আবার আবাদি জমিতে আদা চাষ করলে ধান-ডাল-সবজিসহ অন্যান্য ফসলের উৎপাদন হ্রাস পাবে। তাই আবাদি জমির উপর ভরসা না করে অন্য ফসল চাষ অযোগ্য পতিত জমি, বসতবাড়ির চারপাশ, রাস্তাঘাট, পাহাড়ের ঢালে আদা চাষ করা গেলে একদিকে যেমন পরিবারের চাহিদা পূরণ করা যাবে একইসাথে আমদানি হ্রাস করে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় করা সম্ভব।
পাহাড়ি জমিতে আদা চাষ : আদা গাছ অতিরিক্ত পানি সহ্য করতে পারে না। তাই পানি নিষ্কাশনের ভাল ব্যবস্থা আছে এমন উঁচু, মাঝারি উঁচু, ঢালু জমি আদা চাষের জন্য উত্তম। চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রামসহ সারা দেশে যে পরিমাণ পাহাড়ি জমি আছে তা চাষের আওতায় আনা গেলে বিপুল পরিমাণ আদা উৎপাদন সম্ভব। পাহাড়ের ঢালে ভাল করে মাটি চাষ দিয়ে নরম করে আদা লাগালে এবং নিয়মিত আগাছা পরিষ্কারসহ অন্যান্য পরিচর্যা করলে আদার ফলন ভাল হবে। পাহাড়ের মাটি জৈব পদার্থ সম্পন্ন হওয়ায় এবং পানি নিষ্কাশনের চমৎকার ব্যবস্থা থাকায় পাহাড় হতে পারে আদা চাষের বিপুল সম্ভাবনাময় জায়গা। এ ছাড়া বর্তমানে পাহাড়ে প্রচুর ফলবাগান ও কাজুবাদামের বাগান রয়েছে। এসব বাগানের খালি স্থানেও আদা চাষ করা সম্ভব।
ফলবাগানে আদা চাষ : ২০২১-২২ অর্থবছরে প্রায় ৭ লাখ ৩৪ হাজার হেক্টর জমিতে ফল চাষ করা হয়েছে। এর মধ্যে যদি ১ লাখ হেক্টর জমি আদা চাষের আওতায় আসে তাহলে দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশে আদা রপ্তানি সম্ভব। আংশিক ছায়াযুক্ত স্থানে আদা সমানভাবে চাষ করা যায় বিধায় বিভিন্ন ধরনের ফলবাগান বিশেষ করে আম, পেয়ারা, কুল বাগানে আদা চাষের উৎকৃষ্ট স্থান হতে পারে।
ফলবাগান সাধারণত উঁচু, পানি নিষ্কাশনের উত্তম ব্যবস্থা আছে এমন জায়গায় করা হয়। তাই আদা চাষের পরিবেশ ফলবাগানে বিদ্যমান থাকে। ফলবাগানে আদা চাষ করলে কৃষক প্রধান ফসল ফলের পাশাপাশি আদা বিক্রি করে বাড়তি আয় করতে পারবে এবং তার জন্যে তার বাড়তি কোন জমির প্রয়োজন হবে না। ফলবাগানে আদা চাষ করলে বাগানের কোন ক্ষতি হবে না বরং যখন বাগানে ফল থাকবে না তখন আদা বাগান পরিদর্শনকালে কৃষক ফল বাগানের পরিচর্যা করতে পারবেন। ফলবাগনের আগাছা পরিষ্কার, সেচ, সার ও কীটনাশক প্রয়োগের সময় সহজেই আদা ক্ষেতের পরিচর্যা করা যায়। ফলবাগানে মাটি কুপিয়ে লাইন করে মাটিতে আদা রোপণ করা যায় একইসাথে খুব সহজে বস্তায়ও আদা রোপণ করা যায়।
বসতবাড়ি, পতিত জমি, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও রাস্তার পাশে আদা চাষ : বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ২৫৩ লাখের বেশি বসতবাড়ি আছে যার প্রতিটির গড় আয়তন প্রায় ০.২ হেক্টর। বসতবাড়ির আঙ্গিনাসহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের খালি জায়গাগুলোকে সহজেই আদা চাষের আওতায় আনা সম্ভব। এসব খালি জায়গায় মাটিতে অথবা বস্তায় দ্ইুভাবেই আদা চাষ সম্ভব। কেউ যদি অর্ধশতক জমিতে ১-২ কেজি আদা রোপণ করে অথবা ১০টি বস্তাতে আদা রোপণ করে তাহলে একটি পরিবারের সারা বছরের আদার চাহিদা পূরণ করা সম্ভব। বস্তায় আদা রোপণ করা খুব সহজ ও সুবিধাজনক। 
সিমেন্ট, সার বা অন্য কোন খালি বস্তায় ১০-১২ কেজি মাটি, ৫ কেজি গোবর, ১ কেজি ছাইয়ের সাথে ১০ গ্রাম ইউরিয়া, ১০ গ্রাম এমওপি, ২০ গ্রাম টিএসপি, ৫ গ্রাম করে জিংক ও বোরণ মিশিয়ে বস্তা ভরাট করতে হবে। ১০-১৫ দিন পর ৪০-৫০ গ্রাম ওজনের বীজ আদা ৪-৫ ইঞ্চি গভীরে লাগাতে হবে। বস্তায় আদা চাষে রোগবালাই কম হয়। একটি বস্তা থেকে এক থেকে দেড় কেজি আদা পাওয়া যায়। এরকম বস্তা করে বসতবাড়ি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, রাস্তার পাশে বা পতিত জমিতে আদা চাষ করলে কৃষকের পরিবারের চাহিদা পূরণের সাথে সাথে বাড়তি আয় সম্ভব।

লেখক : উদ্যানতত্ত্ববিদ, হর্টিকালচার সেন্টার, হাটহাজারী, চট্টগ্রাম। মোবাইল : ০১৭৫৩৮৫০০৪৩

ফাইল ১

এক্সেসিবিলিটি

স্ক্রিন রিডার ডাউনলোড করুন