অপুষ্টিজনিত ‘গুপ্ত ক্ষুধা’ নিরাময়ের
বায়োফর্টিফাইড জিঙ্ক রাইস
কৃষিবিদ ড. এম. মনির উদ্দিন
বাংলাদেশের অর্থনীতির গতি যেভাবে এগিয়ে যাচ্ছে তাতে ব্রিটেনের অর্থনৈতিক গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর ইকোনমিক অ্যান্ড বিজনেস রিসার্চের রিপোর্ট অনুযায়ী ২০৩৫ সাল নাগাদ বাংলাদেশ ১৯৩টি দেশ তথা বিশ্বের মধ্যে ২৫তম অর্থনীতির দেশ হিসাবে ঘুরে দাঁড়াবে।
অপ্রতিরোধ্য অগ্রযাত্রার ফলে কৃষি বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বিরাট ভূমিকা রাখতে সক্ষম হয়েছে। ২০২০ সালের করোনাকালীন সময়ে গোটা বিশ্ব যখন খাদ্য উৎপাদনে পিছিয়ে। দেশে দেশে যখন দেখা দিয়েছে খাদ্যাভাব, সে সময়ে বাংলাদেশে শুধূমাত্র দানাজাতীয় খাদ্যশস্য উৎপাদিত হয়েছে প্রায় ৪৩ মিলিয়ন টন যার মধ্যে শুধু চালের উৎপাদন হয়েছে প্রায় ৩৬ মিলিয়ন টন। কৃষিবান্ধব সরকারের সুদুরপ্রসারী ও সময়োপযোগী কর্মসূচি গ্রহণ, গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর নিরলস প্রচেষ্টা, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম জোরদারকরণ ও তদারকি এবং দেশের কৃষককুলের সক্রিয় অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে কৃষির এই অর্জনে দেশ আজ খাদ্যে স্বয়ংসম্পুর্ণ।
দ্রুত খাবার খাওয়ার ফলে ক্ষুধা মেটানো যায়, তবে ’গোপন ক্ষুধা’ এর গভীর সমস্যা রয়েছে যা পুষ্টিগতভাবে সমৃদ্ধ খাবারের মাধ্যমে পরিপূর্ণ হয়। বিশ্বব্যাপী সুবিধাবঞ্চিত মানুষদের জন্য সুষম খাবার গ্রহণ করা হলো একটি সুদূর স্বপ্ন। বিশ্ব জুড়ে চাল, গম ও ভুট্টা প্রধান কার্বহাইড্রেটযুক্ত খাবার খাওয়া হয় এবং ক্ষুধার সমস্যা সমাধানে অবদান রাখে, তবে ‘গোপন ক্ষুধা’ এখনও বিশ্বে অব্যাহত রয়েছে। বিশ্বে তিনজনের মধ্যে একজন মানুষ ’লুকানো ক্ষুধা’ নামক মাইক্রো নিউট্রিয়েন্টজনিত ঘাটতিতে ভোগেন। এই ‘গোপন ক্ষুধার’ কারণ হলো দেহ প্রয়োজনীয় মাইক্রো নিউট্রিয়েন্ট থেকে বঞ্চিত হয়। দেহে প্রয়োজনীয় মাইক্রো নিউট্রিয়েন্টের অভাব একটি নীরব মহামারী অবস্থা যা আস্তে আস্তে দেহের প্রতিরোধ ব্যবস্থা দুর্বল করে দেয়, শারীরিক বৃদ্ধিকে ব্যাহত করে এমনকি মৃত্যুর কারণও হতে পারে। মানবদেহে মাইক্রো নিউট্রিয়েন্টস বিশেষ করে আয়োডিন, আয়রন, ভিটামিন-এ এবং জিঙ্কের ঘাটতি ব্যাপক আকার ধারণ করে এবং এর ফলে গুরুতর পরিণতি ঘটে। ’লুকানো ক্ষুধা’ এবং অপুষ্টিজনিত কারণে বিশ্বব্যাপী প্রতিদিন ২৪ হাজারের বেশি মানুষ মারা যায়। মানবদেহে তাই এই সমস্ত মাইক্রো নিউট্রিয়েন্টসগুলোর ঘাটতি মোকাবেলার জন্য বিভিন্ন জৈবিক এবং রাসায়নিকভাবে পুষ্টি উপাদানগুলো যুক্ত করে প্রয়োজনীয় বা প্রধান খাদ্যকে শক্তিশালী করার চেষ্টা চলছে বিশ্বব্যাপী।
বায়োফর্টিফিকেশন, অর্থাৎ ফসলের ব্রিডিং বা প্রজননের মাধ্যমে প্রধান খাদ্যের মধ্যে মাইক্রো নিউট্রিয়েন্টস এর পরিমাণ বৃদ্ধি করা যাতে কৃষিভিত্তিক প্রযুক্তির মাধ্যমে দরিদ্র শ্রেণীর মানুষের স্বাস্থ্যের অন্যতম বাধা অপুষ্টিজনিত সমস্যাকে দূরীভূত করা। গত দুই দশকে মানব শরীরে মাইক্রো নিউট্রিয়েন্টের ঘাটতি কমানোর জন্য গতানুগতিক খাদ্য পরিপুরক গ্রহণ, খাদ্যে ফর্টিফিকেশন এবং খাদ্য তালিকার বহুমুখীকরনের চেয়ে প্রধান খাদ্য মাইক্রো নিউট্রিয়েন্ট সমৃদ্ধ করার জন্য বায়োফর্টিফিকেশন এর উপর কাজ করা হয়েছে। বিশ্বে খাদ্যে মাইক্রো নিউট্রিয়েন্ট এর ঘাটতির প্রেক্ষাপটে জিনগত যেমন উদ্ভিদ প্রজনন ও কৃষিতাত্ত্বিক কলাকৌশলের মাধ্যমে বায়োফর্টিফাইড প্রধান খাদ্য গ্রহণের পরিমান বাড়িয়ে দরিদ্র মানুষের মাইক্রো নিউট্রিয়েন্টের ঘাটতি পূরণে সহায়ক হতে পারে।
জিঙ্ক মানব স্বাস্থ্যের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি মাইক্রো নিউট্রিয়েন্ট। বিশ্বব্যাপী বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে মানব শরীরে জিঙ্কের ঘাটতি প্রায় ২ বিলিয়ন মানুষের জন্য বিরাট একটি স্বাস্থ্য সমস্যা। এর অধিকাংশ হলো গর্ভবতী মহিলা ও পাঁচ বছরের নিচের শিশুরা। সেই সমস্ত অঞ্চলে মানব শরীরে জিঙ্কের সমস্যা বেশি যেখানে মাটিতে জিঙ্কের পরিমাণ কম থাকে। গবেষণায় আরো জানা যায় যে, মানব শরীরে জিঙ্কের ঘাটতির অন্যতম কারণ হলো সাধারণত বেশি পরিমাণে দানাজাতীয় খাবার গ্রহণ ও কম পরিমাণে প্রাণিজ খাদ্য গ্রহণ।
বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৫৫ শতাংশ অর্থাৎ ৯০ দশমিক ৫ মিলিয়ন মানুষের মধ্যে জিঙ্কের অভাব রয়েছে। প্রাক-স্কুল বয়সী শিশুদের ৪৫ শতাংশ অর্থাৎ প্রায় ৩ দশমিক ৫ মিলিয়ন এবং ৫৭ শতাংশ গর্ভবতী ও স্তন্যদানকারী অর্থাৎ প্রায় ২০ মিলিয়ন মহিলাদের মধ্যে জিঙ্কের ঘাটতি রয়েছে যার কারণে এরা খর্বাকৃতির হয়ে যাচ্ছে এবং প্রায়ই ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে থাকে। দেশের ৫ বছরের কম বয়সী ৪১ শতাংশ অর্থাৎ ৬ দশমিক ৩ মিলিয়ন শিশু জিঙ্কের ঘাটতিজনিত কারণে খর্বাকৃতির হচ্ছে।
যেহেতু বাংলাদেশের মানুষের ভাতভিত্তিক খাদ্যাভ্যাস গড়ে উঠেছে তাই ভাতের মাধ্যমে যাতে অধিক পুষ্টির জোগান পায় বিশেষ করে জিঙ্কের ঘাটতি পূরণের জন্য বিশ্বের মধ্যে শীর্ষস্থানীয় গবেষণা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি) ২০১৩ সাল থেকে অদ্যাবধি মোট ৭টি বায়োফর্টিফাইড জিঙ্ক সমৃদ্ধ ধানের জাত উদ্ভাবন করেছে। ভাত বাংলাদেশের মানুষের প্রধান খাদ্য এবং নিম্ন আয়ের মানুষের প্রতিদিন ভাতের জন্য চাল দরকার হয় ৩৯০ গ্রাম থেকে সর্বাধিক ৪৫০ গ্রাম। এক্ষেত্রে ব্রির উদ্ভাবিত বায়োফর্টিফাইড জিঙ্ক সমৃদ্ধ জাতগুলো মানুষের প্রতিদিনের জিঙ্ক চাহিদার ৯০ শতাংশ পূরণ করতে সক্ষম।
ব্রি ধান৬২ : আমন মৌসুমের সবচেয়ে আগাম বায়োফর্টিফাইড জিঙ্ক সমৃদ্ধ ধানের জাত। চাল সরু আকৃতির এবং এতে উচ্চমাত্রার প্রোটিন ও মধ্যম মাত্রার জিঙ্ক রয়েছে। এর জীবনকাল ১০০ দিন যা ব্রি ধান৩৩ এর চেয়েও ১০-১২ দিন আগে আসে। আশ্বিনের শেষ সপ্তাহে ধান কেটে আলু বা অন্যান্য রবিশস্য করা যায়। ১ কেজি চালে জিঙ্কের পরিমাণ ১৯.৮ মিলিগ্রাম।
ব্রি ধান৭২ : জিঙ্ক সমৃদ্ধ আমনের একটি আগাম জাত। জীবনকাল ১২৫ দিন। আশ্বিনের শেষে ধান কাটার পর সহজেই রবিশস্য চাষ করা যায়। চাল লম্বা ও মোটা এবং ১ কেজি চালে জিঙ্কের পরিমান ২২.৮ মিলিগ্রাম।
ব্রি ধান৭৪ : বোরো মৌসুমের বায়োফর্টিফাইড জিঙ্ক সমৃদ্ধ ধানের জাত জীবনকাল ১৪০ দিন। ১ কেজি চালে জিঙ্কের পরিমাণ ২৪.২ মিলিগ্রাম।
ব্রি ধান৮৪ : বোরো মৌসুমের বায়োফর্টিফাইড জিঙ্ক সমৃদ্ধ ধানের জাত জীবনকাল ১৪৫ দিন। ১ কেজি চালে জিঙ্কের পরিমান ২৭.৬ মিলিগ্রাম।
বঙ্গবন্ধু ধান১০০ : বোরো মৌসুমে চাষাবাদযোগ্য জিংক-এর পরিমাণ ২৫.৭ মি. গ্রাম/কেজি। গড় জীবনকাল ১৪৮ দিন।
ব্রি ধান১০২ : বোরো মৌসুমে চাষাবাদযোগ্য। জিংকের পরিমাণ ২৫.৫ মি. গ্রাম কেজি। এ জাতের গড় জীবনকাল ১৪০ দিন।
বিনা ধান-২০ : আমন মৌসুমে চাষাবাদযোগ্য। প্রতি ১০০ গ্রাম চালে ২.৭৫ মি. গ্রাম জিংক এবং ২.০-৩.১ মিলি গ্রাম আয়রণ থাকে। গড় জীবনকাল ১২৫-১৩০ দিন।
আমন মৌসুমের বায়োফর্টিফাইড জিঙ্ক সমৃদ্ধ ধানের জাতগুলো হেক্টরে ৪.৫ টন থেকে ৬.৫ টন ফলন দিতে সক্ষম। বোরো মৌসুমের জিঙ্ক জাতের ধানের ফলন হেক্টরে ৬.৫ টন থেকে ৮.৫ টন। যদিও বায়োফর্টিফাইড জিঙ্ক রাইসের মাধ্যমে দেশের মানুষের জিঙ্কের ঘাটতি পূরণে একটি প্রতিশ্রুতবদ্ধ সমাধান।
জিঙ্ক মানুষের ইমিউনিটি ফাংশন বাড়ানোর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ যা ভাইরাস এবং অন্যান্য ক্ষতিকারক স্বাস্থ্য হুমকির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য প্রথম সারির হাতিয়ার। একজন প্রাপ্ত বয়স্ক মানুষের দৈনিক ১১-১২ মিলিগ্রাম জিঙ্কের দরকার হয় যার ৪০-৫০ শতাংশ বায়োফর্টিফাইড জিঙ্ক সমৃদ্ধ চাল থেকে পূরণ করা যায়। কারণ জিঙ্ক সমৃদ্ধ জাতগুলোতে সাধারণ জাতের তুলনায় ৫০ শতাংশ জিঙ্ক বেশি থাকে। দেশের শিশু ও মহিলাসহ বিপুল জনগোষ্ঠীর মধ্যে জিঙ্কের ঘাটতিজনিত অপুষ্টি দূর করতে জিঙ্ক সমৃদ্ধ ধানের জাতগুলোর মাঠপর্যায়ে সম্প্রসারণের কোন বিকল্প নেই।
মাঠপর্যায়ে সফলভাবে এই জাতগুলো সম্প্রসারণের জন্য যা করণীয়
য় প্রথমেই যে কাজটি করা জরুরি সেটি হচ্ছে, জিঙ্ক সমৃদ্ধ চাল সম্পর্কে মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানোর ব্যবস্থা করা। বিভিন্ন প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার মাধ্যমে মানব শরীরে জিঙ্কের গুরুত্ব, জিঙ্ক সমৃদ্ধ চালের গুণাবলি সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করতে হবে। কৃষকদের মাঝে ভর্তুকি মূল্যে জিঙ্ক সমৃদ্ধ ধানের বীজ সরবরাহ করে এই ধান চাষে কৃষকদেরকে উৎসাহিত করার ব্যবস্থা নিলে ভাল ফল পাওয়া যেতে পারে।
য় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মাধ্যমে জিঙ্ক ধানের প্রদর্শনী স্থাপন করে মাঠ দিবসের আয়োজন করার মধ্য দিয়ে প্রচার করা এবং কৃষকদেরকে এই ধান চাষে উৎসাহিত করা।
য় সরকারের বিভিন্ন সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিতে সাধারণ চালের পরিবর্তে বায়োফর্টিফাইড জিঙ্ক সমৃদ্ধ চাল দেওয়ার ব্যবস্থা করা। এর ফলে দেশে জিঙ্ক সমৃদ্ধ ধানের চাষ অনেক সহজেই বেড়ে যাবে। সরকারি এই সমস্ত কর্মসূচির একটি বড় সুবিধা হলো যে, এর মাধ্যমে নিম্ন আয়ের পরিবারকে চাল সহায়তা দেয়া হয় যাদের মধ্যে জিঙ্কের ঘাটতি অত্যন্ত বেশি। যদি এই সমস্ত পরিবার জিঙ্ক সমৃদ্ধ চাল পায় তবে তাদের দেহের জিঙ্ক ঘাটতি পূরণে সহায়ক হবে।
য় মিলারদের মাধ্যমে জিঙ্ক জাতের চালের বিশেষ ব্র্যান্ডিং করে বাজারে ছাড়ার ব্যবস্থা করা যার মধ্য দিয়ে মানুষের মাঝে এই চালের উপকারিতা সম্পর্কে সচেতন করতে সহায়ক হবে। এই বিশেষ প্যাকেটজাত জিঙ্ক সমৃদ্ধ চাল শহরের দোকানগুলোতে পাওয়া গেলে উচ্চ আয়ের গ্রাহকগণ প্রয়োজনে কিছুটা বেশি মূল্য দিয়ে হলেও কিনতে আগ্রহী হবে। জিঙ্ক চাল বাজারে ব্র্যান্ড হিসাবে চালু করতে পারলে এর চাহিদা বেড়ে যাবে যার ফলে মিলাররাও আগ্রহী হবে এই জিঙ্ক চালের আলাদা ব্র্যান্ড ও প্যাকেট করতে। এভাবেই চাহিদা বাড়তে থাকলে কৃষকেরাও বাণিজ্যিকভাবে এই সমস্ত জিঙ্ক ধানের চাষে আগ্রহী হয়ে উঠবে যা সর্বোপরি দেশের মানুষের জিঙ্কের ঘাটতিজনিত অপুষ্টি দুরীভুত হবে।
দেশে দক্ষ জনবল তৈরি হবে, দেশের কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্যখাতে অগ্রগতির ধারায় আরো গতি আসবে। এভাবেই বাংলাদেশ মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ভিশন-২০৪১ অর্থাৎ উন্নত দেশে পরিণত হবে। আর এই অগ্রগতির জন্য সুস্থ শক্তিশালী জাতি গঠনের জন্য নিশ্চিত করার প্রয়োজন হবে দেশের মানুষের পুষ্টি নিরাপত্তা। এক্ষেত্রে বায়োফর্টিফাইড জিঙ্ক সমৃদ্ধ চাল সেই পুষ্টি নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে সুরক্ষার মাধ্যমে সুস্থ সবল জাতি গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
লেখক : কনসালট্যান্ট, গেইন বাংলাদেশ, মোবাইলঃ ০১৭১১৯৮৭১১৩, ই-মেইল :monir.uddin@rocketmail.com