কনটেন্টটি শেষ হাল-নাগাদ করা হয়েছে: বৃহস্পতিবার, ৪ জুন, ২০২০ এ ০৩:০৫ PM

অতি গরমে পোল্ট্রির পীড়ন/ধকল ও তার প্রতিকার (কৃষিকথা ১৪২৭ )

কন্টেন্ট: কৃষি কথা মাস: জ্যৈষ্ঠ সাল: ১৪২৭ প্রকাশের তারিখ: ০৪-০৬-২০২০

কৃষিবিদ মোঃ ফজলুল করিম

প্রাণিজ আমিষের বড় একটা অংশ আসে পোল্ট্রি শিল্প থেকে। প্রায় অর্ধকোটি মানুষে জীবন জীবিকা এই শিল্পের সাথে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত তাই এ শিল্পের সুদৃঢ় ভবিষ্যৎ চিন্তা করে সময়োপযোগী পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। গরমকাল এ পোলট্রি খামারে বিশেষ যতœ না নিলে কমে যেতে পারে ব্রয়লারের ওজন বৃদ্ধি এবং লেয়ার খামারের ডিম সংখ্যা। গ্রীস্মকালে আমাদের দেশে অনেক অঞ্চলের তাপমাত্রা কয়েক বছর ধরে ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে এর উপরে চলে যায়। এই সময় উচ্চ উৎপাদনশীল মুরগির জন্য যে সমস্যা বড় আকার ধারণ করে তা হলো হিটস্ট্রোক। এ সময় পানির দুষ্প্রাপ্রতা, পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়া ছাড়াও পানিতে ব্যাকটেরিয়ার পরিমাণ বেড়ে যায়। ফলে মুরগি বড় ধরনের ধকলে আক্রান্ত হয়। গ্রীষ্মকালে বিশেষ করে যে সময়টাতে তাপমাত্রা বেশি থাকে সেই সময় ফিড ফর্মুলেশনে নি¤œলিখিত পদক্ষেপ গ্রহণ করলে মুরগির হিটস্ট্রোক অনেকাংশে কমানো যায়।
তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও এর প্রভাব
ঘর্মগ্রন্থি না থাকার কারণে মোরগ-মুরগির অতিরিক্ত গরম অসহ্য লাগে। এতে উৎপাদন ক্ষমতা ব্যাহত হয়। অতিরিক্ত তাপে এদের পানি গ্রহণ, শ্বাস-প্রশ^াস,শরীরের তাপমাত্রা বৃদ্ধি পায়। অপর দিকে থাইরয়েড গ্রন্থির আকার রক্তচাপ, নাড়ির স্পন্দন, রক্তের ক্যালসিয়ামের সমতা খাদ্য গ্রহণ, শরীরের ওজন ও ডিমের উৎপাদন হ্রাস পায়। ১ থেকে ২৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় এদের উৎপাদন সর্বোচ্চ ২৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস থেকে প্রতি ডিগ্রি তাপমাত্রা বৃদ্ধিতে ডিমের ওজন শতকরা ৪ভাগ হারে পানি গ্রহণ বৃদ্ধি পায়। ২৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার পর থেকে ডিমের সংখ্যা না কমলেও প্রতি ডিগ্রি তাপমাত্রা বৃদ্ধিতে ডিমের ্ওজন শতকরা এক ভাগ হারে করে যায়। ২৬.৫ সেলসিয়াস ডিগ্রি তাপমাত্রার পর থেকে মোরগ-মুরগির খাদ্যের রূপান্তর ক্ষমতা হ্রাস পায়। ২৭ডিগ্রি সেলসিয়াস থেকে প্রতি ডিগ্রি তাপ বৃদ্ধিতে ২ থেকে ৪ শতাংশ খাবার গ্রহণ কমে যায়। ৩৬ থেকে ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা মোরগ-মুরগির জন্য অসহনীয় এবং ৩৮ ডিগ্রির পর মৃত্যু হার খুব বৃদ্ধি পায়।
তাপজনিত ধকল প্রতিরোধ
খামারের আশেপাশে ছায়াযুক্ত বৃক্ষরোপণ এবং ঘর পর্ব-পশ্চিমে হওয়া বাঞ্ছনীয়। তবে আধুনিক খামার ব্যবস্থাপনায় বায়ু          সিকিউরিটির কথা চিন্তা করে গাছপালা রোপণের প্রতি অনুৎসাহিত করা হয়ে থাকে। গরমে পোল্ট্রি শেডে প্রত্যক্ষ সূর্যালোক পড়া যাবে না। অত্যাধিক গরম প্রতিরোধে প্রয়োজনে শেডের ছাদে বা টিনের চালায় দিনে           ২-৩ বার পানি ছিটানোর ব্যবস্থা করতে হবে। টিনের নিচে চাটাই বা হার্ডবোর্ড দিয়ে সিলিংয়ের ব্যবস্থা করতে হবে। অনেক সময় মুরগি যখন হা  করে শ^াস-প্রশ^াস নেয় তখন ঘরে স্প্রে মেশিন দিয়ে কুয়াশার মতো করে পানি ছিটিয়ে দেওয়া যেতে পারে। পানির ড্রিংকার ও ফিডারের সংখ্যা বাড়াতে হবে। ঘন ঘন ড্রিংকারের পানি পাল্টাতে হবে। গরমে বাতাসের আর্দ্রতা বেড়ে যাওয়া কারণে শেডে মেঝে অনেক সময় স্যাঁতস্যেঁতে হয়ে লিটার দ্রæত ভিজে যায়। ফলে রোগের আক্রামণও বাড়ে। সে জন্য প্রতিদিন সকালে ব্রয়লার শেডের লিটার উলোট-পালট করা প্রয়োজন। লিটারে গুঁড়ো  চুন ব্যবহার করলে খুব ভালো ফল পাওয়া যায়। শেড থেকে  শেডের দুরূত্ব ৩০ ফুটের বেশি হলে ভালো হয়। শেডের মোরগ-মুরগির ঘনত্ব বেশি হলে তা কমিয়ে দিতে হবে। বাতাসে অবাধ চলাচল শেডের ভেতরের তাপমত্রা শীতল রাখতে সাহায্য করবে এবং পোল্ট্রির জন্য ক্ষতিকর অ্যামোনিয়া গ্যাসমুক্ত রাখবে। শেড স্টেন্ড ফ্যানের ব্যবস্থা করতে হবে।
খামার ব্যবস্থাপনা   
ঠাÐা ও বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ করতে হবে। যেহেতু তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেলে এদের খাদ্য গ্রহণ কমে যায়,সেহেতু প্রয়োজনীয় পুষ্টির চাহিদা মেটাতে ৮ থেকে ১০ ভাগ শক্তি কমিয়ে প্রোটিন, খনিজ লবণ ও ভিটামিন বাড়িয়ে দিতে হবে। প্রতি লিটার পানিতে ১০-১২ গ্রাম গøুকোজ ও মুরগি প্রতি ১০ গ্রাম ভিটমিন সি পানির সঙ্গে মিশিয়ে দিলে ভালো ফল পাওয়া যায়। এছাড়া প্রাকৃতিক বিটেইনে ধনাতœক ও ঋণাত্মক আছে যা কোষের মধ্যে পানি ধরে রাখতে সাহায্য করে। ফলে হিটস্ট্রোকের হাত থেকে এরা রক্ষা পায়। গরমে পোল্ট্রির অ্যামাইনো অ্যাসিডের চাহিদা বেড়ে যায়। বিটেইনে মিথাইল মূলক বিদ্যমান,যা মিথিওনিন ও কলিনের ঘাটতি পূরণে সহায়তা করে। গরমে প্রয়োজনে একদিনের বাচ্চার জন্য পানিতে আখের গুড়, ভিটামিন সি অথবা ইলেকট্রোলাইট যুক্ত স্যালাইন পানি দিতে হবে। নি¤েœ গরমের সময় পোল্ট্রির পুষ্টি উপাদানসমূহ পোল্ট্রির দেহে কাজ করার প্রক্রিয়া সম্পর্কে ধারণা দেয়া হয়েছে।
ক্রড প্রোটিন : গ্রীস্মকালে প্রোটিনের উৎস হিসেবে উদ্ভিজ উৎসকে বাঁছাই করলে খবুই ভালো হয়। কারণ প্রাণিজ প্রোটিন হজমের সময় বেশি হিট তৈরি হয়।
ভিটামিন সি : হিটস্ট্রেসের সময় ভিটামিন সি এর পরিমাণ কমে যায় ফলে ফিডের সাথে অতিরিক্ত ভিটামিন সি  সরবরাহ  (২০০-৪০০ গ্রাম/টন) করতে হয়। উল্লেখ থাকে যে ফিডে ভিটামিন সরবরাহ করলে পানিতে নতুন করে দেয়ার প্রয়োজন নেই।
সোডিয়াম বাই কার্বোনেট : সোডিয়াম বাই কার্বোনেট ফিডের সাথে দিলে পানি গ্রহণের পরিমাণ বেড়ে যায় এবং সিস্টেমিক এসিডোসিসকে রোধ করে।
বিটেইন : বিটেইন কোষের মধ্যে পানি সামঞ্জ্যসতা ঠিক রাখে বা অসমোলাইট হিসেবে কাজ করে।
মুরগি নিজেই একটি ডিম/মাংস উৎপাদনের কারখানা। বর্তমান অধিক উৎপাদনশীল মুরগির গরম সহ্য করার ক্ষমতা খুবই কম, যার ফলে পরিবেশের তাপমাত্রা সামান্য বেড়ে গেলেই মুরগির হিট স্টোক করে। হিট স্টোক প্রতিরোধ করার জন্য একটি  কার্যকরী উপাদান হল বিটেইন।
অ্যান্টি অক্সিজেন : হিটস্ট্রেসে অক্সিডেটিভ মেটাবলিজম বেশি হয় ফলে বেশি পরিমাণে মুক্ত রেডিক্যাল তৈরি হয়। এই মুক্ত রেডিক্যালগুলো কোষের পদার্থকে নষ্ট করে দেয়। মুক্ত রেডিক্যালকে রোধ করার জন্য ফিডের সাথে অ্যান্টি অক্সিডেন্ট যোগ করতে হয়। অ্যান্টি অকিডেন্টের মধ্যে রয়েছে          ভিটামিন-ই, ভিটামিন-সি ইত্যাদি।
অ্যান্টি কক্সিডিয়াল : গ্রীস্মকালে নিকারবাজিন, মোনেনসিন ফিডে দেয়া ঠিক না। কারন এগুলো পানি গ্রহণের মাত্রাকে কমিয়ে দেয়।
ভিটামিন কে : গ্রীস্মকালে ঠোট কাটতে চাইলে (ডিবেকিং) ফিডে ভিটামিন কে দিতে হয়। কারণ হিট স্টেস রক্ত জমাট বাঁধার সময়কে দীর্ঘয়িত করে।
টক্্িরন বাইন্ডার : গ্রীষ্মকালে যখন আদ্রতা বেশি থাকে সেই সময় ফিডে টক্্িরন তৈরি হয় যা রোধ করার জন্য টক্সিন বাইন্ডার দিতে হয়।
পানি : গ্রীস্মকালে  পানিতে ব্যাকটেরিয়ার পরিমাণ বেশি থাকে, ফলে পানি সঠিক মাত্রায় বিশুদ্ধ করতে হবে। তাছাড়াও পানির পাইপ ট্যাংক নিয়মিত পরিস্কার করতে হবে।
লিটার ব্যবস্থাপনা : যেহেতু গ্রীষ্মকালে পানি গ্রহণ বেশি করে এবং প্রসাবের পরিমাণও বেড়ে যায় এবং অ্যামেনিয়া বেশি উৎপন্ন হয় তাই লিটার শুষ্ক রাখার ব্যবস্থা নিতে হবে। য়

উপজেলা প্রাণিসম্পদ অফিসার, সুন্দরগঞ্জ, গাইবান্ধা, মোবাঃ ০১৭২৪-১৪১৬৬২, ই-মেইল fazlurahi@gmail.com

 

 

ফাইল ১

এক্সেসিবিলিটি

স্ক্রিন রিডার ডাউনলোড করুন