কনটেন্টটি শেষ হাল-নাগাদ করা হয়েছে: শনিবার, ২৮ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬ এ ০২:৫৫ PM

মিষ্টি আলু

কন্টেন্ট: ই-কৃষি ই-কৃষি বিভাগ: অর্থকরী প্রকাশের তারিখ: ২৮-০২-২০২৬

মিষ্টি আলু

বাংলাদেশে মিষ্টিআলু আজও অবহেলিত, তাই একে গরীবের ফসল বলা হয়। কিন্তু এর পুষ্টিমান বিবেচনা করে বর্তমানে কেউ আর এটাকে অবহেলিত বা গরীবের ফসল বলছেন না। কারণ, এতে প্রচুর পরিমাণ শর্করা, খনিজ ও ভিটামিন আছে। এটি বিশ্বের অন্যতম শর্করা সমৃদ্ধ ফসল। এক একক জমি থেকে মিষ্টিআলু যে পরিমাণ শর্করা উৎপন্ন করে তা অন্যান্য ফসল থেকে অনেক বেশি। এতে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন-এ আছে। এই ভিটামিন-এ এর অভাবে আমাদের দেশে প্রায় ৩০,০০০ (ত্রিশ হাজার) শিশু রাতকানা রোগে ভোগে এবং আস্তে আস্তে অনেকে অন্ধত্ব বরণ করে। এক পরীক্ষায় দেখা গেছে, রঙিন শাঁস যুক্ত ১২৫ গ্রাম মিষ্টি আলু প্রতিদিন খেলে একজন পূর্ণবয়স্ক লোকের ‘ভিটামিন-এ’ চাহিদা পূরণ হয়। মিষ্টি আলুতে Glycemic index (GI) অনেক কম থাকার কারণে ডায়াবেটিস রোগীরাও সহজে খেতে পারেন। কাঁচা মিষ্টিআলুর GI মান ৪১। ৩০ মিনিট সিদ্ধ করার পর এর GI মান দাঁড়ায় ৪৪-৪৬ যাহা ৫৫ এর নীচে। যে সকল খাবাবেরর GI মান ৫৫ এর নীচে সেসকল খাবার ডায়াবেটিস রোগে আক্রান্ত রোগীদের জন্য মোটামুটি নিরাপদ। মিষ্টিআলুর ভিটামিন B6 রক্তনালীকে স্বাভাবিক রেখে হৃদরোগ নিয়ন্ত্রণ করে। বাংলাদেশের প্রায় সব জেলাতেই মিষ্টিআলুর চাষ হয়। এ ফসলের স্থানীয় জাতগুলো গুণেমানে ও ফলনে উৎকৃষ্ট নয়। স্থানীয় জাতগুলোর গড় ফলন হেক্টরপ্রতি ১০ টনের কম কিন্তু উচ্চফলনশীল মিষ্টি আলুর জাতের ফলন প্রায় ৩০-৪০ টন/হেক্টর। প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে উৎকৃষ্টমানের হালুয়া, চিপস, জ্যাম, জেলী ইত্যাদি মিষ্টি আলু থেকে তৈরি করা যায়। বিবিএস ২০২৪ অনুযায়ী ২০২২-২০২৩ সালে বাংলাদেশে মিষ্টি আলুর আওতায় জমির পরিমাণ প্রায় ২৪.৯৫ হাজার হেক্টর এবং বার্ষিক উৎপাদন প্রায় ৩.০৪ লক্ষ মে.টন।

বারি মিষ্টি আলু

কন্দাল ফসল গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট, দীর্ঘদিন যাবৎ এ ফসলের উন্নয়নের জন্য কাজ করে আসছে। দীর্ঘ দিন গবেষণার পর এ পর্যন্ত ১৩ টি উচ্চ ফলনশীল ও গুণাগুণ সমৃদ্ধ মিষ্টি আলুর জাত উদ্ভাবন করেছে। জাতগুলি হলো বারি মিষ্টিআলু-১ (তৃপ্তি), বারি মিষ্টিআলু-২ (কমলাপুরী), বারি মিষ্টিআলু-৩ (দৌলতপুরী), বারি মিষ্টিআলু-৪, বারি মিষ্টিআলু-৫, বারি মিষ্টিআলু-৬, বারি মিষ্টিআলু-৭, বারি মিষ্টিআলু-৮, বারি মিষ্টিআলু-৯, বারি মিষ্টিআলু-১০, বারি মিষ্টিআলু-১১, বারি মিষ্টিআলু-১২, বারি মিষ্টিআলু-১৩, বারি মিষ্টিআলু-১৪, বারি মিষ্টিআলু-১৫ ও বারি মিষ্টিআলু-১৬, বারি মিষ্টিআলু-১৭ এবং বারি মিষ্টিআলু-১৮। নিম্নে উদ্ভাবিত লাগসই ও সম্ভাবনাময় জাত সমূহের প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলো বর্ণনা করা হল।

মিষ্টি আলুর জাত

বারি মিষ্টি আলু-২ (কমলা সুন্দরী)

১৯৮০ সালে এশীয় সবজি গবেষণা ও উন্নয়ন কেন্দ্র, তাইওয়ান থেকে লাইনটি এনে অন্যান্য জার্মপ্লাজমের - সাথে বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পরীক্ষা নিরীক্ষার মাধ্যমে উপযোগিতা যাচাই করে ১৯৮৫ সালে জাতটি কমলা সুন্দরী নামে অনুমোদিত হয়। এ জাতের কাণ্ড সবুজ, পাতা কচি অবস্থায় বেগুনী, কাণ্ডের অগ্রভাগ বেগুনী ও পাতা সবুজ। কন্দমূল লাল, শাঁস কমলা বর্ণের। কন্দমূলের আকৃতি উপ বৃত্তাকার হয়। কন্দমূলের ওজন ১৮০-২২০ গ্রাম। শাঁস নরম। প্রতি ১০০ গ্রাম শাঁসে প্রায় ৭,৫০০ আ.ইউ. ভিটামিন ‘এ’ আছে। এ জাতের কাণ্ডের অগ্রভাগ বেগুনী ও পাতার উল্টো দিকের শিরা বর্ণহীন। জীবনকাল ১৩৫-১৪০ দিন। উন্নত পদ্ধতিতে চাষ করলে হেক্টরপ্রতি ৪০-৪৫ টন ফলন হয়ে থাকে। বাংলাদেশের সব অঞ্চলে এ আলুর চাষ করা যায়।

বারি মিষ্টি আলু -৪

কমলা সুন্দরী, তৃপ্তি, দৌলতপুরী ও এস পি-০২৯ এর সাথে উন্মুক্ত পরাগায়নের মাধ্যমে উদ্ভাবিত ক্লোন থেকে বাছাই করে জাতটি ‘বারি মিষ্টি আলু-৪’ নামে ১৯৯৪ সালে অনুমোদন লাভ করে। কন্দমূল ও শাঁস ঘি বর্ণের। কন্দমূলের ওজন ১৭৫-১৯৫ গ্রাম ও আকৃতি উপ বৃত্তাকার। প্রতি গ্রাম শাঁসে প্রায় ১০৫০ আ.ইউ, ভিটামিন ‘এ’ আছে। জীবনকাল ১২০-১৩০ দিন। উন্নত পদ্ধতিতে চাষ করলে হেক্টরপ্রতি ফলন হয় ৪০-৪৫ টন। উইভিলের আক্রমণ কম হয়। বাংলাদেশের সব অঞ্চলেই বিশেষ করে যশোর ও খুলনায় এ জাতটি আগাম চাষ করা যায়। বারি মিষ্টিআলু-৪ একটি উচ্চ ফলনশীল, ক্যারোটিন সমৃদ্ধ ও মাঝারী শুষ্ক শাঁসযুক্ত জাত। এ জাতের কাণ্ড সবুজ, কাণ্ডের অগ্রভাগ বেগুনী, পাতা সবুজ, কচি পাতা বেগুনী।

বারি মিষ্টি আলু-

কমলা সুন্দরী, তৃপ্তি, দৌলতপুরী ও এস পি-০২৯ এর সাথে উন্মুক্ত পরাগায়ণের মাধ্যমে উদ্ভাবিত ক্লোন থেকে বাছাই করে জাতটি 'বারি মিষ্টিআলু-৫' নামে ১৯৯৪ সালে অনুমোদন লাভ করে। কন্দমূল লম্বাটে উপ বৃত্তাকার, বর্ণ ঘিয়ে, শাঁস হলুদাভ। কন্দমূলের ওজন ১৮০-২২০ গ্রাম। প্রতি ১০০ গ্রাম শাঁসে প্রায় ১০০০ আ.ইউ. ভিটামিন 'এ' আছে। জীবনকাল ১২০-১৩০ দিন। উন্নত পদ্ধতিতে চাষ করলে হেক্টরপ্রতি ফলন হয় ৩৫-৪৪ টন। উইভিলের আক্রমণ কম হয়। বিশেষ করে যশোর ও খুলনায় এ জাতটি আগাম চাষ করা যায়। বারি মিষ্টি আলু-৫ একটি উচ্চ ফলনশীল, ক্যারোটিন সমৃদ্ধ ও শুষ্ক শাঁসযুক্ত জাত। এ জাতের কাণ্ড ও কাণ্ডের অগ্রভাগ সবুজ ও কাণ্ড রোমশ হয়। পাতা সবুজ ও সামান্য খাঁজ কাটা। বাংলাদেশের সব অঞ্চলেই এ আলুর চাষ করা যায়।

বারি মিষ্টি আলু-৮

আন্তর্জাতিক আলু গবেষণা কেন্দ্রের মাধ্যমে ২০০২ সালে কয়েকটি মিষ্টি আলুর লাইন সংগ্রহ করা হয়। বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার পর সিআইপি-৪৪০০২৫ লাইনটি খুবই প্রতিশ্রুতিশীল প্রতীয়মান হওয়ায় ২০০৮ সালে উক্ত লাইনটি ‘বারি মিষ্টি আলু-৮’ নামে জাতীয় বীজ বোর্ড কর্তৃক অনুমোদিত হয়। এ জাতের লতা ও পাতার বর্ণ সবুজ। কন্দমূলের চামড়ার বর্ণ লাল, শাঁসের বর্ণ হলুদ। কন্দমূলের গড় ওজন ১৬০ গ্রাম। শুষ্ক বস্তুর পরিমাণ শতকরা ৩৫.৩ ভাগ। প্রতি ১০০ গ্রামে ৬৫০ আ.ইউ ভিটামিন ‘এ’ রয়েছে। জীবনকাল ১২০-১৩৫ দিন। উন্নত পদ্ধতিতে চাষ করলে হেক্টরপ্রতি ৪০-৪৫ টন ফলন পাওয়া যায়। বাংলাদেশের সব অঞ্চলে এ জাতের চাষ করা যায়। এ জাতটি খরা সহিষ্ণু। এ জাতে উইভিলের আক্রমণ কম হয়।

বারি মিষ্টি আলু-১১

বারি মিষ্টি আলু-৭ সিআইপি-৪৪০০২৫ এবং সিআইপি-৪৪০০৭৫-২ এর সাথে ২০০৬ সালে উন্মুক্ত পরাগায়ণের মাধ্যমে উদ্ভাবিত ক্লোন এসপি-৬১৩ কে বাছাই করে এবং বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার পর এ জাতটি ‘বারি মিষ্টি আলু-১১’ নামে ২০১৩ সালে জাতীয় বীজ বোর্ড কর্তৃক অনুমোদিত হয়। লতার কাণ্ড বেগুনী ও পাতা সবুজ। কন্দমূলের চামড়া লাল ও শাঁস হালকা হলুদ, কন্দমূলের গড় ওজন ১৮০-২০০ গ্রাম, শুষ্ক বস্তুর পরিমাণ ৩৫.৪৪%, ভিটামিন-এ ৫০০ আ.এ/১০০ গ্রাম। জীবনকাল ১২০-১৩০ দিন। সাধারন অবস্থায় এর ফলন হেক্টরপ্রতি প্রায় ৩৫-৪০ টন। বাংলাদেশের সব অঞ্চলে এ জাতের চাষ করা যায়। জাতটিতে উইভিলের আক্রমণ কম হয়।

বারি মিষ্টি আলু-১২

আন্তর্জাতিক আলু গবেষণা কেন্দ্রের মাধ্যমে ২০০৬ সালে কয়েকটি মিষ্টিআলুর লাইন সংগ্রহ করা হয়। বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার পর সিআইপি-৪৪০০০১ লাইনটি প্রতিশ্রুতিশীল প্রতীয়মান হওয়ায় উক্ত লাইনটি 'বারি মিষ্টি আলু-১২' নামে ২০১৩ সালে জাতীয় বীজ বোর্ড কর্তৃক অনুমোদিত হয়। লতার কাণ্ড ও পাতা সবুজ। কন্দমূলের চামড়া হলুদ ও শাঁস কমলা রঙের, কন্দমূলের গড় ওজন ১৬০-১৮০ গ্রাম, শুষ্ক বস্তুর পরিমাণ ২৯.৪৬%, ভিটামিন-এ ৫৮০০ আ.এ/১০০ গ্রাম। সাধারণ অবস্থায় এর ফলন হেক্টরপ্রতি প্রায় ৩৫-৪০ টন। বাংলাদেশের সব অঞ্চলে এ জাতের চাষ করা যায়। জাতটিতে উইভিলের আক্রমণ কম হয়।

বারি মিষ্টি আলু-১৩

আন্তর্জাতিক আলু গবেষণা কেন্দ্রের মাধ্যমে ২০০৬ সালে কয়েকটি মিষ্টিআলুর লাইন সংগ্রহ করা হয়। বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার সিআইপি-৪৪০০১৪ লাইনটি প্রতিশ্রুতিশীল প্রতীয়মান হওয়ায় উক্ত লাইনটি ‘বারি মিষ্টি আলু-১৩’ নামে ২০১৩ সালে জাতীয় বীজ বোর্ড কর্তৃক অনুমোদিত হয়। লতার কাণ্ড ও পাতা সবুজ এবং খাঁজকাটা, কন্দমূলের চামড়া গাঢ় হলুদ ও শাঁস কমলা রঙের, কন্দমূলের গড় ওজন ১৬০-১৮০ গ্রাম, শুষ্ক বস্তুর পরিমাণ ২৮.৯৩%, ভিটামিন-এ ১৩,২০০ আ.এ/১০০ গ্রাম। সাধারন অবস্থায় এর ফলন হেক্টরপ্রতি প্রায় ৩৫-৪০ টন। বাংলাদেশের সব অঞ্চলে এ জাতের চাষ করা যায়। জাতটিতে উইভিলের আক্রমণ কম হয়।

বারি মিষ্টি আলু-১৪

কন্দাল ফসল গবেষণা কেন্দ্রে আন্তর্জাতিক আলু গবেষণা কেন্দ্র হতে কিছু উন্নত লাইন পাওয়া যায় যা কন্দাল ফসল গবেষণা কেন্দ্র হতে মূল্যায়িত হয়েছে। এর মধ্যে ‘বারি মিষ্টিআলু-১৪’ (CIP-441132) জাতটি খুবই প্রতিশ্রুতিশীল হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে। নিম্ন বর্ণিত জাতটির উদ্ভিদতাত্ত্বিক বিবরণ ও চাষাবাদ পদ্ধতি সংক্ষেপে দেয়া হলো।

কাণ্ড মধ্যম পুরু এবং সবুজ বর্ণের। পাতা খাঁজ কাটা, মধ্য শিরা পর্যন্ত পৌঁছায়। কচি ও বয়স্ক পাতার বর্ণ সবুজ কিন্তু কিনারা বেগুনী। পাতার উল্টা দিকের শিরা বেগুনী বর্ণের। কাণ্ডের অগ্রভাগ কিছুটা রোমশ। কন্দমূল লম্বাটে ও অনিয়মিত। কন্দমূলের বর্ণ হালকা গোলাপী ও শাঁস কমলা বর্ণের, শাঁসের শুষ্ক পদার্থের পরিমাণ ২৪.১২°১%। আন্তর্জাতিক আলু গবেষণা কেন্দ্র কর্তৃক প্রদত্ত কালার চার্ট অনুযায়ী প্রতি ১০০ গ্রাম শাঁসে বিটা ক্যারোটিনের পরিমান ৪.৯২ মিলিগ্রাম (প্রায়)।

বারি মিষ্টি আলু-১৫

জাতটি খুবই প্রতিশ্রুতিশীল হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে। নিম্ন বর্ণিত জাতটির উদ্ভিদতাত্ত্বিক বিবরণ ও চাষাবাদ পদ্ধতি সংক্ষেপে দেয়া হলো।

কাণ্ড মধ্যম পুরু এবং সবুজ বর্ণের। পাতা খাঁজ কাটা নয়। কচি ও বয়ষ্ক পাতার বর্ণ সবুজ। পাতার উল্টা দিকের শিরা বেগুনী বর্ণের। কাণ্ডের অগ্রভাগ কিছুটা রোমশ। কন্দমূল লম্বাটে ও অনিয়মিত। কন্দমূলের বর্ণ হালকা গোলাপী ও শাঁস কমলা বর্ণের, শাঁসের শুষ্ক পদার্থের পরিমাণ ২২.৩৯°১%। আন্তর্জাতিক আলু গবেষণা কেন্দ্র কর্তৃক প্রদত্ত কালার চার্ট অনুযায়ী প্রতি ১০০ গ্রাম শাঁসে বিটা ক্যারোটিনের পরিমাণ ৪.৪১ মিলিগ্রাম (প্রায়)।

বারি মিষ্টি আলু-১৬

বৈশিষ্ট্য: কাণ্ড মধ্যম পুরু এবং সবুজ বর্ণের। পাতা খাঁজকাটা নয়। কচি ও বয়ষ্ক পাতার বর্ণ সবুজ। কন্দমূল উপবৃত্তাকার। কন্দমূলের বর্ণ হালকা গোলাপী ও শাঁস কমলা বর্ণের, শাঁসের শুল্ক পদার্থের পরিমাণ ২৮.৯৭°১%। আন্তর্জাতিক আলু গবেষণা কেন্দ্র কর্তৃক প্রদত্ত কালার চার্ট অনুযায়ী প্রতি ১০০ গ্রাম শাঁসে বিটা ক্যারোটিনের পরিমান ১.১৫ মিলিগ্রাম (প্রায়)।

বারি মিষ্টি আলু-১৭

ইন্দোনেশিয়া থেকে সংগৃহীত Antho SP-01 জাতটি সংগ্রহ করে বাংলাদেশের আবহাওয়ায় চাষাবাদ উপযোগিতা যাচাই বাছাই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে উদ্ভাবিত ‘বারি মিষ্টিআলু-১৭’ জাত হিসেবে ২০২১ সালে বাংলাদেশে চাষাবাদের জন্য অনুমোদিত হয়। কাণ্ড মধ্যম পুরু এবং সবুজ বর্ণের। পাতা খাঁজকাটা (Lobed)। কচি ও বয়ষ্ক পাতার বর্ণ সবুজ। কন্দমূলের আকৃতি লম্বাটে ও অনিয়মিত। কন্দের চামড়ার রং বেগুনী এবং শাঁসের রং গাঢ় বেগুনী, শাঁসের শুল্ক পদার্থের পরিমাণ ৩০°১%। প্রতি ১০০ গ্রাম শাঁসে এন্থোসায়ানিনের পরিমাণ ৩৫.৩০ মিলিগ্রাম (প্রায়)। জীবন কাল ১২০-১৩০ দিন। হেক্টর প্রতি ফলন প্রায় ২২-২৫ টন।

বারি মিষ্টি আলু-১৮

মোজাম্বিক থেকে সংগৃহীত Moz 1.15 লাইনটি সংগ্রহ করে বাংলাদেশের আবহাওয়ায় চাষাবাদ উপযোগিতা যাচাই বাছাই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে উদ্ভাবিত ‘বারি মিষ্টিআলু-১৮’ জাত হিসেবে ২০২৪ সালে বাংলাদেশে চাষাবাদের জন্য অনুমোদিত হয়। পাতার উল্টা দিকের শিরা সাদাটে বর্ণের কিন্তু উপরের পৃষ্ঠের শিরার উৎসে বেশ কিছু অংশ পর্যন্ত বেগুনী রঙের। কন্দমূল লম্বাটে ও অনিয়মিত। কন্দমূলের চামড়া লাল ও শাঁস কমলা বর্ণের, শাঁসের শুষ্ক পদার্থের পরিমাণ ২৩.৪৫°১%। প্রতি ১০০ গ্রাম শাঁসে বিটাক্যারোটিনের পরিমাণ ৮.৮৭ মিলিগ্রাম প্রায়। জীবনকাল ১২০-১৩০ দিন। হেক্টর প্রতি গড় ফলন প্রায় ৪৩-৪৫ টন।

উৎপাদন প্রযুক্তি

জমি নির্বাচন ও তার প্রস্তুতি: সুনিষ্কাশিত, উঁচু ও রৌদ্রজ্জ্বলসম্পন্ন জমি মিষ্টি আলু চাষের জন্য নির্বাচন করা প্রয়োজন। বেলে দোআঁশমাটি উত্তম তবে ভাল ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সব ধরণের মাটিতে মিষ্টিআলুর চাষ করা যায়। মাটির অম্লতা (pH) ৫.৬ হলে ভাল। মিষ্টি আলুর জন্য মাটির উপরের ৩০ সে. মি. পর্যন্ত গভীর করে চাষ দিয়ে মাটি ঝুরঝুরা করা প্রয়োজন। মিষ্টি আলু চাষের জন্য এঁটেল মাটি ভাল নয়। এঁটেল মাটিতে চাষ করলে কন্দ চিকন, লম্বা বা অনিয়মিত আকারের হয় ফলে বাজার মূল্য দারুণভাবে কমে যায়।

বংশবিস্তারের জন্য লতা প্রস্তুতি: মিষ্টি আলু সাধারণত লতার কাটিং এর মাধ্যমে বংশবিস্তার করা হয়। রোগ জীবাণু মুক্ত সুস্থ, সবল, পরিপক্ক লতা হতে কাটিং প্রস্তুত করা হয়। লতার কাটিং এর দৈর্ঘ্য ২৫-৩০ সে.মি. (প্রায় ১ ফুট) হওয়া উচিত যাতে ২-৩টি পর্ব বিদ্যমান থাকে। মিষ্টি আলুর লতার প্রথম কাটিং সর্বোত্তম ও ফলন বেশি দেয়।

রোপণের সময়: অক্টোবরের মাঝামাঝী থেকে নভেম্বর মাস পর্যন্ত (কার্তিক থেকে মধ্য অগ্রহায়ণ) মিষ্টি আলুর লতা রোপণ করা যায়।

রোপণ পদ্ধতি ও চারার সংখ্যা: মিষ্টি আলুর লতার কাটিং সমতল বেডে বা উঁচু ভেলি পদ্ধতিতে রোপণ করা যায়। তবে উঁচু ভেলি পদ্ধতিতে ফলন বেশি হয়। সাধারণত চরাঞ্চলে এবং সেচবিহীনভাবে চাষ করলে সমতল জমিতে ফারো করে লতার কাটিং লাগানো হয়। সারি থেকে সারির দুরত্ব ৬০ সে.মি. (২ফুট) এবং চারা থেকে চারার দুরত্ব ৩০ সে.মি. (১ফুট)। লতার অগ্রভাগ মাটির উপরে রেখে দুই থেকে তিনটি পর্ব সমান্তরাল ভাবে মাটির ৪ থেকে ৮ সে.মি. নিচে পুঁতে দিতে হবে।

এ পদ্ধতিতে রোপণ করলে প্রতি হেক্টর জমির জন্য প্রায় ৫৬ হাজার লতার প্রয়োজন হয়। জমিতে পর্যাপ্ত রস না থাকলে লতা লাগানোর পর পরই সেচ দিতে হবে এবং ভালভাবে না লাগা পর্যন্ত প্রয়োজনানুসারে ১-২ দিন পর পর সেচ দেয়া উচিত।

সারের মাত্রা ও প্রয়োগ পদ্ধতি: কৃষক ভাইয়েরা মিষ্টিআলুতে সাধারণত সার দিতে চান না। তবে সর্বোচ্চ ফলনের জন্য সুষম সার সঠিক পদ্ধতিতে প্রয়োগ করা অত্যাবশ্যক। সারের পরিমাণ নির্ভর করে মূলত মাটির প্রকৃত ও প্রকার ফসলের জাত, সেচ ব্যবস্থাপনা ইত্যাদির উপর মিষ্টিআলুর জন্য সারের মাত্রা সারণী-১ এ উল্লেখ করা হলো।

সারণী-১ মিষ্টিআলুর জন্য সারের মাত্রা:

সারের নাম

সারের পরিমাণ

কেজি /হেক্টর

কেজি/বিঘা

কেজি/ শতক

ইউরিয়া

২৫০-২৮০

৩৪.৪-৩৮.৬

০.১৪-০.১৬

টি এস পি

১৪০-১৭০

১৯.৩-২৩.৪

০.০৮-০.১০

এম ও পি

২৩০-২৬০

৩১.৭-৩৫.৫

০.১৩-০.১৫

জিপসাম

৬০-৮০

৮.২৬-১১.০

০.০৩-০.০৫

জিংক সালফেট*

১০-১২

১.৩৮-১.৬৫

০.০০৬-০.০০৭

ম্যাগনেসিয়াম সালফেট*

৯০-১২০

১২.৪-১৬.৫

০১৫-০.১৭

বরিক এসিড*

৬-৮

০.৮৩-১.১০

০.০০৩-০.০০৪

গোবর

১০,০০০

১৩৭৭

৫.৫৯

*জিপসাম, জিংক সালফেট ও বরিক এসিড এলাকাভেদে প্রয়োজন হয়।

সম্পূর্ণ গোবর বা খামারজাত সার, টিএসপি, জিপসাম, জিংক সালফেট ও বরিক এসিড এবং অর্ধেক ইউরিয়া ও এমওপি সার শেষ চাষের সময় জমিতে প্রয়োগ করতে হবে। বাকি অর্ধেক ইউরিয়া ও এমওপি রোপণের ৩৫-৪০ দিনের মধ্যে সারির পার্শ্বে (সারি থেকে উভয় দিকে ১০ সে. মি. দূরে) ফারো তৈরী করে প্রয়োগ করা উত্তম। সারের উপরি প্রয়োগের পর পরই গাছের গোড়ায় অল্প পরিমাণে মাটি উঠিয়ে দিয়ে সেচ দেওয়া প্রয়োজন। চরাঞ্চলে বা সেচবিহীনভাবে চাষ করলে উপরোক্ত রাসায়নিক সার শতকরা ১০-১২ ভাগ কমিয়ে একসঙ্গে জমি প্রস্তুতির শেষ পর্যায়ে প্রয়োগ করতে হবে।

পানি সেচ ও নিষ্কাশন: মিষ্টি আলুর গাছ মাটিতে লেগে গেলে ৩০ দিন, ৬০ দিন ও ৯০ দিন পর বার সেচ দেয়া উচিত। অতিরিক্ত বৃষ্টি হলে পানি নিষ্কাশণের যথোপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। সময়মতো পানি সেচ মিষ্টি আলুর ফলন এবং বাজারজাতকরণের উপযোগী কন্দমূলের সংখ্যা, ওজন ও গুণাগুণ বৃদ্ধি করে।

আগাছা ব্যবস্থাপনা: মিষ্টি আলু দ্রুত বর্ধনশীল ফসল এবং এটি দ্রুত মাটিকে ঢেকে ফেলে ও আগাছাকে অবদমিত করে। তবুও গাছের বৃদ্ধির প্রাথমিক পর্যায়ে আগাছা দমন করা জরুরী। ভাল ফলনের জন্য চারা রোপণের পর এবং সারির উপরি প্রয়োগের আগে কমপক্ষে একবার আগাছা দমন করা অত্যাবশ্যক।

লতা নাড়ানো: চারা রোপণের ৫০-৬০ দিন পর থেকে মাসে অন্তত একবার লতা নেড়ে চেড়ে দিতে হবে। এতে মিষ্টি আলুর পর্ব থেকে শিকড় গজানো তথা বাজারজাত অনুপযোগী কন্দমূল উৎপাদন এড়ানো সম্ভব হয় এবং ফলশ্রুতিতে কন্দের আকার ও ফলন বৃদ্ধি পায়।

পোকা ও দমন ব্যবস্থাপনা: মিষ্টি আলুর উইভিল বিশ্বব্যাপী পরিচিতি একটি ক্ষতিকর পোকা। এটি জমিতে এবং গুদামজাত কন্দমূলে আক্রমণ করে ফলশ্রুতিতে মিষ্টি আলু খাওয়ার অনুপযোগী হয়ে পড়ে।

দমন ব্যবস্থাপনা

  • পোকার আক্রমণমুক্ত সুস্থ্য, সবল মিষ্টি আলুর লতা বা কান্ডের অগ্রভাগ (৩০ সে.মি) জমিতে লাগানো উচিত।

  • মিষ্টিআলুর লতা এডমায়ার দ্রবণে (০.৫ মিলিলিটার/ লিটার পানি) ২০ মিনিট ডুবিয়ে রেখে পরে রোপণ করতে হবে।

  • ফেরোমোন ফাঁদ পেতে পুরুষ উইভিল মেরে ফেলা সম্ভব। এত করে নতুন উইভিলের জম্ম হতে পারে না এবং আস্তে আস্তে উইভিলের সংখ্যা কমে যাবে।

  • গাছের গোড়ায় সময়মতো মাটি উঠিয়ে দিতে হবে।

  • উইভিল আক্রান্ত লতা ও কন্দমূল পুড়িয়ে ফেলতে হবে অথবা গর্ত করে মাটিতে পুঁতে রাখতে হবে।

  • হেক্টরপ্রতি ১৫ কেজি হারে ডায়াজিনন ১৪ জি /কারবোফুরান জি/ প্রয়োগ করে হাল্কা সেচ দিতে হবে।

  • মিষ্টি আলুর লতা বা কান্ডের অগ্রভাগ (৩০ সে.মি.) জমিতে লাগানো উচিত। লতার অগ্রভাগে সাধারণত মিষ্টি আলুর উইভিলের ডিম থাকে না।

  • মিষ্টি আলুর উইভিল পোকা দমনে সেক্টর ফেরোমন ট্রাপ এর সাথে মাটি উঠানো ( Earthing Up) এবং কার্বোফুরান ৫জি প্রয়োগের মাধ্যমে এই পোকা দমন করা যায়। সেক্টর ফেরোমন ট্রাপ+মাটি উঠানো (মাটি উঠানো কমপক্ষে তিন বার-৩০, ৬০, ৯০ দিনে করতে হবে) + কার্বোফুরান ৫ জি (মিষ্টি আলুর লতা লাগানোর ৬০ দিন পর প্রয়োগ করে সেচ দিতে হবে)।

  • মিষ্টি আলু সংরক্ষণের সময় উইভিল আক্রমণমুক্ত কন্দমূল শুকনা বালি দিয়ে ঢেকে রাখতে হবে। মেঝেতে প্রথমে সে.মি পুরু একটি শুকনা বালির স্তর সাজানো যেতে পারে। এরপর ৭৫ সে.মি পুরু পর্যন্ত মিষ্টি আলুর স্তর সাজাতে হবে। মিষ্টি আলুর উপরে আবার ১০ সে.মি পুরু বালির স্তর দিয়ে ঢেকে দিতে হবে।

  • আক্রান্ত আলু, দুপ্রান্ত হতে দ্রুত নরম ও আর্দ্র হয়ে পচে যায় যা নরম পচা রোগে আক্রান্ত সংরক্ষিত মিষ্টি আলু গাজন এর গন্ধ ছড়াতে থাকে।

  • আক্রান্ত আলুর উপরিভাগে মাইসেলিয়ামের পুরু স্তর দেখা যায়। এছাড়া প্যাথোজেনের কাল বর্ণের ফ্রুটিং বড়িও দেখা যায়।

  • জমি হতে টিউবার উত্তোলন, পরিবহন, সংরক্ষণ প্রভৃতির সময়ে খেয়াল রাখতে হবে যাতে টিউবার আঘাত প্রাপ্ত না হয়।

  • সংরক্ষণের পূর্বে টিউবার ভাল করে কিউরিং করতে হবে।

  • এ রোগ কমানোর জন্য কাটা, ছেড়া থেতলানো টিউবার বেছে শুধু নিখুঁত টিউবার সংরক্ষণ করতে হবে।

  • এ রোগের আক্রমণে আক্রান্ত গাছ ধীরে ধীরে কাল হয়ে যায়।

  • গুদামজাত অবস্থায় টিউবারেও এ রোগ দেখা যায়। টিউবারে এ রোগের আক্রমণে কাল দাগ পড়ে।

  • পরবর্তীতে পচন শুরু হয়ে পুরো টিউবারটি পচে নষ্ট হয়ে যায়।

  • সংরক্ষিত টিউবারকে এ রোগের আক্রমণ হতে রক্ষা করতে টিউবারকে সংরক্ষণের পূর্বে ভালভাবে কিউরিং করে নিতে হবে।

  • এ রোগ কমানোর জন্য কাটা, ছেড়া, থেতলানো টিউবার বেছে শুধু নিখুঁত টিউবার সংরক্ষণ করতে হবে।

  • ফসল উঠানোর পর প্রতি লিটার পানিতে ১ মিলি ডায়থেন এম-৪৫ অথবা রিডোমিল গোল্ড প্রয়োগ করে তা টিউবারে স্প্রে করে এ রোগ দমন করা যায়।

  • মিষ্টি আলুর পাতায় হালকা থেকে গাঢ় মোটল দাগ পড়ে।

  • গাছের আকার ছোট হয়ে যায়।

  • মিষ্টি আলুর রাসেট ক্রাক, ভেইন ক্লিয়ারিং, ভেইন ফিদারিং এবং ক্লোরোটিক স্পট এ রোগের অন্যতম লক্ষণ।

  • রোগ মুক্ত লতা লাগানো।

  • পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন চাষাবাদ করলে রোগের প্রকোপ কমানো যায়।

  • জাব পোকা দমনের মাধ্যমে এ রোগের বিস্তার রোধের জন্য এডমায়ার নামক কীটনাশক ০.১% হারে প্রতি ১৫ দিন পর পর ২-৩ বার স্প্রে করা।

  • এ রোগে মিষ্টি আলুর পাতা খুব ছোট হয়ে যায়।

  • মিষ্টি আলুর পাতা উর্ধ্ধমুখী হয়ে কুকড়িয়ে যায়।

  • রোগমুক্ত লতা লাগানো।

  • পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন চাষাবাদ করা

  • এডমায়ার নামক কীটনাশক ০.১% হারে প্রতি ১৫ দিন পর পর স্প্রে করে সাদা মাছি পোকা দমনের মাধ্যমে এ রোগের বিস্তার রোধ করা।

  • পাতায় হালকা মোজাইক বা হালকা হলুদ রঙ ধারণ করা।

  • গাছ ছোট হয়ে যাওয়া এ সব ভাইরাসের মূল লক্ষণ।

  • এ রোগের ফলে মিষ্টি আলুর ফলন কিছুটা হ্রাস পায়।

  • রোগমুক্ত গাছ থেকে লতা সংগ্রহ করে ব্যবহার করতে হবে।

  • এ ভাইরাস রোগের বিস্তার রোধের জন্য এদের বাহক পোকা কীটনাশকের মাধ্যমে দমন করতে হবে।

কন্দমূল উত্তোলন ও ফলন: চারা রোপণের ১২০ থেকে ১৪০ দিন পর কন্দমূল উত্তোলন উপযোগী হয়ে তবে ১৬০ দিনের বেশি রাখলে শাঁস আঁশযুক্ত হয়। মাটির সাধারন ‘জো’ অবস্থায় কোঁদাল দ্বারা কুপিয়ে মিষ্টি আলু উত্তোলন করা হয়। উত্তম ব্যবস্থাপনায় উচ্চফলনশীল মিষ্টি আলুর জাতগুলোর ফলন ৩৫-৪০ টন /হেক্টর হয়ে থাকে।

মিষ্টি আলু সংরক্ষণ:

মিষ্টি আলুর সংরক্ষণ গুণ খুব একটা আশাপ্রদ নয়। বাংলাদেশে মিষ্টি আলু সংগ্রহকালীন সময় মার্চ-এপ্রিল মাসে (মধ্য ফাল্গুন থেকে মধ্য বৈশাখ) তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা দ্রুত বৃদ্ধি পায়, ফলে উইভিলের আক্রমণ বৃদ্ধি পায় এবং কন্দমূল সহজেই নষ্ট হয়। মিষ্টি আলু সংরক্ষণের পূর্বে কিছু সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হয়। যেমন: ১. মিষ্টি আলু সংগ্রহের সময় মাটি সাধারণ ‘জো’ অবস্থায় অর্থাৎ মাটি যেন কাদাময় না থাকে। ২. ফসল সংগ্রহের সময় পূর্বে লতা টান দিয়ে না ছিড়ে কাঁচি দ্বারা কেটে আলাদা করতে হবে। ৩. সংগ্রহের পর মিষ্টি আলু ৭-১০ দিন ছায়ায় ছড়িয়ে রেখে কিউরিং করে নিতে হবে। ৪. রোগাক্রান্ত কাটা বা থেতলানো এবং উইভিল আক্রান্ত মিষ্টি আলু দ্রুত বাছাই করে আলাদা করে ফেলতে হবে। ৫. কন্দমূলের ত্বক যাতে আঘাতপ্রাপ্ত না হয় সেজন্য ফসল সংগ্রহ থেকে সংরক্ষণ পর্যন্ত সকল কার্যক্রম সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে। এরপর কিউরিংকৃত বাছাই করা নিখুঁত মিষ্টি আলু উত্তম বায়ু চলাচলযুক্ত ঘরে শুকনা বালি বিছিয়ে তার উপর একস্তর মিষ্টি আলু (৭৫ সে.মি) আবার বালুর স্তর (১০ সে.মি) এভাবে ৫-৬ টি স্তরে সংরক্ষণ করা হয়। বায়ু চলাচলযুক্ত ঘর যেখানে তাপমাত্রা ১৬-১৮ ডিগ্রী সে. থাকে সেখানে মিষ্টি আলু ৫-৬ মাস সংরক্ষণ করা যায়।

ব্যবহার: রুপান্তরিত কন্দমূল এবং লতার কচি ডগা মানুষের ভক্ষণযোগ্য অংশ। বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলায় মিষ্টি আলুর কচি ডগা সবজি হিসেবে খাওয়া হয়। এটি একটি উপাদেয় ও পুষ্টিকর সবজি। মিষ্টি আলুর কন্দ সাধারণত পুড়িয়ে সিদ্ধ করে খাওয়া হয় । মিষ্টি আলুর পেকটিন হতে জ্যাম, জেলি ও মারমালেট প্রস্তুত করা যায়। এছাড়া স্টার্চ/শর্করা, সিরাপ, এ্যালকোহল এবং বেকিং ও কনফেকশনারী শিল্পে এটির বহুল ব্যবহারের সম্ভবনা আছে। এ ছাড়াও উন্নত মানের আলু সিদ্ধ করলে কিছুটা নরম হয়। সিদ্ধ মিষ্টি আলু দুধের সাথে মিশিয়ে বা পায়েশ তৈরি করে খাওয়ানো যায়। এছাড়া মিষ্টিআলু টুকরা টুকরা করে খিচুড়ী রান্না করে বা ময়দার সাথে মিশিয়ে রুটি তৈরী করেও শিশুদের খাওয়ানো সম্ভব। সুতরাং ভিটামিন-এ সমৃদ্ধ মিষ্টি আলু আমাদের ভিটামিন-এ চাহিদা পূরণে এবং এর বহুমুখী ব্যবহার কৃষি অর্থনীতিতে বৈচিত্রময় ভূমিকা রাখতে পারে।

মিষ্টি আলুর অন্যান্য পরিচর্যা

মিষ্টি আলুর উইভিল পোকা

পূর্ন বয়স্ক উইভিল প্রায় ৬ মি.মি লম্বা এবং ১.৪ মি.মি চওড়া হয়ে থাকে। এ পোকার মাথার শুড়ের মতো একটি মুখাংশ আছে। মাথা এবং শাখার উপরিভাগ গাঢ় নীল রং এর চোখ ও পা উজ্জল লাল-কমলা বর্ণের। কীড়া কন্দমূলের ভিতরে আঁকাবাঁকা সুড়ঙ্গ করে ক্ষতি করে থাকে। উইভিল আক্রান্ত কন্দমূল খাওয়ার অযোগ্য হয়ে পড়ে।

প্রতিকার

মিষ্টি আলুর বিভিন্ন রোগ ও তার দমন ব্যবস্থাপনা

মিষ্টি আলু বাংলাদেশের শর্করা সমৃদ্ধ খাদ্য ফসলের অন্যতম হলেও, পূর্বে এটি অবহেলিত ছিল। তবে বর্তমানে পুষ্টিমানের বিবেচনায় এটি এ দেশে ধান, গম, আলুর পরই অবস্থান করছে। এতে প্রচুর শর্করা, খনিজ ও ভিটামিন বিশেষ করে ভিটামিন এ রয়েছে। এ সকল কারণে এর চাষ দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। নিম্মে মিষ্টি আলুর বিভিন্ন রোগের লক্ষণ সহ এদের প্রতিকার দেয়া হল।

নরম পচা রোগ (Soft Rot)

এ রোগটি রাইজোপাস রট নামেও পরিচিত। এ রোগটি প্রধানত সংরক্ষিত মিষ্টি আলুতে দেখা যায়। এটি সংরক্ষিত অবস্থায় মিষ্টি আলুর সবচেয়ে মারাত্মক রোগ।

রোগের কারণ: রাইজোপাস নিগরিকানস নামক এক ধরণের ছত্রাক দ্বারা এ রোগটি হয়ে থাকে।

রোগের লক্ষণ:

রোগ দমন ব্যবস্থাপনা

কালচে রোগ বা বাক রট/চারকোল রট (Charcol rot)

এ রোগটি প্রধানত সংরক্ষিত মিষ্টি আলুতে দেখা যায়।

রোগের কারণ: ম্যাকরোফোমিনা ফেজিওলিনা/ডিপ্লোডিয়া নাটালেনসিস (Macrophomina phaseolina/Diplodia natalensis) নামক ছত্রাক দ্বারা এ রোগ হয়ে থাকে।

রোগের লক্ষণ:

রোগ দমন ব্যবস্থাপনা

ফিদারী মোটল ভাইরাস রোগ

এটি এক প্রকার ভাইরাস রোগ। এ রোগের ফলে ফলন মারাত্মক হ্রাস পায়।

রোগের কারণ: এই ভাইরাসের নাম মিষ্টি আলুর ফিদারী মোটল ভাইরাস। জাব পোকা দ্বারা এ ভাইরাসটি অসুস্থ গাছ হতে সুস্থ গাছে ছড়িয়ে পড়ে।

ফিদারী মোটল ভাইরাস রোগের লক্ষণ

ফিদারী মোটল ভাইরাস রোগ রোগ দমন ব্যবস্থাপনা

পাতা কোকড়ানো বা লিফ কার্ল ভাইরাস

এটি এক ধরণের ভাইরাস রোগ। এ রোগের আক্রমণে ফলন মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্থ হয় । এ রোগটি সাদা মাছি পোকা দ্বারা ছড়ায়। পাতা কোকড়ানো বা লিফ কার্ল ভাইরাস রোগের লক্ষণ

পাতা কোকড়ানো বা লিফ কার্ল ভাইরাস রোগ দমন ব্যবস্থাপনা

মিষ্টি আলুর মাইলড মোটল, ক্লোরটিক ফ্লেক্স এবং লেটেন্ট ভাইরাস

একাধিক ভাইরাস এ রোগের জন্য দায়ী। এ ভাইরাসটি বাহক পোকার মাধ্যমে আক্রান্ত গাছ হতে সুস্থ গাছে ছড়িয়ে পড়ে।

রোগের লক্ষণ

রোগ দমন ব্যবস্থাপনা

মেটে আলু

বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে জনপ্রিয় একটি সবজি মেটে আলু। অনেকেই এটিকে কন্দ আলু বা গোড়া আলু বলে থাকে। এটি সবজী হিসাবে ব্যবহার হলেও এর পুষ্টিগুণ বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এতে রয়েছে প্রচুর পরিমাণ ভিটামিন, মিনারেল, আমিষ ও শর্করা। এছাড়া মেটে আলু ক্যালসিয়াম, ফসফরাস, সোডিয়াম ও আয়রনের খুবই ভাল উৎস। এটি কোষ্ঠকাঠিন্য নিরাময়ে সহায়তা করে। মেটে আলুতে ডায়োসজেনিন নামক উপাদান থাকে যা মানুষের মস্তিষ্ক ও স্মৃতিশক্তি সতেজ ও কর্মক্ষম রাখতে সহায়তা করে। এই মেটে আলুর প্রধানত রুপান্তরিত কন্দ উৎপন্ন করে সেই সাথে পত্রের অক্ষে বায়বীয় কন্দ উৎপন্ন হয়। দুই ধরনের আলুই খাবার হিসাবে উপাদেয়। সবজির চাহিদা পূরণের পাশাপাশি দেশের মানুষের পুষ্টির চাহিদা, পতিত জমির সঠিক ব্যবহার, সাথী ফসল, নিরাপদ সবজি এবং আর্থিক স্বচ্ছলতা পূরণে মেটে আলু গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। গবেষণা করে এ পর্যন্ত বিএআরআই মেটে আলুর সাতটি জাত উদ্ভাবন করেছে। এ জাতগুলোর সংক্ষিপ্ত বর্ণনা নিম্নে দেওয়া হলো।

মেটে আলুর জাত

বারি মেটে আলু-১

প্রত্যেক হিল বা মাদায় ২-৫টি করে টিউবার থাকে যা গোড়ায় এসে মিলে যায়। টিউবার অনিয়মিত কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রে ক্লাভেট আকৃতির। টিউবারলেট/করম থাকে যা টিউবারের তুলনায় অনেক ছোট এবং সংযুক্ত থাকে। টিউবারের মাংসল অংশ হলুদ বর্ণের এবং বালুর মত যা কাটার পর অক্সিডেশন হতে এক থেকে দুই মিনিট সময় নেয় এবং বাদামী রঙ ধারণ করে, সাথে হালকা গাম/আঠা নির্গত হয়। বুলবিল সংখ্যায় কম এবং ওভেট থেকে ফ্লাটেন্ড আকৃতির হয়। খোসা ঘন বাদামী ও পাতলা এবং হালকা কুঁচিত। মাংসল সাদা ও বেশ আঠালো। শুষ্ক পদার্থের পরিমাণ ২২.২২+১। গড় ফলন ১০৫.৩৯ টন/হেক্টর।

বারি মেটে আলু-২

প্রত্যেক হিল বা মাদায় গড়ে ৫ এর অধিক করে টিউবার থাকে যা সম্পূর্ণ আলাদা কিন্তু গুচ্ছভাবে থাকে। টিউবার অনিয়মিত আকৃতির। বড় আকৃতির টিউবারলেট/করম থাকে যা টিউবার থেকে সহজে আলাদা করা যায়। টিউবারের মাংসল অংশ সাদা ক্রিম থেকে হালকা হলুদ বর্ণের হয়ে থাকে। মাংসল অংশ কাটার পর অক্সিডেশন হতে এক মিনিটের (কয়েক সেকেণ্ড) কম সময় নেয় এবং ঘন বাদামী রঙ ধারণ করে সেই সাথে হালকা গাম/আঠা নির্গত হয়। বুলবিল সংখ্যায় বেশী যা ছোট ছোট হয় এবং ওভেট, ফ্লাটেন্ড ও অনিয়মিত হয়। খোসা হালকা বাদামী ও পাতলা এবং হালকা কুঁচিত। মাংসল সাদা ও আঠালো। শুষ্ক পদার্থের পরিমাণ ২৭.৯৯+১%। ফলন ৯১.৬২ টন/হেক্টর।

বারি মেটে আলু-৩

প্রত্যেক হিল বা মাদায় >৫ টি করে টিউবার থাকে যা সম্পূর্ণ আলাদা কিন্তু একসাথে গুচ্ছভাবে থাকে। টিউবার অনিয়মিত কিন্তু টিউবারলেট/করম থাকে যা সাইজে বড় এবং সংযুক্ত থাকে। টিউবারের মাংসল হালকা হলুদ বর্ণের এবং বালুর মত যা কাটার পর এক মিনিটের মধ্যে অক্সিডেশন হয়ে বাদামী রং ধারণ করে সাথে হালকা গাম নির্গত হয়। বুলবিল শামুকের (Clavate) মত ও গোল-অবলং হয়। খোসা ঘন বাদামী ও মোটা এবং কুঁচিত। মাংসল হলদেটে ও কম আঠালো। শুষ্ক পদার্থের পরিমাণ ২৮.৫৬+১। ফলন ১১৭.৮ টন/হেক্টর।

বারি মেটে আলু-৪

প্রত্যেক হিল বা মাদায় >৫ টি করে টিউবার থাকে যা সম্পূর্ণ আলাদা কিন্তু একসাথে গুচ্ছভাবে থাকে। টিউবার সিলিন্ড্রিকাল (Czlindrical) ও প্রসারিত (Elongated) যার টিউবারলেট/করম থাকে যা সাইজে বড়। টিউবারের মাংসল ক্রিম বর্ণের এবং বালুর মত টেক্সার যা কাটার পর এক থেকে দুই মিনিটের মধ্যে অক্সিডেশন হয়ে বাদামী রং ধারণ করে সাথে হালকা গাম নির্গত হয়। বুলবিল লম্বাটে, ওভেট ও অনিয়মিত হয় যার খোসা ঘন বাদামী ও পুরু এবং কুঁচিত। মাংসল হলদেটে সাদা ও কম আঠালো। শুষ্ক পদার্থের পরিমাণ ২৯.৯৪+১। ফলন ৯৯.৪৯ টন/হেক্টর।

বারি মেটে আলু-৫

প্রত্যেক হিল বা মাদায় ২-৫টি করে টিউবার থাকে যা ঘাড়ে এসে মিলে যায়। টিউবার অনিয়মিত। টিউবারের মাংসল - হলুদ বর্ণের এবং বালুর মত টেক্সার যা কাটার পর এক মিনিটের মধ্যে অক্সিডেশন হয়ে বাদামী রং ধারণ করে সাথে হালকা গাম নির্গত হয়। বুলবিল প্রায়ই গোলাকৃতির হয় যার খোসা ধূসর থেকে হালকা বাদামী ও পুরু এবং মসৃণ। মাংসল সবুজাভহলুদ হয়। শুষ্ক পদার্থের পরিমাণ ২২.৪৮+১। জাতটি বিটা-ক্যারোটিন (২১.৬৫ মি.গ্রা./১০০ গ্রা.) সমৃদ্ধ। ফলন ৪১.৮০ টন/হেক্টর।

বারি মেটে আলু-৬

প্রত্যেক হিল বা মাদায় ১ টি টিউবার থাকে যা। টিউবারের মাংসল হালকা হলুদ বর্ণের এবং বালুর মত টেক্সার যা কাটার পর এক মিনিটের মধ্যে অক্সিডেশন হয়ে বাদামী রং ধারণ করে সাথে হালকা গাম নির্গত হয়। বুলবিল প্রায়ই গোলাকৃতি, অনিয়মিত এবং সংকুচিত হয় যার খোসা বাদামী ও পুরু এবং মসৃণ ও কিছু অংশ অমসৃণ। মাংসল হলুদ কিন্তু চারপাশ সবুজাভ হয়। শুষ্ক পদার্থের পরিমাণ ১৯.৫৯ + ১। জাতটি বিটা-ক্যারোটিন (১৪.২৬ মি.গ্রা./১০০ গ্রা.) সমৃদ্ধ। ফলন ২৮.৯৯ টন/হেক্টর।

বারি মেটে আলু-৭

প্রত্যেক হিল বা মাদায় >৫ টি করে টিউবার থাকে যা ঘাড়ে এসে মিলে যায়। টিউবার অনিয়মিত এবং কখনও হাতের আঙ্গুলের মত। টিউবারের মাংসল ক্রিম বর্ণের এবং বালুর মত টেক্সার যা কাটার পর দুই মিনিটের বেশি সময় লাগে অক্সিডেশন হয়ে হালকা বাদামী রং ধারণ করতে সাথে হালকা গাম নির্গত হয়। বুলবিল প্রায়ই ওভেট, গোলাকৃতি ও অনিয়মিত হয় যার খোসা ঘন বাদামী ও পাতলা এবং অমসৃণ। মাংসল ক্রিম রং হয়। শুষ্ক পদার্থের পরিমাণ ২৯.২৫ + ১। জাতটি বিটা-ক্যারোটিন (৩৩.১৭ মি.গ্রা./১০০ গ্রা.) সমৃদ্ধ। ফলন ৬৮.৬৭ টন/হেক্টর।

উৎপাদন প্রযুক্তি

গাছ: একক (Simple) পাতা ফেদাড়ী এবং গোড়ার দিকে পাতা Alternate ও উপরের দিকের পাতা কাণ্ডের দুই পাশের একই স্থান থেকে উৎপত্তি হয় (Opposite)। পরিপক্ক পাতায় লোব ফাঁকা থাকে তবে কচি পাতায় লোব একটি আরেকটির উপরে দেখা যায়। বোটার গোড়ায় গোলাপী রঙ থাকে। কাণ্ড বাম থেকে ডান দিকে পেঁচানো। চারটি নরম রিহম থাকে। কাণ্ডের দৈর্ঘ্য ৪৮৩ সে.মি. (৫ মাস ১৪ দিন বয়সে) যা সবুজ ও লোমহীন। গিট থেকে গিটের দূরত্ব ২০ সে.মি. (মাটি থেকে ১ মিটার এর মধ্যে)।

জলবায়ু ও মাটি:

মেটে আলুর জন্য সুনিষ্কাশিত গভীর বেলে দোআঁশ মাটি সর্বোত্তম। মাটিতে উত্তম pH হচ্ছে ৫.০-৭.০।

চাষাবাদ পদ্ধতি:

চাষের গভীরতা ২০ সে.মি. (৮") বা তার বেশী হলে কন্দের সঠিক বৃদ্ধির জন্য ভাল। মেটে আলুর বীজ রোপণের তিনটি পদ্ধতি রয়েছে। যথা-

১) ঢিবি পদ্ধতি (Mound planting):

এটি মাটির সমতল ছোট আকারের গর্ত করে উপরের মাটির সাথে জৈব পদার্থ যোগ করে ৫০-৬০ সেমি (২০-২৪") উঁচু স্তুপ তৈরি করা হয়। স্তুপ থেকে স্তুপের দূরত্ব ১-১.২ মিটার (৪০-৪৮")। এই স্তুপ কন্দের সঠিক বৃদ্ধি, সহজে সংগ্রহ ও উচ্চ ফলন দিতে সহায়তা করে। প্রত্যেক স্তুপের মাঝখানে অঙ্কুরিত বীজ কন্দ রোপণ করা হয়।

২) উঁচু ভেলী পদ্ধতি (Ridge planting):

সাধারণত এঁটেল মাটিতে এই পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়। উত্তম রুপে চাষ করা জমিতে ১ মিটার প্রস্থের উঁচু ভেলী তৈরি করা হয়। বীজ কন্দ উঁচু ভেলীতে রোপণ করা হয়। অন্যান্য পদ্ধতির তুলনায় এই পদ্ধতিতে ফলন বেশী হয়।

৩) সমতল পদ্ধতি (Flat planting):

হালকা বেলে মাটিতে এই পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়। জমিতে সাধারণভাবে চাষ দিয়ে প্রস্তুত করে নির্দিষ্ট দূরত্বে সারি করে বীজ কন্দ রোপণ করা হয়।

রোপণের সময়: মধ্য ফেব্রুয়ারি থেকে মে মাস (ফাল্গুন থেকে মধ্য জ্যৈষ্ঠ) পর্যন্ত মেটে আলু রোপণ করা যায়।

রোপণ দূরত্ব ও গভীরতা:

বীজ কন্দ মাটির উপরিতল হতে ১০-১৫ সে.মি. (৪"-৬") গভীরে ও ১.২ মি. × ১.২ মি. (৪' × ৪') বা ১.২ মি. × ০.৯ মি. (৪' × ৩') দূরত্বে রোপণ করা হয়।

বীজ প্রস্তুতি:

খাদ্যোপযোগী মেটে আলুর ছোট আকারের কন্দ, কন্দের কাটা টুকরা বা সেট এবং বুলবিল বীজ হিসাবে ব্যবহৃত হয়। ছোট আকারের কন্দ (২৫০ গ্রাম-১ কেজি) পুরোটাই রোপণ করা হয়। বড় আকারের কন্দ কেটে টুকরা করে অঙ্কুরোদগমের জন্য রেখে দেওয়া হয়।

বীজের হার: ২-২.৫ টন/হেক্টর।

সারের মাত্রা ও প্রয়োগ পদ্ধতি:

মেটেআলুতে জৈব সারের ব্যাপক প্রভাব রয়েছে। হেক্টরপ্রতি ২০ টন গোবর বা খামারজাত সার ও ২ টন ছাই, ২৬০ কেজি ইউরিয়া, ৩০০ কেজি টিএসপি এবং ১৬০ কেজি এমপি সার প্রয়োগ করতে হবে। গোবর বা খামার জাত সার, ছাই ও টিএসপি সারের সবটুকু এবং অর্ধেক এমওপি সার মাদা তৈরির সময় মাদার মাটির সাথে ভালভাবে মিশিয়ে দিতে হবে। ইউরিয়া অর্ধেক এবং অবশিষ্ট এমওপি সারের অর্ধেক বীজ রোপণের ৩৫-৪০ দিন পর এবং অর্ধেক ইউরিয়া ও অবশিষ্ট এমওপি সার বীজ রোপনের ৭০-৮০ দিনের মধ্যে উপরি প্রয়োগ করতে হবে।

আশ্রয়দাতা/খুঁটি দেওয়া:

মেটে আলু লতানো উদ্ভিদ বিধায় বাউনি দেয়া গুরুত্বপূর্ণ। (১) একক খুঁটি (২) পিরামিডীয় খুঁটি (৩) মাচা পদ্ধতি।

সেচ ও নিষ্কাশন: বীজ রোপণ ও বৃদ্ধির প্রাথমিক পর্যায়ে মার্চ থেকে মে (মধ্য ফাল্গুন থেকে মধ্য জ্যৈষ্ঠ) পর্যন্ত মাটির আর্দ্রতা বুঝে ২/৩ টি হালকা সেচ দিলে ফলন ভাল হয় এবং পানি নিষ্কাশনের সুবন্দোবস্ত করতে হবে।

রোগ ও পোকা দমন ব্যবস্থাপনা:

অ্যানথ্রাকনোজ: এ রোগের ফলে পাতায় বৃত্তাকার বাদামী দাগ ও তার চারপাশে হলুদাভ বলয় দেখা যায়। পরবর্তীতে আক্রান্ত বৃত্তাকার অংশ ছিদ্রযুক্ত হয়ে যায়। অতিরিক্ত আক্রমণে গাছের বৃদ্ধি ও ফলন কমে যায়।

প্রতিকার: ১. রোগমুক্ত ভাল বীজ ব্যবহার করতে হবে। ২. অতিরিক্ত আক্রমণে টিল্ট (০.৫ মিলি/লিটার) প্রয়োগ করতে হবে।

বিছা পোকা (Hairy caterpillar): পোকার লার্ভা গাছের পাতায় আক্রমণ করে সবুজ অংশ খেয়ে ফেলে। এরা প্রাথমিক অবস্থায় দলবদ্ধ ভাবে পাতায় অবস্থান করে, পরবর্তীতে আলাদা হয়ে সমস্ত গাছে ছড়িয়ে পড়ে।

ব্যবস্থাপনা: আলোর ফাঁদ দিয়ে মথকে আকৃষ্ট করে ধরে মারা যায়। আক্রমণের মাত্রা বেশী হলে ক্যারাটে ২.৫ ইসি (১ মিলি/লিটার) অথবা ক্লোরোপাইরিফস (২ মিলি/লিটার) স্প্রে করা যেতে পারে।

জুন বিটল (June beetle): এ পোকা কচি পাতায় আক্রমণ করে ছিদ্রযুক্ত করে ফেলে। পোকাগুলি দিনের বেলায় পার্শ্ববর্তী গাছে লুকিয়ে থাকে, সন্ধ্যার পর গাছে আক্রমণ করে।

ব্যবস্থাপনা: সন্ধ্যার পর পোকা সংগ্রহ করে মেরে ফেলতে হবে। আক্রমণ বেশি হলে ক্যারাটে ২.৫ ইসি (১ মিলি/লিটার) অথবা ক্লোরোপাইরিফস (২ মিলি/লিটার) প্রয়োগ করা যেতে পারে। বিকেল বেলা স্প্রে করা উত্তম।

পাতা মোড়ানো পোকা (Leaf roller): পোকার লার্ভা পাতা মুড়িয়ে ভিতরের অংশ খায়। লার্ভাগুলি মোড়ানো পাতার ভিতরে অবস্থান করে। এদের আক্রমণ মারাত্মক নয়।

তাসক মথ (Tussok moth): পোকার লার্ভা গাছের পাতা খেয়ে ফেলে, পাতায় অসম ছিদ্র দেখা যায়। লার্ভাগুলি সুন্দর আকারের হয়।

ব্যবস্থাপনা: মোড়ানো পাতার ভিতর হতে লার্ভা সংগ্রহ করে মেরে ফেলতে হবে। আক্রমণ কম হওয়ায় কীটনাশক প্রয়োগের প্রয়োজন নেই।

ফসল সংগ্রহ: যখন অধিকাংশ পাতা হলুদ বর্ণ ধারণ করে অথবা লতা সম্পূর্ণরূপে শুকিয়ে যায় তখন মেটে আলু উত্তোলনের উত্তম সময়। মেটে আলুর জীবন কাল ৮ থেকে ১১ মাস।

ফলন: মেটে আলুর ফলন প্রজাতি ও উৎপাদন ব্যবস্থাপনার উপর দারুনভাবে নির্ভরশীল। জাতটির কন্দের গড় ফলন ১১৭.৮ টন/হেক্টর।

সংরক্ষণ: মেটে আলু সাধারণ তাপমাত্রা অর্থাৎ ৩০ ডিগ্রি সে. তাপমাত্রায় সহজেই ৬ মাস পর্যন্ত সংরক্ষণ করা যায়। ঠাণ্ডা ও উত্তম বায়ু চলাচলযুক্ত ঘরে ১-২ স্তরে ২-৩ ইঞ্চি বালুর স্তর দিয়ে বিছিয়ে সহজেই সংরক্ষণ করা যায়।

ফাইল ১

এক্সেসিবিলিটি

স্ক্রিন রিডার ডাউনলোড করুন