কনটেন্টটি শেষ হাল-নাগাদ করা হয়েছে: শনিবার, ২৮ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬ এ ০৫:১৬ PM
কন্টেন্ট: ই-কৃষি ই-কৃষি বিভাগ: মসলা প্রকাশের তারিখ: ২৮-০২-২০২৬
চুই লতাজাতীয় একটি সম্ভাবনাময় অর্থকরী ফসল। প্রাকৃতিকভাবেই এটি ভেষজ গুণ সম্পন্ন উদ্ভিদ। চুঁই এর বোটানিক্যাল নাম (Piper chaba), পরিবার (Piperaceae) , জেনাস পিপার piper) এবং স্পেসিস হলো চাবা ( Chaba)। সাধারণত ২ ধরনের চুই গাছ দেখতে পাওয়া যায়, একটি হলো ঝাড় চুই অন্যটি লতানো চুই। লতা সুযোগ পেলে ৪০ থেকে ৫০ ফুট পর্যন্ত বাড়ে। পাতা ২ থেকে ৩ ইঞ্চি লম্বা হয় ও হার্টের মতো আকার। এর কান্ড ধূসর, পাতা পান পাতার মতো সবুজ রঙের। প্রাচীনকাল থেকে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে চুইয়ের আবাদ হয়ে আসছে। এর কান্ড, শিকড়, শাখা-প্রশাখা সবই মসলা হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। দেশের দক্ষিণাঞ্চলে বিশেষ করে খুলনা, যশোর, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা ও পার্বত্য এলাকায় চুইয়ের জনপ্রিয়তা রয়েছে। এসব অঞ্চলে চুইঝালের কান্ড, শিকড়, পাতা বাটা রান্নায় ব্যবহৃত হয়ে থাকে। আঞ্চলিক মসলা গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট, মাগুড়া কর্তৃক ২০২৩ সালে সারা দেশ থেকে চুইঝালের সংগৃহীত জার্মপ্লাজম হতে উপযোগিতা যাচাইয়ের মাধ্যমে বারি চুইঝাল-১ নামে গেছো চুইঝালের সহজে চাষ উপযোগী, দ্রুত বর্ধনশীল একটি জাত অবমুক্ত করে।
চুইঝালের জাত:
বারি চুইঝাল-১
এ জাতটি বহুবর্ষজীবী
গাছের গড় উচ্চতা ১০-১২ মিটার
গাছ প্রতি প্রাথমিক শাখার সংখ্যা গড়ে ৭৫-৮০টি
পাতার দৈর্ঘ্য ১৮-২০ সেমি. এবং প্রস্থ ১২-১৪ সেমি.
পর্বসন্ধীর দৈর্ঘ্য ১৪-১৬ সেমি.
তিন বছর বয়সী গাছের কান্ডের ব্যাস ৬-৮ সেমি.
তিন বছর বয়সী প্রতি গাছের ফলন ৯-১১ কেজি
১.৫-২.০ বছর পর কান্ড বা শাখা সংগ্রহ করা যায়।
বংশ বিস্তার: অঙ্গজ প্রজননের মাধ্যমে সাধারণত চুইয়ের বংশবিস্তার করা হয়ে থাকে। তবে বীজ ও লতার কাটিং দিয়ে বংশ বিস্তার করা যায়। লতা কাটিং পদ্ধতিতে উৎপাদিত চারার বৃদ্ধি এবং ফলন দ্রুত পাওয়া যায়। কাটিং পদ্ধতিতে এর কান্ড বা শাখা ৩০-৩৫ সেমি. লম্বা করে কেটে সরাসরি মাটিতে রোপণ করা হয়। একটি পোড়ে কমপক্ষে ৪ থেকে ৫টি পর্বসন্ধি থাকে। বীজ থেকে বংশবিস্তার জটিল ও সময় সাপেক্ষ বলে চুই চাষি ও নার্সারি মালিকেরা লতা কাটিং পদ্ধতিতে বংশ বিস্তার করে থাকেন।
জমি ও মাটি: দো-আঁশ ও বেলে দো-আঁশ মাটি ও পানি নিষ্কাশনের সুবিধাযুক্ত, ছায়াময় উঁচু জমিতে চুই চাষ করা হয়ে থাকে। চুইঝালের জন্য আলাদা কোন জমির প্রয়োজন হয় না, সাধারণত ফলবাগান বা বৃক্ষ বাগানের মাটি চুইয়ের চাষের জন্য উপযুক্ত। তবে খেয়াল রাখতে হবে চুই গাছের গোড়ার যেন পানি না জমে। বর্তমানে অবশ্য কিছু কৃষি উদ্যক্তা বাণিজ্যিকভাবে মাঠে চুইয়ের বাগান স্থাপনে এগিয়ে আসছেন।
রোপণের সময়: বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ (এপ্রিল-মে) এবং আশ্বিন কার্তিক (অক্টোবর-নভেম্বর) মাস হলো কাটিং বা চারা বা পোড় রোপণের উপযুক্ত সময়। খোলা স্থানে যেমন: পুকুরপাড় অথবা বাড়ির পাশের উঁচু জমিতে ১.৫ মিটার পর পর লাগানো যেতে পারে। উক্ত দূরত্বে শতক প্রতি ১৮-২০টি চারার প্রয়োজন হয়।
কাটিং শোধন: চুইঝালের কাটিং অথবা পোড় রোপণ বা চারা রোপণের আগে অবশ্যই শোধন করে নিতে হবে। প্রতি লিটার পানিতে ২-৩ গ্রাম কার্বেন্ডাজিম গ্রুপের ছত্রাকনাশক মিশিয়ে ৩০ মিনিট ডুবিয়ে রাখার পর পরিষ্কার পানিতে ধুয়ে ফেলে কাটিং বা পোড় রোপণ করতে হয়।
জমি বা মাদা প্রস্তুত: দো-আঁশ ও বেলে দো-আঁশ মাটি এবং পানি নিষ্কাশনের সুবিধাযুক্ত ও ছায়াময় উঁচু জমিতে সাধারণত চুইঝাল চাষ করা হয়। চুইঝালের জন্য আলাদা কোনো জমির প্রয়োজন নেই। সাধারণত ফলবাগান বা বৃক্ষ বাগানের মাটিই চুইঝালের জন্য উপযুক্ত। শুধু খেয়াল রাখতে হবে বর্ষায় বা বন্যায় যেন চুইঝাল গাছের গোড়ায় পানি না জমে। লাগানোর জায়গা ঠিক করার পর সেখানে (৫০ সেমি. x ৫০ সেমি. x ৫০ সেমি.) মাপে গর্ত তৈরি করতে হবে।
সার ব্যবস্থাপনা: চুই চাষে সাধারণত তেমন সার প্রয়োগের প্রয়োজন হয় না। তবে কাটিং বা পোড় রোপণের আগে গর্তে কম্পোস্ট বা আবর্জনা পচা সার এবং ছাই প্রয়োগ করলে চুই গাছের বাড়বাড়তি ভালো হয়। শুষ্ক মৌসুমে সপ্তাহে অন্তত একবার সেচ দেয়া ভালো এবং বর্ষায় যেন চুই গাছের গোড়ায় পানি না জমে সেদিকে বিশেষ খেয়াল রাখতে হবে। চারা রোপণের ১০-১৫ দিন আগে গর্ত প্রতি ১০ কেজি পচা গোবর সার, ১১৫ গ্রাম টিএসপি, ১০০ গ্রাম এমওপি সার মিশিয়ে দিয়ে গর্ত ভরাট করে রেখে দিতে হয়। প্রতি বছর বর্ষার আগে ও পরে গাছের গোড়া থেকে ৫০ সেমি. দূরে সার প্রয়োগ করতে হবে। সার দেয়ার সময় গাছের গোড়ায় মাটি হালকা করে কুপিয়ে দিতে হবে এবং সেচ প্রদান করতে হবে। শুকনো মৌসুমে ১৫ দিন অন্তর অন্তর সেচের ব্যবস্থা করতে হবে। বর্ষাকালে চুইঝালের গোড়ায় যাতে পানি জমে না যায় সে দিকে বিশেষ খেয়াল রাখতে হবে।
পরিচর্যা: চুই লতা জাতীয় ফসল। এ কারণে আম, জাম, সুপারি, নারিকেল, মেহগনি, কাফলা বা জিয়ল গাছ বাউনি হিসেবে চুই চাষের জন্য ব্যবহৃত হয়ে থাকে। বাউনি না দিলেও চুই ঝোপ আকারে মাটিতে বৃদ্ধি পেয়ে থাকে। তবে এ ক্ষেত্রে বর্ষা মৌসুমে গাছের ক্ষতি হয়। কৃষকের মতে আম ও কাফলা গাছে চাষকৃত চুঁই উন্নতমানের ও সুস্বাদু হয়ে থাকে।
ফসল সংগ্রহ ও ফলন: বারি চুইঝাল-১ লাগানোর বা রোপণের ১.৫-২ বছরের মধ্যে খাওয়ার উপযোগী হয়। তবে ভালো ফলনের জন্য ৪-৫ বছরের গাছ উত্তম। হেক্টর প্রতি প্রায় ২ থেকে ২.৫ মে.টন পর্যন্ত ফলন পাওয়া যায়। ৩ বছরের একটি গাছ থেকে প্রায় ৯ থেকে ১১ কজি পর্যন্ত ফলন পাওয়া যায়।
সংরক্ষণের নিয়ম: চুইঝাল কান্ড বাকলসহ পলিথিনে মুড়ে ডিপ ফ্রিজারে রেখে দীর্ঘদিন পর্যন্ত সংরক্ষণ করা যায়। ফ্রিজ ছাড়াও চটের বস্তায় মুড়ে মাঝে মাঝে পানির ছিটা দিয়েও ৩০-৪০ দিন পর্যন্ত চুইঝাল সংরক্ষণ করা যায়। এছাড়াও চুইঝালকে শুকিয়ে গুঁড়া আকারেও দীর্ঘদিন রাখা যায়। পাউডার তৈরির জন্য চুই গাছ কেটে এনে সেটিকে পানি দিয়ে ভালোভাবে পরিষ্কার করে ছোট ছোট টুকরো করে কাটতে হয়। কাটার পর ছোট টুকরোগুলোকে ৪/৫ দিন প্রখর রোদে শুকিয়ে নিতে হয়। শুকানো টুকরোগুলোকে মেশিনে গুড়ো করে প্যাকেট বা কৌটায় সংরক্ষণ করা হয়। ১০-১২ কেজি কাঁচা চুইঝাল শুকিয়ে ১ কেজি পাউডার তৈরি করা হয়।
চুইয়ের ব্যবহার: চুইয়ের কান্ড ও শাখা খাওয়ার জন্য ব্যবহৃত হয়। বড় বড় মাছ বা যে কোন মাংসের সাথে চুঁই খাওয়া হয়ে থাকে। অঁশযুক্ত নরম কান্ডের স্বাদ ঝাল প্রকৃতির। কাঁচা কান্ড অনেকে লবন দিয়ে খেয়ে থাকেন। ছোলা ভুনা, আচার, হালিম, চটপটি, ঝালমুড়ি, চপ ও ভর্তা তৈরীতেও চুঁয়ের ব্যবহার দেখতে পাওয়া যায়।
ঔষধি গুণাগুণ: চুইঝালে ০.৭ ভাগ সুগন্ধি তেল রয়েছে, অ্যালকালয়েড ও পিপালারটিন রয়েছে ৫ শতাংশ। এ ছাড়াও পরিমাণমতো গ্লুকোজ, ফ্রুক্টোজ, গ্লাইকোসাইডস, সিজামিন, পিপলাসটেরল রয়েছে। এর কান্ড, পাতা, শিকড়, ফুল, ফল সবই ভেষজ গুণাগুণসম্পন্ন। চুইয়ের শিকড়ে রয়েছে ০.১৩ থেকে ০.১৫ শতাংশ পিপারিন যা মানব দেহের জন্য খুবই উপকারী। চুইয়ের ভেষজ গুণাগুণের মধ্যে রয়েছে-
গ্যাস্ট্রিকের সমস্যার সমাধান করে;
কোষ্ঠ্যকাঠিন্য দূর করে;
খাবারের রুচি বাড়ায় ও ক্ষুদামন্দা দূর করতে কার্যকর ভূমিকা রাখে;
পাকস্থলী ও অন্ত্রে প্রদাহ দূর করতে চুঁইঝাল বেশ উপকারী;
স্নায়ুবিক উত্তেজনা ও মানসিক অস্থিরতা প্রশমন করে;
ঘুমের ওষুধ হিসেবে ভালো কাজ করে;
শারীরিক দুর্বলতা কাটায় ও শরীরের ব্যথা সারাতে ভূমিকা রাখে;
প্রসূতি মায়েদের শরীরে ব্যথা সারাতে সাহায্য করে;
কাশি, কফ, হাঁপানি, শ্বাসকষ্ট, ডায়রিয়া ও রক্তসল্পতা দূর করতে কার্যকর ভূমিকা রাখে;
মাত্র ১ ইঞ্চি পরিমাণ চুঁইয়ের সাথে আদা পিষে খেলে সর্দির সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়া যায়।
অর্থনৈতিক গুরুত্ব: নার্সারি শিল্পে চুইঝাল একটি মূল্যবান উপকরণ হিসেবে কাজ করে। পাহাড়ি কিংবা দুর্গম এলাকায় চুই প্রাকৃতিকভাবেই জন্মে থাকে। বর্তমানে দেশের দক্ষিণাঞ্চলে বিশেষকরে বৃহত্তর বরিশাল, খুলনা, ফরিদপুর, যশোরসহ দেশের নবখানেই কমবেশি চুইয়ের আবাদ ও বিপণন হতে দেখা যায়। শুকনো ও কাঁচা উভয় অবস্থায় চুই বিক্রি হয়ে থাকে। প্রতি কেজি কাঁচা চুইঝাল লতা ৩০০ থেকে ১৫০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়। তবে শাখা ডাল থেকে শিকড়ে ঝাল বেশি বলে এর মূল্যও একটু বেশি। শুকনো চুইয়ের দাম আরও বেশি। একজন সাধারণ কৃষক মাত্র ২-৪টি চুই গাছের চাষ করে নিজের পরিবারের চাহিদা মেটাতে পারেন। অধিক ফলনের মাধ্যমে বাণিজ্যিকভাবে পারিবারিক অন্যান্য চাহিদা মেটানো সম্ভব হয়। দেশের সকল এলাকায় চুইয়ের আবাদ বৃদ্ধির মাধ্যমে হাজার কোটি টাকা সাশ্রয় করা যেতে পারে। বর্তমানে এ ফসলটি বিদেশে রপ্তানির মাধ্যমে বৈদেশিক মূদ্রা অর্জন সম্ভব হচ্ছে। তাই চুই আমাদের দেশে একটি সম্ভবনাময় গুরুত্বপূর্ণ অর্থকরী ফসল।
চুইঝাল ব্যবহারের নিয়ম: চুইঝালের কান্ডের ছাল বা বাকল ছাড়িয়ে ১.৫-২.০ ইঞ্চি পরিমাণ ছোট ছোট টুকরো করে কেটে নিতে হবে। কান্ড দেখতে কাঠের মতো হলেও রান্নার পর সম্পূর্ণ নরম হয়ে যায়। এই ছোট টুকরো পরিষ্কার পানিতে ধুয়ে মাছ, মাংস, খিচুরি, ডাল ও অন্যান্য খাবারের সাথে রান্না করে খাওয়া যায়। খাওয়ার সময় ডাটার মতো চিবিয়ে খাওয়া হয়।