কনটেন্টটি শেষ হাল-নাগাদ করা হয়েছে: শনিবার, ২৮ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬ এ ০৪:১৯ PM

চিয়া বীজের উৎপাদন প্রযুক্তি

কন্টেন্ট: ই-কৃষি ই-কৃষি বিভাগ: দানাদার প্রকাশের তারিখ: ২৮-০২-২০২৬

চিয়া বীজের উৎপাদন প্রযুক্তি

চিয়া বাংলাদেশে একটি নতুন সম্ভবনাময় ফসল, যা খরা এবং চরাঞ্চলে এই গুরুত্বপুর্ণ ফসলটি চাষের সম্ভাবনা রয়েছে। চিয়া মূলত মরুভূমির উদ্ভিদ যা অল্প সেচে জন্মাতে পারে। চিয়া বীজে প্রোটিন ১৫-২৫%, লিপিড ৩০-৩৩%, ফাইবার ১৮-৩০% এবং শর্করা ২৬-৪১% থাকে। চিয়াতে ওমেগা-৩ ফ্যাটি এসিড থাকে যা শরীরের ক্ষতিকারক কোলেস্টেরলের পরিমাণ কমিয়ে বিভিন্ন ধরনের হৃদরোগের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে। তাছাড়া চিয়া বীজ শরীরের শক্তি বৃদ্ধি করে হজম ও কোষ্ঠকাঠিন্য দূরীকরণে সহায়তা করে। এটি অ্যান্টিঅক্সিড্যান্ট সমৃদ্ধ, ওমেগা-৩ ফ্যাটি এসিডের উৎস, উচ্চমানের প্রোটিন ও ফাইবার সমৃদ্ধ। এতে রয়েছে দুধের চেয়ে ৫ গুণ বেশি ক্যালসিয়াম, কমলার চেয়ে ৭ গুণ বেশি ভিটামিন সি, পালংশাকের চেয়ে ৩ গুণ বেশি আয়রন (লোহা), কলার চেয়ে দ্বিগুণ পটাশিয়াম, স্যামন মাছের থেকে ৮ গুণ বেশি ওমেগা-৩ ফ্যাটি এসিড।

মাটি ও বালি ছাড়া স্বল্প জায়গায় চিয়া সিড রোপণ করবেন যেভাবে

উপযোগীতা: গাজীপুর, দিনাজপুর, জামালপুর, যশোর, রংপুর, চট্টগ্রামের হাটহাজারীসহ দেশের উত্তর পশ্চিমাঞ্চলের খরাপ্রবণ রাজশাহী ও বরেন্দ্র অঞ্চল চিয়া চাষ করা যেতে পারে। অনাবাদী ও পতিত জমি উঁচু থেকে মাঝারি উঁচু এবং চরাঞ্চলে এটি চাষযোগ্য।

বারি চিয়া-১: বারি চিয়া-১ জাতটি Lamiaceae পরিবারের সদস্যভুক্ত (Salvia hispanica) একটি পুষ্টিকর ভোজ্য দানাশস্য ও শুষ্ক আবহাওয়ার ফসল। উদ্ভিদ প্রজনন বিভাগ, বারি ২০২৩ সালে বারি চিয়া ১ জাতটি অবমুক্ত করে। গাছের গড় উচ্চতা ৯৬-১০০ সেমি.। গড়ে ১৯-২৫টি করে শীষ থাকে এবং শীষের দৈর্ঘ্য গড়ে ২৩.৪-২৬.৬ সেমি.। জীবনকাল ৯৬-১০৪ দিন। জাতটির ফলন ১০০৯-১১০০ কেজি/হে.। বীজ ছোট ডিম্বাকৃতির এবং প্রায় ১ মিমি. ব্যাস বিশিষ্ট । হাজার দানার ওজন ১.২ গ্রাম। বীজে উচ্চ মাত্রার ওমেগা-৩ ফ্যাটি এসিড (৫৬.৮%) ও ক্যালসয়িাম (৫.২%) বিদ্যমান। কাণ্ড তুলনামূলকভাবে শক্ত ও মজবুত বলে ঝড়-বাতাসে সহজে হেলে ও ভেঙ্গে পড়ে না এবং তেমন রোগ ও পোকামাকড়ের আক্রমণ হয় না।

মাটি: চিয়া সবধরনের মাটিতে জন্মাতে পারে। তবে বেলে দো-আঁশ মাটিতে সবচেয়ে ভালো হয়। জমি ভালোভাবে চাষ দিয়ে মাটি ঝুরঝুরে করে নিতে হবে।

বীজ বপনের সময়: নভেম্বর মাসের ২য় খেকে ৩য় সপ্তাহ বীজ বপনের উপযুক্ত সময়। অতঃপর ২-৩ সেমি. গভীরে সারিতে বীজ বপন করতে হবে। বপন করার পর বীজ আলগা মাটি দিয়ে ঢেকে দিতে হবে। বপনের পর হালকা সেচ দেওয়া প্রয়োজন।

চারা পাতলাকরণ: বীজ গজানোর ১২-১৫ দিন পর চারা পাতলা করে দিতে হবে। ভালো ফলন পেতে হলে অবশ্যই ২-৩টি সেচ দিতে হবে। চিয়া চারা অবস্থায় ২-৩ দিন পর্যন্ত জলাবদ্ধতা সহ্য করতে পারে ।

বীজের হার ও বপণ দূরত্ব: ৫-৬ কেজি/হেক্টর। বিঘায় (৩৩ শতকে) ০.৮ কেজি বীজের প্রয়োজন হয়। সারি থেকে সারির দূরত্ব ৪০ সেমি. এবং প্রতি সারিতে প্রায় ২০-২৫ সেমি. পরপর বীজ বপন করতে হবে।

সার ব্যবস্থাপনা:

সারের নাম

হেক্টরপ্রতি সারের পরিমাণ (কেজি)

বিঘাপ্রতি সারের পরিমাণ

ইউরিয়া

১৫০ কেজি

২০ কেজি

টিএসপি

৮০ কেজি

১০.৬ কেজি

মিউরেট অব পটাশ

৬০ কেজি

৮ কেজি

সাধারণত সম্পূর্ণ মিউরেট অব পটাশ ও টিএসপি সার ১/৩ ভাগ ইউরিয়ার সাথে মিশ্রিত করে জমি তৈরির সময় ব্যাসাল ডোজ হিসেবে প্রয়োগ করা হয়। যেসমস্ত জমিতে বোরন ও জিংকের ঘাটতি আছে সেসব জমিতে কাঙ্ক্ষিত ফলন পেতে হেক্টর প্রতি ৫ কেজি হারে বোরিক এসিড ও জিংক সালফেট প্রয়োগ করত হবে। বাকি ইউরিয়া ২ বারে টিলারিং ও বৃদ্ধি পর্যায়ে প্রয়োগ করতে হবে। বৃষ্টিনির্ভর অবস্থায় চাষাবাদ করলে সকল সার ব্যাসাল ডোজ হিসেবে প্রয়োগ করা হয়।

আগাছা ব্যবস্থাপনা: জমিতে প্রয়োজনীয় নিড়ানি দিয়ে আগাছামুক্ত রাখতে হবে। প্রতিটি সেচের পরে মাটির উপরিভাগের চটা ভেঙ্গে দিতে হবে যাতে মাটিতে পর্যাপ্ত বাতাস চলাচল করতে পারে। প্রয়োজনীয় নিড়ানী দিলে মাটিতে শিকড়ের বৃদ্ধি ভালো হয়।

সেচ প্রয়োগ: ২-৩টি হালকা সেচের প্রয়োজন হয়। বীজ বপনের ২০-২৫ দিন পর ১ম এবং ৫০-৫৫ দিন পর ২য় সেচ (গাছে ফুল আসার সময়) দিতে হবে। প্রতি সেচে খুব অল্প পরিমাণ পানি প্রয়োগ করতে হবে। তবে চিয়া বিনা সেচেও চাষ করা সম্ভব।

ফসল সংগ্রহ: গাছের ফল যখন শুষ্ক খড়ের রঙ ধারণ করে ও গাছের পাতা শুকিয়ে যায় তখন গাছগুলোকে কেটে শক্ত মাটিতে বা মাটির উপর পলিথিন বিছিয়ে অথবা পাকা মেঝেতে ছড়িয়ে রেখে শুকাতে হবে। তারপর রৌদ্রোজ্জ্বল দিনে লাঠি দিয়ে গাছের ফলগুলোকে পিটিয়ে মাড়াই করতে হবে। ঝাড়াই করার জন্য কুলা ব্যবহার করা উত্তম। বীজ বপনের ১০৫ দিন থেকে ১১০ দিন পর ফসল সংগ্রহ করা যায়।

ব্যবহার প্রক্রিয়া: বিশেষ কোনো পদ্ধতির প্রয়োজন হয় না। চিয়ার বীজ সহজে হজমযোগ্য হওয়ায় সম্পূর্ণ দানা খাওয়া যায়। চিয়া বীজকে সারারাত পানিতে ভিজিয়ে সহজেই শরবত হিসেবে খাওয়া যায়। এছাড়াও সালাদ বা প্রস্তুতকৃত বিভিন্ন মিষ্টি খাবারের উপর ছিটিয়ে পরিবেশন করা যায়। অন্যদিকে চিয়া বীজের মূল্যবান ঔষধি এবং স্বাস্থ্য সুরক্ষাকারী উপাদানসমুহ কাঁচামাল হিসেবে খাদ্যশিল্পে ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা যেতে পারে।

রোগ, পোকামাকড় ও প্রতিকার: এ ফসলে তেমন কোনো রোগ ও পোকামাকড়ের আক্রমণ পরিলক্ষিত হয়নি।

ফলন: ১০০০-১২০০ কেজি/হেক্টর

সূত্র: কৃষি প্রযুক্তি ভাণ্ডার, বাংলাদেশ ‍কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট

কৃষি প্রযুক্তি হাতবই, দশম সংস্করণ, বাংলাদেশ ‍কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট

ফাইল ১

এক্সেসিবিলিটি

স্ক্রিন রিডার ডাউনলোড করুন