কনটেন্টটি শেষ হাল-নাগাদ করা হয়েছে: বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারী, ২০২৬ এ ০১:১১ PM
কন্টেন্ট: ই-কৃষি ই-কৃষি বিভাগ: ফুল প্রকাশের তারিখ: ১৫-০১-২০২৬
প্রচলিত অন্যান্য ফুলের মতো প্রতিনিয়ত আমাদের দেশে এই গ্লাডিওলাস ফুলের যথেষ্ট জনপ্রিয়তা ও চাহিদা বাড়ছে। আর এর একমাত্র কারণ হলো এই ফুল দীর্ঘসময় সজীব থাকে এবং এই গ্লাডিওলাস ফুলের রং ও গঠন খুবই আকর্ষণীয়।
তাই বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায় যেমন-যশোর, সাতক্ষীরা, গাজীপুর এবং সাভার অঞ্চলে বাণিজ্যিকভাবে এই গ্লাডিওলাস ফুলের চাষ হচ্ছে এবং কৃষকরাও অধিক লাভবান হচ্ছেন।
গ্লাডিওলাস ফুলের বিভিন্ন জাত
গ্লাডিওলাস ফুলের অনেক জাত রয়েছে। আর এই গ্লাডিওলাস ফুলগুলোকে বিভিন্ন নামে শ্রেণীবিন্যাস করা হয়ে থাকে। এই গ্লাডিওলাস ফুলের জাতগুলোকে আগাম, মাঝারি ও নাবী জাতে বিভক্ত করা যায়।
বৈশিষ্ট্য | জাত |
আকারের উপর ভিত্তি করে। | বৃহদাকার, বড় ফুল, ক্ষুদ্র ফুল এবং প্রজাপতি ইত্যাদি নামে। |
সিঙ্গেল ও ডাবল জাতও বিদ্যমান। | |
বিভিন্ন রঙের উপর ভিত্তি করে। | সাদা, হলুদ, গোলাপী, ফিকে লাল, লাল, গাঢ় লাল, কমলা, বেগুনী ইত্যাদি। |
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট গ্লাডিওলাস ফুলের কয়েকটি উচ্চফলনশীল জাত উদ্ভাবন করেছে | বারি গ্লাডিওলাস-১, বারি গ্লাডিওলাস-২, বারি গ্লাডিওলাস-৩, বারি গ্লাডিওলাস-৪, বারি গ্লাডিওলাস-৫, বারি গ্লাডিওলাস-৬
|
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট গ্লাডিওলাস ফুলের কয়েকটি উচ্চফলনশীল জাত উদ্ভাবন করেছে। আর সেগুলো হলোঃ-
বারি গ্লাডিওলাস-১
বারি গ্লাডিওলাস-১ জাতটি বাংলাদেশের জলবায়ুতে চাষের জন্য ২০০৩ সালে অনুমোদন করা হয়। জাতটি বর্ষজীবী এবং গাছের উচ্চতা মাঝারী (৫০ সেমি.) ও বেশ শক্ত। ফুলের বোঁটা লম্বা ও অধিক ফ্লোরেট সমৃদ্ধ। লাল রঙের দুটি পাঁপড়িতে হলুদ ছোপ থাকে। সাধারণত পানিতে ফুলের স্থায়িত্বকাল ৭-৮ দিন। ফ্লোরেটের সংখ্যা ৯-১০টি। ফুলের আকার দৈর্ঘ্য ১০ সেমি. এবং প্রস্থ ৮ সেমি.। করমের সংখ্যা ২-৩টি এবং করমেলের সংখ্যা ২৫-৩০টি।
বারি গ্লাডিওলাস-২
আমাদের দেশের জলবায়ুতে সহজে আবাদযোগ্য বারি গ্লাডিওলাস-২ জাতটি ২০০৩ সালে চাষাবাদের জন্য অবমুক্ত করা হয়। এ জাতের গাছ বর্ষজীবী, উচ্চতা মাঝারী ও গাছ বেশ শক্ত। লম্বা বোঁটাসম্পন্ন ফুলে গাঢ় মেজেন্টা রঙের অনেকগুলি ফ্লোরেট থাকে। প্রতি ফ্লোরেটের দুটি পাপড়িতে ক্রিম রঙের ছোপ দেখা যায় এবং অন্যান্য পাঁপড়িতে সাদা বারি গ্লাডিওলাস-৩ স্ট্রাইপ থাকে। প্রতিটি ফুলের ব্যাস ৯.০-১০.০ সেমি. হয়ে থাকে। সাধারণত পানিতে এ ফুল ৯ থেকে ১০ দিন তাজা থাকে।
বারি গ্লাডিওলাস-৩
এটি একটি কন্দ জাতীয় ফুল। সারা বছর এর চাষাবাদ করা যায়, বাজারে চাহিদা আছে এবং বাণিজ্যিক দৃষ্টিকোণ থেকে এ জাতের কাটফ্লাওয়ারের তুলনা নেই। এ গাছের পাতা তরবারীর মত। করম রোপণের উপযুক্ত সময় হচ্ছে মধ্য-অক্টোবর থেকে মধ্য-নভেম্বর। ফুলের রং সাদা এবং ৯.১-৯.৩ সেমি. ব্যাস বিশিষ্ট। স্পাইকপ্রতি ফ্লোরেটের সংখ্যা প্রায় ১৩-১৪টি। সাধারণত স্পাইকের নিচের দিক থেকে ১-২টি ফ্লোরেট উন্মুক্ত হওয়া শুরু হলে স্পাইক কাটার উপযুক্ত সময় হয়েছে বলে ধরে নেয়া হয়। হেক্টরপ্রতি ১.৭৫-২.০০ লক্ষ ফুলের স্টিক পাওয়া যায়। ফুলের সজীবতা প্রায় ৮- দিন থাকে।
বারি গ্লাডিওলাস-৪
কন্দজাতীয় এ ফুলটি সোর্ড লিলি নামে পরিচিত। এ গাছের পাতা তরবারীর মতো এবং দু’সারিতে পরপর বিপরীত দিকে অবস্থান করে। গ্লাডিওলাস বিরুৎ জাতীয় উদ্ভিদ। সারা বছর এ ফুলের চাষাবাদ করা যায়। ফুলের রং গাঢ় গোলাপী এবং প্রায় ৯.১-৯.২ সেমি. ব্যাস বিশিষ্ট। স্পাইক ৭০-৭৫ সেমি. লম্বা এবং ফ্লোরেটের সংখ্যা প্রায় ১২-১৩টি। ফুলের সজীবতা ৮-৯ দিন। জীবনকাল প্রায় ১৪৫-১৫৫ দিন। গড় ফলন প্রায় ২,০০,০০০ স্টিক/হেক্টর। জাতটি ২০০৯ সালে অবমুক্ত করা হয়।
বারি গ্লাডিওলাস-৫
এটি একটি কন্দ জাতীয় হলুদ রঙের ফুল। তাপ সহনশীল হওয়ায় সারা বছর চাষ করা যায়। সারা দেশে চাষ উপযোগী, বিশেষ করে দক্ষিণাঞ্চল ও উত্তরাঞ্চলে। পুষ্পদণ্ড প্রায় ৮০-৮২ সেমি.। স্পাইক প্রতি ফ্লোরেটের সংখ্যা প্রায় ১১-১২টি। ফুলের সজীবতা প্রায় ৭-৮ দিন। ফলন প্রায় ২ লক্ষ স্টিক/হেক্টর। জাতটি ২০০৯ সালে অবমুক্ত করা হয়।
বারি গ্লাডিওলাস-৬
এটি একটি কন্দ জাতীয় ফুল। এ গাছের পাতা তরবারীর মতো। সারাবছর এ ফুলের চাষাবাদ করা যায়। ফুলের রং আকর্ষণীয় নীল এবং প্রায় ৯.০-৯.১ সেমি. ব্যাস বিশিষ্ট। স্পাইক ৭০-৮০ সেমি. লম্বা এবং ফ্লোরেটের সংখ্যা প্রায় ১০-১১টি। ফুলের সজীবতা প্রায় ৮-৯ দিন। গড় ফলন প্রায় ১,৯০,০০০স্টিক/হেক্টর। জাতটি ২০১৬ সালে অবমুক্ত করা হয় ।
উৎপাদন প্রযুক্তি
জলবায়ু ও মাটি : ঠাণ্ডা আবহাওয়ায় এ ফুল ভাল জন্মে। সাধারণত ১৫-২৫°সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রা এর অঙ্গজ বৃদ্ধি ও ফুল উৎপাদনের জন্য উপযোগী। গ্লাডিওলাস দৈনিক ৮-১০ ঘণ্টা আলো পছন্দ করে। তাই রৌদ্রজ্জ্বল জায়গা ও সে সাথে ঝড়ো বাতাস প্রতিহত করার ব্যবস্থা আছে এমন স্থান এ ফুল চাষের জন্য নির্বাচন করা উচিত। সুনিষ্কাশিত দো-আঁশ ও বেলে দো-আঁশ মাটি গ্লাডিওলাস চাষের জন্য উত্তম। মাটির pH মান ৬-৭ এর মধ্যে থাকা উচিত।
বংশ বিস্তার : বীজ, করম এবং করমেলের মাধ্যমে গ্লাডিওলাসের বংশবিস্তার করা যায়। সাধারণভাবে চাষের জন্য ‘করম’রোপণ করা হয়।
জমি তৈরি ও সার প্রয়োগ : সেপ্টেম্বর-অক্টোবর মাসে ভালভাবে চাষ দিয়ে মাটি ঝুরঝুরে করে জমি তৈরি করতে হয়। শেষ চাষ দেয়ার সময় হেক্টরপ্রতি ১০ টন গোবর সার, ৩৭৫ কেজি টিএসপি, ৩০০ কেজি এমওপি, ১২ কেজি বরিক এসিড, ৮ কেজি জিংক সালফেট ও ১০০ কেজি জিপসাম সার মাটির সাথে ভালভাবে মিশিয়ে দেয়া উচিত। ৩০০ কেজি ইউরিয়া এর অর্ধেক কম রোপণের ২০-২৫ দিন পর এবং বাকি অর্ধেক পুষ্পদণ্ড বের হওয়ার সময় উপরি প্রয়োগ করা উচিত।
করম রোপণ : অক্টোবর-নভেম্বর মাসে জমি তৈরির পর ৫.০-৫.৫ সেমি. ব্যাসের রোগমুক্ত করম মাটির ৬-৭ সেমি. গভীরতায় রোপণ করা উচিত।
রোপণ দূরত্ব : সারি থেকে সারি ২০ সেমি. এবং গাছ থেকে গাছ ২০ সেমি.।
গ্লডিওলাস ফুল চাষের সময়ে পরিচর্যা
নিয়মিত সেচ প্রদান :
গ্লাডিওলাস ফুলের ভালো ফুল পাবার জন্য মাটিতে পর্যাপ্ত পরিমাণে রস থাকতে হবে। আর তাই করম মাটিতে রোপণ করার পর জমিতে হালকা সেচ দিতে হবে, যাতে কর্মগুলো মাটিতে ভালোভাবে লেগে যেতে পারে। আর এরপরে সময়গুলোতে আবহাওয়া বুঝে ১০ থেকে ১৫ দিন অন্তর অন্তর নিয়মিত সেচ দিতে হবে।
গ্লাডিওলাস ফুল চাষে নিয়মিত আগাছা দমন
গ্লাডিওলাস ফুলের ভালো উৎপাদন করতে নিয়মিতভাবে গভীর শিকড় যুক্ত আগাছা দমন করতে হবে।
গ্লাডিওলাস ফুল চাষে রোগবালাই ও পোকামাকড় দমন পদ্ধতি
গ্লাডিওলাস ফুল চাষের ক্ষেত্রে অনেক ক্ষতিকর পোকা আক্রমণ করে থাকে। এ ছাড়াও এই ফুলের গাছ বিভিন্ন রোগেও আক্রান্ত হয়ে থাকে।
শোষক পোকা (থ্রিপস) : এটি অতি ক্ষুদ্র ছাই রঙের পোকা যা খালি চোখে দেখা যায় না। এই পোকা পাতা, স্পাইক ও ফুলের রস শোষণ করে ফলে আক্রান্ত পাতায় রুপালি ও বাদামি রঙের লম্বা দাগ দেখা যায় এবং পাতা ও ফুল শুকিয়ে যায় এবং আক্রমণ বেশি হলে গাছও শুকিয়ে যায়।
ব্যবস্থাপনা : এই পোকা দমন করার জন্য ২০-৩০ মিলি. ম্যালাথিয়ন ১৮ লিটার পানিতে মিশিয়ে ২ থেকে ৩ বার গাছে স্প্রে করতে হবে। নোভাক্রন (০.১ থেকে ০.১৫%) স্প্রে করেও ভাল ফল পাওয়া যায়।
সাদা রঙের আঁঠালো ফাদ ব্যবহার
ফিপ্রোনিল গ্রুপের কীটনাশক ১মিলি/লিটার পানি হারে ৭-১০ দিন অন্তর ২-৩ বার স্প্রে
জাবপোকা : জাবপোকা কচি পাতা, নতুন স্পাইক ও ফুলের রস খায়।
ব্যবস্থাপনা : স্টার্টার/টাফগর ৪০ ইসি প্রতি লিটার পানিতে ২ মিলি হারে স্প্রে করে এই পোকা দমন করা যায়, তাছাড়া হলুদ আঁছালো ফাঁদ ব্যবহার, সাবানের গুঁড়া ৫ গ্রাম/লিটার পানিতে ৭-১০ দিন পর পর ২-৩ বার স্প্রে করেও দমন করা যায়।
নেমাটোডস/কৃমি : বহু ধরনের নেমাটোড গ্লাডিওলাসে আক্রমণ করতে পারে। এদের মধ্যে ‘রুট নট নেমাটোড’ উল্লেখযোগ্য।
ব্যবস্থাপনা : মাটি শোধন করে এবং নেমাটোড নাশক নিউফরান/ফুরাকার্ব ৩ থেকে ৪ কেজি একরে ব্যবহার করে নেমাটোডের হাত থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে।
ভাইরাস : গ্লাডিওলাস অনেক করম ভাইরাস দ্বারা আক্রান্ত হতে পারে। ভাইরাস দ্বারা আক্রান্ত হলে গাছের বৃদ্ধি বন্ধ হয়ে যায়, পাতা, ফুল ও স্পাইক বিকৃত হয় এবং রঙিন ফুলের ওপর লম্বা দাগ পড়ে।
ব্যবস্থাপনা : একবার আক্রান্ত হলে করমসহ গাছ পুড়িয়ে ফেলতে হবে। করমেল-এ ভাইরাস প্রবেশ করার আগেই সংগ্রহ করা হলে রোগমুক্ত করমেল পাওয়া যেতে পারে। কিছু ভাইরাস পোকা দ্বারা ছড়ায় বলে প্রতি লিটার পানিতে ২ মিলি স্টার্টার/টাফগর/পারফেকথিয়ন কীটনাশক স্প্রে করে এ রোগকে দমন করা যায়।
গ্লাডিওলাস ফুল কাটা বা উত্তোলন
সাধারণত গ্লাডিওলাস ফুলের বীজ বা করম লাগানোর ৭৫ থেকে ৯০ দিনের মধ্যে এর গাছে গ্লাডিওলাস ফুল ফোটে। এই গ্লাডিওলাস ফুল কাটার নিয়ম হলো যে দণ্ডটিতে ফুল ও পাতা ধরে সেই দণ্ডটি কাটা। আর এই গ্লাডিওলাস ফুল কাটার সাথে সাথে সেগুলোকে কিছুক্ষণ ছায়ায় রাখতে হবে।
গ্লাডিওলাস ফুলের চাষের ক্ষেত্রে একর প্রতি ১৩৫০০০ করম বা বীজ জমিতে রোপণ করলে সেখান থেকে ১০৫০০০-১২০০০০ পর্যন্ত গ্লাডিওলাস ফুলের স্টিক পাওয়া যায়।