কনটেন্টটি শেষ হাল-নাগাদ করা হয়েছে: শনিবার, ২৮ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬ এ ০৫:২০ PM

গাজর

কন্টেন্ট: ই-কৃষি ই-কৃষি বিভাগ: সবজি প্রকাশের তারিখ: ২৮-০২-২০২৬

ভিটামিন-এ সমৃদ্ধ পুষ্টিকর সবজি হলো গাজর। এতে ক্যালসিয়াম, লৌহ, ফসফরাস, শ্বেতসার এবং অন্যান্য ভিটামিন যথেষ্ট পরিমাণে রয়েছে। তরকারি ও সালাদ হিসেবে গাজর খাওয়া যায়। গাজরের হালুয়া অনেকের প্রিয় খাবার। নিয়ম অনুযায়ী চাষ করলে গাজরের ভালো ফলন পাওয়া যায়। এটি সহজে নষ্ট হয় না। সারা বছর ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। তাই গাজর চাষ তুলনামূলক লাভজনক।

গাজরের পুষ্টিগুণ

পুষ্টিগুণে সমৃদ্ধ একটি সবজি গাজর। হালুয়া, সালাদ কিংবা রান্না ছাড়াও কাঁচা খাওয়া যায়। এ সবজি খেলে স্বাস্থ্য ভালো থাকে।
# গাজরে ক্যালরির পরিমাণ কম। ১৫০ গ্রাম ওজনের দুটি বড় মাপের গাজরে থাকে ৬০ ক্যালরি। এতে পর্যাপ্ত পরিমাণ আঁশ বা

ফাইবার রয়েছে। পর্যাপ্ত পরিমাণে ভিটামিন ‘এ’, ‘সি’, ‘কে’, প্যানটোথেনিক এসিড (বি৫), ফোলেট (বি৯), পটাশিয়াম,

আয়রন, তামা বা কপার ও ম্যাঙ্গানিজ রয়েছে।
# গাজরে রয়েছে বিটা ক্যারোটিন। এ ক্যারোটিনয়েড অ্যান্টি-অক্সিডেন্টটি ভিটামিন ‘এ’তে রূপান্তরিত হয়। ভিটামিনটি চোখ

ভালো রাখে, দৃষ্টিশক্তি বাড়াতেও সাহায্য করে
# গাজরের ক্যারোটিনয়েড ভেঙে শরীরে চর্বির সঙ্গে মিশে যায়। যকৃৎ থেকে নিষ্কৃত পিত্তরস ভালোভাবে প্রবাহিত হতে সাহায্য

করে। ফলে যকৃতের বর্জ্য দূর হয়; যকৃৎ সুস্থ রাখে।
# ফুসফুস ও প্রস্টেট ক্যানসারের ঝুঁকি কমিয়ে দেয়।
# দাঁতের সুরক্ষায় গাজর খাওয়া যেতে পারে।
# গাজরে থাকা আলফা ক্যারোটিন হৃৎপিণ্ড সুরক্ষায় বিশেষ ভূমিকা রাখে। স্ট্রোকের ঝুঁকি কমাতে প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায়

সবজিটি রাখা যেতে পারে।
# রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে গাজরের জুড়ি মেলা ভার।
# স্থুলতা রোধে বেশি করে গাজর খাওয়া যেতে পারে।
# গাজরে থাকা ভিটামিন ও মিনারেল চুল পড়া কমায়। এমনকি চুলের গোড়া শক্ত ও মজবুত করে।
# সুন্দর ত্বকের জন্য গাজর খাওয়া যেতে পারে। এর মধ্যে থাকা অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট এবং ভিটামিন ব্রন ও চামড়া ঝুলে পড়া রোধ

করে।
# গাজর দিয়ে তৈরি করতে পারেন মজার খাবার। হালুয়া, সেমাই, লাড্ডু, জুস, মার্মালেড, কুনাফা, চিপস, চাটনি, কেক, স্যুপ,

জর্দা, পুডিং প্রভৃতি বেশ মজার। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, সর্বোচ্চ পুষ্টি পেতে কাঁচা গাজর খাওয়াই উত্তম।

গাজরের জাত পরিচিতি

সাধারণত বিদেশ থেকে বিভিন্ন জাতের গাজরের বীজ আমদানি করে চাষ করা হয়। যেমন-রয়েল ক্রস, কোরেল ক্রস, কিনকো সানটিনে রয়েল ও স্কারলেট নান্টেস। এছাড়াও আরও আছে পুষা কেশর, কুরোদা-৩৫, নিউ কোয়ারজা, সানটিনি, ইয়োলো রকেট ইত্যাদি জাতগুলো কৃষকদের নিকট জনপ্রিয়। এসব জাতের মধ্যে পুষা কেশর আমাদের দেশের জলবায়ুতে বীজ উৎপাদনে সক্ষম।

চাষ পদ্ধতি: বাংলাদেশে গাজরের কোনো অনুমোদিত জাত নেই। সাধারণত আমদানি করা বীজে দুই মৌসুমে গাজর চাষ করা হয়। এর মধ্যে একটি হলো গ্রীষ্মকালীন এবং অপরটি হল নাতিশীতোষ্ণ।

আবহাওয়া ও মাটি

পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা আছে এমন বেলে দোঁ-আশ ও দো-আঁশ মাটি গাজর চাষের জন্য উপযোগী। গাজর একটি শীতকালীন সবজি এবং এটি ঠান্ডা আবহাওয়ায় ভালো জন্মে। জমিতে বীজ বপনের জন্য উপযুক্ত তাপমাত্রা হলো ৭ থেকে ২৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং শিকড়ের বিকাশের জন্য ১৬ থেকে ২১ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা প্রয়োজন। গাজর চাষের জন্য শুষ্ক পরিবেশ ভালো এবং চারা অবস্থায় বৃষ্টিপাত ক্ষতিকর হতে পারে। গাজর চাষের জন্য দিনের বেশির ভাগ সময় ছায়ামুক্ত এবং পর্যাপ্ত সূর্যালোক পায় এমন জায়গা নির্বাচন করা উচিত।

বীজ বপন সময়

আশ্বিন থেকে কার্তিক (মধ্য সেপ্টেম্বর-মধ্য নভেম্বর) মাস বীজ বপনের উত্তম সময়।

বীজ হার ও বীজ বপন

প্রতি হেক্টরে ৩-৪ কেজি বীজ লাগে।

সারি-সারির দূরত্ব: ২০-২৫ সেমি.।

গাছ-গাছের দূরত্ব: ১০ সেমি.।

জমি তৈরি
১) গাজর চাষের জন্য ভালভাবে চাষ ও মই দিয়ে তৈরি করতে হবে।
২) জমির মাটি ঝুরঝুরে করে তৈরি করতে হবে।
৩) গাজরের বীজ সারিতে বপন করা ভালো। এতে গাজরের যত্ন নেয়া সহজ হয়।
৪) গাজরের বীজ খুব ছোট বিধায় ছাই বা গুড়া মাটির সাথে মিশিয়ে বপন করা ভালো। এজন্য ভাল বীজের সাথে ভালো শুকনা

ছাই বা গুঁড়া মাটি মিশিয়ে বপন করা যেতে পারে।

সার প্রয়োগ

গাজর চাষে হেক্টরপ্রতি নিম্নরূপ হারে সার প্রয়োগ করতে হবে।

সার

সারের পরিমাণ (প্রতি বিঘায়)

সারের পরিমাণ (প্রতি হেক্টরে)

গোবর/জৈবসার
ইউরিয়া
টিএসপি
এসওপি/এমপি

১.৩৩ টন

২০ কেজি

১৬.৬৬ কেজি

২৬.৬৬ কেজি

১০ টন
১৫০ কেজি
১২৫ কেজি
২০০ কেজি

সার প্রয়োগ পদ্ধতি
১) সম্পূর্ণ গোবর ও টিএসপি এবং অর্ধেক ইউরিয়া ও এমপি সার জমি তৈরির সময় প্রয়োগ করতে হবে।
২) বাকি অর্ধেক ইউরিয়া সমান দুই কিস্তিতে চারা গজানোর ১০-১২ দিন ও ৩৫-৪০ দিন পর উপরি প্রয়োগ করতে হবে।
৩) বাকি অর্ধেক এমপি সার চারা গজানোর ৩৫-৪০ দিন পর উপরিপ্রয়োগ করতে হবে।

সেচ ব্যবস্থাপনা

গাজর চাষে সেচ ও নিষ্কাশন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সঠিক সেচ এবং নিষ্কাশন ব্যবস্থা গাজরের ফলন বাড়াতে সাহায্য করে। গাজর চাষে সেচ দেওয়ার সময় লক্ষ রাখতে হবে, যাতে জমিতে রসের অভাব না হয় এবং অতিরিক্ত পানি জমে না থাকে। বীজ বপনের পর হালকা সেচ দেওয়া উচিত, যাতে অঙ্কুরোদগম ভালো হয়। মাটির আর্দ্রতা বজায় রাখার জন্য ১৫-২০ দিন পর পর সেচ দিতে হবে। সেচের অভাবে গাজর ফেটে যেতে পারে, তাই নিয়মিত সেচ দেওয়া জরুরি। জমিতে রসের অভাব হলে বা বেশি সেচ দিলেও গাজরের ক্ষতি হতে পারে। বিশেষ করে, শীতকালে এবং খরার সময় ১৫ দিন পরপর সেচ দেওয়া প্রয়োজন। ড্রিপ সেচ গাজর চাষের জন্য একটি ভালো পদ্ধতি, যা মাটির আর্দ্রতা ধরে রাখতে সাহায্য করে।

নিষ্কাশন ব্যবস্থা

জমিতে অতিরিক্ত পানি জমে থাকলে গাজরের শিকড় পচে যেতে পারে। তাই, জমি থেকে অতিরিক্ত পানি বের করে দেওয়ার জন্য নিষ্কাশন ব্যবস্থার দিকে মনোযোগ দিতে হবে। বেড ও নালা পদ্ধতিতে চাষ করলে সেচ ও নিষ্কাশন দুটোই সুবিধাজনক হয়। গাজর চাষের জন্য বেলে দো-আঁশ ও দো-আঁশ মাটি উপযুক্ত। মাটি ভালোভাবে প্রস্তুত করা জরুরি, কারণ গাজরের শিকড় গভীরে যায়। জমিতে আগাছা পরিষ্কার রাখা এবং প্রয়োজনে সার ও কীটনাশক ব্যবহার করা উচিত। পর্যাপ্ত সেচ এবং সঠিক নিষ্কাশন ব্যবস্থার মাধ্যমে গাজর চাষে ভালো ফলন পাওয়া সম্ভব।

আন্তঃপরিচর্যা

১। বীজ থেকে চারা গজাতে ১০-২০ দিন সময় লাগতে পারে। তবে বপনের আগে বীজ ভিজিয়ে রাখলে (১৮-২৪ ঘন্টা) ৭-১০ দিনের মধ্যে চারা বের হয়।

২। চারা গজানোর ৮-১০ দিন পর ৮-১০ সেমি. পরপর ১টি করে গাছ রেখে বাকি সব উঠিয়ে ফেলতে হবে। একই সাথে আগাছা পরিষ্কার ও মাটির চটা ভেঙ্গে দিতে হবে।

৩। প্রয়োজনমতো সেচ দেয়া ও নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করতে হবে। মাটির জো দেখে দুই সপ্তাহ পরপর ৩-৪টি সেচ দেয়া উৎপাদনের জন্য ভালো।

৪। মাটিতে রস কম হলে পানি সেচ দিতে হবে। সেচের পর জো এলে নিড়ানি দিয়ে চটা ভেঙ্গে মাটি আলগা করে দিতে হবে। আগাছা জন্মালে দমন করতে হবে।

এছাড়া…

  • চারা গজানোর ৮-১০ দিন পর ১০ সেন্টিমিটার পরপর ১টি করে গাছ রেখে বাকি সব উঠিয়ে ফেলতে হবে।

  • একইসাথে আগাছা পরিষ্কার ও মাটির চটা ভেঙ্গে দিতে হবে।

  • প্রয়োজনমতো সেচ দেয়া ও নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করতে হবে।

  • মাটির জো দেখে দুই সপ্তাহ পরপর ৩-৪ বার সেচ দেয়া গাজর উৎপাদনের জন্য ভালো।

টবে গাজর চাষ করার পদ্ধতি

  • টব বাছাই খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বড় আকারের টব হলে ভালো; এতে একসাথে অনেক বীজ বোনা যাবে।

  • টবের গভীরতা হতে হবে কমপক্ষে ১২ ইঞ্চি। এছাড়া পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা রাখতে হবে।

  • সব ধরনের মাটিতেই গাজর চাষ করা গেলেও বেলে দো-আঁশ মাটি সবচেয়ে উপযোগী।

  • আজকাল অবশ্য কোকোপিট ও জৈবসারের মিশ্রণও পাওয়া যায়।

  • ওই মাটিও গাজর চাষের জন্য ভালো। তবে যে মাটিই হোক তা আগে ঝুরঝুরে করে নিতে হবে।

  • টবের মাটি তৈরি হয়ে গেলে ততে বীজ বুনতে হবে।

  • যেহেতু গাজরের বীজ ছোট, অনেকগুলো একসাথে বুনতে হয়।

  • অবশ্যই চারা বেড়ে ওঠার পর সুস্থ চারা রেখে বাকিগুলো ফেলে দেওয়া যায়।

  • আকারে ছোট হওয়ায় গাজরের বীজের সাথে ছাই বা মাটির গুঁড়া মিশিয়ে বুনতে হয়।

  • বীজ বোনার আগে তা পানিতে ভিজিয়ে রাখতে হবে।

  • সকালে পানিতে ভিজালে বিকেলের দিকে বোনা ভালো।

  • গাজর চাষে যত বেশি পরিমাণ জৈবসার দেয়া যায় ততই ভালো।

  • গোবর সার, কম্পোস্ট সার, কেঁচো সার, তরকারির খোসা এসব দিলে ফলন ভালো হয়।

  • এ ছাড়া অজৈব সার হিসেবে টিএসপি ও এমওপি ও ব্যবহার করা যাবে।

  • প্রয়োজনে সামান্য ইউরিয়া দেয়া যেতে পারে।

  • তবে নাইট্রোজেন জাতীয় সার বেশি ব্যবহার করা যাবে না।

  • এ ছাড়া প্রতি দুই সপ্তাহ পর পর একবার করে চা পাতা শুকিয়ে টবের গোড়া ব্যবহার করা যায়। এটিও গাছের জন্য উপকারী।

রোগ ও পোকা দমন

১। গাজরের চারা ঢলে পড়া রোগ

লক্ষণ

  • আক্রান্ত চারার গোড়ার চারদিকে পানিভেজা দাগ দেখা যায়।

  • গোড়ার সাদা ছত্রাকজালি ও অনেক সময় সরিষার মতো ছত্রাকের অনুবীজ পাওয়া যায়।

  • শিকড় পচে যায়, চারা নেতিয়ে পড়ে গাছ মারা যায়।

  • স্যাঁতস্যাঁতে মাটি ও মাটির উপরিভাগ শক্ত হলে রোগের প্রকোপ বাড়ে ।

  • রোগটি মাটিবাহিত বিধায় মাটি, আক্রান্ত চারা ও পানির মাধ্যমে বিস্তার লাভ করে ।

সমন্বিত দমন ব্যবস্থাপনা

  • পরিমিত সেচ ও পর্যাপ্ত জৈবসার প্রদান করা ও পানি নিষ্কাশনের ভালো ব্যবস্থা রাখা।

  • সরিষার খৈল ৩০০ কেজি/ হেক্টর হারে জমিতে প্রয়োগ করা।

  • প্রতি লিটার পানিতে ছত্রাকনাশক যেমন: উপশম ৭৮ ডব্লিউপি ২ গ্রাম বা কাডিম ৫০ ডব্লিউপি ১ গ্রাম হারে মিশিয়ে স্প্রে করে মাটিসহ ভিজিয়ে দেয়া।

  • বীজতলায় হেক্টর প্রতি ২.০ টন ট্রাইকো-কম্পোস্ট ব্যবহার করা।

  • একই জমিতে বার বার গাজর চাষ করবেন না।

  • দিনের বেশির ভাগ সময় ছায়া পড়ে এমন জমিতে গাজর চাষ করবেন না।

  • বপনের আগে প্রতি কেজি বীজে ২-৩ গ্রাম কাডিম ৫০ ডব্লিউপি মিশিয়ে বীজ শোধন করে নিন।

  • লাল মাটি বা অম্লীয় মাটির ক্ষেত্রে শতাংশ প্রতি চার কেজি হারে সাদিক ডি-পাউডার প্রয়োগ করুন (প্রতি তিন বছরে একবার)

  • বীজ বপনের আগে বীজতলায় বা ক্ষেতে শুকনো কাঠের গুঁড়া ৩ ইঞ্চি পুরু করে বিছিয়ে পোড়ানো।

  • মাটি সোলারাইজেশন করা- রোদের সময় মাটি পলিথিন দিয়ে ঢেকে রাখা।

২। গাজরের পাতা পোড়া রোগ

লক্ষণ

  • আক্রান্ত পাতায় গায়ে সবুজ-বাদামি থেকে বাদামি রঙের ছোট ছোট দাগ দেখা যায়।

  • ধীরে ধীরে একাধিক দাগ একত্রিত হয়ে বড় দাগ হয় এবং পাতায় ছড়িয়ে পড়ে।

  • পাতার বোঁটায়ও দাগ দেখা যায়।

সমন্বিত দমন ব্যবস্থাপনা

  • আক্রান্ত গাছের অংশ সংগ্রহ করে নষ্ট করা।

  • উপশম ৭৮ ডব্লিউপি ২ গ্রাম/প্রতি লিটার পানি মিশিয়ে স্প্রে করা।

  • স্প্রে করার পর ১৫ দিনের মধ্যে সেই সবজি খাবেন না বা বিক্রি করবেন না।

  • আক্রান্ত গাছ থেকে বীজ সংগ্রহ করবেন না।

  • আগাম বীজ বপন করা।

  • সুষম সার ব্যবহার করা।

  • রোগ প্রতিরোধী জাত যেমন: বারি জাতের চাষ করা।

  • বিকল্প পোষক যেমন: আগাছা পরিষ্কার রাখা।

৩। গাজরের পাউডারি মিলডিউ রোগ

লক্ষণ

  • পাতা ও গাছের গায়ে সাদা পাউডারের মতো দাগ দেখা যায়, যা ধীরে ধীরে সমস্ত পাতায় ছড়িয়ে পড়ে।

  • আক্রান্ত বেশি হলে পাতা হলুদ বা কালো হয়ে মারা যায়।

সমন্বিত দমন ব্যবস্থাপনা

  • সম্ভব হলে গাছের আক্রান্ত অংশ সংগ্রহ করে ধ্বংস করুন।

  • ক্ষেত পরিষ্কার রাখুন এবং পানি নিষ্কাশনের ভালো ব্যবস্থা রাখুন।

  • উপশম ৭৮ ডব্লিউপি ২ গ্রাম/ লিটার হারে অথবা সালফার ছত্রাকনাশক যেমন: ভিটাসালফ ৮০ ডব্লিউডিজি ২ গ্রাম অথবা কার্বেন্ডাজিম গ্রুপের ছত্রাকনাশক যেমন: কাডিম ৫০ ডব্লিউপি ০.৫ মিলি. হারে পানিতে মিশিয়ে স্প্রে করা ।

  • স্প্রে করার পর ১৫ দিনের মধ্যে সেই সবজি খাবেন না বা বিক্রি করবেন না।

  • আক্রান্ত ক্ষেত থেকে বীজ সংগ্রহ করবেন না।

  • এলোপাতারি বালাইনাশক ব্যবহার করে পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের ক্ষতি করবেন না।

  • আগাম বীজ বপন করুন।

  • সুষম সার ব্যবহার করুন।

  • রোগ প্রতিরোধী জাত যেমন: বারি উদ্ভাবিত/ অন্যান্য উন্নত জাতের চাষ করুন।

  • বিকল্প পোষক যেমন: আগাছা পরিষ্কার রাখুন।

৪। গাজরের ব্যাকটেরিয়াজনিত পাতা পোড়া রোগ

লক্ষণ

  • আক্রান্ত পাতার কিনারায় হলুদ-বাদামি থেকে বাদামি রঙের ছোট ছোট দাগ দেখা যায়।

  • ধীরে ধীরে একাধিক দাগ একত্র হয়ে বড় দাগ হয় এবং পাতায় ছড়িয়ে পড়ে।

  • পাতার ঝলসে যায় এবং আগা বাঁকা হয়ে যায় ।

সমন্বিত দমন ব্যবস্থাপনা

  • আগাম বীজ বপন করা।

  • সুষম সার ব্যবহার করা।

  • রোগ প্রতিরোধী জাত যেমন: বারি জাতের চাষ করা।

  • কপার অক্সিক্লোরাইড ২ গ্রাম/প্রতি লিটার পানি মিশিয়ে স্প্রে করা ।

  • উপশম ৭৮ ডব্লিউপি ২ গ্রাম/লিটার হারে পানিতে মিশিয়ে স্প্রে করা

  • স্প্রে করার পর ১৫ দিনের মধ্যে সেই সবজি খাবেন না বা বিক্রি করবেন না।

  • আক্রান্ত গাছ থেকে বীজ সংগ্রহ করবেন না।

  • আক্রান্ত গাছের অংশ সংগ্রহ করে নষ্ট করা ।

৫। গাজরের ভায়োলেট শিকড় পচা রোগ

লক্ষণ

গাজরের প্রধান শিকড়ের আগায় অথবা গাজরের গায়ে শিকড়ে পচন শুরু হয় এবং ক্রমশ উপরের দিকে পচতে থাকে। গাজরের গায়ে মাটি লেগে যায় ।

সমন্বিত দমন ব্যবস্থাপনা

  • আক্রমণের শুরুতেই আক্রান্ত গাছের অংশ সংগ্রহ করে নষ্ট করা।

  • কাডিম ৫০ ডব্লিউপি ২ গ্রাম/প্রতি লিটার পানি মিশিয়ে স্প্রে করা।

  • একই জমিতে বার বার গাজর চাষ করবেন না।

  • আক্রান্ত গাছ থেকে বীজ সংগ্রহ করবেন না।

  • আগাম বীজ বপন করা।

  • সুষম সার ব্যবহার করা।

  • জমিতে কয়েকবার দানাদার ফসল চাষ করে আবার গাজর চাষ করা।

  • বিকল্প পোষক যেমন: আগাছা পরিষ্কার রাখা ও ফসলের পরিত্যক্ত অংশ ধ্বংস করা।

৬। গাজরের নরম পচা রোগ

লক্ষণ

  • আক্রান্ত গাজর নরম হয়ে পচে যায়। পচা গাজর থেকে এক ধরনের গন্ধও বের হয় ।

সমন্বিত দমন ব্যবস্থাপনা

  • আক্রান্ত গাছের অংশ সংগ্রহ করে নষ্ট করা ।

  • কাডিম ৫০ ডব্লিউপি ২ গ্রাম/প্রতি লিটার পানি মিশিয়ে স্প্রে করা ।

  • একই জমিতে বার বার গাজর চাষ করবেন না।

  • আক্রান্ত গাছ থেকে বীজ সংগ্রহ করবেন না।

  • আগাম বীজ বপন করা।

  • সুষম সার ব্যবহার করা।

  • জমিতে কয়েকবার দানাদার ফসল চাষ করে আবার গাজর চাষ করা।

  • বিকল্প পোষক যেমন: আগাছা পরিস্কার রাখা ও ফসলের পরিত্যাক্ত অংশ ধ্বংস করা।

৭। গাজরের সাউদার্ন ব্লাইট রোগ

লক্ষণ

  • একধরনের ছত্রাকের আক্রমণে গাছের গোড়ায় বা কাণ্ডে পচন ধরে এবং ছত্রাকের সাদা মাইসেলিয়া ও সরিষার দানার মত স্কেরোশিয়া দেখা যায়।

  • গাছ আস্তে আস্তে নেতিয়ে পড়ে।

  • পরবর্তীতে পুরো গাছ মারা যায়।

সমন্বিত দমন ব্যবস্থাপনা

  • সম্ভব হলে আক্রান্ত গাছ সংগ্রহ করে ধ্বংস করা বা পুড়ে ফেলা।

  • বপনের পূর্বে বীজ শোধন করা (কাডিম ৫০ ডব্লিউপি ৩-৪ গ্রাম/ কেজি বীজ) দ্বারা শোধন করা।

  • ট্রাইকোডারমা ভিড়িডি ৩০ গ্রাম /৫০০ গ্রাম হারে গোবরের সাথে মিশিয়ে মাটিতে প্রয়োগ করা।

  • আক্রান্ত জমিতে কয়েকবার দানাজাতীয় ফসল চাষ করে আবার শিম চাষ করুন।

  • ফসল সংগ্রহের পর পুরাতন গাছ ও আবর্জনা আগুনে পুড়িয়ে দিন।

  • জমি তৈরি করার সময় জমি গভীরভাবে চাষ দিন।

  • চারা গজানোর পর অতিরিক্ত সেচ না দেওয়া।

৮। গাজরের কালো পচা রোগ

লক্ষণ

  • আক্রান্ত গাছের পাতার গোড়ায়/ বোঁটায় কালো দাগ দেখা যায়। গাজরের গায়ে গর্ত হয়ে পচতে দেখা যায় ।

সমন্বিত দমন ব্যবস্থাপনা

  • আক্রান্ত গাছের অংশ সংগ্রহ করে নষ্ট করা ।

  • কাডিম ৫০ ডব্লিউপি ২ গ্রাম/প্রতি লিটার পানি মিশিয়ে স্প্রে করা ।

  • একই জমিতে বার বার গাজর চাষ করবেন না।

  • আক্রান্ত গাছ থেকে বীজ সংগ্রহ করবেন না।

  • আগাম বীজ বপন করা।

  • সুষম সার ব্যবহার করা।

  • রোগ প্রতিরোধী জাত যেমন: বারি জাতের চাষ করা।

৯। গাজরের দাদ রোগ

লক্ষণ

  • আক্রান্ত গাজরের গায়ে উঁচু এবড়ো খেবড়ো দাগ দেখা যায় ।

  • এতে ফলনে তেমন প্রভাব না পড়লেও বাজার দর কম হয়।

সমন্বিত দমন ব্যবস্থাপনা

  • আক্রান্ত গাছের অংশ সংগ্রহ করে নষ্ট করা ।

  • কপার অক্সিক্লোরাইড ২ গ্রাম/প্রতি লিটার পানি মিশিয়ে স্প্রে করা ।

  • উপশম ৭৮ ডব্লিউপি ২ গ্রাম/লিটার হারে পানিতে মিশিয়ে স্প্রে করা

  • স্প্রে করার পর ১৫ দিনের মধ্যে সেই সবজি খাবেন না বা বিক্রি করবেন না।

  • আক্রান্ত গাছ থেকে বীজ সংগ্রহ করবেন না।

  • আগাম বীজ বপন করা।

  • সুষম সার ব্যবহার করা।

  • রোগ প্রতিরোধী জাত যেমন: বারি জাতের চাষ করা।

১০। গাজরের হলুদ ভাইরাস রোগ

লিফ হপার পোকার মাধ্যমে গাজরে অনেক সময় হলুদ ভাইরাস রোগ র্প্রাদুভাব দেখা যায়। এ পোকার আক্রমণের ফলে গাজরের ছোট বা কচি পাতাগুলো হলুদ হয় পরে কুঁকড়িয়ে যায় এবং লক্ষণীয়ভাবে গাছের পাতার পাশের ডগাগুলো হলুদ ও বিবর্ণ হয়ে যায়। লিফ হপার পোকা দমনের ব্যবস্থা নিতে হবে। আক্রান্ত ডালপালা কেটে ফেলতে হবে এবং চারপাশে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে। সবিক্রন ৪২৫ ইসি ২ মিলি/লিটার পানি অথবা রেলোথ্রিন ১ মিলি/লিটার পানিতে স্প্রে করতে হবে।

১১। গাজরের উড়চুঙ্গা পোকা

লক্ষণ

এ পোকা গাজর কেটে দেয়। সকালবেলা চারা মাটিতে পড়ে থাকতে দেখা যায় ।

ব্যবস্থাপনা

১। সকাল বেলা কেটে ফেলা চারার আশেপাশে মাটি খুড়ে পোকা বের করে মেরে ফেলা ।

২। অধিক আক্রান্ত জমিতে ফিপ্রোনিল/ ক্লোরপাইরিফস গ্রুপের কীটনাশক যেমন: রিজেন্ট ৩ জি আর ১০ কেজি / হেক্টর হারে প্রয়োগ করা।

সাবধানতা

১। উত্তমরুপে জমি চাষ দিয়ে পোকা পাখিদের খাবার সুযোগ করে দিন। ২। চারা লাগানোর প্রতিদিন সকালে ক্ষেত পরিদর্শন করুন।

১২। গাজরের কাটুই পোকা

পোকা চেনার উপায়: এরা মাঝারি আকারের নিশাচর মথ। উপরের পাখা ছাই ও ধুসর রঙ্গের ছোপযুক্ত, নিচের কিনারা ঝালের মতো। এরা হালকা ধুসর থেকে কালচে তেলতেলা ধরনের।

ক্ষতির ধরন: এ পোকা রাতের বেলা চারা মাটি বরাবর কেটে দেয়। সকাল বেলা চারা মাটিতে পড়ে থাকতে দেখা যায় ।

আক্রমণের পর্যায়: চারা

ফসলের যে অংশে আক্রমণ করে: কাণ্ড

পোকার যেসব স্তর ক্ষতি করে: কীড়া

ব্যবস্থাপনা

কারটাপ জাতীয় কীটনাশক (যেমন: কেয়ার ৫০ এসপি; অথবা সানটাপ ৫০ এসপি; অথবা ফরাটাপ ২০ মিলিলিটার) প্রতি ১০ লিটার পানিতে মিশিয়ে ১০ দিন পর পর ২-৩ বার স্প্রে করুন। ঔষধ স্প্রে করায় সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।

১৩। জাব পোকা

এ পোকা ও গাছের কচি অংশের রস শুষে খেয়ে গাছের অনেক ক্ষতি করে। পোকা দমনের জন্য রগোর এল-৪০, ক্লাসিক ২০ ইসি, টিডফেট ৭৫ এসপি, টিডো ২০ এসএল ইত্যাদি কীটনাশকের যেকোনো একটি অনুমোদিত মাত্রায় ব্যবহার করা যেতে পারে। অথবা, বাইকাউ-১ প্রয়োগ করতে হবে।

ফসল সংগ্রহ ও সংরক্ষণ

চারা গজানোর ৭০-৮০ দিন পর সবজি হিসেবে গাজর খাওয়ার জন্য তোলার উপযুক্ত হয়। হেক্টরপ্রতি গাজরের ফলন ২০-২৫ টন। ঠাণ্ডা ও শুষ্ক স্থানে ২–৩ সপ্তাহ ভালো থাকে।

অতিরিক্ত গাজর খেলে যেসব সমস্যা হতে পারে

ত্বকের রং পরিবর্তন: অতিরিক্ত বিটা-ক্যারোটিনের কারণে ত্বক হলুদ বা কমলা রঙের হয়ে যেতে পারে (ক্যারোটিনেমিয়া)

হজমজনিত সমস্যা: অত্যধিক ফাইবার গ্যাস, পেটফাঁপা, ডায়রিয়া বা পেটে ব্যথার কারণ হতে পারে।

ডায়াবেটিস ও রক্তে শর্করার ওপর প্রভাব: গাজরে প্রাকৃতিক শর্করা থাকায়, ডায়াবেটিস রোগীদের পরিমিত পরিমাণে খাওয়া উচিত।

অ্যালার্জির প্রতিক্রিয়া: কিছু মানুষের গাজরে অ্যালার্জি থাকতে পারে, যার ফলে চুলকানি বা ফুসকুড়ি দেখা দিতে পারে।

শিশুদের ক্ষেত্রে: ছোট শিশুদের বেশি গাজর খাওয়ালে দাঁতের ক্ষয় হতে পারে।

অন্যান্য সমস্যা: অতিরিক্ত গাজর খেলে শরীরে কিছু খনিজ (যেমন:জিঙ্ক) শোষণে প্রভাব পড়তে পারে এবং মহিলাদের ক্ষেত্রে বুকের দুধের স্বাদ পরিবর্তন হতে পারে।

বাজারজাতকরণ

  • স্থানীয় হাট-বাজারে বিক্রয়
  • সুপারশপ, প্রসেসিং ফ্যাক্টরি
  • অনলাইন/ডিজিটাল বিক্রয় মাধ্যম

সতর্কতা

বালাইনাশক/কীটনাশক ব্যবহারের আগে বোতল বা প্যাকেটের গায়ের লেবেল ভালো করে পড়ুন এবং নির্দেশাবলী মেনে চলুন। ব্যবহারের সময় নিরাপত্তা পোশাক পরিধান করুন। ব্যবহারের সময় ধূমপান এবং পানাহার করা যাবে না। বালাইনাশক ছিটানো জমির পানি যাতে মুক্ত জলাশয়ে না মেশে তা লক্ষ রাখুন। বালাইনাশক প্রয়োগ করা জমির ফসল কমপক্ষে ৭ থেকে ১৫ দিন পর বাজারজাত করুন।

কৃষকের জন্য গুরুত্বপূর্ণ তথ্য

  • ভালো জাত ও বিশুদ্ধ বীজ ব্যবহার করুন

  • সুষম সার ও সঠিক সেচ দিন

  • গাছের স্বাস্থ্য নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করুন

  • প্রাকৃতিক পদ্ধতিতে রোগ দমন করুন

  • উন্নত জাত ব্যবহার করুন

  • সঠিক সময়ে চাষ করুন

  • জৈবসার ব্যবহার করুন

  • বাজার চাহিদা বুঝে উৎপাদন বৃদ্ধি

অতিরিক্ত পরামর্শ

  • গাজরের মূল সোজা ও আকর্ষণীয় করতে মাটি ভালোভাবে আলগা করতে হবে এবং পাথর বা শক্ত মাটির ঘেলা থাকলে তা সরিয়ে ফেলতে হবে।

  • ফসল পরিবর্তন (Crop Rotation) করে মাটির উর্বরতা বজায় রাখা যায়।

  • স্থানীয় কৃষি অফিসারের পরামর্শ নিয়ে স্থানীয় আবহাওয়া ও মাটির ধরন অনুযায়ী চাষের পরিকল্পনা করা উচিত।

গাজর একটি শীতকালীন মূলজাতীয় সবজি। গাজর এমন একটি সবজি যা রান্না করে ও কাঁচা উভয় অবস্থাতেই খাওয়া যায়। গাজরের প্রসেসিং করা বিভিন্ন খাদ্য সারা বিশ্বেই প্রচলিত, তাই পুষ্টিমানে ভরপুর এই ফসলটি এদেশে উচ্চমূল্য ফসল হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে।

তথ্যসূত্র

  • জাতীয় কৃষি বাতায়ন

  • কৃষিকথা

  • বিভিন্ন কৃষি বিষয়ক ওয়েবসাইট ও সংবাদপত্র

  • স্থানীয় কৃষক ও উপসহকারী কৃষি অফিসার

ফাইল ১

এক্সেসিবিলিটি

স্ক্রিন রিডার ডাউনলোড করুন