কনটেন্টটি শেষ হাল-নাগাদ করা হয়েছে: শনিবার, ২৮ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬ এ ০৫:১০ PM

ক্যাপসিকাম

কন্টেন্ট: ই-কৃষি ই-কৃষি বিভাগ: সবজি প্রকাশের তারিখ: ২৮-০২-২০২৬

ক্যাপসিকাম

ক্যাপসিকাম বা মিষ্টিমরিচ বাংলাদেশে একটি জনপ্রিয় সবজি। ক্যাপসিকামে ভিটামিন এ, সি এবং কোলাজেন থাকে। এসব উপাদান রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে এবং ত্বক ও অস্হি সন্ধি ভালো রাখতে সাহায্য করে। এতে ক্যাপসিসিন নামক এক ধরনের উপাদান থাকে। এটি শরীরে কোলেস্টেরল ও ট্রাইগ্লিসারাইডের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। এটি অভিজাত হোটেলে ও বড় মার্কেটে প্রচুর বিক্রি হয়ে থাকে। চাহিদা বাড়তে থাকায় টবে ও জমিতে মিষ্টিমরিচ বা ক্যাপসিকামের চাষ দিন দিন জনপ্রিয় হচ্ছে।

মিষ্টিমরিচের পুষ্টিমান ও ব্যবহার

পুষ্টিমানের দিক থেকে মিষ্টিমরিচ একটি অত্যন্ত মূল্যবান সবজি। প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন ‘সি’ থাকার কারণে এবং অতি সহজেই টবে চাষ করা যায় বলে দেশের জনসাধারণকে মিষ্টিমরিচ খাওয়ার জন্য উদ্বুদ্ধ করা যেতে পারে।

জাত

আমাদের দেশে আবাদকৃত জাতগুলোর মধ্যে প্রধান হচ্ছে- California Wonder, Tender Bell (B1) এবং Yolow Wonder ইত্যাদি। প্রতি বছর এগুলোর বীজ আমাদানি করতে হয়। তবে আমাদের দেশে California Wonder এর বীজ উৎপাদন করার যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট কর্তৃক উদ্ভাবিত মিষ্টিমরিচের ২টি জাত আছে। বারি মিষ্টিমরিচ-১ ও বারি মিষ্টিমরিচ-২।

বারি মিষ্টিমরিচ-১

বৈশিষ্ট্য

১। ৭-৯টি ফল/গাছ পাওয়া যায়

২। গড় ফলের ওজন ৭৫-৮৫ গ্রাম

৩। উজ্জ্বল সবুজ বেল আকৃতির ফল পাকলে লাল রং ধারণ করে।

৪। জাতটি মাঝারি আকৃতির এবং ৭০-৭৫ সেমি. হয়।

৫। চারা লাগানোর ৬০ দিন পরে ফুল আসতে শুরু করে এবং ৩০-৪০ দিন ধরে ফল সংগ্রহ করা যায়।

বারি মিষ্টিমরিচ-২

১। সাধারণত ৮০-৯০ গ্রাম ওজনের বড় আকর্ষণীয় ঘণ্টাকৃতির হয়।

২। পাকলে এটি হলুদ বর্ণ ধারণ করে।

উৎপাদন প্রযুক্তি

জলবায়ু ও মাটি

ক্যাপসিকাম উৎপাদনের জন্য ১৬-২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা ও শুষ্ক পরিবেশ সবচেয়ে উপযোগী। রাতের তাপমাত্রা ১৬-২১ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কম বা বেশি হলে গাছের বৃদ্ধি ব্যহত হয়, ফুল ঝরে পড়ে, ফলন ও মান কমে যায়। কোন কোন ক্ষেত্রে একেবারেই ফলন হয়না। সুনিষ্কাশিত দো-আঁশ বা বেলে দো-আঁশ মাটি ক্যাপসিকাম চাষের জন্য উত্তম। ক্যাপসিকাম খরা এবং জলাবদ্ধতা কোনটি সহ্য করতে পারেনা। ক্যাপসিকামের জন্য মাটির অম্লক্ষারত্ব ৫.৫-৭.০ এর মধ্যে হওয়া বাঞ্ছনীয়।

জীবনকাল

জাত ও মৌসুমভেদে ক্যাপসিকামের জীবনকাল ১৩০ থেকে ১৫০ দিন পর্যন্ত হয়ে যায়।

উপযোগী এলাকা

সারা দেশে চাষ উপযোগী।

বীজ বপনের সময়

অক্টোবর থেকে নভেম্বর মাস।

বীজের মাত্রা

প্রতি গ্রাম বীজে প্রায় ১৪০টি বীজ থাকে। অঙ্কুরোদগমের হার ৯০% এবং মাঠে বাঁচার হার ৯০%। প্রতি হেক্টর বীজের পরিমাণ ২৩০ গ্রাম এবং চারার সংখ্যা ৩০,০০০ প্রয়োজন।

চারা উৎপাদন

প্রথমে বীজগুলো ১২ ঘণ্টা পানিতে ভিজিয়ে রাখতে হবে। সুনিষ্কাশিত উঁচু বীজতলায় মাটি মিহি করে ১০ × ২ সেমি. দূরে দূরে বীজ বপন করে হালকাভাবে মাটি দিয়ে ঢেকে দিতে হবে। বীজতলায় প্রয়োজন অনুসারে ঝাঝরি দিয়ে হালকা ভাবে সেচ দিতে হবে। বীজ গজাতে ৩-৪ দিন সময় লাগে। বীজ বপনের ৭-১০ দিন পর চারা ৩-৪ পাতা বিশিষ্ট হলে ৯ × ১২ সেমি. আকারের পলিব্যাগে স্থানান্তর করতে হবে। পটিং মিডিয়াতে ৩:১:১ অনুপাতে যথাক্রমে মাটি, কম্পোস্ট এবং বালু মিশাতে হবে। পলিব্যাগ ছায়াযুক্ত স্থানে স্থানান্তর করতে হবে যাতে প্রখর সূর্যালোক না পড়ে এবং ঝড় বৃষ্টি আঘাত হানতে না পারে।

জমি তৈরি ও চারা রোপণ

চারা রোপণের দুরত্ব জাত ভেদে ভিন্ন হয়। সাধারণত ৩০ দিন বয়সের চারা ৪৫ × ৪৫ সেমি. দুরত্ব রোপণ করতে হয়। মাঠে চারা লাগানোর জন্য বেড তৈরি করতে হবে। প্রতিটি বেড দৈর্ঘ্য ৯ মিটার এবং প্রস্থ ৭৫ সেমি. হতে হবে যাতে দুই সারিতে ২০টি চারা সংকোলন করা যায়। দুই সারির মাঝখানে ৩০ সেমি. ড্রেন তৈরি করতে হবে। চারা বিকেলে রোপণ করা উত্তম। চারা রোপণের পর গাছের গোড়ায় পানি দিতে হবে। নভেম্বরের শেষ সপ্তাহ হতে জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত রাতের তাপমাত্রা অনেক কমে যায় ফলে গাছের দৈহিক বৃদ্ধি ব্যাহত হয়। এক্ষেত্রে গাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধির জন্য নাইলন নেট এবং পলিথিন ছাউনিতে গাছ লাগালে রাতে ভেতরের তাপমাত্রা বাহির অপেক্ষা বেশি থাকে এবং গাছের দৈহিক বৃদ্ধি স্বাভাবিক হয়।

সারের পরিমাণ ও প্রয়োগ পদ্ধতি

ক্যাপসিকাম চাষে শতক প্রতি সার প্রয়োগের পরিমাণ ও প্রয়োগ পদ্ধতি নিম্নরুপ:

সার

মোট পরিমাণ কেজি/শতক

শেষ চাষের

সময়/কেজি /শতক

পিটে বা গর্তে কেজি/শতক

উপরি প্রয়োগ

গোবর/কম্পোস্ট

৪০

২০

২০

-

-

ইউরিয়া

-

০.৩৪

০.৩৪

০.৩৪

টিএসপি

১.৪২

১.৪২

-

-

-

এমওপি

-

০.৩৪

০.৩৪

০.৩৪

জিপসাম

০.৪৪

০.৪৪

-

-

-

জিংক সালফেট

০.০৫

০.০৫

-

-

-

জমি তৈরি সময় অর্ধেক গোবর সার প্রয়োগ করতে হবে। বাকি অর্ধেক গোবর, টিএসপি, জিংক সালফেট, জিপসাম এবং ১/৩ ভাগ ইউরিয়া এবং এমওপি পরবর্তী দুই ভাগ করে চারা লাগানোর ২৫ এবং ৫০ দিন পর প্রয়োগ করতে হবে।

সেচ প্রয়োগ

ক্যাপসিকাম খরা ও জলাবদ্ধতা কোনটি সহ্য করতে পারে না। জমিতে প্রয়োজন মতো সেচ দিতে হবে। অতিরিক্ত সেচ দিলে ঢলে পড়া রোগ দেখা দিতে পারে। জলাবদ্ধতা সৃষ্টি না হওয়ার জন্য সুষ্ঠু নিকাশ ব্যবস্থা করতে হবে।

ঠাণ্ডা থেকে সুরক্ষা

শীতকালে তাপমাত্রা কমে গেলে পলিথিন দিয়ে ছাউনি দিলে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে থাকে, যা ফলনের জন্য জরুরি।

খুঁটি

কোন কোন জাতে ফল ধরা অবস্থায় খুঁটি দিতে হয় যাতে ফলের ভারে হেলে না পড়ে।

রোগ ও পোকা

অ্যাফিড, থ্রিপস ও ফল ছিদ্রকারী পোকা এবং পাউডারি মিলডিউ, ব্যাকটেরিয়াল উইল্ট ও মোজাইক ভাইরাসের আক্রমণ হতে পারে, তাই সেদিকে নজর রাখতে হবে। কাঙ্ক্ষিত ফলন পেতে রোগ পোকার হাত থেকে ফসলকে রক্ষা করতে হবে। এর জন্য নিয়মিত প্রয়োজনে ওষুধ প্রয়োগ করতে হবে।

আগাছা দমন

আগাছানাশক বা হাত দিয়ে অথবা নিড়ানি দিয়ে প্রয়োজনীয় আগাছা দমন করতে হবে।

এছাড়া…

  • এসব রোগ বা পোকা আক্রমণ হলে টক্সিন মুক্ত দ্রবণ ব্যবহার করাই শ্রেয়।

  • এক চামচ সাবান গুঁড়া এবং নিম তেল এক টেবিল চামচ নিন, উভয় এক লিটার পানিতে মিশ্রিত করুন।

  • প্রতি সপ্তাহে এই দ্রবণ একবার স্প্রে করুন।

টবে ক্যাপসিকাম চাষ

টবে ক্যাপসিকামের জন্য অর্ধেক দো-আঁশ মাটি, অধেক জৈব সার বা ভার্মি কম্পোস্ট, এক মুঠো হাড়ের গুঁড়া এক মঠো নিম খৈল, এক চামচ এপসম সল্ট, পরিমাণমতো এনপিকে এস বা মিশ্রসার একসাথে মিশিয়ে নিন। এখন টবে আপনার পছন্দের ক্যাপসিকাম চারাটি লাগিয়ে দিয়ে টবে ভরপুর পানি দিয়ে দিন। দো-আঁশ মাটি না হলে সমস্যা নাই, ক্যাপসিক্যাম প্রায় সব মাটিতেই হয়, তবে এঁটেল মাটি থাকলে অর্ধেক এঁটেল মাটি, অর্ধেক নদীর বালি দিয়ে তৈরি করে নিতে পারেন।

অন্যান্য পরিচর্যা

ক্যাপসিকাম গাছ রোদ পছন্দ করে তবে হালকা রোদেও ভালো হয়। তবে কোনোভাবে ছায়াতে রাখা যাবে না। প্রতিদিন পানি দিতে হবে অর্থ্যাৎ টবের মাটি একটু শুকিয়ে আসলে পানি দিতে হবে, প্রয়োজনে দিনে একাধিকবার দিতে হবে। যারা হালকা রোদে করবে তাদের মাটি শুকানোর আগে পানি দেয়া ঠিক হবে না। এ গাছের সহ্যশক্তি কম হওয়ায় খরা বা জলাবদ্ধতা সহ্য করতে পারে না এবং আগাছামুক্ত রাখতে হবে। ক্যাপসিকামের আকার বড় তাই হেলে পড়া রোধে খুঁটির ব্যবস্থা করতে হবে। গাছটি ৭/৮ ইঞ্চি হলে এর আগা কেটে দিলে গাছটি অনেক ঝোপড়া হবে এবং ফলনও বেশি হবে।

গাছের পরিচর্যা

টবের ক্ষেত্রে অঙ্কুরোদগমের আগে গাছটি যেন কম সূর্যালোকে থাকে, সেটিকে বাড়ির ভেতরে রাখতে হবে। অঙ্কুরোদগম হওয়ার পর টবটিকে বারান্দায় সূর্যালোকে রাখতে হবে, তবে গাছটি প্রখর সূর্যের আলো যেন না পায়, সেদিকে নজর রাখতে হবে। যে টবে বা পাত্রে গাছটি রোপণ করা হবে তার মাটিতে যেন ভালো পরিমাণে আর্দ্রতা বজায় থাকে সেদিকে নজর রাখতে হবে। চারা পড়ন্ত বিকেলে রোপণ করা উত্তম। চারা রোপণের পর গাছের গোড়ায় পানি দিতে হবে। ক্যাপসিকামের গাছ বৃদ্ধি পেতে প্রায় ৪৫ থেকে ৬০ দিন সময় লাগে। আর জমিতে চাষ করলে মনে রাখতে হবে মিষ্টি মরিচ খরা ও জলাবদ্ধতা কোনটিই সহ্য করতে পারে না। মাঠে চারা লাগানোর জন্য বেড তৈরি করতে হবে। প্রতিটি বেড প্রস্থে ৭৫ সেমি. হতে হবে এবং লম্বায় দু’টি সারিতে ২০টি চারা সংকলনের জন্য ৯ মিটার বেড হবে। দু’টি সারির মাঝখানে ৩০ সেমি. ড্রেন করতে হবে। জমিতে প্রয়োজনমতো সেচ দিতে হবে। আবার অতিরিক্ত সেচ দিলে ঢলে পড়া রোগ দেখা দিতে পারে। অতিরিক্ত বৃষ্টির ফলে যাতে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি না হয় সে জন্য সুষ্ঠু নিকাশ ব্যবস্থা করতে হবে। কোনো কোনো জাতে ফল ধরা অবস্থায় খুঁটি দিতে হয় যাতে গাছ ফলের ভারে হেলে না পড়ে। আগাছানাশক বা হাত দিয়ে অথবা নিড়ানি দিয়ে প্রয়োজনীয় আগাছা দমন করতে হবে।

ফসল উত্তোলন

ক্যাপসিকাম সাধারণত পরিপক্ব সবুজ অবস্থায়, বারি মিষ্টিমরিচ-১ পরিপূর্ণ লাল রং হলে ও বারি মিষ্টিমরিচ-২ পরিপূর্ণ হলুদ, লালচে হলুদ হওয়ার আগেই মাঠ থেকে উঠানো হয়। সাধারণত সপ্তাহে একবার গাছ থেকে ফল সংগ্রহ করা হয়ে থাকে। ফল সংগ্রহের পর শীতল ও ছায়াযুক্ত স্থানে বাজারজাতকরণের আগ পর্যন্ত সংরক্ষণ করতে হবে। ফল সংগ্রহের সময় প্রতিটি ফলে সামান্য পরিমাণ বোঁটা রেখে দিতে হবে।

ফলন

চারা বপণের ৬০-৭০ দিন পর থেকে ফলন দিতে শুরু করে বেল পেপার বা ক্যাপসিকাম। যা পরবর্তী এক থেকে দেড় মাস পর্যন্ত ফল দিতে থাকবে। ৫০-৬০ কেজি/শতক অথবা ২ টন /বিঘা । ক্যাপসিকাম ফলগুলো আকারে বড় এবং বোঁটাগুলো মোটা হওয়ায় ফসল সংগ্রহের সময় গাছের ডাল ভেঙে যেতে পারে বা আঘাত পেতে পারে; ফসল সাবধানে তোলা উচিত।

ফাইল ১

এক্সেসিবিলিটি

স্ক্রিন রিডার ডাউনলোড করুন