কনটেন্টটি শেষ হাল-নাগাদ করা হয়েছে: বৃহস্পতিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬ এ ০১:১৭ PM
কন্টেন্ট: ই-কৃষি ই-কৃষি বিভাগ: দানাদার প্রকাশের তারিখ: ২৬-০২-২০২৬
কাউন চাষ
| উপযুক্ত জমি ও মাটি: প্রায় সব ধরনের মাটিতে কাউনের চাষ করা যায়। তবে পানি দাঁড়ায় না এমন বেলে দোঁআশ মাটিতে এর ফলন ভাল হয়। |
বপনের সময়: দেশের উত্তরাঞ্চলে অগ্রহায়ণ থেকে মাঘ মাস (মধ্য নভেম্বর থেকে মধ্য ফেব্রুয়ারি) পর্যন্ত বীজ বোনা যায়। দেশের দক্ষিণাঞ্চলে সাধারণত অগ্রহায়ণ মাসে বীজ বোনা হয়। | |
জাত:
|
বারি কাউন-২: বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কর্তৃক উদ্ভাবিত বারি কাউন-২ একটি উচ্চফলনশীল জাত। গাছের উচ্চতা ১২০ সেমি.। কাণ্ড শক্ত ও মজবুত হওয়ায় গাছ সহজে হেলে পড়ে না। শীষ ২০-২৫ সেমি. লম্বা এবং ছোট শুয়োযুক্ত হয়। বীজ গোলাকার এবং ঘিয়ে রঙের। হাজার বীজের ওজন ২.৫৫ গ্রাম। এ জাতটির ফলন হেক্টরপ্রতি ২.৭৫ -৩.০ টন। এ জাতটির জীবনকাল ১২০-১২৫ দিন। এ জাতটিতে রোগ-বালাই বা পোকামাকড়ের আক্রমণ তেমন দেখা যায় না।
বারি কাউন-৩: কাউনের এ জাতটি মিউটেশন ব্রিডিং পদ্ধতিতে উদ্ভাবিত। এই জাতটি খাটো, গড়ে ৪৫-৫০ সেমি. পর্যন্ত লম্বা হয়। গাছ প্রবল বাতাসে নুয়ে পড়ে না। ফলে পাহাড়ের ঢালে চাষের জন্য বিশেষ উপযোগী। এই জাতটির শীষ মাঝারি (গড়ে ১৭ সেমি.) এবং ছোট শুয়াযুক্ত হয়। বীজ আকারে বড়, গোলাকার এবং ঘিয়ে রঙের। হাজার বীজের ওজন ২.৩৬ গ্রাম। রবি মৌসুমে এ জাতটির ফলন হেক্টরপ্রতি ২.৫-৩.০ টন। জীবনকাল ১২০-১২৫ দিন। পাতার অগধভাগ সুঁচালো হওয়ায় পাখির আক্রমণজনিত ক্ষতি অনেক কম হয়। এ জাতটিকে রোগবালাই বা পোকামাকড়ের আক্রমণ তেমন একটা দেখা যায়।
বারি কাউন-৪: এই জাতটি ২০১৩-১৪ সালে ICRISA ( International Crops Research Institute for the Sami Aried Tropics), ভারত হতে সংগৃহীত জার্মপ্লাজম সমূহের মধ্য হতে নির্বাচন করা হয়। এ জাতের গাছের গড় উচ্চতা ১০৫ সে.মি., যা বারি কাউন-২ জাতের চেয়ে প্রায় ২৩% কম। কাণ্ড দৃঢ়, শক্ত, মজবুত ও অপেক্ষাকৃত খাট হওয়ায় জাতটি সহজে হেলে পড়ে না। এর শীষ খাড়া, ছোট শুঁয়াযুক্ত, লম্বা ও আঁটসাট । পাতা চওড়া, লম্বা ও কিছুটা বক্রাকার।দানা গোলাকার বড় ও ঘিয়ে রঙের। হাজার দানার ওজন ২.৫৫ গ্রাম। জাতটির গড় ফলন হেক্টরপ্রতি ৩.৫৩ টন (রবি মৌসুমে), যা বারি কাউন-২ জাতের চেয়ে প্রায় ১৬% বেশি। জাতটি দ্রুত বর্ধনশীল এবং ১০৮ দিনে পরিপক্ব হয়। খাদ্য ও পানির চাহিদা কম হওয়ায় খরা প্রবণ ও চরাঞ্চলেও চাষ করা যায়। এ জাতটিতে রোগ-বালাই বা পোকামাকড়ের আক্রমণ তেমন দেখা যায় না।
সাথী ফসল: বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকায় কাউন একক ফসল হিসেবে চাষ করা হয়। পাবনা, রংপুর ও দিনাজপুর অঞ্চলে কাউনের সাথে আউশ ধান, ডাটাশাক, তিল, চিনাবাদাম ও আখের চাষ হয়ে থাকে। কাউনের সাথে অনান্য ফসল চাষ করে চাষীরা অধিক লাভবান হতে পারে।
বীজের হার: কাউনের বীজ ছিটিয়ে ও সারিতে বোনা যায়। ছিটিয়ে বুনলে বিঘা প্রতি ১.৩৩ কেজি এবং সারিতে বুনলে ১.০৬ কেজি বীজের প্রয়োজন হয়।
রোপণ দূরত্ব: বীজ সারিতে বুনলে সারি থেকে সারির দূরত্ব ২৫-৩০ সেমি. রাখতে হবে। চারা থেকে চারার দূরত্ব ৬-৮ সেমি.। চারা গজানোর পর ২-৩ সপ্তাহের মধ্যে সারিতে চারার দূরত্ব ঠিক রেখে বাকি চারা তুলে ফেলতে হবে।
সার ব্যবস্থাপনা: কাউন চাষে সচরাচর রাসায়নিক সার প্রয়োগ করা হয় না। তবে অনুর্বর জমিতে হেক্টর প্রতি নিম্নরূপ সার প্রয়োগ করলে ফলন বেশি হয়।
সারের নাম | পরিমাণ/শতকে | পরিমাণ/বিঘায় | সারের পরিমাণ/হেক্টর |
ইউরিয়া | ৫২৭-৬৮৪ গ্রাম | ১৭.৪ -২২.৬ কেজি | ১৩০-১৭০ কেজি |
টিএসপি | ৪০৩- ৫০৩ | ১৩.৩-১৬.৬ কেজি | ১০০-১২৫ কেজি |
এমওপি | ৩২১-৩৬৩ গ্রাম | ১০.৬- ১২ কেজি | ৮০-৯০ কেজি |
জিপসাম | ১৮১-২২১ গ্রাম | ৬-৭.৩ কেজি | ৪৫-৫৫ কেজি |
জিংক সালফেট | ১২-১৫ গ্রাম | ০.৪ -০.৫ কেজি | ৩-৪ কেজি |
সার প্রয়োগ পদ্ধতি: সেচ বিহীন চাষে সবটুকু সার শেষ চাষের সময় প্রয়োগ করতে হবে। সেচের ব্যবস্থা থাকলে শেষ চাষের সময় অর্ধেক ইউরিয়া এবং সবটুকু টিএসপি ও এমওপি সার প্রয়োগ করতে হবে। বাকি অর্ধেক ইউরিয়া বীজ বপনের ৩৫-৪০ দিন পর উপরিপ্রয়োগ করতে হবে।
পানি সেচ: কাউন একটি খরা সহিষ্ণু ফসল । তবে রবি মৌসুমে খরা দেখা দিলে ১-২টি হালকা সেচের ব্যবস্থা করলে ফলন বেশি হয়। জমিতে আগাছা দেখা দিলে নিড়ানী দিয়ে দমন করতে হবে।
ফসল সংগ্রহ: কাউনের শীষ খড়ের রং ধারন করলে এবং বীজ দাঁতে কাটার পর কট্ করে শব্দ হলে বুঝতে হবে কাটার উপযুক্ত সময় হয়েছে। ফসল কাটার পর রোদে ভালভাবে শুকিয়ে পরে লাঠি দিয়ে পিটিয়ে বা গরু দ্বারা পায়ে মাড়িয়ে দানা ছাড়াতে হবে। ছাড়ানো দানা ভালভাবে ঝেড়ে পুনরায় রোদে শুকিয়ে ঠান্ডা করে মাটি বা টিনের পাত্রে মুখ বন্ধ করে রাখতে হবে যাতে বাতাস প্রবেশ না করতে পারে। এছাড়া মোটা পলিথিনের থলিতে ও বীজ সংরক্ষণ করা যেতে পারে।
পোকামাকড়: কাউনে পোকামাকড়ের আক্রমণ কম।
দমন ব্যবস্থা: পোকার আক্রমণ দেখা দিলে আক্রমণের ব্যপকতা বুঝে কার্বোফুরান ৫ জি জাতীয় দানাদার কীটনাশক (যেমন- ফুরাডান, ব্রিফার ইত্যাদি) হেক্টর প্রতি ১৮ কেজি হারে বীজ বপনের সময় প্রয়োগ করতে হবে এবং কাটুই পোকার জন্য প্রতি লিটার পানির সাথে ৫ মিলি ক্লোরোপাইরিফস ২০ ইসি জাতীয় কীটনাশক (ডার্সবান/পাইরিফস/অন্য নামের) মিশিয়ে চারাগাছের গোড়ায় মাটি ভিজিয়ে ভালোভাবে স্প্রে করে দিয়ে এ পোকার আক্রমণ কমানো যায়।
কাউনের ব্যবহার: কাউন আতপ বা সিদ্ধ দুভাবেই খাওয়া যায়। ধানের মতো ছেটে চাল বের করতে হয়। ১০০ কেজি কাউন হতে ৮০-৮৫ কেজি চাল পাওয়া যায়। কাউনের চাল ভাত অথবা ডালের সাথে মিশিয়ে খিচুরি হিসেবে খাওয়া যায়। আতপ কাউনের পায়েস শিশু,গর্ভবতী মা ওরোগীদের সহজপাচ্য খাবার। ইহা ভিটামিন বি-১, আয়রনের ভালো উৎস যা রক্তস্বল্পতা কমায়, হজমে সহায়ক ও ডায়বেটিস নিয়ন্ত্রণ করে।
ফলন: উপযুক্ত যত্ন ও পরিচর্যায় প্রতি হেক্টরে ২.০ -৩-০ টন পর্যন্ত ফলন দেয়।
তথ্যসূত্র: কৃষি প্রযুক্তি হাতবই, নবম সংস্করণ, বিএআরআই
বিএআরআই উদ্ভাবিত ফসলের জাতসমূহ, বিএআরআই