কনটেন্টটি শেষ হাল-নাগাদ করা হয়েছে: শনিবার, ২৮ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬ এ ০৫:৪৭ PM

কাঁকরোল উৎপাদন প্রযুক্তি

কন্টেন্ট: ই-কৃষি ই-কৃষি বিভাগ: সবজি প্রকাশের তারিখ: ২৮-০২-২০২৬

কাঁকরোল (Momordica dioica) এক ধরনের কুমড়া (Cucurbitaceae) গোত্রীয় ছোট লতানো প্রকৃতির গুল্মজাতীয় দীর্ঘজীবী উদ্ভিদ। খোসায় ছোট ছোট ঘন নরম কাঁটায় ভরা সবুজ রঙের কাঁকরোল একটি জনপ্রিয় গ্রীষ্মকালীন সবজি যা মূলত গ্রীষ্ম ও বর্ষাকালে বাংলাদেশে চাষ হয়ে থাকে। ভেতরের শাঁস সাদাটে সবুজ, বিচি নরম ও ছোট। জমি, বাড়ির আঙিনা, ছাদে বা টবে এ সবজি চাষ করা যায়। এই সবজির বাজার মূল্যও তুলনামূলক বেশি। বাংলাদেশ থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ কাঁকরোল মধ্যপ্রাচ্য ও যুক্তরাজ্যে রপ্তানি করা হয়।

উৎপত্তি ও বিস্তার

কাকরোলের উৎপত্তি স্থান সুনির্দিষ্ট নয়। ভারতীয় উপমহাদেশ ছাড়া এই সবজি অন্য কোথাও খুব একটা দেখা যায় না। তবে ভারত, বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা, মায়ানমার, মালয়েশিয়া প্রভৃতি এলাকায় বুনো অবস্থায় জন্মে থাকে বলে এসব এলাকাকে কাকরোলের উৎপত্তি স্থান হিসাবে ধরা হয় । বাংলাদেশের কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, পঞ্চগড়, গাইবান্ধা, বান্দরবান, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি, কুমিল্লা, নরসিংদী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, সাভার, যশোর প্রভৃতি এলাকায় কাঁকরোল বেশি হয়। এগুলোর মধ্যে ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কুমিল্লা এবং চট্রগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার লালমাই গ্রামে কৃষকরা ধানের পরে প্রধান ফসল হিসেবে কাঁকরোল চাষ করে থাকেন।

পুষ্টিমান

কাঁকরোল ভেষজ গুণসম্পন্ন পুষ্টিগুণে ভরপুর একটি সবজি। এর গাছ থেকে শুরু করে পাতা, শেকড়, ফল ও বীজ সবকিছুই মানবদেহের জন্য উপকারী। কাঁকরোলের প্রতি ১০০ গ্রাম খাদ্যাংশে আছে ৮৪% পানি। এ ছাড়া আছে ৭.৭ গ্রাম শর্করা, ৩.১ গ্রাম আমিষ, ১ গ্রাম চর্বি, ৩ গ্রাম আঁশ, ১.১ গ্রাম বিভিন্ন খনিজ উপাদান, শক্তি ৫২ কিলোক্যালোরি, ক্যালসিয়াম ৩৩ মিগ্রা, ফসফরাস ৪২ মিগ্রা, আয়রন ৪.৬ মিগ্রা এবং ক্যারোটিন ১৬২০ মাইক্রোগ্রাম। এতে আছে এন্টিঅক্সিডেন্ট, সর্বোচ্চ পরিমাণ ভিটামিন ‘এ’ ও ‘সি’, লুটেইন, জিয়াজেন্থিন যা আমাদের স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী। বিশেষজ্ঞদের মতে, কাঁকরোলে টমেটোর চেয়ে ৭০ গুণ বেশি লাইকোপিন, গাজরের চেয়ে ২০ গুণ বেশি বিটা ক্যারোটিন এবং ভুট্টার চেয়ে ৪০ গুণ বেশি জিয়াজেন্থিন থাকে ।

ব্যবহার

কাঁকরোলের ব্যবহার প্রধানত সবজি হিসেবে। এ গাছের কচি ফল ভাজি, ভর্তা ও তরকারি রান্না করে খাওয়া হয়। তবে কোনো কোনো দেশে কাঁকরোলের মূলও আলুর মতো খাওয়া হয়। কাঁকরোল খেলে দেহে শক্তি আসে। ব্যথা, ফোলা ও ক্ষত সারাতে কাঁকরোল ব্যবহৃত হয়। কাঁকরোল নিয়মিত খেলে প্রোস্ট্রেট ক্যান্সারের ঝুঁকি কমে যায়। এ ছাড়া এই সবজি শরীরের ক্ষতিকর কোলেস্টেরলের মাত্রা কমায়, দৃষ্টিশক্তির উন্নতি ঘটায়, দেহের তারুণ্য ধরে রাখে, ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে ও কিডনির পাথর নির্মূলে সহয়তা করে, হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি কমায়। এই সবজি খাওয়ার পর হজমে সাহায্য করে।

উল্লেখযোগ্য জাত

বাংলাদেশে স্থানীয় জাতের বেশ কিছু কাঁকরোল চাষ হয়। ফলের আকার, আকৃতি ও বর্ণ এবং নরম কাটার বৈশিষ্ট্য দ্বারা বিভিন্ন জাত শনাক্ত করা যায়। এসব জাতের মধ্যে মুকুন্দপুরী, আসামি, মণিপুরি, আলমী, হলুদ টেম্পু, বর্ণ টেম্পু, সবুজ টেম্পু ইত্যাদি অন্যতম। আসামীর ফল গোলাকার, বেঁটে এবং সুস্বাদু। মণিপুরীর লম্বাটে, অপেক্ষাকৃত চিকন, অন্যান্য জাতের তুলনায়ে ফলন বেশি হয়ে থাকে।

জলবায়ু ও মাটি

কাঁকরোলের জন্য উষ্ণ ও আর্দ্র জলবায়ু দরকার। শীতকালে মোথা বা কন্দমূল গজায় না, গাছের বৃদ্ধিও হয় না। শীত শেষে তাপমাত্রা যখন বাড়তে থাকে তখন গাছ গজাতে ও বাড়তে শুরু করে। আংশিক ছায়াতে এর চাষ করা যায়, তবে পূর্ণ আলোকিত স্থানে ফলন বেশি হয়। সুনিষ্কাশিত উঁচু জমি কাঁকরোল চাষের জন্য দরকার। বেলে দোআঁশ, দোআঁশ ও এঁটেল দোআঁশ মাটিতে কাঁকরোল চাষ করা যায়। তবে জৈব সার প্রয়োগ করে অন্য মাটিতেও কাঁকরোল চাষ করা যেতে পারে। কাকরোলের জন্য কিঞ্চিৎ অম্ল মাটি ভালো। বাংলাদেশে কেবল খরিফ মৌসুমেই কাকরোল জন্মানো সম্ভব।

উৎপাদন পদ্ধতি

বাড়ির আনাচে-কানাচে কয়েকটি গাছ লাগিয়ে দিয়ে বছর বছর ধরে, লতার বাওয়ার জন্য বাউনী তৈরি করে, অন্যান্য গাছ বা বেড়ার উপর লতা বাইয়ে সেগুলো থেকে দীর্ঘ সময় ধরে ফসল সংগ্রহ করা যায়। বাণিজ্যিকভাবে মাচায় কাঁকরোল চাষ করলে প্রচুর ফলন দেয় এবং অধিক লাভবান হওয়া যায়।

চারা তৈরি

কাকরোলের বংশবিস্তার বীজ, কাটিং বা শাখা-কলম ও কন্দমূল (মোথা) সব পদ্ধতিতেই হয়ে থাকে। তবে বাণিজ্যিক চাষের জন্য কাণ্ডের শাখা-কলম ও কন্দমূল ব্যবহার করা ভালো এবং লাভজনক। বীজ থেকে চারা গজানোর হার মাত্র ৫০% এবং চারার বেশির ভাগ গাছই পুরুষ হয়ে থাকে। এছাড়াও বীজ থেকে গজানো গাছের ফলন কম হয় এবং জাতের গুণাগুণ ঠিক থাকে না। কাকরোলের কাণ্ডের কাটিং থেকে নতুন গাছ উৎপাদন সম্ভব। কাটিং এর ক্ষেত্রে গাছের আগা কেটে বালি বা মাটির মধ্যে ছায়াযুক্ত জায়গায় পুঁতে দিলে ১০-১৫ দিনের মধ্যে চারা হয়। শাখা কলম ৫০ পিপিএম ইনডোল বিউটারিক এসিড IBA দ্রবণে ৫ মিনিট ডুবিয়ে রেখে মাদায় বা পিটে লাগালে তাড়াতাড়ি এবং বেশি সংখ্যক শিকড় গজায়। কন্দমূল দ্বারা বংশবিস্তার খুবই সহজ। জমিতে মাদা তৈরি করে সরাসরি কন্দমূল লাগিয়ে চারা উৎপাদন করা যায়। কন্দমূল মাটি বা বালু দিয়ে ঢেকে কিঞ্চিৎ স্যাঁতস্যাঁতে অবস্থায় সংরক্ষণ করা উচিত। ভালো ফলনের জন্য জমিতে রোপণের সময় ১০ শতাংশ পুরুষ গাছ রাখা উত্তম।

জমি তৈরি

কাকরোলের কন্দমূল বা শিকড় গজানো কাটিং মাদায় অথবা সারিতে লাগানো যেতে পারে। জমিতে ভালোভাবে ৪-৫টি চাষ ও মই দিয়ে মাটি ঝুরঝুরে করে জমির উপরিভাগ সমান করে নিয়ে আগাছামুক্ত করতে হবে। শেষ চাষের সময় জমিতে প্রয়োজনীয় পরিমাণ সার প্রয়োগ করতে হবে। তারপর চাষকৃত জমিতে প্রয়োজনীয় মাপের বেড তৈরি করে নিতে হবে।

জমিতে বেড তৈরি

বেড তৈরির ক্ষেত্রে প্রস্থ নিতে হবে ২ মিটার ও জমির দৈঘ্য অনুযায়ী লম্বা করতে হবে। দুই বেডের মাঝে নালার প্রস্থ ও গভীরতা হবে যথাক্রমে ৩০ সেমি. এবং ২০ সেমি.। প্রতিটি বেডে ২টি করে সারি রাখতে হবে। বেডে সারি থেকে সারির দূরত্ব হবে ২ মিটার। প্রতিটি সারিতে ৬০x৬০x৬০ সেমি. আকারের গর্ত মাদা তৈরি করে নিতে হবে।

মাদা তৈরি

মাদা পদ্ধতিতে ২.৫ মিটার দূরত্বে মাদা বসানো যেতে পারে। এতে প্রতি হেক্টরে ২৫০০ মাদা বসানো যাবে। মাদা প্রতি ২টি করে কন্দমূল রোপণ করা উচিত। কাটিং রোপণ করলে প্রতি মাদায় অন্তত তিনটি কাটিং লাগানো উচিত। মাদাপ্রতি সুপারিশকৃত মাত্রার সার মাদার মাটিতে মিশিয়ে দিতে হবে।

রোপণের সময়

ফেব্রুয়ারি থেকে মে মাসের মধ্যে যেকোনো সময় কাঁকরোলের কন্দমুল রোপণ করা যেতে পারে।

রোপণ দূরত্ব

সারি থেকে সারির দূরত্ব হবে ২ মিটার ও গাছ থেকে গাছের দূরত্ব হবে ২ মিটার। এতে প্রতি হেক্টরে প্রায় ৭ হাজার চারা লাগবে।

কন্দমুল রোপণ

মাদায় ৪-৬ সেমি. গভীরে কন্দমুল পুঁততে হবে। তারপর মাটি দিয়ে মাদা ঢেকে তার ওপর খড় বিছিয়ে দিতে হবে যাতে মাদার মাটি শুকিয়ে না যায়। প্রয়োজনে ২/১ দিন পর পর ঝাঁঝরি দিয়ে মাদায় সেচ দিতে হবে। রস না থাকলে কন্দ গজাবে না আর বেশি রস থাকলে কন্দ পচে যাবে। মোথা লাগানোর সময় পুরুষ ও স্ত্রী মোথার অনুপাত ঠিক রেখে লাগাতে হবে। সেজন্য ৯টি স্ত্রী মোথা লাগানোর পর ১টি পুরুষ মোথা লাগাতে হবে। পুরুষ গাছে স্ত্রী গাছের তুলনায় দেরিতে ফুল আসে। তাই স্ত্রী গাছের মোথা লাগানোর ১৫-২০ দিন আগে পুরুষ গাছের মোথা লাগাতে হবে।

সার প্রয়োগ

কাঁকরোলের বেশি ফলন ও গাছের ভালো বৃদ্ধির জন্য নিয়ম মতো সার দিতে হবে।

সারের নাম

মোট পরিমাণ (প্রতি শতকে)

জমি তৈরির সময় (শতকে)

প্রতি মাদায়

কন্দ

রোপণের ৭-১০ দিন আগে

কন্দ রোপণের ১০-১৫ দিন পরে

কন্দ রোপণের ৩০-৩৫ দিন পরে

কন্দ রোপণের ৫০-৫৫ দিন পরে

কন্দ রোপণের

৭০-৭৫

দিন পরে

গোবর সার

৮০ কেজি

২০ কেজি

১০ কেজি

-

-

-

-

টিএসপি

৭০০ গ্রাম

৩৫০ গ্রাম

৬০ গ্রাম

-

-

-

-

ইউরিয়া

৭০০ গ্রাম

-

-

৩০ গ্রাম

৩০ গ্রাম

৩০ গ্রাম

৩০ গ্রাম

এমওপি

৬০০ গ্রাম

২০০ গ্রাম

৫০ গ্রাম

২৫ গ্রাম

-

-

-

জিপসাম

৪০০ গ্রাম

৪০০ গ্রাম

-

-

-

-

-

দস্তা সার

৫০ গ্রাম

৫০ গ্রাম

-

-

-

-

-

বোরাক্স

৪০ গ্রাম

৪০ গ্রাম

-

-

-

-

-

ম্যাগনেশিয়াম

সালফেট

৫০ গ্রাম

-

৮ গ্রাম

-

-

-

-

মাটি পরীক্ষা করে সার সুপারিশ

মাটির
উর্বরতা মান

সার সুপারিশ (গ্রাম/গর্ত)

N

P

K

S

Zn

B

জৈব সার/গোবর (টন/হেঃ)

পরিমিত

০-১৫

০-৩

০-১৪

০-৬

-

-

-

মধ্যম

১৬-৩০

৪-৬

১৫-২৮

৭-১২

০.০-১.৩

০.০-০.৬

নিম্ন

৩১-৪৫

৭-৯

২৯-৪২

১৩-১৮

১.৪-২.৬

০.৭-১.২

অতিনিম্ন

৪৬-৬০

১০-১২

৪৩-৫৬

১৯-২৪

২.৭-৪.০

১.৩-২.০

উৎস: বিএআরসি, ২০০৫

সার প্রয়োগ পদ্ধতি

গোবর সার জমি তৈরির সময় মাটির সঙ্গে ভালোভাবে মিশিয়ে দিতে হবে। টিএসপি, এমওপি ও জিপসাম সার মোথা বা কন্দ লাগানোর ১৫ দিন আগে মাদার মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিতে হবে। ইউরিয়া সার সমান দুই থেকে চার ভাগে ভাগ করে মোথা থেকে চারা গজানোর পর যথাক্রমে ১৫, ৩০, ৬০ ও ৭৫ দিন পর উপরি প্রয়োগ করতে হবে। ডিএপি প্রয়োগ করলে টিএসপি সার প্রয়োগ করার প্রয়োজন নেই। প্রতি কেজি ডিএপি সার প্রয়োগে ৪০০ গ্রাম ইউরিয়া কম প্রয়োগ করতে হবে। মাটি অম্লীয় হলে শেষ চাষের সময় হেক্টরপ্রতি ৮০ থেকে ১০০ কেজি ডলোচুন প্রয়োগ করে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিতে হবে। মাটির উর্বরতা বা মাটি পরীক্ষা করে সার দিলে সারের মাত্রা সে অনুপাতে কম বেশি হতে পারে।

সেচ ও পানি নিকাশ

কাঁকরোল শুষ্ক দিনে লাগানো হয়। লাগানোর পর মাটি শুকাতে দেয়া যাবে না। মাদার মাটিতে জো বা রস রাখতে হবে। না হলে লাগানো মোথা শুকিয়ে যাবে ও গজানো চারা বাড়বে না। সেজন্য শুষ্ক মৌসুমে মাটি ও গাছের অবস্থা বুঝে ৫-৬ দিন অন্তর সেচ দিতে হবে। বর্ষা মৌসুমে পানি নিকাশের ব্যবস্থা করতে হবে। কারণ কাঁকরোল গাছ জলাবদ্ধতা সহ্য করতে পারে না।

আগাছা পরিষ্কার

নিয়মিত জমি পর্যবেক্ষণ করে কাঁকরোলের ক্ষেত সব সময় আগাছামুক্ত রাখতে হবে। বিশেষ করে প্রতিবার সেচ ও ইউরিয়া সার দেয়ার সময় আগাছা পরিষ্কার করতে হবে। মাদায় শুকনো আগাছা ও খড় দিয়ে ঢেকে রেখে মাদার মাটির রস ধরে রাখা যায়।

মাচা তৈরি বা জাংলা দেয়া

কাঁকরোলের গাছ লতানো হওয়ায় এর সহায়তার প্রয়োজন হয়। কাঁকরোল গাছ ১০ থেকে ১৫ সেন্টিমিটার বা ৫-৬ ইঞ্চি লম্বা হলে চারার গোড়ায় কাঠি পুঁতে দিতে হবে। গাছ যখন ৫০ সেন্টিমিটার বা ২০ ইঞ্চি লম্বা হবে তখন বাউনির জন্য মাচা তৈরি করে দিতে হবে। মাচা ১ থেকে ১.৫ মিটার উঁচু হবে। বাঁশের খুঁটি ও জিআই তার বা নাইলনের রশি দিয়ে করা যায়। পাটকাঠি বা ধৈঞ্চা গাছের শলাও এ কাজে ব্যবহার করা যায়।

পরাগায়ন

কাঁকরোলের পুরুষ ও স্ত্রী ফুল আলাদা গাছে ফুটে বলে ফুলের পরাগায়ন বিভিন্ন প্রকার কীটপতঙ্গের উপর নির্ভরশীল। প্রাকৃতিকভাবে পরাগায়ন খুব কম হয়। তাই পরাগায়নের কোনো নিশ্চয়তা থাকে না। চারা রোপণের ৩০-৬০ দিন পর প্রথম স্ত্রী ফুল ফোটে এবং ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত সতেজ বা জীবিত থাকে। অন্যদিকে একই সময়ে গজানো পুরুষ গাছে ফুল বেশ কিছুদিন দেরিতে আসে। কিছু দূরে দূরে পুরুষ ও স্ত্রী গাছ লাগিয়ে মাত্র ৫০% স্ত্রী ফুল থেকে ফল পাওয়া যায়। হরমোন প্রয়োগ করে পরাগায়ন ব্যতিরেকে কাকরোলে ফল উৎপাদন করা যায়।

কৃত্রিম পরাগায়ন

কাকরোলের ভালো ফলনের জন্য প্রকৃতির ওপর নির্ভর না করে ফুলের কৃত্রিম পরাগায়ন করতে হয়। কৃত্রিম পরাগায়নের জন্য সকাল ৬ টার দিকে সদ্য ফোটা পুরুষ ফুল বোটাসহ কেটে নিয়ে সতেজ রাখার জন্য ফুলগুলোর বোটা পানির ভেতর ডুবিয়ে ছায়াযুক্ত স্থানে রেখে দিতে হবে। এরপর পুরুষ ফুলের পুংকেশর ঠিক রেখে পাঁপড়িগুলো ছিঁড়ে ফেলতে হবে। এতে কৃত্রিম পরাগায়নের কাজ সহজ হবে। তারপর স্ত্রীফুলের গর্ভমুণ্ডের ওপর পুরুষ ফুলের পুংকেশর বা পরাগধানির রেণু বা হলদে গুড়া খুব আস্তে আস্তে ২-৩ বার স্পর্শ করাতে হবে। এই কাজটি স্ত্রী ফুল ফোটার ১২ ঘণ্টার মধ্যেই করতে হবে। এর ফলে গর্ভমুণ্ডে রেণু আটকে যাবে ও পরাগায়ন হবে। সাবধনতা অবলম্বন করলে ১টি পুরুষ ফুল দিয়ে ৬-৭টি স্ত্রী ফুলে কৃত্রিম পরাগায়ন সম্ভব। কৃত্রিম পরাগায়ন করলে শতভাগ স্ত্রী ফুল থেকে ফল হয়।

মুড়ি বা রেটুন কাকরোল

যেসমস্ত ফসল একবার সংগ্রহের পর একই গাছ হতে পরবর্তী বছর পরিচর্যার মাধ্যমে ফলন পাওয়া যায়, সে সমস্ত ফসলকে মুড়ি ফসল বলে। শীতের শুরুতেই কাকরোল গাছ মরে যায় এবং পরবর্তী বর্ষা না আসা পর্যন্ত মাটির নিচে মোথা নিষ্ক্রিয় অবস্থায় থাকে, যা থেকে পরের বছর আবার সঠিকভাবে যত্ন নিলে ভালো ফলন পাওয়া যায়। এভাবে কাঁকরোল চাষ করলে বীজের খরচ, রোপণ এবং রোপণ পরবর্তী খরচ অনেকাংশে কমে যায় এবং বেশি লাভবান হওয়া যায়।

পোকামাকড় ব্যবস্থাপনা

কাঁটালে পোকা: কাঁকরোলের সবচেয়ে বড় শত্রু হলো কাঁটালে পোকা। এ পোকার পূর্ণাঙ্গ ও বাচ্চা পোকারা পাতা ঝাঁঝরা করে খেয়ে নষ্ট করে।

প্রতিকার: আক্রান্ত পাতায় পোকা বা বাচ্চা দেখলে সেগুলো হাত দিয়ে টিপে মেরে ফেলতে হবে বা কিড়ার গাদা সংগ্রহ করে ধ্বংস করতে হবে। এছাড়া ৫ মিলিলিটার নিমতেলের সাথে ৫ মিলিলিটার ট্রিকস বা তরল সাবান ১ লিটার পানিতে গুলে স্প্রে করেও এ পোকা দমন করা যেতে পারে। আক্রমণ বেশি হলে অনুমোদিত কীটনাশক স্প্রে করতে হবে।

ফলের মাছি পোকা: ফলের মাছি পোকা কাঁকরোলের কচি ফল নষ্ট করে, ফল বিকৃত হয়ে যায়। এই পোকা কচি ফলের গায়ে ছিদ্র করে ডিম পাড়ে। এসব ডিম ফুটে কিড়া বেরিয়ে ফলের মধ্যে ঢোকে ও ফল খেয়ে নষ্ট করে, আক্রান্ত ফল বিকৃত হয়ে যায়।

প্রতিকার: কীটনাশক স্প্রে করে এ পোকা সহজে দমন করা যায় না। আক্রান্ত ফল ও ফুল তুলে ধ্বংস করতে হবে। ক্ষেত পরিচ্ছন্ন রাখলে এ পোকার আক্রমণ কম হয়। মাচায় প্রতি ১০ মিটার পর পর একটি করে সেক্স ফেরোমোন ফাঁদ বা ১২ মিটার পর পর বিষটোপ ফাঁদ পেতে এ পোকা নিয়ন্ত্রণ করা যায়।

লেদা পোকা: সবুজ রঙের এসব পোকা পাতা মুড়ে খেয়ে নষ্ট করে। ফুল ও ফল ছিদ্র করে খেয়ে নষ্ট করে।

প্রতিকার: হাত দিয়ে ধরে টিপে মেরে ফেলা এ পোকা দমনের সবচেয়ে সহজ উপায়। তা সম্ভব না হলে মাদার মাটিতে চারার চারপাশে ঘুরিয়ে দানাদার কীটনাশক ছিটিয়ে সেচ দিতে হবে।

জাব পোকা: গাছের কচি পাতা ও ডগার রস শুষে নেয়, গাছ দুর্বল হয়ে যায়।

প্রতিকার: আক্রান্ত অংশ অপসারণ, শুকনো ছাই প্রয়োগ, সাবান পানি বা তামাকের গুঁড়া মিশ্রিত পানি স্প্রে। প্রয়োজনে অনুমোদিত কীটনাশক যেমন ইমিডাক্লোরোপ্রিড (এডমায়ার, ইমিটাফ) ব্যবহার করা যেতে পারে।

ফল ছিদ্রকারী পোকা: পোকার কীড়া কচি ফল ও ডগা ছিদ্র করে খায়।

প্রতিকার: আক্রান্ত ডগা ও ফল সংগ্রহ করে নষ্ট করা, ক্ষেত পরিষ্কার রাখা। নিমবিসিডিন এর মতো জৈব বালাইনাশক ব্যবহার করা যায়। আক্রমণের তীব্রতা বেশি হলে রিপকর্ড, ডেসিস বা সুমিথিয়ন জাতীয় কীটনাশক ব্যবহার করা যেতে পারে।

অন্যান্য: স্কেল ইনসেক্ট বা খোস পোকা পাতার নিচে ও লতায় আক্রমণ করে রস চুষে খেয়ে শুকিয়ে ফেলে। রেড পাম্পকিন বিটিল চারা অবস্থায় রেড পাম্পকিন বিটিল ক্ষতি করে।

রোগ ব্যবস্থাপনা

চারার ঢলে পড়া রোগ: এটি একটি ছত্রাকজনিত রোগ। এ রোগের আক্রমণে কচি গাছের গোড়া পঁচে যায়। চারা ঢলে পড়ে ও মার যায়।

দমন ব্যবস্থাপনা: পানি নিকাশের ব্যবস্থা করতে হবে। রোগমুক্ত মোথা লাগাতে হবে। আক্রান্ত গাছ তুলে পুড়ে ফেলতে হবে। অনুমোদিত ম্যানকোজেব জাতীয় ছত্রাকনাশক স্প্রে করতে হবে।

পাউডারী মিলডিউ রোগ: এটি একটি ছত্রাকজনিত রোগ। পাতার উপরে সাদা সাদা ধূসর পাউডারী দেখা যায় এবং পাতা মরে যায়।

দমন ব্যবস্থাপনা: রোগমুক্ত মোথা রোপণ করতে হবে। রোগ দেখা দেয়ার সাথে সাথে থায়োভিট বা মাইক্রোথিয়ন বা সালফোটক্স বা অন্যকোনো ছত্রাকনাশক স্প্রে করতে হবে।

সুটিমোল্ড রোগ: পাতা, ফল ও কাণ্ডে কালো ময়লা জমে। খোসা পোকা বা সাদা মাছির আক্রমণে এটি হয়।

দমন ব্যবস্থাপনা: আক্রান্ত পাতা ও ডগা ছাঁটাই করে ধ্বংস করা। বাহক পোকা দমন করার জন্য ফেনিট্রথিয়ন জাতীয় কীটনাশক স্প্রে করতে হবে।

মোজাইক রোগ: ভাইরাস জনিত রোগ। পাতায় হলুদ ও গাঢ় সবুজ ছোপ ছোপ মোজাইক দেখা যায়। জাব পোকা ও সাদা মাছি এই রোগের বাহক।

দমন ব্যবস্থাপনা: আক্রান্ত গাছ তুলে ফেলা বা ডাল কেটে দিতে হবে। বাহক পোকা দমনের জন্য ইমিডাক্লোরোপ্রিড গ্রুপের কীটনাশক স্প্রে করতে হবে। সকাল বেলা গাছে ছাই ছিটিয়ে দিলে এই পোকা গাছ থেকে পড়ে যাবে৷ ঔষধ স্প্রে করায় সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।

ফসল সংগ্রহের সময়

কাঁকরোল গাছের জীবনকাল ১৩০-১৫০ দিন। মধ্য জুলাই হতে মধ্য সেপ্টেম্বর মাস কাঁকরোল সংগ্রহের উত্তম সময়।

ফসল সংগ্রহ

রোপণের দেড় থেকে দুই মাসের মধ্যে কাঁকরোলে ফুল আসা শুরু হয়। কাঁকরোল হলদে সবুজ হলে একটা একটা করে কেটে বা ছিঁড়ে কচি অবস্থায় সংগ্রহ করতে হয়। মোথা লাগানোর ৩০-৬০ দিনের মধ্যে স্ত্রী গাছে ফুল ফুটোতে শুরু করে। চারা গজানোর ৬০-৭০ দিন পর কাঁকরোল তোলা শুরু করা যায়। কাঁকরোল গাছে পরাগায়নের ১২-১৫ দিনের মধ্যে কাঁকরোল সংগ্রহের উপযোগী সময়। শেষ পর্যন্ত কাঁকরোল তোলা যায়। নিয়মিত ফল সংগ্রহ করলে গাছের ফলন ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়।

ফলন
সঠিকভাবে পরিচর্যা নিলে জাতভেদে হেক্টরপ্রতি কাঁকরোলের ২৫ থেকে ৩০ টন (শতক প্রতি ৮০-১২০ কেজি) পর্যন্ত ফলন পাওয়া যায়। পাশাপাশি হেক্টরে প্রায় ১ টন বা শতকে ৪ কেজি মোথা পাওয়া যায় যা বীজমোথা হিসেবে বাজারে বিক্রি করা যায়। মোথা বিক্রি করলে পুরুষ ও স্ত্রী উভয় মোথাই বিক্রি করতে হবে।

গ্রেডিং, প্যাকেজিং ও বাজারজাতকরণ

কাঁকরোল সংগ্রহের পরপরই আকার অনুসারে গ্রেডিং করা হয়। গ্রেডিংকৃত কাঁকরোল প্যাকিং করে বাজারজাত করা হয়। কাঁকরোল বস্তাবন্দী না করে বায়ু চলাচলের সুবিধাযুক্ত প্লাস্টিক, কাঠ বা বাঁশের খাঁচা বা হার্ডবোর্ডের বাক্সে করে বাজারে পাঠাতে হয় যাতে গায়ে আঘাত না লাগে।

কাঁকরোল উৎপাদন প্রযুক্তির তথ্যসূত্র

১। সবজি বিজ্ঞান, মোহাম্মদ মামুনুর রশিদ, প্রকাশকাল- নভেম্বর, ১৯৯৯।

২। শাক সবজি চাষ, মৃত্যুঞ্জয় রায়, প্রকাশকাল- ফেব্রুয়ারি, ২০১৪।

৩। কৃষি তথ্য সার্ভিসের ওয়েবসাইট

৪। কাঁকরোলের আধুনিক চাষ পদ্ধতি, কৃষি বাতায়ন, মোঃ মাশরেফুল আলম, উপজেলা কৃষি অফিসার, জামালগঞ্জ, সুনামগঞ্জ

২৯-০৫-২০১৯

৫। কাঁকরোল- উইকিপিডিয়া

৬। কাঁকড়োল চাষ পদ্ধতি কীভাবে, শিক্ষক বাতায়ন, মোঃ সেলিম রেজা, সহকারী শিক্ষক, ২৯ জুলাই, ২০২৫

৭। আধুনিক পদ্ধতিতে কাঁকরোল চাষ পদ্ধতি, শিক্ষক বাতায়ন, মোঃ আবদুল্লাহ আল মামুন, রেজা, সহকারী শিক্ষক, ০৭ মার্চ,

২০২৪

ফাইল ১

এক্সেসিবিলিটি

স্ক্রিন রিডার ডাউনলোড করুন