কনটেন্টটি শেষ হাল-নাগাদ করা হয়েছে: বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারী, ২০২৬ এ ০১:০৮ PM

কচু চাষ

কন্টেন্ট: ই-কৃষি ই-কৃষি বিভাগ: কন্দাল প্রকাশের তারিখ: ১৫-০১-২০২৬

কচু Araceae গোত্রভুক্ত একধরনের কন্দজাতীয় উদ্ভিদ। কচু মানুষের চাষকৃত প্রাচীন উদ্ভিদগুলোর মধ্যে একটি। বাংলাদেশ ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গের প্রায় সব এলাকায় কম বেশি কচু দেখতে পাওয়া যায়। রাস্তার পাশে, বাড়ির আনাচে কানাচে, বিভিন্ন পতিত জমিতে অনাদরে-অবহেলায় অনেক সময় কচু জন্মাতে দেখা যায়।

খাবার উপযোগী জাতগুলোর অন্যতম মুখীকচু, পানিকচু, পাইদনাইল, ওলকচু, দুধকচু, মানকচু, শোলাকচু ইত্যাদি।

বাংলাদেশে কচু একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সবজি। এ দেশে কচুজাতীয় সবজির মধ্যে পানিকচু, মুখীকচু, ওলকচু, পঞ্চমুখীকচু, ঘটমানকচু, মানকচু, দুধকচু ইত্যাদির চাষ হয়ে থাকে। কচুতে ভিটামিন ‘এ’ এবং লৌহ প্রচুর পরিমাণে থাকে। বাংলাদেশের মাটি ও জলবায়ু কচু চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী।

মুখীকচু

মুখী কচু একটি সুস্বাদু সবজি। এ সবজি খারিফ মৌসুমের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের সব অঞ্চলেই এর চাষ হয়। মুখীকচু বাংলাদেশের গুঁড়াকচু, কুড়িকচু, ছড়াকচু, দুলিকচু, বিন্নিকচু, ইত্যাদি নামে ও পরিচিত। মুখী কচুতে প্রচুর পরিমাণ শ্বেতসার, ক্যালসিয়াম, লৌহ, ফসফরাস এবং ভিটামিন এ ও সি পাওয়া যায়।

সারাদিন রোদ পায় এমন স্থানে মুখীকচু জন্মানো উচিত। এ ফসলের জন্য উষ্ণ ও আর্দ্র জলবায়ু প্রয়োজন।

বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘বিলাস’, বারি মুখীকচু-২ ও বারি মুখী কচু-৩ নামে উচ্চফলনশীল জাত উদ্ভাবন করেছে।

জাত পরিচিতি

১. বিলাসী : বিলাসী গুণে উৎকৃষ্ট ও উচ্চ ফলনশীল। এর গাছ সবুজ, খাড়া, মাঝারি লম্বা। এর মুখী খুব মসৃণ, ডিম্বাকার হয়।

জীবনকাল : ২১০-২৮০ দিন।

ফলন : সাধারণ অবস্থায় এর ফলন হেক্টরপ্রতি প্রায় ২৫-৩০ টন। উন্নত পদ্ধতিতে চাষ করলে হেক্টরপ্রতি ৪০ টন পর্যন্ত ফলন হয়ে থাকে।

২. বারি মুখীকচু-২ : গাছ খাড়া, মাঝারি আকৃতির এবং সবুজ বর্ণের। পাতা সবুজ ও Peltate আকৃতির। বোঁটা ও পত্র ফলকের সংযোগস্থল সবুজ রঙের। মুখী ধূসর রঙের এবং ফ্লেস সাদা। সাধারণ অবস্থায় এর ফলন হেক্টরপ্রতি প্রায় ৩৫ টন।

৩. বারি মুখীকচু-৩ : বারি মুখীকচু-৩ এর গাছ সবুজ, খাড়া, মাঝারি লম্বা। মুখী মসৃণ ও ডিম্বাকার। মুখী খুবই সুস্বাদু, সিদ্ধ করলে সমানভাবে সিদ্ধ হয় এবং গলা চুলকায় না।

সংগ্রহ কাল : খাওয়ার উপযোগী সংগ্রহকাল ২৩০-২৬০ দিন এবং বীজের জন্য জীবনকাল ২৭০-৩০০ দিন। হেক্টর প্রতি গড় ফলন ৪০-৪৫ টন।

উৎপাদন প্রযুক্তি

মাটি : দো-আঁশ মাটি মুখীকচুর জন্য উত্তম। বর্ষাকালে পানি দাঁড়ায় না এমন জমি নির্বাচন করতে হবে।

রোপণের সময় : মধ্য মাঘ থেকে মধ্য ফাল্গুন (ফেব্রুয়ারি)।

রোপন পদ্ধতি

১. একক সারি পদ্ধতি : সারি থেকে সারির দূরত্ব ৬০ সেমি. এবং গাছ থেকে গাছের দূরত্ব ৩৫ সেমি.।

২. ডাবল সারি পদ্ধতি : এ পদ্ধতিতে ৭৫ সেমি.× ৬০ সেমি. দূরত্ব বেশি উপযোগী বলে প্রমাণিত।

বীজের হার : মুখীর ছড়া ৪৫০-৬০০ কেজি/হেক্টর (১৫-২০ গ্রাম ওজনের মুখী)।

মুখীকচুর চাষে নিম্নলিখিত হারে সার ব্যবহার করতে হয়-

সারের নাম

সারের পরিমাণ

কেজি/হেক্টর

কেজি/বিঘা

কেজি/শতক

গোবর

১০,০০০

১৩৭৭

৫.৫৯

ইউরিয়া

২৫০-৩৩০

৩৪.৪৪-৪৫.৪৫

০.১৪-০.১৮

টিএসপি

১৫০-২০০

২০.৬৬-২৭.৫৫

০.০৮-০.১১

এমওপি

২৫০-৩৫০

৩৪.৪৪-৪৮.২১

০.১৪-০.২০

জিপসাম

১০০-১৩০

১৩.৭৭-১৭.৯১

০.০৬-০.০৭

জিংক সালফেট

১০-১৬

১.৩৮-২.২

০.০১

বরিক এসিড

১০-১২

১.৩৮-১.৬৫

০.০১

সার প্রয়োগ পদ্ধতি : সম্পূর্ণ গোবর বা খামারজাত সার, টিএসপি, জিপসাম, ‍জিংক সালফেট ও বরিক এসিড এবং অর্ধেক ইউরিয়া ও এমওপি জমি প্রস্তুতির শেষ চাষের সময় ছিটিয়ে প্রয়োগ করতে হবে। বাকি অর্ধেক এমওপি চারা গজানোর ২০-২৫ দিন পর এবং বাকিক ইউরিয়া সমান দুই কিস্তিতে বীজ গজানোর ২০-২৫ দিন এবং ৪০-৫০ দিনের মধ্যে পার্শ্ব প্রয়োগ পদ্ধতিতে ওপরি প্রয়োগ করতে হবে।

ফসল সংগ্রহ : বীজ রোপণের ছয় মাস পর আগাম ফসল সেপ্টেম্বর (মধ্য-ভাদ্র) মাস থেকে মুখী সংগ্রহের উপযোগী হয়।

ফলন : উচ্চ ফলনশীল বিলাসী জাতে গড় ফলন হেক্টরপ্রতি ২০-৩৫ টন। মোট ফেলনের ৭৫-৮৫% মুখী (Corn) এবং বাকিটা গুঁড়িকন্দ (Cormel)।

পানিকচু

যে সমস্ত কচু স্বল্প পানিতে চাষ করা যায় তাকে পানিকচু বলে। জলে হয় বলে সম্ভবতই এর নাম পানিকচু বা জল কচু। সারাদেশে পানিকচু বা জলকচুর বিভিন্ন নাম রয়েছে যেমন- নারিকেলকচু, জাতকচু, বাঁশকচু ইত্যাদি। সবজি হিসেবে পানিকচুর গুরুত্ব ব্যাপকভাবে সমাদৃত। বিশেষ করে চট্টগ্রাম অঞ্চলের মানুষের কাছে এটি একটি জনপ্রিয় সবজি। কারণ এর স্বাদ এবং পুষ্টিমান ও অত্যধিক, রান্না করাও সহজ। বাংলাদেশে প্রায় ৩২.৭৯ হেক্টর জমিতে কচুর চাষ করে প্রায় ১.২১ লক্ষ টন ফলন পাওয়া যায়। পানিকচু ও মুখীকচু এর মধ্যে প্রায় ৮৫% জায়গা দখল করে আছে।

জমি ও মাটি : পলি দো-আঁশ ও এটেল মাটি পানিকচু চাষের জন্য উপযুক্ত ।

জাত পরিচিতি : বারি কর্তৃক উদ্ভাবিত জাতসমূহ-

১. বারি পানি কচু-১

২. বারি পানি কচু-২

৩. বারি পানি কচু-৩

৪. বারি পানি কচু-৪

৫. বারি পানি কচু-৫

৬. বারি পানি কচু-৬

৭. বারি পানি কচু-৭

৮. বারি পানি কচু-৮

৯. বারি পানি কচু-৯

১. বারি পানিকচু-৭ : রাইজোমের বাইরের পৃষ্ঠা হালকা বেগুণী (Purple) এবং ভিতরের মাংশল অংশ সাদা থাকে যা জাতটির সনাক্তকারী বৈশিষ্ট্য। গলা একেবারেই ধরে না (non-acrid)। সিদ্ধ করলে মোলায়েম ভাবে সিদ্ধ হয়, কোনো কচকচে ভাব থাবে না।

ফলন (টন/হেক্টর) : হেক্টরপ্রতি ফলন ৬০-৭৫ টন রাইজোম ও প্রায় ৮-১১ টন লতি উৎপন্ন হয়।

২. বারি পানিকচু-৮ : বারি পানিকচু-৮ এর প্রধান ভক্ষণযোগ্য অংশ হলো লতি। তবে কাণ্ড (রাইজোম) আর পাতাও সবজি হিসেবে খাওয়া য়ায়। লতি তুলনামূলক মোটা ও খাটো।

ফলন (টন/হেক্টর) : প্রতি হেক্টর লতির গড় ফলন ২৫ টন এবং রাইজোমের গড় ফলন প্রায় ২৪ টন।

৩. বারি পানিকচু-৯ : বারি পানিকচু-৯ এর প্রধান ভক্ষণযোগ্য অংশ হলো লতি। তবে কাণ্ড (রাইজোম) আর পাতাও সবজি হিসেবে খাওয়া য়ায়।

ফলন (টন/হেক্টর) : প্রতি হেক্টর লতির গড় ফলন ৩০ টন এবং রাইজোমের গড় ফলন প্রায় ২৫ টন। রান্না করলে লতি সমানভাবে সিদ্ধ হয় এবং খেতে সুস্বাদু।

ওলকচু

এতে পুষ্টি ও ঔষধি মূল্য উভয়ই বিদ্যমান এবং সাধারণত রান্না করে তরকারি হিসেবে খাওয়া হয়। বাংলাদেশে এটি গ্রীষ্ম মৌসুমে জন্মে যখন বাজারে সবজির খুব ঘাটতি থাকে। ওলকচুর রস, উচ্চরক্তচাপের রোগীকে প্রতিষেধক হিসেবে খাওয়ানো হয়। পার্বত্য চট্টগ্রামে ও সাতক্ষীরা অঞ্চলে বাণিজ্যিকভাবে এর আবাদ হয়।

জাত : বারি ওলকচু -১ ও বারি ওলকচু -২

জাত এর বৈশিষ্ট্য

বারি ওলকচু-১ : জাতটির পত্রকগুলি ঘনভাবে বিন্যস্ত, একটার সাথে আরেকটা লেগে থাকে। ভয়াকাণ্ডে সাদা ছোপ ছোপ দাগগুলো বড় আকারের এবং অল্প সংখ্যক কাঁটা কাঁটা গঠন থাকে বিধায় ভয়াকাণ্ডটি হালকা খসখসে হয়। প্রধান গুঁড়িকন্দ বড় আকারের হয়, প্রতিটি গুঁড়িকন্দ হতে গড়ে ৩-৩.৫টি করমেল উৎপন্ন করে। গুঁড়িকন্দের মাংসল অংশ ক্রিম রঙের এবং ক্যারোটিন সমৃদ্ধ।

বারি ওলকচু-২ : জাতটির পত্রকগুলো হালকাভাবে বিন্যস্ত, একটা থেকে আরেকটা পৃথক থাকে। ভূয়াকাণ্ডে সাদা ছোপ ছোপ দাগগুলো ছোট আকারের এবং অধিক সংখ্যক কাঁটা কাঁটা গঠন থাকে বিধায় ভূয়াকাণ্ডটি বেশ খসখসে হয়।

ফলন : হেক্টরপ্রতি ফলন ৩৫-৪৫ টন।

বীজ বপনের সময় : মধ্য-মাঘ থেকে মধ্য-ফাল্গুন (ফেব্রুয়ারি) মাস বীজ বপনের উপযুক্ত সময়। প্রয়োজনে মধ্য-চৈত্র থেকে মধ্য-বৈশাখ (এপ্রিল) মাসেও লাগানো যায় তবে এরপরে রোপণ করলে ফলন কমে যায়।

জীবনকাল : ২১০-২৭০ দিন দিন ।

উৎপাদন (সেচসহ)/প্রতি হেক্টর : ৪৫-৫৫ টন ।

মানকচু

মানকচুর ডগা ও পাতা বাতের রোগীকে খাওয়ানোর প্রথা এ দেশের ঘরে ঘরে প্রচলিত রয়েছে। কচুশাকে পর্যাপ্ত আঁশ থাকায় এটি দেহের হজমের কাজে সহায়তা করে। মানকচু সাধারণত বাড়ির আশেপাশে বা পতিত জমিতেও চাষ করা যায়। অন্যান্য সবজির সাথেও মানকচু চাষ করা যেতে পারে। এটি একটি লাভজনক সবজি, যা চাষ করে ভালো আয় করা সম্ভব। মানকচু সাধারণত ভর্তা বা অন্যান্য সবজি হিসেবে খাওয়া হয়।

জমি তৈরি

জমিতে ৪-৫টি চাষ ও মই দিয়ে মাটি ঝুরঝুরে ও সমান করে নিতে হবে। জমির আগাছা পরিষ্কার করে নিতে হবে। মাটি উর্বর হলে, লাইন থেকে লাইনের দূরত্ব ২৪ ইঞ্চি এবং গাছ থেকে গাছের দূরত্ব ১৮ ইঞ্চি রাখতে হবে। যদি মাটি অনুর্বর হয়, তবে লাইন থেকে লাইনের দূরত্ব ২৪ ইঞ্চি এবং গাছ থেকে গাছের দূরত্ব ১ ফুট ৪ ইঞ্চি রাখতে হবে।

চারা রোপণ

  • মানকচুর চারা সাধারণত ‘চোখ’ থেকে তৈরি করা হয়, যা কচুর গায়ে থাকে।

  • চোখগুলো কেটে নিয়ে আর্দ্র মাটিতে রোপণ করতে হয়।

  • রোপণের সময় খেয়াল রাখতে হবে, যেন প্রতিটি চারার গোড়া ভালোভাবে মাটিতে লাগে।

  • রোপণের পর হালকা সেচ দেওয়া যেতে পারে।

পরিচর্যা : মানকচুর জমিতে পর্যাপ্ত পরিমাণে সূর্যের আলোর প্রয়োজন হয়। মাটি শুকিয়ে গেলে সেচ দিতে হবে। জমিতে আগাছা দেখা গেলে তা পরিষ্কার করতে হবে। রোগবালাই দেখা দিলে অনুমোদিত বালাইনাশক নিদৃষ্ট মাত্রায় স্প্রে করতে হবে।

ফসল সংগ্রহ : চারা রোপণের ৬-৭ মাস পর মানকচু সংগ্রহ করা যায়। কচুর লতা হলুদ হয়ে গেলে এবং পাতা কিছুটা শুকিয়ে গেলে, কন্দ (মূল) সংগ্রহ করার উপযুক্ত সময়।

ফাইল ১

এক্সেসিবিলিটি

স্ক্রিন রিডার ডাউনলোড করুন