কনটেন্টটি শেষ হাল-নাগাদ করা হয়েছে: সোমবার, ৯ মার্চ, ২০২৬ এ ১২:৫১ PM
কন্টেন্ট: ই-কৃষি ই-কৃষি বিভাগ: তেল ফসল প্রকাশের তারিখ: ০৯-০৩-২০২৬
সূর্যমুখী একটি উৎকৃষ্ট তেলফসল। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশেসূর্যমুখীর ব্যাপক চাষ হয়। ১৯৭৫ সালথেকে সূর্যমুখী একটি তেলফসল হিসেবে বাংলাদেশে আবাদহচ্ছে। বর্তমানে পটুয়াখালী, রাজশাহী, যশোর, কুষ্টিয়া, নাটোর, পাবনা, দিনাজপুর, গাজীপুর, টাঙ্গাইল প্রভৃতি জেলাতে চাষহচ্ছে। সূর্যমুখীরবীজে ৪০-৪৫% লিনোলিক এসিড রয়েছে। সূর্যমুখীর তেলেক্ষতিকারক ইরোসিক এসিড নেই। হৃদরোগীদের জন্যসূর্যমুখীর তেলখুবই উপকারী। সূর্যমুখীর হেক্টরপ্রতি গড় ফলন১.৭-১.৯ টন। সূর্যমুখীরখৈল গরুও মহিষের উৎকৃষ্টমানের খাদ্যহিসেবে ব্যবহৃত হয়। এর বীজ ছাড়ানোর পর মাথাগুলো গরুর খাদ্যহিসেবে ব্যবহার করা যায়। গাছ ও পুষ্পস্তবক জ্বালানী হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
পুষ্টিমূল্য ও ভেষজগুণঃ সূর্যমুখীর বীজে ৪০-৪৫% লিনোলিক এসিড রয়েছে, তাছাড়া এতেক্ষতিকারক ইরোসিক এসিড নেই। হৃদরোগীদের
জন্য সূর্যমুখীরতেল খুবইউপকারী।
ব্যবহারঃ সূর্যমুখীর খৈল গরুও মহিষের উৎকৃষ্টমানের খাদ্যহিসেবে ব্যবহৃত হয়। এর বীজ ছাড়ানোর পর মাথাগুলো গরুর খাদ্যহিসেবে ব্যবহার করা যায়। গাছ ও পুষ্পস্তবক জ্বালানী হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
উপযুক্ত জমি ও মাটিঃ সূর্যমুখী সাধারণত সবমাটিতেই জন্মে। তবে দোআঁশমাটি সবচেয়ে বেশী উপযোগী।
জাত পরিচিতিঃ এ পর্যন্ত বারিকর্তৃক ৩টিজাত উদ্ভাবন করা হয়েছে। কিরণী (ডিএস-১), বারি সুর্যমুখী-২ এবং বারিসূর্যমুখী-৩। কিরণী ১৯৮২সালে জাতটির অনুমোদন দেয়াহয়। এ জাতের গাছেরউচ্চতা ৯০-১১০ সে.মি.। বীজ লম্বাও চ্যাপ্টা। ১০০০ বীজেরওজন ৬০-৬৫ গ্রাম। বীজের রংকালো। প্রতি গাছে ১টিকরে মাঝারি আকারের পুষ্পস্তবক ধরে থাকে। ভাদ্র-আশ্বিন (মধ্য-আগস্ট থেকে মধ্য-অক্টোবর) মাসে বপন করলেসংগ্রহ করতে৯০-১০০ দিন সময়লাগে। কার্তিক-অগ্রহায়ণ মাসে (মধ্য-অক্টোবর থেকে মধ্য-ডিসেম্বর) বপন করলে ১০০-১১০ দিনসময় লাগে। প্রতি হেক্টরে ১.৬-১.৮ টন ফলন পাওয়া যায়। বীজে তেলেরপরিমাণ ৪২-৪৪%। জাতটি মোটামুটিভাবে অলটারনেরিয়া ব্লাইট রোগ সহনশীল। বারি সূর্যমুখী-২ এসটি-২২৫০ হাইব্রিড থেকেস্ব-পরাগায়ন ও নির্বাচন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এসটি-২২৫০ সি লাইনটি বাছাই করাহয়। এটি ২০০৪ সালেরমার্চ মাসে ‘বারি সূর্যমুখী-২’ নামে বাংলাদেশে চাষাবাদের জন্য অনুমোদিত হয়। এ জাতের গাছেরউচ্চতা ১২৫-১৪০ সে.মি. ও ব্যাস ২.০-২.৪ সে.মি.। পরিপক্ক পুস্পযুগবী বা মাথারব্যাস ১৫-১৮ সে.মি.। বীজের রংকালো। প্রতি মাথায় বীজেরসংখ্যা ৩৫০-৪৫০টি। বীজে তেলের পরিমাণ শতকরা ৪২-৪৪ ভাগ। ফসলের জীবনকাল রবি মৌসুমে ৯৫-১০০ দিন এবংখরিফ মৌসুমে ৮৫-৯০ দিন। হেক্টরপ্রতিফলন রবিমৌসুমে ২.০-২.৩০ টন এবং খরিফমৌসুমে ১.৫-১.৮ টন। বারি সূর্যমুখী-৩ গাছের উচ্চতা ৭৫-৮০ সে.মি.। ১,০০০ বীজের ওজন৬৫-৮৭ গ্রাম। প্রতি মাথায় বীজেরসংখ্যা ৪১০-৮২৯ টি। বীজে তেলেরপরিমাণ শতকরা৩৮-৪০ ভাগ।
জীবনকালঃ ৯০-১১০ দিন।
বীজ শোধনঃ মাটিও বীজথেকে সৃষ্টবিভিন্ন রোগপ্রতিরোধের জন্যবীজ শোধনখুব দরকারি। ভিটাভেক্স-২০০ ছত্রাকনাশক দিয়েবীজ শোধনকরা যায়। প্রতি কেজিসূর্যমুখী বীজেরজন্য মাত্র৩ (তিন) গ্রাম ভিটাভেক্স-২০০ প্রয়োজন। এটি বড়প্লাস্টিকের ঢাকনাদেয়া পাত্রে সূর্যমুখীর বীজনিয়ে পরিমাণমতো ঔষধ মিশিয়ে পাত্রের মুখবন্ধ করেভালোভাবে ঝাঁকিয়ে ১ দিনরেখে দেয়ারপর বীজজমিতে বপনকরতে হবে।
বপনের সময়ঃ সূর্যমুখী সারা বছরচাষ করাযায়। তবে অগ্রহায়ণ মাসে (মধ্য-নভেম্বর থেকে মধ্য-ডিসেম্বর) চাষ করলে ভালফলন পাওয়াযায়। দেশের উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চলে তাপমাত্রা ১৫ সে. এর নিচে হলে ১০-১২ দিন পরে বীজবপন করাউচিত। খরিফ-১ মৌসুমে অর্থাৎ জ্যৈষ্ঠ (মধ্য-এপ্রিল থেকে মধ্য-মে) মাসেও এর চাষ করা যায়।
বপন পদ্ধতি ও বীজের হারঃ সূর্যসুখীর বীজ সারিতে বুনতে হয়। সারি থেকেসারির দূরত্ব ৫০ সে.মি. এবং সারিতে গাছথেকে গাছেরদূরত্ব ২৫সে.মি. রাখতে হয়। এভাবে বীজবপন করলেহেক্টরপ্রতি ৮-১০ কেজি বীজের প্রয়োজন হয়। বারি সূর্যমুখী-২ এর জন্য হেক্টরপ্রতি ১২-১৫ কেজি বীজের প্রয়োজন হয়।
সারের পরিমাণঃ সূর্যমুখীতে পরিমাণমতো সারব্যবহার করলেভাল ফলনপাওয়া যায়।
সারের নাম | সারের পরিমাণ/হেক্টর |
ইউরিয়া | ১৮০-২০০ কেজি |
টিএসপি | ১৫০-২০০ কেজি |
এমওপি | ১২০-১৫০ কেজি |
জিপসাম | ১২০-১৭০ কেজি |
জিংক সালফেট | ৮-১০ কেজি |
বরিক এসিড* | ১০-১২ কেজি |
ম্যাগনেসিয়াম সালফেট* | ৮০-১০০ কেজি |
*রংপুর, দিনাজপুর, পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও, বগুড়া, জয়পুরহাট, নওগাঁ ও রাজশাহী এলাকার জন্যপ্রয়োজন।
‘বারি সূর্যমুখী-২’ চাষের জন্যনিম্নবর্ণিত হারেসার প্রয়োগ করলে ভালফলন পাওয়াযায়।
সারেরনাম | বিঘাপ্রতি (কেজি) | একরপ্রতি (কেজি) | হেক্টরপ্রতি (কেজি) |
ইউরিয়া | ২৫-২৭ | ৭৫-৮০ | ১৮০-২০০ |
টিএসপি | ২৩-২৫ | ৬৮-৭২ | ১৬০-১৮০ |
এমওপি | ২০-২৫ | ৬৩-৬৭ | ১৫০-১৭০ |
জিপসাম | ২০-২৫ | ৬৩-৬৭ | ১৫০-১৭০ |
জিংক সালফেট | ১.৩৫ | ৪ | ৮-১০ |
বরিক এসিড* | ১.৩৫ | ৪ | ১০-১২ |
ম্যাগনেসিয়াম সালফেট* | ১০.৫-১৩.৫ | ৩২.৫-৪০.৫ | ৮০-১০০ |
গোবর (টন) | ১.১-১.৩ | ৩.২-৪.০ | ৮-১০ |
*রংপুর, দিনাজপুর, পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও, বগুড়া, জয়পুরহাট, নওগাঁ ও রাজশাহী অঞ্চলের জন্য প্রয়োজন।
সার প্রয়োগ পদ্ধতিঃ ইউরিয়া সারের অর্ধেক এবং বাকিসব সারশেষ চাষেরসময় জমিতেছিটিয়ে মাটিরসাথে মিশিয়ে দিতে হবে। বাকি অর্ধেক ইউরিয়া ২ ভাগ করেপ্রথম ভাগচারা গজানোর ২০-২৫ দিন পরএবং দ্বিতীয় ভাগ ৪০-৪৫ দিন পর ফুল ফোটার পূর্বে প্রয়োগ করতেহবে।
গাছ পাতলাকরণঃ অতিরিক্ত গাছ থাকলেচারা গজানোর ১৫-২০ দিন পরপ্রতি হিলে/গোছায় ১টিকরে সুস্থসবল গাছরেখে বাকিগাছগুলো উঠিয়েফেলতে হবে।
সেচ ও আগাছা ব্যবস্থাপনাঃ সূর্যমুখী ফসলের ফলনবেশী পেতেহলে কয়েকবার সেচ দেয়াপ্রয়োজন। প্রথম সেচ বীজবপনের ৩০দিন পর (গাছে ফুলআসার আগে), দ্বিতীয় সেচবীজ বপনের৫০ দিনপর (পুষ্পস্তবকতৈরির সময়) এবং তৃতীয়সেচ বীজবপনের ৭০দিন পর (বীজ পুষ্টহবার আগে) সেচ দেয়াদরকার। সূর্যমুখীরজমি সর্বদা আগাছামুক্ত রাখতেহবে। জমিতে আগাছা দেখাদিলে সেটিতুলে ফেলতেহবে।
অন্যান্য পরিচর্যা
সূর্যমুখীর পাতা ঝলসানো রোগ দমনঃ আমাদের দেশে সূর্যমুখীর রোগের মধ্যেপাতা ঝলসানো রোগটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। অলটারনেরিয়াহেলিয়ান্থি নামকছত্রাকের আক্রমণে সূর্যমুখীর এ রোগটি হয়েথাকে। প্রথমে পাতায় ধূসরবা গাঢ়বাদামী বর্ণের অসম আকৃতির দাগ পড়ে। পরে দাগমিশে গিয়েবড় দাগেরসৃষ্টি করে। অবশেষে সম্পূর্ণ পাতা ঝলসেযায়।
প্রতিকার
রোগ সহনশীল বারিসূর্যমুখী-২ জাত চাষকরতে হবে।
রোগ দেখা দেওয়ার সাথে সাথেরোভরাল-৫০ ডব্লিউপি (২% হারে) পানির সাথে মিশিয়ে ১০ দিনপর পর২-৩ বার পাতায়প্রয়োগ করলেরোগের প্রকোপ কমে যায়।
ফসল কাটার পরগাছের পরিতাক্ত অংশ নষ্টকরলে বাপুড়িয়ে ফেললেএ রোগেরউৎস নষ্টহয়ে যায়।
সূর্যমুখীর শিকড় পচা রোগ দমনঃ সূর্যমুখী সাধারণত স্কেলেরোশিয়াম রলফসি নামক ছত্রাকের কারণে এ রোগ হয়েথাকে। আক্রান্ত গাছের গোড়াসাদা তুলারমতো ছত্রাকের মাইসেলিয়াম এবংগোলাকার সরিষার দানারমতো স্কেলেরোশিয়াম দেখা যায়। প্রথমে গাছ কিছুটা নেতিয়ে পড়ে। কয়েক দিনেরমধ্যে সমস্তগাছ ঢলেপড়ে এবংশুকিয়ে মারাযায়।
প্রতিকার
প্রোভেক্স-২০০ ডাব্লিউপি ৩ গ্রামপ্রতি কেজিবীজের সাথেমিশিয়ে এরসাহায্যে বীজশোধনের মাধ্যমে এ রোগেরবিস্তার রোধকরা যায়।
জমির পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা উন্নতকরতে হবেকারণ ভেজাস্যাঁতস্যাঁতে জমিতেরোগের প্রকোপ বেশি হয়। পর্যায়ক্রমিকভাবে ফসলেরচাষ করলেউপযুক্ত পোষকগাছের অভাবেপূর্ববর্তী আক্রমণকারী রোগের বিস্তার রোধ করাযায়।
সূর্যমুখীর বিছাপোকাঃ লালচেকমলা রঙেরবিছাপোকার ছোটছোট কীড়াগুলো একত্রে দলবদ্ধভাবে সূর্যমুখীর নিচেরসবুজ অংশখেয়ে জালিকা সৃষ্টি করে। পরে বয়স্ককীড়া পাতা, ফুল ও নরম কান্ডপেটুকের মতোখেয়ে ক্ষতিকরে। ফলে গাছের বৃদ্ধি ব্যাহত হয়, ফুল ও ফল ধারণ বাধাগ্রস্ত হয়এবং ফলনকমে যায়। জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসেগাছের অংগজবৃদ্ধির সময়থেকে অর্ধপরিপক্ক অবস্থা পর্যন্ত এদেরআক্রমণ হয়েথাকে।
সমন্বিত ব্যবস্থাপনাঃ
এ ক্ষেত্রে প্রথমে ২/১টি পাতায় বিছাপোকার দলবদ্ধ অবস্থান দেখা মাত্রই হাত দ্বারা পাতাসহ কীড়াসংগ্রহ করেধ্বংস করতেহবে।
আক্রমণ খুব বেশিহলে নাইট্রো (সাইপারমেথ্রিন+ক্লোরোপাইরিপাস) ৫০৫ ইসি২ মিলিপ্রতি লিটারপানিতে মিশিয়ে আক্রান্ত ক্ষেতে ১০ দিনঅন্তর ২ বার ছিটিয়ে পোকা দমনকরা যায়।
ফসল কাটা ও শুকানোঃ সূর্যমুখী বপনের ৬৫-৭০ দিন পরে ফুলেরবীজ পুষ্টহওয়া শুরুহয়। সূর্যমুখীকাটার সময়হলে গাছেরপাতা হলুদহয়ে আসেএবং পুষ্পস্তবক (মাথা) সহ গাছগুলো নুয়েপড়ে। বীজগুলো কালো রংএবং দানাগুলো পুষ্ট ও শক্ত হয়। মৌসুম অনুসারে ফসল পরিপক্ক হতে ৯০-১০০ দিনসময় লাগে।
বীজ সংরক্ষণ বা গুদামজাতকরণঃ সূর্যমুখী বীজ পরেরমৌসুমে লাগানোর জন্য গুদামজাত করা প্রয়োজন হয়। বীজ সংরক্ষণের পূর্বে অপরিপক্ক এবংভাঙ্গা বীজবেছে ফেলতেহবে। মোটা পলিথিন ব্যাগবা কেরোসিন টিন বাটিনের ড্রামে বীজ সংরক্ষণ করা উত্তম। ভেতরে পলিথিন দিয়ে চটেরবস্তায় ভালভাবে শুকানো বীজপ্রতি ৩০কেজির জন্য২৫০ গ্রামক্যালসিয়াম ক্লোরাইডসহ সংরক্ষণ করলে৭-৮ মাস পরেওবীজের শতকরা৮০ ভাগঅঙ্কুরোদগম ক্ষমতা বজায় থাকে। বর্ষাকালে একথেকে দু’বার বীজপুনরায় রোদেশুকিয়ে নেয়াভালো।
তৈল নিষ্কাশনঃ ঘানিতে ২৫% এবং এক্সপেলারে ৩০-৩৫% তেল নিষ্কাশন সম্ভব।