কনটেন্টটি শেষ হাল-নাগাদ করা হয়েছে: শনিবার, ২৮ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬ এ ০৫:১২ PM

মসুর

কন্টেন্ট: ই-কৃষি ই-কৃষি বিভাগ: ডাল ফসল প্রকাশের তারিখ: ২৮-০২-২০২৬

মসুর

বাংলাদেশে মসুর সবচেয়ে জনপ্রিয় ডাল ফসল। জমির পরিমাণ ও উৎপাদনের ভিত্তিতে মসুর ডাল বাংলাদেশে ৩য় স্থানে অবস্থান করলেও, ব্যবহার ও জনপ্রিয়তার দিক থেকে ১ম স্থান লাভ করে আছে। বাংলাদেশে ডাল ফসলের এলাকা ও উৎপাদনের দিক থেকে মসুরের স্থান দ্বিতীয়। মোট আবাদি এলাকা প্রায় ১.০৭২ লক্ষ হেক্টর এবং উৎপাদন প্রায় ১.৫৫০৪ লক্ষ মে. টন এবং গড় ফলন প্রতি হেক্টরে ১২৮০ কেজি (কৃষি ডায়েরি, ২০২৫)। ডাল গবেষণা কেন্দ্রের বিজ্ঞানীগণ সংকরায়ণ ও প্রচলিত প্রজনন পদ্ধতি অবলম্বন করে মসুরের জাত উদ্ভাবন কাজ করছেন। এছাড়া ICARDA হতে প্রাপ্ত লাইনসমূহ বাংলাদেশের মাটি ও আবহাওয়াতে পরীক্ষার মাধ্যমে সরাসরি প্রবর্তন করা হয়। তারপর কাঙ্ক্ষিত লাইনকে প্রাথমিক, অগ্রবর্তী, অঞ্চলভিত্তিক ও কৃষকের মাঠে মূল্যায়ন পরীক্ষার পর জাত হিসেবে চূড়ান্তভাবে নির্বাচন করা হয়। এই পর্যন্ত ডাল গবেষণা কেন্দ্র কর্তৃক ০৯টি উচ্চফলনশীল, রোগ সহনশীল ও পুষ্টিগুণ সম্পন্ন মসুরের জাত অবমুক্ত করা হয়েছে। বারি কর্তৃক উদ্ভাবিত এসব জাত কৃষক পর্যায়ে ব্যাপক আবাদ হলে দেশে ডালের চাহিদা অনেকাংশে পূরণ করা সম্ভব হবে। মসুর একদিকে একক ফসল এবং অন্যদিকে সাথী ও আন্তঃফসল হিসেবে বাংলাদেশের কৃষকের মাঝে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। মসুর চাষে জমির উর্বরতাও অনেকাংশে বৃদ্ধি পায়।

জাত: বারি কর্তৃক উদ্ভাবিত জাতগুলো বারি মসুর-১, বারি মসুর-২, বারি মসুর-৩, বারি মসুর-৪, বারি মসুর-৫, বারি মসুর-৬, বারি মসুর-৭, বারি মসুর-৮, বারি মসুর-৯।

বারি মসুর-১: গাছের আকৃতি মধ্যম এবং উপরিভাগ লতানো হয় না ও ডগা বেশ সতেজ। গাছের পাতা গাঢ় সবুজ। কাণ্ড হালকা সবুজ। ফুলের রং সাদা। হাজার বীজের ওজন ১৫-১৬ গ্রাম। ডাল রান্না হওয়ার সময়কাল ১০-১২ মিনিট। আমিষের পরিমাণ ২৬-২৮%। এ জাতের জীবনকাল ১০৫-১১০ দিন। হেক্টরপ্রতি ফলন ১৭০০-১৮০০ কেজি।

বারি মসুর-২: গাছের আকার মধ্যম ও গাছের উপরিভাগ সামান্য লতানো হয়। পাতায় সরু আকর্ষী থাকে। গাছের পাতা গাঢ় সবুজ। কাণ্ড হালকা সবুজ ও ফুল সাদা। হাজার বীজের ওজন ১২-১৩ গ্রাম। রান্না হওয়ার সময়কাল ১৪-১৬ মিনিট। আমিষের পরিমাণ ২৭-২৯%। জাতটির জীবনকাল ১০৫-১১০ দিন। হেক্টরপ্রতি ফলন ১৫০০-১৭০০ কেজি।

বারি মসুর-৩: পাতার রং সবুজ। বীজের রং ধূসর এবং বীজে ছোট ছোট কালচে দাগ আছে। বীজের আকার স্থানীয় জাত অপেক্ষা বড়। হাজার বীজের ওজন ২২-২৫ গ্রাম। ডাল রান্না হওয়ার সময়কাল ১০-১২ মিনিট। আমিষের পরিমাণ ২৪-২৬%। জীবনকাল ১০০-১০৫ দিন। ফলন হেক্টরপ্রতি ১৫০০-১৭০০ কেজি।

বারি মসুর-৪: গাছের রং হালকা সবুজ। পত্রফলক আকারে বড় এবং পাতার শীর্ষে আকর্ষী আছে। ফুলের রং বেগুনি। বীজের আকার স্থানীয় জাত হতে বড় ও চ্যাপ্টা ধরনের। বীজের রং লালচে বাদামি। হাজার বীজের ওজন ২০-২১ গ্রাম। এ জাতটি মরিচা ও স্টেমফাইলিয়াম ব্লাইট রোগসহনশীল। ডাল রান্না হওয়ার সময়কাল ১১-১৩ মিনিট। আমিষের পরিমাণ ২৪-২৬%। ফলন হেক্টরপ্রতি ১৬০০-১৭০০ কেজি।

বারি মসুর-৫: পাতা ও গাছের রং সবুজ, পাতার অগ্রভাগে ছোট আকারের টেন্ড্রিল থাকে। গাছের ধরন ঝোপালো, গাছের উচ্চতা ৩৮ সেমি. এবং ফুলের রং হালকা বেগুনি, বীজ স্থানীয় জাত হতে বড় ও চ্যাপ্টা ধরণের। বীজের রং লালচে বাদামি পরিপক্বতার সময় ১১০-১১৫ দিন। হেক্টরপ্রতি গড় ফলন ২১০০-২২০০ কেজি। এ জাতটি মরিচা ও স্টেমফাইলিয়াম ব্লাইট রোগসহনশীল।

বারি মসুর-৬: গাছের ধরণ ঝোপালো, উচ্চতা ৩৫-৪০ সেমি.। ফুলের রং বেগুনি, বীজ আকারে স্থানীয় জাত হতে অনেক বড় ও চ্যাপ্টা ধরনের। বীজের রং গাঢ় বাদামি, হেক্টরপ্রতি ফলন ২২০০-২৩০০ কেজি। পরিপক্বতার সময় ১১০-১১৫ দিন। এ জাতটি মরিচা ও স্টেমফাইলিয়াম ব্লাইট রোগসহনশীল।

বারি মসুর-৭: জাতটি বাংলাদেশের সকল এলাকায় চাষাবাদের উপযোগী বিশেষ করে মসুর উৎপাদন এলাকা যেমন-পাবনা, যশোর, কুষ্টিয়া, ফরিদপুর, রাজশাহী, মাগুরা, ঝিনাইদহ এবং মাদারীপুরে জাতটি অধিক উৎপাদনক্ষম। সব ধরনের মাটিতেই জাতটি চাষ করা যেতে পারে। তবে সুনিষ্কাশিত বেলে দোঁ-আশ মাটিতে ভালো জন্মে। জমিতে পানি জমে না থাকলে কাদা মাটিতেও রিলে ফসল হিসেবে এর চাষ করা যেতে পারে। গাছের উচ্চতা ৩২-৩৮ সেমি.। প্রতি গাছে পড সংখ্যা ৫৫-৬০টি। বীজের রং লালচে বাদামি ও হালকা কালো ফোটাযুক্ত। ১০০০ বীজের ওজন ২২-২৩ গ্রাম। জীবনকাল ১১০-১১৫দিন। ফলন হেক্টরপ্রতি ১৮০০-২৩০০ কেজি।

বারি মসুর-৮: এ জাতটির পাতা ও কাণ্ড হালকা সবুজ এবং পাতায় হালকা ট্রেন্ড্রিলযুক্ত। গাছ ঝোপালো আকৃতির এবং ফুলের রং বেগুনি। গাছের গোড়ায় খয়েরি পিগমেন্ট বিদ্যমান। বীজ গোলাকার, ধূসর ও হালকা কালো ফোটা যুক্ত। স্টেমফাইলিয়াম ব্লাইট (পাতা ঝলসানো) রোগ সহনশীল। আমিষের পরিমাণ ২৪.০ - ২৪.৯ %। জিংক এর পরিমাণ ৬০ পিপিএম। আয়রন এর পরিমাণ ৮০ পিপিএম। ১০০০টি বীজের ওজন ১৯-২২ গ্রাম। জীবনকাল ১১০-১১৫ দিন। ফলন হেক্টর প্রতি ২১০০-২২০০ কেজি। নাবিতে বপনযোগ্য (নভেম্বরের শেষ সপ্তাহ পর্যন্ত)।

বারি মসুর-৯: পাতা ও কাণ্ড হালকা সবুজ রংয়ের, ফুল নীলাভ সাদা, বীজ হালকা ধুসর বর্ণের এবং জীবনকাল ৮৫-৯০ দিন। এ জাতটি পাতা ঝলসানো রোগ সহনশীল, ১০০ বীজের ওজন ২.২২-২.৯৬ গ্রাম এবং গড় ফলন- ১১৯০-১৫৬২৩ কেজি/হেক্টর। জাতটি স্বল্প মেয়াদি হওয়ায় আমন ও বোরো ধানের মধ্যবর্তী সময়ে সহজেই চাষোপযোগী ।

বিনা কর্তৃক উদ্ভাবিত উল্লেখযোগ্য জাতাসমূহ হলো- বিনামসুর-৮, বিনামসুর-৯, বিনামসুর-১০, বিনামসুর-১২।

বিনামসুর-৮: এ জাতটি উচ্চফলনশীল। গাছ খাড়া এবং অধিক শাখা-প্রশাখা বিশিষ্ট। ফুল গোলাপি বর্ণের ও আগাম পাকে। জীবনকাল ৯৫-১০০ দিন। গড় ফলন ২.৫ টন/হেক্টর। চাষাবাদের মৌসুম রবি।

বিনামসুর-৯: এ জাতটি উচ্চফলনশীল। কান্ড হালকা সবুজ এবং পাতা গাঢ় সবুজ। ফুল সাদা বর্ণের ও আগাম পাকে। গড় ফলন ২.৩ টন/হেক্টর। জীবনকাল ১০০-১০৫ দিন। চাষাবাদের মৌসুম রবি।

বিনামসুর-১০: খরাসহিষ্ণু জাত, উচ্চফলনশীল, ফুল বেগুনি বর্ণের। গড় ফলন ১.৯ স্বাভাবিক/১.৫ খরা অবস্থায়। জীবনকাল ১০৮-১১২ দিন। চাষাবাদের মৌসুম রবি।

বিনামসুর-১২: পাতা গাঢ় সবুজ এবং ফুল গোলাপি রঙের। গাছের উচ্চতা ৩৮-৪২ সেমি.। গড় ফলন ২.৭ টন/হেক্টর। জীবনকাল ৯৫-১০০ দিন। চাষাবাদের মৌসুম রবি।

উৎপাদন কলাকৌশল

মাটি: সুনিষ্কাশিত দো-আঁশ/বেলে দো-আঁশ/এঁটেল দো-আঁশ মাটি মসুর চাষের জন্য উত্তম।

জমি তৈরি: একক ফসল হিসেবে আবাদের ক্ষেত্রে জমিতে সুনিষ্কাশিত ও উপর্যুক্ত রস থাকলে ৩-৪টি গভীর চাষ ও মই দিয়ে মাটি ঝুরঝুরে করে নিতে হবে। মসুর আমন ধান কাটার পূর্বে রিলে ফসল হিসেবে আবাদ করা হলে চাষের প্রয়োজন হয় না।

বপনের সময়: কাঙ্ক্ষিত ফলনের জন্য সঠিক সময়ে বীজ বপন করা প্রয়োজন। অক্টোবরের শেষ সপ্তাহ থেকে নভেম্বরের ২য় সপ্তাহ পর্যন্ত (কার্তিকের ২য় সপ্তাহ - কার্তিকের শেষ সপ্তাহ পর্যন্ত) বীজ বপনের উত্তম সময়। গবেষণায় দেখা যায় বপনের সময় প্রতি ১০ দিন বাড়ার সাথে সাথে ফলন ২০ ভাগ হারে কমতে থাকে। তবে বারি মসুর-৮ নভেম্বরের শেষ সপ্তাহ পর্যন্ত বোনা যেতে পারে। সেক্ষেত্রে ফলন কিছুটা কমলেও রোগের কারণে ব্যাপক ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা কম।

বীজ শোধন: ডাল জাতীয় ফসল বীজ বপনের পূর্বে শোধন করলে মাটি ও বীজবাহিত অনেক জীবাণুর আক্রমণ হতে রক্ষা পাওয়া যায়। তাই মসুর বীজ বপনের আগে অবশ্যই প্রোভেক্স-২০০ ডব্লিউ পি (কার্বোজিন+থিরাম) ২.৫ গ্রাম হারে প্রতি কেজি বীজে মিশিয়ে শোধন করলে শুরুতে গোড়া পচা রোগের প্রকোপ কমে যায়। বারি মসুর-৯ ডাল ফসল কৃষি প্রযুক্তি হাতবই ৬১ বপন পদ্ধতি: ছিটানো ও সারি এই দুই পদ্ধতিতে মসুরের বীজ বপন করা যায়। সারিতে বীজ বপন করলে গাছ সমানভাবে বৃদ্ধি পায়। এ ছাড়া বিভিন্ন রকম অন্তর্বর্তীকালীন পরিচর্যা যেমন- আগাছা দমন, রোগ ও পোকা দমন, সেচ ও নিষ্কাশন ব্যবস্থাপনা এবং পরিশেষে ফসল সংগ্রহ সহজ হয়। তাই সারি থেকে সারির দূরত্ব ২৫ সেন্টিমিটার দেয়া ভালো।

বীজের হার: বীজের হার ৩০-৩৫ কেজি/হেক্টর। ছিটিয়ে বপনের ক্ষেত্রে বীজের পরিমাণ সামান্য বেশি দিতে হয়। তবে বারি মসুর-৩ এর বেলায় হেক্টরপ্রতি ৩৫-৪০ কেজি বীজ ব্যবহার করতে হবে। তবে আমন ধানের সাথে সাথী ফসল (রিলে ক্রপ) হিসাবে আবাদ করলে ৫০-৬০ কেজি/ হেক্টর বীজ প্রয়োজন হয়। বারি মসুর-৯ জাতের ক্ষেত্রে বীজ হার ৭০-৭৫ কেজি/হেক্টর।

সারের পরিমাণ ও প্রয়োগ পদ্ধতি: যে জমিতে পূর্বে মসুর চাষ করা হয়নি সেখানে প্রতি কেজি বীজের জন্য ৫০ গ্রাম হারে অনুমোদিত অণুজীব সার বীজের সাথে মিশিয়ে বপন করতে হবে। ইনোকুলাম ব্যবহার করলে সাধারণত ইউরিয়া সার ব্যবহার করতে হয় না। একক ফসলের জন্য অনুর্বর জমিতে হেক্টরপ্রতি নিম্নলিখিত সারগুলি জমি শেষ চাষের সময় ব্যবহার করতে হবে।

সারের নাম

সারের পরিমাণ/হেক্টর (কেজি)

সারের পরিমাণ/বিঘা (কেজি)

ইউরিয়া

৪০-৪৫

৫-৬

টিএসপি

৮০-৯০

১১-১৩

এমওপি

৪০-৪৫

৫-৬

জিপসাম

৫০-৫৫

৭-৮

বোরণ (প্রয়োজনবোধে)

৭-১০

১-১.৫

অণুজীব সার (প্রয়োজনবোধে)

সুপারিশমতো

সুপারিশমতো

রোগবালাই ও পোকামাকড় দমন ব্যবস্থাপনা

পাতা ঝলসানো রোগ

স্টেমফাইলিয়াম ব্লাইট (পাতা ঝলসানো রোগ) স্টেমফাইলিয়াম ব্লাইট বাংলাদেশে বর্তমানে মসুরের সবচেয়ে ক্ষতিকর রোগ। ১৯৮৬ সালে এ রোগ সর্ব প্রথম শনাক্ত করা হয়। এর পর থেকে ঢাকা জেলাসহ দেশের পশ্চিম ও দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলীয় জেলাগুলোতে এর প্রকোপ ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। সাধারণভাবে সমগ্র বাংলাদেশে এর আক্রমণ লক্ষ করা গেছে। স্টেমফাইলিয়াম বোট্রায়সাম (Stemphylium botryosum) নামক একটি ছত্রাকজাতীয় জীবাণু এ রোগের কারণ। এ রোগের রোগচক্র খুব বিস্তারিতভাবে পরীক্ষা নিরীক্ষা ও পর্যবেক্ষণ করা না গেলেও এটা নিশ্চিত যে জীবাণু ছত্রাকটি বায়ু প্রবাহ দ্বারা পরিবাহিত হয়। বীজের মাধ্যমে অভ্যন্তরীণ বা বাহ্যিকভাবে পরিবাহিত হওয়ারও কোন নিদর্শন বা প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তবে আক্রান্ত ফসলের অবশিষ্টাংশ থেকে এ রোগ ছড়ায়। এ রোগের আক্রমণের ফলে শতকরা ৮০ ভাগ পর্যন্ত ফলন কমে যেতে পারে বলে গবেষণার ফলাফল থেকে জানা যায়।

রোগের লক্ষণ: রোগের প্রাথমিক অবস্থায় পাতার উপর হালকা বাদামি বা শুকনা খড়ের রঙের পিনের মাথা বরাবর সাইজের ছোট ছোট দাগ দেখা যায়। এই দাগগুলো আকারে দ্রুত বৃদ্ধি পেতে থাকে এবং ৩ থেকে ৪ দিনের মধ্যেই সম্পূর্ণ পাতাটি আক্রান্ত হয়ে ঝরে পড়ে। ধীরে ধীরে নতুন নতুন শাখার অগ্রভাগও আক্রান্ত হয় এবং শুকিয়ে মরে যায়। আক্রমণের প্রকোপ বেশি হলে সমগ্র ফসলের মাঠটি ঝলসানো রং ধারণ করে। তবে ফলগুলো তখনও সবুজ থেকে যায়।

দমন ব্যবস্থাপনা: এ ক্ষতিকর রোগটি দমনের জন্য বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের ডাল গবেষণা কেন্দ্রের উদ্ভিদ রোগতত্ত্ববিদগণ বিভিন্ন প্রকার গবেষণা ও অনেক পরীক্ষা সম্পন্ন করেছেন। এসব পরীক্ষার ফলাফল থেকে জানা যায় রোভরাল-৫০ ডব্লিউ পি অথবা ফলিকুর ২৫০ ইসি অথবা দুটি ঔষুধের মিশ্রণ ০.২% হারে পানিতে মিশিয়ে ৭ দিন অন্তর অন্তর তিন থেকে চারবার হালকা রোদ্রোজ্জ্বল সকালে (৯-১০টি) স্প্রে করলে এই রোগের অনিষ্ট থেকে ফসল রক্ষা করা যায়। এছাড়া বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট কর্তৃক উদ্ভাবিত মসুরের উন্নত জাত বারি মসুর-৮ এ, এ রোগের প্রতিরোধ ক্ষমতা রয়েছে। উক্ত জাতটি আবাদ করলে এ রোগের আক্রমণ থেকে ফসলকে রক্ষা করে ক্ষতির মাত্রা বহুলাংশে কমানো যায়।

গোড়া পচা রোগ

গোড়া পচা রোগ মসুরের একটি ক্ষতিকর রোগ। মসুর আবাদকারী অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও এ রোগের যথেষ্ট প্রকোপ রয়েছে। গোড়া পচা রোগটি মূলত একটি চারা আক্রমণকারী রোগ। ইহা সাধারণত এক মাস বা তার চেয়ে কম বয়সের চারাকে আক্রমণ করে। এই রোগটি স্কেলরেশিয়াম রল্ফছি (Sclerotium rolfsii) নামক ছত্রাকের আক্রমণের কারণেই হয়ে থাকে। এই ছত্রাক জীবাণু প্রধানত মাটিতেই অবস্থান করে।

রোগের লক্ষণ: অতি অল্প বয়সে আক্রান্ত হলে চারা হঠাৎ নেতিয়ে পড়ে মারা যায় এবং নেতিয়ে পড়া চারা শুকিয়ে খড়ের রং ধারণ করে এবং পরিশেষে তা অদৃশ্য হয়ে যায়। বয়স্ক চারা আক্রান্ত হলে আক্রান্ত অংশে সুতার মতো ছত্রাকের মাইসিলিয়াম এবং সরিষার বীজের মতো স্কেলরেশিয়াম লক্ষ্য করা যায়। গাছের মূল এবং শিকড় আক্রান্ত হলে প্রাথমিক অবস্থায় গাছের আকার বামুন বা খর্বাকৃতির হয় এবং পরিশেষে গাছ ঢলে পড়ে মারা যায়।

দমন ব্যবস্থাপনা: গবেষণার ফলাফল থেকে জানা যায় যে সাধারণত যে সকল জমির মাটিতে বপনের প্রারম্ভে স্বাভাবিক অবস্থার (জো অবস্থা) চেয়ে বেশি রস থাকে সেই সকল জমিতে গোড়া পচা রোগের প্রাদুর্ভাব বেশি হয়। সুতরাং বপনের সময় জমিতে যাতে অতিরিক্ত রস না থাকে সেদিকে লক্ষ রাখতে হবে। এছাড়া বিভিন্ন ছত্রাকনাশক দিয়ে বীজ শোধন করেও এ রোগ দমনের প্রচেষ্টা নেয়া যায়। এ সমস্ত ছত্রাক নাশকের মধ্যে প্রোভেক্স-২০০ ডব্লিউ @ ২.৫-৩.০ গ্রাম প্রতি কেজি বীজের সাথে মিশিয়ে বীজ শোধন করলে এ রোগের প্রকোপ উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পায়। এ ছাড়া রোগ দেখা দেয়ার সাথে সাথে অটোস্টিন-৫০ ডব্লিউ পি নামক ঔষধ ০.২ গ্রাম/লিটার পানির সাথে মিশিয়ে ৭ হতে ১০ দিন পর পর ২-৩ বার গাছের গোড়া ভিজিয়ে স্প্রে করলে এ রোগ অনেকাংশে দমন করা যায়। এভাবে দমন করা সম্ভব না হলে পরবর্তী বছর শস্যপর্যায় অবলম্বন করতে হবে।

মরিচা রোগ

মরিচা রোগ মরিচা রোগ ইউরোমাইসিস ফেবেই (Uromyces fabae) নামক এক প্রকার ছত্রাকজাতীয় জীবাণুর আক্রমণে হয়ে থাকে। মসুরের বেশি ক্ষতিকর রোগগুলো অন্যতম। তবে রোগের কারণে ক্ষতির পরিমাণ ফসলের অবস্থার উপর নির্ভর করে। যদি ফুল আসার সাথে সাথে আক্রমণ শুরু হয় তা হলে ক্ষতির পরিমাণ হয় অনেক বেশি। পক্ষান্তরে ফল পরিপক্বতার পরে আক্রান্ত হলে কম ক্ষতি হয়। কিন্তু আক্রমণের মাত্রা কম বেশি হওয়া নির্ভর করে আবহাওয়া এবং জমিতে গাছের ঝোপের পরিমাণের উপর। ঘন ঝোপযুক্ত জমিতে যেখানে ঝোপের অভ্যন্তরে বাতাসের আপেক্ষিক আর্দ্রতা শতকরা ৮৫-৯০ ভাগ থাকে এবং বায়ুমন্ডলের তাপমাত্রা ২০-২২ ডিগ্রী সেলসিয়াস সে স্থান এ ডাল ফসল কৃষি প্রযুক্তি হাতবই ৬৩ রোগের আক্রমণের জন্য খুবই উপযোগী। রোগের আক্রমণকারী ছত্রাক মসুর গাছেই তার জীবনচক্র পরিপূর্ণ করে। বীজের সাথে মিশ্রিত আক্রান্ত গাছের অংশ বিশেষের সহিত জীবাণু পরবর্তী বছর প্রাথমিক আক্রমণের উৎস হিসাবে বাহিত হয়ে থাকে।

রোগের লক্ষণ: সাধারণত জমির যে অংশ গাছের ঘনত্ব বেশি এবং বৃদ্ধি বেশি সে অংশে সর্ব প্রথম রোগের আক্রমণ শুরু হয়। পাতা কান্ড, শাখা-প্রশাখা এবং ফলের উপর হলুদ বা মরিচা রঙের ফোস্কা পড়া দাগ দেখা দেয়। পরে এই ফোস্কাগুলো গাঢ় বাদামি বা কাল রং ধারণ করে। আক্রমণের প্রকোপ বেশি হলে পাতা ঝরে যায় এবং পরিপক্ব হওয়ার আগেই গাছগুলো শুকিয়ে যায়। দূর থেকে তাকালে ফসল ধূসর বর্ণের দেখায়। সাধারণত দেশের দক্ষিণাংশে জানুয়ারি মাস শেষ হওয়ার পূর্বে এবং উত্তরাংশে ফেব্রুয়ারি মাসের প্রথমার্ধে এ রোগের আক্রমণ শুরু হয়।

দমন ব্যবস্থাপনা: বারি মসুর-৬, বারি মসুর-৭ এবং বারি মসুর-৮ জাতটি মরিচা রোগের প্রতিরোধ ক্ষমতাসম্পন্ন। ইহা সাধারণত ১১০-১১৫ দিনের মধ্যে পাকে। এ জাতটি যদি দক্ষিণাঞ্চলীয় জেলাগুলোতে অক্টোবর মাসের শেষ সপ্তাহে এবং উত্তরাঞ্চলীয় জেলাগুলোতে নভেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহের মধ্যে বপন করা যায় তাহলে এরোগের আক্রমণ থেকে ফসলকে বাঁচানো যায়। স্বাভাবিক উর্বর জমিতে জৈবসার কিংবা নাইট্রোজেন সার দেওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। আক্রান্ত গাছের অংশ বিশেষের সাথে এ রোগের জীবাণু বাহিত হয় বিধায় বীজ ভালোভাবে পরিষ্কার করে নিলে আক্রমণের প্রাথমিক উৎস নির্মূল করা যায়। এছাড়া রোগ দেখা দেয়ার সাথে সাথে টিল্ট-২৫০ ইসি প্রতি ১০ লিটার পানিতে ৫ মিলি হারে পানিতে মিশিয়ে ৭ হতে ১০ দিন পর পর ২-৩ বার স্প্রে করলে এ রোগ দমন করা যায়।

ঢলে পড়া রোগ

ঢলে পড়া রোগ ঢলে পড়া বা নেতিয়ে পড়া মসুরের একটি ক্ষতিকর রোগ। মসুর আবাদকারী অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও এ রোগের যথেষ্ট প্রকোপ রয়েছে। বাংলাদেশে এ রোগটি সর্বপ্রথম শনাক্ত করা হয় ১৯৭৭ সালে। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ এর খামারে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের পার্শ্ববর্তী ময়মনসিংহ জেলার বিভিন্ন থানার কৃষকের মাঠে এরোগের আক্রমণ লক্ষ করা যায়। আক্রান্ত গাছের নমুনা ল্যাবরেটরিতে বিশ্লেষণ করে জানা যায় যে, ইহা একটি ছত্রাকজনিত রোগ এবং আক্রমণকারী ছত্রাক হল “ফিউসারিয়াম অক্সিস্পোরাম (Fusarium oxysporum f.sp. lentis) নামক একটি জীবাণু। এই ছত্রাক জীবাণু প্রধানত মাটিতেই অবস্থান করে তবে কখনও ইহা বীজের মাধ্যমে বিস্তার ঘটায় বলেও জানা যায়। এ রোগের কারণে ফসলের শতকরা কতভাগ ক্ষতি হতে পারে ইহার পরিমাণ বাংলাদেশের অবস্থায় নির্ণয় করা হয় নাই।

রোগের লক্ষণ: চারা গজিয়ে উপরে উঠার আগে ও পরে উভয় অবস্থায়ই রোগের লক্ষণ শনাক্ত করা যায়। পূর্বেই বলা হয়েছে যে এরোগের জীবাণু ছত্রাক বীজের মাধ্যমে বাহিত হয়ে বিস্তার লাভ করতে পারে। আক্রান্ত বীজ অঙ্কুরিত হলে অঙ্কুর বাদামি রং ধারণ করে এবং চারা মাটির উপরে বের হওয়ার পূর্বেই মারা যায়। চারা অবস্থায় মাটিতে থাকা জীবাণু দ্বারা আক্রান্ত হলে চারার বৃদ্ধি থেমে যায় এবং গাছের নিচের দিক থেকে ক্রমশ উপরের দিকে পাতা হলুদ রং ধারণ করে বেকে যায়। চারার আগা নেতিয়ে পড়ে এবং চারা মারা যায়। বয়স্ক গাছ আক্রান্ত হলেও মোটামুটি একই ধরনের লক্ষণ প্রকাশ পায়। এছাড়াও আক্রান্ত গাছের শিকড় হলুদাভ বাদামি থেকে গাঢ় বাদামি রং ধারণ করে। তবে আক্রান্ত শিকড়ের উপর ফুটরট বা গোড়া পচা রোগের অনুরূপ কোন ছত্রাকের সাদা মাইসেলিয়াম দেখা যায় না। কম বয়সের চারার শিকড়ের অগ্রভাগ আক্রান্ত হলে শিকড়ের নিচের অংশ নষ্ট হয়ে যায়। মাটিতে উপযুক্ত পরিমাণ রস থাকলে আক্রান্ত শিকড়ের উপরের অংশে গুচ্ছ আকারের নতুন শিকড় গজায়। ঢলে পড়া রোগ আক্রান্ত গাছের শিকড় বা মূল লম্বালম্বিভাবে চিরলে লম্বা কালো বা গাঢ় বাদামি রঙের ডোরা দাগ দেখা যায়।

দমন ব্যবস্থা: এ রোগের দমন ব্যবস্থা উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে গোড়া পচা রোগের অনুরূপ পদক্ষেপ নেয়া যায়। রাসায়নিক পদ্ধতিতে বিভিন্ন ছত্রাকনাশক ব্যবহার করে এ রোগ দমনের চেষ্টা করা যেতে পারে। অটোস্টিন এবং থিরাম নামক ঔষধ একত্রে (১:১ অনুপাতে) শুকনা বীজের সাথে ০.২৫% হারে মিশিয়ে বীজ শোধন করলে এ রোগ উল্লেখযোগ্য হারে কম হয়। আবাদ কৌশলে বা ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন এনেও এ রোগ দমনের চেষ্টা করা যায়। উপযুক্ত সময়ে বপন করে যেমন দেশের মধ্য দক্ষিণাঞ্চলে অক্টোবর মাসের শেষ সপ্তাহে এবং উত্তারাঞ্চলে নভেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহে বপন করলে এরোগের আক্রমণ উল্লেখযোগ্য হারে কম হতে দেখা যায়। এ ছাড়া বপনের সময় জমির মাটিতে যাতে ‘জো’ অবস্থার চেয়ে বেশি রস না থাকে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। কারণ মাটিতে অতিরিক্ত রস থাকা অবস্থায় বপন করলে এ রোগের প্রকোপ বৃদ্ধি পায়। এছাড়া রোগ দেখা দেয়ার সাথে সাথে অটোস্টিন ২ গ্রাম/প্রতি লিটার পানিতে মিশিয়ে ৭ হতে ১০ দিন পর পর ২-৩ বার স্প্রে করলে এ রোগ দমন করা যায়। এসব ব্যবহারের পরেও যদি এরাগের আক্রমণ থাকে তাহলে পরবর্তী বছর শস্য পর্যায় অবলম্বন করতে হবে।

মসুরের জাবপোকা

মসুরের জাবপোকা জাবপোকা মসুরের পাতা, কাণ্ড, পুষ্পমঞ্জুরি ও ফলে আক্রমণ করে থাকে এবং সেখান থেকে রস চুষে খায়। মারাত্মক আক্রমণে গাছের বৃদ্ধি কমে যায় এবং ফলন ব্যাহত হয়। মারাত্মক আক্রমণে ডায়মেথয়েট জাতীয় কীটনাশক (যেমন- টাফগর ৪০ ইসি বা অন্য নামের) প্রতি লিটার পানিতে ২ মিলি হারে মিশিয়ে স্প্রে করতে হবে।

অন্তর্বর্তীকালীন পরিচর্যা: জমিতে আগাছা থাকলে বপনের ২৫-৩০ দিনের মধ্যে নিড়ানি দ্বারা একবার আগাছা দমন করা প্রয়োজন। অতিবৃষ্টির ফলে জমিতে যাতে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি না হয় সেজন্য পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করতে হবে। তবে মাটিতে রসের অভাবে গাছের বৃদ্ধি ব্যাহত হলে গাছ গজানোর ৩০-৪০ দিনের মধ্যে একবার হালকা সেচ দিতে হবে।

ফসল সংগ্রহ: বীজ বপনের ১১০-১১৫ দিন পর মসুর সংগ্রহ করা যায়। বারি মসুর-৯ জাতটি স্বল্প জীবনকাল হওয়ায় ৮৫-৯০ দিন পর মসুর সংগ্রহ করা যায়। গাছসহ ফল পেকে বাদামি বর্ণ ধারণ করলে ফসল সংগ্রহ করা যায়।

(সূত্র: কৃষি প্রযুক্তি হাত বই)

ফাইল ১

এক্সেসিবিলিটি

স্ক্রিন রিডার ডাউনলোড করুন