কনটেন্টটি শেষ হাল-নাগাদ করা হয়েছে: শনিবার, ২৮ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬ এ ০৫:২৩ PM

মরিচ

কন্টেন্ট: ই-কৃষি ই-কৃষি বিভাগ: মসলা প্রকাশের তারিখ: ২৮-০২-২০২৬

মরিচ

মরিচ একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থকরী ফসল। আমাদের দেশে মূলত মরিচ মসলা ফসল হিসেবে পরিচিত। কাঁচা ও পাকা উভয় অবস্থাতেই এর প্রচুর চাহিদা রয়েছে। পুষ্টিমানে কাঁচা মরিচ ভিটামিন এ ও সি সমৃদ্ধ। দৈনন্দিন রান্ন্ায় রং, রুচি ও স্বাদে ভিন্নতা আনার জন্য মরিচ একটি অপরিহার্য উপাদান। আমাদের দেশে সাধারণত মরিচ ছাড়া কোন তরকারি রান্না চিন্তা করা হয় না। এছাড়া বিভিন্ন খাবারের স্বাদ বাড়ানোর জন্য মরিচের সসের অনেক চাহিদা রয়েছে। তাছাড়া এর ঔষধি গুণাগুণও রয়েছে।

মরিচে বিভিন্ন ধরনের পুষ্টি উপাদান রয়েছে, যা শরীরের জন্য উপকারী। এতে ভিটামিন এ, ভিটামিন সি, ভিটামিন ই, ভিটামিন কে, ভিটামিন বি৬, থায়ামিন, রিবোফ্লাবিন, নিয়াসিন, ফলিক অ্যাসিড, এবং পটাশিয়াম সহ আরও অনেক খনিজ উপাদান বিদ্যমান। এছাড়া, মরিচে থাকা অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে।

মরিচের পুষ্টিমানঃ

মরিচের কিছু প্রধান পুষ্টি উপাদান ও উপকারিতা নিচে উল্লেখ করা হলো:

  • ভিটামিন সি:

মরিচে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন সি থাকে, যা শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে এবং ত্বককে উজ্জ্বল করে।

  • ভিটামিন এ:

ভিটামিন এ দৃষ্টিশক্তি বাড়াতে এবং রাতকানা রোগ প্রতিরোধে সাহায্য করে।

  • ভিটামিন কে:

ভিটামিন কে রক্ত জমাট বাঁধতে সাহায্য করে এবং হাড়ের গঠন মজবুত করে।

  • পটাশিয়াম:

পটাশিয়াম উচ্চ রক্তচাপ কমাতে সাহায্য করে এবং হৃদরোগের ঝুঁকি কমায়।

  • ক্যাপসাইসিন:

মরিচের ঝাল স্বাদের জন্য দায়ী উপাদান হলো ক্যাপসাইসিন। এটি শরীরের বিপাক ক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করে এবং ওজন কমাতে সাহায্য করে।

  • অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট:

মরিচে থাকা অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট শরীরের ফ্রি রেডিক্যালের কারণে হওয়া ক্ষতি থেকে কোষকে রক্ষা করে।

  • অন্যান্য পুষ্টি উপাদান:

মরিচে আরও রয়েছে ডায়াটারি ফাইবার, থায়ামিন, রিবোফ্লাবিন, নিয়াসিন, ফলেট, আয়রন, ম্যাঙ্গানিজ, ফসফরাস এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় খনিজ উপাদান, যা শরীরের জন্য খুবই দরকারি।

জাত পরিচিতিঃ

মরিচের অনেক জাত রয়েছে, যার মধ্যে কিছু জনপ্রিয় জাত হল বারি মরিচ-১, বারি মরিচ-২, বারি মরিচ-৩, সনিক, প্রিমিয়াম, ধুম, মেজর, ডেমন, চন্দ্রমুখী, হটমাস্টার, এম এস ফায়ার, যমুনা ইত্যাদি। এগুলি ছাড়াও, স্থানীয়ভাবে বিভিন্ন নামে যেমন ছোট মরিচ, বড় মরিচ, ধানী মরিচ, সাহেব মরিচ, বোম্বাই মরিচ, গোল মরিচ, বালিঝুরা মরিচ, পাটনাই মরিচ, রাঁচি মরিচ, সূর্যমুখী ইত্যাদি নামে মরিচ চাষ করা হয়।

কিছু উল্লেখযোগ্য মরিচের জাতের বিবরণ:

  • বারি মরিচ-১:

এটি একটি সারা বছর চাষ করা যায় এমন জাত, যা খাটো এবং ঝোপালো প্রকৃতির।

  • বারি মরিচ-২:

এই জাতটি গ্রীষ্মকালে চাষের জন্য উপযোগী এবং গাছ লম্বা ও শাখা-প্রশাখা বিশিষ্ট হয়।

  • বারি মরিচ-৩:

এটি শীতকালে চাষের জন্য উপযুক্ত একটি জাত।

  • সনিক:

একটি জনপ্রিয় হাইব্রিড জাত, যা উচ্চ ফলনশীল এবং বিভিন্ন আবহাওয়ায় চাষ করা যায়।

  • হটমাস্টার:

এটি একটি হাইব্রিড জাত, যা গ্রীষ্মকালে চাষের জন্য উপযোগী এবং ভাইরাস ও রোগ প্রতিরোধী।

  • বিজলী প্লাস:

এই জাতটি আগাম ফলনশীল এবং ৪০-৪৫ দিনের মধ্যে ফলন পাওয়া যায়।

  • বোম্বাই মরিচ:

এটি একটি স্থানীয় জাত, যা সাধারণত আকারে বড় হয়ে থাকে।

  • যমুনা:

এটি একটি জনপ্রিয় এবং অধিক ফলনশীল জাত।

এগুলি ছাড়াও, আরও অনেক স্থানীয় এবং হাইব্রিড জাত রয়েছে, যা বিভিন্ন অঞ্চলের কৃষকরা চাষ করে থাকেন।

মাটি ও আবহাওয়া:

পানি নিষ্কাশনে সুবিধাযুক্ত বেলে দোআঁশ থেকে এঁটেল দোআঁশ মাটিতে মরিচ চাষ করা হয়। তবে জৈব পদার্থ সমৃদ্ধ ঊর্বর দোআঁশ মাটি চাষাবাদের জন্য উত্তম। সব মাটিতে মরিচের চাষ করা গেলেও ক্ষারীয় মাটিতে ফলন ভাল হয় না। মাটির পিএইচ ৬.০-৭.০ হলে মরিচের উৎপাদন ভালো হয়। বন্যা বিধৌত পলি এলাকায় মাঝারী ও উঁচু জমি যেখানে বর্ষার পর ভাদ্র (আগস্ট-সেপ্টেম্বর) মাসে ‘জো’ আসে সেখানে মরিচ ভালো হয়। মরিচ উষ্ণ ও আর্দ্র আবহাওয়ায় ভাল জন্মে। সাধারণত ২০- ২৫০ সে. তাপমাত্রা মরিচ চাষের জন্য উপযোগী। সর্বনিম্ন ১০০ সে. এবং সর্বোচ্চ ৩৫০ সে. তাপমাত্রায় মরিচের গাছের বৃদ্ধিতে বিভিন্ন ধরনের সমস্যা দেখা যায়। অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত হলে মরিচ গাছের পাতা ঝরে যায় এবং গাছ পচে যায়। পানি নিষ্কাশনের সুবিধাযুক্ত বেলে দোআঁশ থেকে এঁটেল-দোআঁশ মাটিতে মরিচ চাষ করা যায়। তবে জৈব পদার্থ সমৃদ্ধ দোআঁশ বা পলি দোআঁশ মাটি চাষাবাদের জন্য উত্তম। মাটি অতিরিক্ত ভিজা থাকলে ফুল ও ফল ঝরে পরে। মাটির pH ৬.৫-৭.০ হলে মরিচের ফলন ভাল হয়।

বপন/রোপণ সময়:

বারি মরিচ-৩ এর জন্য সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি থেকে অক্টোবরের মাঝামাঝি পর্যন্ত বীজ তলায় বীজ বপন করতে হবে। মূল জমিতে সেপ্টেম্বর মাসে বীজ বপন করতে হবে এবং অক্টোবরের মাঝামাঝি পর্যন্ত মূল জমিতে চারা রোপণের উপযুক্ত সময়।

বীজহার ও রোপন পদ্ধতি:

বারি মরিচ-৩ এর বীজ ১.০-১.৫ কেজি/হে. সারিতে বপন ও ২.০-৩.০ কেজি/হে. ছিটিয়ে রোপণের জন্য দরকার। প্রতি হেক্টর জমিতে ৪০,০০০ চারা প্রয়োজন।

মরিচের বীজ শোধন:

বীজ তলায় বীজ বপনের আগে মরিচের বীজকে শোধন করে নিতে হবে এতে করে চারা অবস্থায়

রোগ-বালাই কম হবে।

 অটোস্টিন বা প্রোভেক্স জাতীয় ছত্রাকনাশক দিয়ে বীজ শোধন করা যায়। প্রতি লিটার পানিতে ২.০ গ্রাম অটোস্টিন

ও ২.৫ গ্রাম প্রভেক্স-২০০ দ্বারা বীজ শোধন করতে হবে

 বীজ বপনের পূর্বে মরিচ বীজ উপরে উল্লেখিত ছত্রাক নাশক দ্বারা ৩০ (ত্রিশ) মিনিট ভিজিয়ে রেখে ছায়াযুক্ত স্থানে ১০-১৫ মিনিট শুকাতে হবে।

 বীজশোধনের কাজে ব্যবহৃত দ্রব্যাদি ও শোধিত বীজ ব্যবহারে সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে।

 বীজ শোধনের ফলে বীজ বাহিত রোগ সংক্রমণ থেকে প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে।

বীজ তলা তৈরি:

বারি মরিচ ৩-এর চারা উৎপাদন করে মূল জমিতে রোপণ করার ক্ষেত্রে উত্তম চারা উৎপাদনে বিশেষ দৃষ্টি

রাখা আবশ্যক। অপেক্ষাকৃত উঁচু জমি যেখানে পানি দাড়ায় না, যথেষ্ট আলো বাতাস পায়, পানি সেচের উৎস রয়েছে এবং

আশে পাশে সোলানেসী পরিবারের কোন উদ্ভিদ নাই এরূপ জমি বীজতলা তৈরির জন্য উত্তম। প্রতিটি বীজ তলার আকৃতি ৩

মি. x ১ মি. হওয়া বাঞ্চনীয়। এ ধরনের প্রতিটি বীজ তলায় ১৫ গ্রাম হারে বীজ সারিতে বপন করতে হবে। ভাল চারার জন্য

প্রথমে বীজতলার মাটিতে প্রয়োজনীয় কম্পোস্ট সার এবং ছাই মিশিয়ে ঝুরঝুরে করে নিতে হবে। শোধিত বীজ তৈরিকৃত

বীজতলায় ৪-৫ সেমি দূরে দূরে সারি করে ১ সেমি গভীরে সরু দাগ টেনে ঘন করে বপন করতে হবে।

চারার পরিচর্যা:

বীজ বপনের পর বীজতলায় বীজ যাতে পোকামাকড় দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেজন্য প্রতি লিটার পানিতে ২ গ্রাম সেভিন মিশিয়ে মাটিতে দিতে হয়। বীজ বপনের পর অতিবৃষ্টি বা প্রখর রোদ থেকে রক্ষা পেতে বাঁশের চাটাই বা পলিথিন দিয়ে বীজতলা ঢেকে দিতে হবে। বাঁশের চাটাই বা পলিথিন সকাল, বিকাল বা রাতে সরিয়ে নিতে হবে। চারা গজানোর সাথে সাথে ইনসেক্ট গ্রæপ নেট দিয়ে চারা ঢেকে দিতে হবে। এই নেট রোদ, বৃষ্টি এবং ভাইরাস বহনকারী বিভিন্ন পোকামাকড় থেকে চারাকে রক্ষা করবে। বীজ বোনার পর চারা বের না হওয়া পর্যন্ত নেটের উপর ঝরনা দিয়ে সেচ দেয়া আবশ্যক। ৫-৭ দিনের মধ্যে বীজ গজায়। চারা ৩-৪ সেমি হলে নির্দিষ্ট দূরত্বে চারা পাতলা করা হয়। বীজতলায় আগাছা গজালে ১-২ বার নিড়ানী দিয়ে আগাছা বেছে মাটি আলগা করে দিলে চারা ভাল হয়। চারা তোলার আগের দিন বীজতলায় সেচ দিলে মাটি নরম হয়। এতে শিকড়ের ক্ষতি না করে সহজেই চারা তোলা যায় এবং চারা সহজেই জমিতে প্রতিষ্ঠিত হয়। চারার বয়স ৩০-৩৫ দিন হলে জমিতে লাগানোর উপযোগী হয়। খাট, মোটা কান্ড ও ৪-৫ পাতা বিশিষ্ট চারা লাগানোর জন্য ভাল। সারি থেকে সারি ৫০ সেন্টিমিটার এবং গাছ থেকে গাছ ৫০ সেন্টিমিটার দূরত্বে রোপণ করতে হবে। চারা রোপণের মুহুর্তে পানি সেচ দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। এর ফলে মাটিতে সহজে গাছ নিজেকে খাপ খাইয়ে নিতে পারে।

জমি তৈরি:

শীতকালীন মরিচের জন্য প্রথমে জমিকে চারিদিক দিয়ে আইলের অতিরিক্ত অংশ কেটে নিতে হবে। তারপর ৪-৬টি গভীর চাষ ও মই দিতে হবে। জমিতে শেষ চাষের পর মই দিয়ে সমান করে আগাছা বেছে ফেলে দিতে হবে। মাটির ঢিলা ভেঙ্গে মাটি ঝুরঝুর ও সমতল করে নিতে হবে। জমি তৈরিতে শেষ চাষের আগে জৈব এবং রাসায়নিক সার প্রয়োগ করতে হবে। এরপর বেড তৈরি করতে হবে। বেড চওড়ায় ১ মিটার হলে ভাল হয়। তবে দৈর্ঘ্য জমির আকার অনুসারে হলে ভাল হয়। বেডের উচ্চতা ১০-১৫ সেমি হতে হয়। পাশাপাশি দুটো বেডের মাঝখানে ৪০-৫০ সেমি প্রশস্ত এবং ১০ সেমি গভীরতা বিশিষ্ট নালা পানি সেচ ও নিষ্কাশনের সুবিধার্থে রাখতে হয়।

সার ব্যবস্থপনা ও প্রয়োগ পদ্ধতি:

নিম্নোক্ত হারে জমিতে সার প্রয়োগ করতে হবে-

শেষ চাষের সময় সম্পূর্ণ গোবর বা কম্পোস্ট, টিএসপি, জিপসাম, জিংক, বোরন এবং এমওপি ৫০ কেজি প্রয়োগ করতে হবে। বাকি এমপি এবং ইউরিয়া সার তিন কিস্তিতে বীজ গজানোর ২৫, ৫০ এবং ৭৫ দিন পর জমিতে প্রয়োগ করতে হবে। সাধারণত সকাল বেলা কিংবা বিকাল বেলা জমিতে সার প্রয়োগ করতে হয়। জমিতে সেচ দেওয়ার পর পানি বের করে দিয়ে অর্থাৎ জমিতে সেচ দেওয়ার পর যখন কোন পানি জমিতে জমে না থাকে সে সময় ইউরিয়া সার প্রয়োগ করতে হবে। কারণ সেচের পর জমিতে সার প্রয়োগ করলে সার তাড়াতাড়ি মাটির সাথে মিশে যায়। এভাবে সার প্রয়োগ করলে সারের অপচয় কম হয়। তবে এমওপি সেচের পূর্বে গাছের গোড়া থেকে ১০-১৫ সেমি দূরে প্রয়োগ করে নিড়ানী দিয়ে মাটির সাথে মিশিয়ে দিতে হবে।

হরমোন প্রয়োগ:

প্ল্যানোফিক্স নামক হরমোন প্রয়োগে দেখা গেছে মরিচের ফুল কম ঝরে এবং ফলন বাড়ে। এক মিলিলিটার প্ল্যানোফিক্স ৪.৫ লিটার পানিতে মিশিয়ে সমস্ত গাছের উপর ছিটিয়ে দিতে হবে। ফুল আসলে প্রথমবার এবং ২০-২৫ দিন পর দ্বিতীয়বার প্রয়োগ করতে হবে। এক হেক্টর জমিতে প্রায় ৫০০ লিটার মিশ্রণের প্রয়োজন হয়।

আন্তঃপরিচর্যাঃ

নিড়ানী:

জমিতে আগাছার পরিমাণের উপর নির্ভর করে নিড়ানী দিতে হবে। যদি আগাছা বেশি থাকে তাহলে নিড়ানী বেশি দিতে হবে। অর্থাৎ জমিতে কোনক্রমেই আগাছা রাখা যাবে না।

সেচ:

মাটিতে অতিরিক্ত আর্দ্রতা মরিচ সহ্য করতে পারে না আবার বেশি সেচ প্রয়োগ করলে গাছ লম্বা হয় ও ফুল ঝড়ে যায়। জমির আর্দ্রতার উপর নির্ভর করে ৩/৪টি সেচ দিতে হবে। ফুল আসার সময় এবং ফল বড় হওয়ার সময় জমিতে পরিমানমতো আর্দ্রতা রাখতে হবে।

মালচিং:

সেচের পর মাটিতে চটা বাঁধলে নিড়ানী দিয়ে ভেঙ্গে দিতে হবে তাতে শিকড় প্রয়োজনীয় বাতাস পায় এবং

গাছের বৃদ্ধি তরান্বিত হয়।

মাটি তোলা:

ভাল ফসলের জন্য ৩-৪ বার দুই সারির মাঝের মাটি গাছের গোড়ায় তুলে দিতে হয়। সার প্রয়োগের পর পরই মাটি তুলে দিতে হয়। এতে গাছের গোড়া শক্ত হয় এবং পানি নিষ্কাশনের সুবিধা হয়।

খুঁটি প্রদান:

অধিক উচ্চতা, ফলনের ভার, ঝর বা অতি বৃষ্টি কারণে গাছ হেলে। ফলে মরিচের গুণাগুণ হ্রাস পায়। প্রায় হেলে পড়া

থেকে রক্ষা পাবার জন্য খুঁটি প্রদান করা হয়। গাছের পাশে বাঁশের খুঁটি পুঁতে প্লাস্টিকের সুতলী দিয়ে গাছ বেধে দিতে হবে।

ফসল সংগ্রহ:

মরিচ পাকা অবস্থায় তোলা হয়। বীজ বপনের ৬০-৬৫ অথবা চারা লাগানোর ৩৫-৪০ দিন পর গাছে ফুল ধরতে শুরু করে, ৫৫-৬০ দিনের মধ্যে ফল ধরে এবং ৭৫ থেকে ৯০ দিনের মধ্যে ফল পাকতে আরম্ভ করে। সাধারণত কৃষকের প্রথম বারের সংগৃহীত ফসল কাচা মরিচ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। পরের মরিচ পাকা (লাল রং) হিসেবে সংগ্রহ করা হয়। লম্বা, উজ্জল লাল বর্ণ, চকচকে, পাতলা মসৃণ ত্বক এবং বেশি ঝাঁঝের পাকা মরিচ (যা পরবর্তীতে শুকানো হয়) মসলা হিসাবে অধিক জনপ্রিয়। মরিচের ফুল ফোটা, ফল ধরা, রং ধারণ ইত্যাদি তাপমাত্রা, মাটির ঊর্বরতা এবং ভালো জাতের উপর নির্ভর করে। উষ্ণ তাপমাত্রায় ফল তাড়াতাড়ি পাকে এবং ঠান্ডায় ফল পাকতে দেরি হয়। অনুকূলে আবহাওয়া বিরাজ করলে এর স্বাভাবিক উৎপাদন কয়েক মাস পর্যন্ত চলতে পারে। পাকা মরিচ সাধারণত ৩-৫ পর্যায়ে তুলতে হয়। বোঁটাসহ মরিচ তুলতে হয়। কারণ বোটা ছাড়া মরিচ তাড়াতাড়ি সজিবতা হারায় ও সহজে রোগাক্রান্ত হয়। শুকনো মরিচের জন্য আধাপাকা মরিচ তুললে মরিচের রং ও গুণগতমান নষ্ট হয়ে যায়।

শুকানো:

পাকা মরিচ পাকা মেঝে বা মাটিতে পলিথিনের উপরে অথবা পাকা বাড়ীর ছাদে ৫-৮ সেন্টিমিটার পুরু করে

বিছিয়ে সূর্যের আলোতে শুকানো হয়। তবে গবেষণায় দেখা গেছে যে, সরাসরি সূর্যের আলো মরিচে ”হোয়াইট প্যাচ”

সৃষ্টি করে যা মরিচের গুণগত মান নষ্ট করে। সাধারণত ২২-২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা মরিচ শুকানোর জন্য

সবচেয়ে উৎকৃষ্ট। সব মরিচের রং সমভাবে ঠিক রেখে শুকানোর জন্য এবং যাতে মোল্ড/ছত্রাক জন্মাতে না পারে সে

জন্য মাঝে মাঝে রৌদ্রের মধ্যে মরিচ নেড়ে দিতে হবে। ভালভাবে না শুকালে মরিচের রং, ঝাঝ এবং চকচকে ভাব নষ্ট

হয়ে যায়। ভাল বীজ উচ্চ অঙ্কুরোদগম ক্ষমতা, উজ্জল রং, উন্নত পুষ্টিমান, অণুজীবের আক্রমণ এবং আফলাটক্সিন এর

হাত হতে মরিচকে রক্ষার জন্য শুকনো মরিচের আর্দ্রতা ৮-১০% মধ্যে রাখতে হবে। শুকানোর সময় রোগে আক্রান্ত

এবং রং নষ্ট হয়ে যাওয়া মরিচ বেছে ফেলে দিতে হবে। সাধারণত ১০০ কেজি পাকা মরিচ শুকিয়ে ২৫-৩৫ কেজি (১

কেজি পাকা মরিচ শুকালে ২৫০-৩০০ গ্রাম) শুকনো মরিচ পাওয়া যায়। সোলার ড্রায়ার এর সাহায্যও মরিচ শুকানো

যায়। ৮ ফুট লম্বা ৪ ফুট চওড়া এবং ৪ ফুট উচ্চতা বিশিষ্ট হার্ডবোর্ড, কাঁচ ও তারের জাল দিয়ে ৩-৪ স্তর বিশিষ্ট

সোলার ড্রায়ার তৈরি করে অপেক্ষাকৃত কম সময়ে মরিচ শুকানো যায়। এতে মরিচের রং ভাল থাকে।

সংরক্ষণ:

দূরবর্তী স্থানে কাচা মরিচ পরিবহনের ক্ষেত্রে ছিদ্রযুক্ত বাঁশের ঝুড়ি এবং চটের ব্যাগ ব্যবহার করলে মরিচ ভাল

থাকে। মরিচ শুকানোর পরে ছায়াযুক্ত স্থানে ঠান্ডা করে সংরক্ষণ করতে হবে।

বাজারজাতকরণঃ

  • স্থানীয় হাট ও আড়ত
  • শুকনা মরিচ প্রসেসিং কারখানা
  • অনলাইন কৃষিপণ্য বিক্রয় প্ল্যাটফর্ম

কৃষকের জন্য পরামর্শঃ

✔️ শুষ্ক ও উঁচু জমি বেছে নিন
✔️ নিয়মিত মাঠ পরিদর্শন করুন
✔️ জৈব সার ও জৈব কীটনাশক ব্যবহার করুন
✔️ ফসল বিক্রির আগেই বাজার সম্পর্কে তথ্য নিন

মরিচের রোগ ব্যবস্থাপনাঃ

মরিচের ঢলে পড়া রোগ

রোগের জীবাণু: Fusarium oxysporum f.sp. capsici, Sclerotium sp. (Soil borne fungi) and Ralstonia solanacearum নামক জীবাণুর আক্রমণে মরিচের ঢলে পড়া রোগ হয়।

রোগের বিস্তার: ছত্রাক প্রধানত মাটি বাহিত এবং অন্যান্য শস্য আক্রমণ করে। মাটিতে যথেষ্ট পরিমাণ আর্দ্রতা থাকলে এ রোগের ব্যাপকতা বৃদ্ধি পায়। পানি সেচের মাধ্যমে আক্রান্ত ফসলের জমি হতে সুস্থ ফসলের মাঠে বিস্তার লাভ করে।

রোগের লক্ষণঃ

 ছত্রাক গাছের নিচের দিকে কান্ডে আক্রমণ করে এবং গাঢ় বাদামী ও দাবানো ক্যাংকার সৃষ্টি করে।

 ক্রমে এই ক্যাংকারজনিত দাগ কান্ডের গোড়াকে চর্তুদিক হতে বেস্টন করে ফেলে।

 গাছের অগ্রভাগের পাতা হলুদ হয়ে যায়, পরে সমস্ত গাছ হলুদ বর্ণ ধারণ করে।

 স্যাঁতসেতে মাটিতে কান্ডের গোড়া সাদা অথবা নীলাভ ছত্রাক স্পোর দ্বারা আবৃত হয়ে পড়ে।

 গাছ লম্বালম্বিভাবে ফাটালে ভাসকুলার বান্ডল বিবর্ণ দেখা যাবে।

 রোগের অনুকূল অবস্থায় ১০-১৫ দিনের মধ্যে গাছ সম্পূর্ণরূপে ঢলে পড়ে, কিন্ত প্রতিকুল অবস্থায় ২-৩ মাস সময় লাগতে পারে।

 ব্যাকটেরিয়া দ্বারা আক্রান্ত হলে আক্রান্ত অংশ হতে ধারালো ছুরি দ্বারা কেটে গ্লাসভর্তি পরিষ্কার পানিতে ডুবালে গ্লাসের উপরের অংশের পানিতে ঘন/পাতলা সাদা রঙের পদার্থ (Ooze) পড়তে দেখা যায় ।

রোগের প্রতিকার:

 সুস্থ ও সবল ফল থেকে বীজ সংগ্রহ করতে হবে।

 প্রোভেক্স-২০০ বা অটোস্টিন (প্রতি কেজি বীজে ২.৫ গ্রাম) দ্বারা বীজ শোধন করে বপন করতে হবে।

 পানি নিকাশের ব্যবস্থা করতে হবে।

 গাছের পরিত্যক্ত অংশ, আগাছা ও আশেপাশের ধুতুরা জাতীয় গাছ একত্র করে ধ্বংস করে ফেলতে হবে।

 রোগ দেখা দেয়ার সাথে সাথে প্রতি লিটার পানিতে টিল্ট ২৫০ ইসি ০.৫ মিলিলিটার হারে মিশিয়ে ১০ দিন পর পর স্প্রে করতে হবে।

আগা মরা/ ক্ষত/ ফল পচা (Die back/Anthracnose/fruit rot)

রোগের কারণ: কোলেটোট্রিকাম ক্যাপসিসি (Colletotrichum capsici) নামক ছত্রাক।

রোগের বিস্তার: বীজ, বিকল্প পোষক এবং গাছের পরিত্যক্ত অংশের মাধ্যমে এ রোগ ছড়ায়। আর্দ্র আবহাওয়া ও অধিক বৃষ্টিপাত এ রোগ বিস্তারে সহায়তা করে।

রোগের লক্ষণঃ

 মরিচ গাছের নতুন ডগা, ডাল, ফুলের কুঁড়ি ও ফল এ রোগে আক্রান্ত হয়।

 এ রোগের আক্রমণে গাছের আক্রান্ত অংশ যেমন পাতা, কান্ড ও ফল ক্রমশ উপর হতে মরতে থাকে এবং গাছ ফ্যাকাশে বর্ণ ধারণ করে।

 গাছ দুর্বল হয়ে পড়ে এবং ফল ধারণ ক্ষমতা কমে যায়।

 ফলের উপর গোলাকার কালো বলয় বিশিষ্ট গাঢ় ক্ষতের সৃষ্টি হয় এবং ইহা ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পেয়ে ফলকে পচিয়ে দেয়।

 আক্রান্ত ফল ঝরে পড়ে।

 ব্যাপকভাবে আক্রান্ত হলে গাছ দ্রুত মরে যায়।

 মরা অথবা শুকনা কালো পচার মত রঙ ধারণ করে।

রোগের প্রতিকার:

 সুস্থ ও সবল ফল থেকে বীজ সংগ্রহ করতে হবে।

 প্রোভেক্স-২০০ বা অটোস্টিন (প্রতি কেজি বীজে ২.৫ গ্রাম) দ্বারা বীজ শোধন করে বপন করতে হবে।

 পানি নিকাশের ব্যবস্থা করতে হবে।

 গাছের পরিত্যক্ত অংশ, আগাছা ও আশেপাশের ধুতুরা জাতীয় গাছ একত্র করে ধ্বংস করে ফেলতে হবে।

 রোগ দেখা দেয়ার সাথে সাথে প্রতি লিটার পানিতে টিল্ট ২৫০ ইসি ০.৫ মিলিলিটার হারে মিশিয়ে ৭-১০ দিন পর পর স্প্রে করতে হবে।

চুয়ানিফোরাপাতা পচা(Choaniphora leaf rot)

রোগের কারণঃ চুয়ানিফোরা (Choanephora cucurbitarum) নামক ছত্রাক।

রোগের বিস্তার: উচ্চ তাপমাত্রা ও স্যাতস্যাতে আবহাওয়ায় (কুয়াশাচ্ছন্ন আবহাওয়া) এ রোগ হয়ে থাকে। বায়ু দ্বারা রোগ দ্রুত বিস্তার লাভ করে।

রোগের লক্ষণঃ

 চারা ও বয়স্ক গাছের শাখা-প্রশাখা, পাতা, ফুল-ফল আক্রান্ত হয়।

 প্রথমে পাতায় পানি ভেজা দাগ হয়। পাতা দ্রুত পচতে থাকে।

 আক্রমণ গাছের আগা থেকে নিচের দিকে নামতে থাকে।

 আক্রান্ত গাছের পাতা ও ডাল কালো রঙের হয়ে থাকে।

 রোগের প্রকোপ বেশি হলে এবং অনুকূল আবহাওয়ায় ৫-৭ দিনের মধ্যে সম্পূর্ণ গাছটি মারা যায়।

 সতর্কতার সাথে পর্যবেক্ষণ করলে আগা ও ডালে ছত্রাকের সাদা বর্ণের মাইসেলিয়াম খালি চোখে দেখা যায়।

 ফলনের প্রচুর ক্ষতি হয়। ১০০% পর্যন্ত ফলনের ক্ষতি হতে পারে।

রোগের প্রতিকারঃ

 ফসলের পরিত্যক্ত অংশ পুড়িয়ে ফেলতে হবে।

 জমিতে অতিরিক্ত সেচ দেয়া যাবে না।

 গাছ আক্রান্ত হওয়া মাত্রই অটোস্টিন প্রতি লিটার পানিতে ১ গ্রাম হারে মিশিয়ে ১০ দিন পর পর ৩-৪ বার স্প্রে করতে হবে।

ব্যাকটেরিয়া জনিত পাতায় দাগ (Baeterial leaf spot)

রোগের কারণ: জ্যানথোমোনাস ক্যামপেস্ট্রিস পিভি. ভেরিকেটোরিয়া (Xanthomonas campestrispv. vericatoria) নামক ব্যাকটেরিয়া।

রোগের বিস্তার: ব্যাকটেরিয়া শীতকালে মাটিতে থাকে। ইহারা পোকামাকড়, কৃষি যন্ত্রপাতি, শ্রমিক ও বৃষ্টির পানির

মাধ্যমে ছড়ায়।

রোগের লক্ষণঃ

 গাছের পাতার নিচে প্রথমে ছোট গোলাকার থেকে অসমান পানি ভেজার মতো ক্ষতদাগ দেখতে পাওয়া যায়।

 স্পটগুলো ফুলে ওঠে এবং এর কেন্দ্র কালো রং ধারণ করে।

 পাতা শুকিয়ে গাছ মারা যায়।

 সবুজ ফল আক্রান্ত হয় এবং এগুলো বাদামী হতে কালো হয়।

রোগের প্রতিকার:

 সুস্থ ও রোগ মুক্ত গাছ হতে বীজ সংগ্রহ করতে হবে।

 নিড়ানীর সময় যেন গাছ ক্ষত না হয় সে দিকে খেয়াল রাখতে হবে।

 আক্রান্ত গাছ উঠিয়ে ফেলতে হবে।

 এক লিটার পানির মধ্যে ৩ গ্রাম কপার অক্রিক্লোরাইড (কুপ্রাভিট) মিশিয়ে বীজ শোধন করতে হবে।

 রোগের প্রাথমিক অবস্থায় এক লিটার পানিতে সানভিট বা কুপ্রাভিট ৭ গ্রাম হারে মিশিয়ে গাছে ৭-১০ দিন পর পর

স্প্রে করতে হবে।

পাতা কুঁকড়ানো (Leaf Curl):

রোগের জীবাণু: এক প্রকার ভাইরাস (Nicotiana virus-10) দ্বারা এ রোগ হয়ে থাকে।

রোগের বিস্তার: বাহক পোকা (সাদা মাছি) ও পোষক উদ্ভিদের মাধ্যমে ছড়ায়।

রোগের লক্ষণ:

 আক্রান্ত গাছের পাতা কুঁকড়ে যায় এবং স্বাভাবিক পাতার তুলনায় পুরু হয়।

 পাতাগুলো ছোট গুচ্ছাকৃতির হয়।

 গাছের বৃদ্ধি কমে যায়।

 গাছের পর্বগুলি কাছাকাছি হয় (পর্ব দৈর্ঘ্য কমে যায়) ও গাছ খর্বাকৃতি হয়ে পড়ে।

 গাছে অতিরিক্ত ডালপালা জন্মায় ও ঝোপের মত হয়।

 ফল ধারণ ক্ষমতা কমে যায় এবং ফল আকারে ছোট ও কুঁকড়ানো হয়।

রোগের প্রতিকার:

 সুস্থ গাছ থেকে পরবর্তী মৌসুমের জন্য বীজ সংগ্রহ করতে হবে।

 রোগাক্রান্ত চারা কোন অবস্থাতেই লাগানো যাবে না।

 চারা অবস্থায় বীজ তলা মশারীর নেট দ্বারা ঢেকে রাখতে হবে।

 রোগাক্রান্ত গাছ ও আশেপাশের পোষক উদ্ভিদ তুলে ধ্বংস করতে হবে।

মরিচকে এই রোগ হতে মুক্ত রাখতে হলে নিয়মিতভাবে ৭-১০ দিন দিন পর পর কীটনাশক ও মাকড়নাশক

(থিওভিট/ভার্টিমেক/ওমাইট) সমস্ত গাছে স্প্রে করতে হবে।

মরিচের পোকা-মাকড় ব্যবস্থাপনা:

১) কাটুই পোকা:

 আক্রান্ত হওয়ার পর্যায়- জমিতে চারা রোপণের পর পরই এই পোকা রাতের বেলা গাছের গোড়া কেটে দিয়ে ব্যাপক ক্ষতি সাধন করে থাকে।

 ক্ষতির ধরন- কচি চারা গাছ গোড়া কাটা অবস্থায় মাটিতে পড়ে থাকে। শুককীট দিনের বেলায় গাছের গোড়ায় মাটির

সামান্য নিচে বা আবর্জনার ভিতর বিশ্রাম নেয় এবং রাতে উপরে উঠে চারা গাছের গোড়া কেটে দেয়। শুককীট যা খায় তার চেয়ে অনেক বেশি চারা বা গাছের গোড়া কেটে নষ্ট করে।

দমন ব্যবস্থা:

 বিষটোপ দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। ১০০ গ্রাম গমের ভুষি অথবা ধানের কুড়া, ১০০ গ্রাম চিটা গুড় এবং ২০০ গ্রাম সেভিন ৫০ ডব্লিউ পি সবগুলো একত্রে মিশিয়ে প্রয়োজনীয় পানি দিয়ে মন্ড তৈরি করতে হবে।

 সন্ধ্যার পর মন্ড ছিটিয়ে দিলে শুককীট আকর্ষিত হবে এবং এই বিষটোপ খেয়ে মারা যাবে। ১ মিলিলিটার পরিমাণ সুমিসাইডিন ২০ ইসি বা রিপকর্ড ১০ ইসি বা সিমবুশ ১০ ইসি ১ লিটার পরিমাণ পানির সাথে মিশিয়ে সন্ধ্যার সময় জমিতে ছিটিয়ে দিলে এই পোকা নিয়ন্ত্রণ করা যায়।

 জমি তৈরির সময় দানাদার জাতীয় ঔষধ শতকে ৪০ গ্রাম হারে প্রয়োগ করতে হয়। অনেক সময় ফ্লাড সেচ দিলে মাটির গর্ত থেকে কাটুই পোকা বের হয়ে আসে ফলে পাখিতে খেয়ে ফেলে।

২) থ্রিপস্

 আক্রান্ত হওয়ার পর্যায়- সাধারণত কচি চারা গাছ ও চারা রোপণের ৭-১৭ দিনের মধ্যে এই পোকা মরিচ গাছকে আক্রমণ করে।

 ক্ষতির ধরন- থ্রিপ্স কচি পাতার রস শুষে খায় ফলে পাতা উপরের দিকে কুঁকড়ে যায়। পাতার মধ্যশিরার নিকটবর্তী এলাকা বাদামী রঙ ধারণ করে ও শুকিয়ে যায় নতুন কিংবা পুরাতন পাতার নিচের পিঠে অধিক ক্ষতি হয় নৌকার খোলের ন্যায় পাতা উপরের দিকে কুঁকড়ে যায় আক্রান্ত পাতা বিকৃত ও বেঢপ দেখায়।

দমন ব্যবস্থা

 আঠালো সাদা ফাঁদ (প্রতি হেক্টরে ৪০ টি) ব্যবহার করে পোকা নিয়ন্ত্রণ করা।

 এক কেজি আধা ভাঙ্গা নিম বীজ ২০ লিটার পানিতে ২৪ ঘণ্টা ভিজিয়ে রেখে উক্ত পানি (ছেঁকে নেওয়ার পর) পাতার

উপরের দিকে ¯েপ্র করা।

 আন্তঃফসল হিসাবে মরিচের সঙ্গে গাজর (রেপিলেন্ট ক্রপ) চাষ করে।

 আক্রমণ বেশি হলে ফিপ্রোনিল (রিজেন্ট/এসেন্ড/গুলি/এই গ্রুপের অন্য যেকোন) বা ডাইমেথয়েট (বিস্টারথোয়েট/টাফগর/ এই গ্রুপের অন্য যেকোন) ১০ লিটার পানিতে ১০ মিলি হারে বা সাকসেস ১০ লিটার পানিতে ১২ মিলি হারে স্প্রে করে এদের নিয়ন্ত্রণ করা যায়।

 চারা রোপণের ১০-৩০ দিনের মধ্যে তিন বার ১০ দিন অন্তর অন্তর এই পোকা দমনের জন্য প্রতি ১০ লিটার পানিতে ৫ মিলি এ্যাডমায়ার/টিডো/গেইন কীটনাশক প্রতি ৫ শতক জমিতে স্প্রে করতে হয়।

৩) এফিড বা জাব পোকা

 আক্রান্ত হওয়ার পর্যায়- মরিচ গাছের কচি ও বয়স্ক পাতা।

 সব ধরনের পাতার নিচের দিকে বসে রস শুষে খায় এমনকি এরা গাছের কান্ডেও আক্রমণ করে থাকে ফলে কান্ড

শুকিয়ে মারা যায়।

দমন ব্যবস্থাঃ

 আঠালো হলুদ ফাঁদ (প্রতি হেক্টরে ৪০ টি) ব্যবহার করে।

 আধা ভাঙ্গা নিম বীজের (৫০ গ্রাম এক লিটার পানিতে ২৪ ঘণ্টা ভেজানোর পর মিশ্রণটি ছাঁকতে হবে) নির্যাস আক্রান্ত গাছে ১০ দিন পর পর ৩ বার ¯েপ্র করে এই পোকা নিয়ন্ত্রণ করা যায়।

 বন্ধু পোকাসমূহ (লেডীবার্ড বিটলের পূর্ণাঙ্গ ও কীড়া এবং সিরফিড ফ্লাই) প্রকৃতিতে লালন।

 আক্রমণ বেশি হলে স্বল্পমেয়াদী বিষক্রিয়ার ম্যালাথিয়ন ৫৭ ইসি (ফাইফানন/সাইফানন) ১০ মিলি অথবা কুইনালফস

২৫ ইসি (করলাক্স/একালাক্স/কিনালাক্স/অন্য নামের) বা ডাইমেথয়েট (বিস্টারথোয়েট/টাফগর/অন্য নামে) বা কারাটে ১০ লিটার পানিতে ১০ মিলি হারে বা সাকসেস ১০ লিটার পানিতে ১২ মিলি হারে স্প্রে করে এদের নিয়ন্ত্রণ করা যায়।

৪) সাদা মাছিঃ

 আক্রান্ত হওয়ার পর্যায়- সাধারণত কচি চারা গাছ আক্রমণ করে।

 ক্ষতির ধরন- কচি পাতার নিচে বসে রস শুষে খায় ফলে পাতা কুঁকড়ে যায়।

দমন ব্যবস্থাঃ

 সাবান-পানি ব্যবহার (প্রতি লিটার পানিতে ২ গ্রাম ডিটারজেন্ট ) করে।

 নিম বীজের নির্যাস (আধা ভাঙ্গা ৫০ গ্রাম নিম বীজ ১ লিটার পানিতে ২৪ ঘণ্টা ভিজিয়ে মিশ্রণটি ছেঁকে নিয়ে) ¯স্প্রে

করা ।

 আক্রমণ বেশি হলে ম্যালাথিয়ন ৫৭ইসি (১০ লিটার পানিতে ১০ মিলি হারে) অথবা এডমায়ার ২০০ এসএল (১০

লিটার পানিতে ৫ মিলি হারে) স্প্রে করে।

৪) মাইটঃ

 আক্রান্ত হওয়ার পর্যায়- মাইট মরিচ গাছের কচি ও বয়স্ক পাতা আক্রমণ করে।

 ক্ষতির ধরন- সাধারণত পাতার নিচের দিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। শিরার মধ্যকার এলাকা বাদামী রং ধারণ করে ও শুকিয়ে

যায় এবং মারাত্মকভাবে আক্রান্ত পাতা সহজেই ভেঙে গুঁড়িয়ে যায়। কচি পাতা মাকড় দ্বারা আক্রান্ত হলে পাতা নিচের দিকে মুড়ে গিয়ে স্বাভাবিকের চেয়ে সরু হয়ে যায় ।

দমন ব্যবস্থা:

 নিমতেল ৫ মিলি + ৫ গ্রাম ট্রিকস প্রতি লিটার পানিতে মিশিয়ে পাতার নিচের দিকে ¯েপ্র করতে হবে ।

 এক কেজি আধা ভাঙ্গা নিম বীজ ২০ লিটার পানিতে ২৪ ঘণ্টা ভিজিয়ে রেখে উক্ত পানি (ছেকে নেওয়ার পর) পাতার

নিচের দিকে ¯েপ্র করা।

 পাইরিথ্রয়েড জাতীয় কীটনাশক ব্যবহার যথাসম্ভব পরিহার করতে হবে।

 আক্রমণ বেশি হলে মাকড়নাশক ওমাইট ৫৭ইসি (প্রতি লিটার পানিতে ২.০ মিলি হারে) বা ভার্টিমেক ১.৮ ইসি

প্রতি ১০ লিটার পানিতে ১২ মিলি হারে পাতা ভিজিয়ে ¯েপ্র করে মাকড়ের আক্রমণ প্রতিহত করা সম্ভব।

 মাকড়ের সাথে অন্য পোকার আক্রমণ দেখা দিলে প্রথমে মাকড়নাশক ব্যবহার করে অতপর কীটনাশক প্রয়োগ

করতে হবে।

৪) ফল ছিদ্রকারী পোকাঃ

 আক্রান্ত হওয়ার পর্যায়- এই পোকা কচি ও বাড়ন্ত ফল ছেদ করে ভিতরে ঢুকে ফলের ভিতরের অংশ খেয়ে ফেলে।

 ক্ষতির ধরন- ফলের বৃন্তের কাছে একটি ক্ষুদ্র আংশিক বদ্ধ কালচে ছিদ্র দেখা যাবে। ক্ষতিগ্রস্ত ফলের ভিতরে পোকার

বিষ্ঠা ও পচন দেখা যাবে। পোকা আক্রান্ত ফল নিধারিত সময়ের পূর্বেই পাকে বা ঝরে পড়ে।

দমন ব্যবস্থাঃ

 সেক্স ফেরোমন ফাঁদ (প্রতি বিঘায় ১৫টি) ব্যবহার করে পোকা নিয়ন্ত্রণ করা ।

 ডিম নষ্টকারী পরজীবী পোকা, ট্রাইকোগ্রামা কাইলোনিজ ও কীড়া নষ্টকারী পরজীবী পোকা, ব্রাকন হেবিটর পর্যায়ক্রমিকভাবে মুক্তায়িত করে এদের নিয়ন্ত্রণ করা যায়।

 আধভাঙ্গা নিম বীজ (৫০ গ্রাম এক লিটার পানিতে ২৪ ঘণ্টা ভেজানোর পর মিশ্রণটি ছাকতে হবে) নির্যাস আক্রান্ত

গাছে ১০ দিন পর পার ৩ বার ¯স্প্রে করে এই পোকা অনেকটা নিয়ন্ত্রণ করা যায়।

 আক্রমণ তীব্র হলে কুইনালফস ২৫ ইসি (দেবীকুইন/কিনালাক্স/করলাক্স) প্রতি ১০ লিটার পানিতে ১০ মিলি হারে মিশিয়ে স্প্রে করা যেতে পারে বা সাকসেস ১০ লিটার পানিতে ১২ মিলি হারে স্প্রে করে এদের নিয়ন্ত্রণ করা যায়।

 বেশি মাত্রায় মরিচ এ পোকা দ্বারা আক্রান্ত হলে ডেনিটল ১০ ইসি/ ট্রিবন ১০ ইসি/ রিপকর্ড ১০ ইসি প্রতি লিটার পানিতে ১ মিলি হারে অথবা ফেনকিল ২০ ইসি প্রতি লিটার পানিতে ০.৫ মিলি হারে অথবা সুমিথিয়ন ৫০ ইসি ২ মিলি হারে এগুলোর যে কোন একটি কীটনাশক প্রতি লিটার পানির সাথে মিশিয়ে গাছের সমস্ত অংশ ভালভাবে মিশিয়ে স্প্রে করা।

মরিচ একটি উচ্চমূল্য ফসল। সঠিক জাত নির্বাচন ও উত্তম কৃষি চর্চা অবলম্বন করে মরিচ দেশের মানুষের চাহিদা মিটিয়ে ও বিদেশে রপ্তানী করে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব। তাই এই সম্ভাবনাময় মসলাজাতীয় ফসলটি চাষের ক্ষেত্রে কৃষকের পছন্দের তালিকায় থাকা উচিত।

📌 পরিশিষ্ট

এই বইটি নতুন ও অভিজ্ঞ উভয় কৃষকের জন্য উপযোগী। মরিচ চাষে লাভবান হতে হলে সঠিক জাত, সময়মতো চাষ এবং বালাইনাশক ব্যবস্থাপনা জানতে হবে। এই ই-বুক তারই পথনির্দেশনা

তথ্যসূত্রঃ

  • কৃষি প্রযুক্তি হাতবই (৮ম সংস্করণ)

  • জাতীয় কৃষি বাতায়ন

  • কৃষি প্রযুক্তি ভান্ডার এপস

  • কৃষি তথ্য ভান্ডার (Agro Knowledge Bank)

  • চ্যাটজিপিটি (Chatgpt)

  • জেমিনি এআই (Gemini AI)

  • বামিস পোর্টাল

  • স্থানীয় কৃষক ও উপসহকারী কৃষি অফিসার

ফাইল ১

এক্সেসিবিলিটি

স্ক্রিন রিডার ডাউনলোড করুন