কনটেন্টটি শেষ হাল-নাগাদ করা হয়েছে: বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারী, ২০২৬ এ ০১:০৪ PM

তালের চারা উৎপাদন

কন্টেন্ট: ই-কৃষি ই-কৃষি বিভাগ: ফল প্রকাশের তারিখ: ১৫-০১-২০২৬

কিছু কিছু বারমাসি গাছ ছাড়া তালগাছ সাধারণত বৎসরে একবার ফল দেয় এবং আগস্ট মাস হতে তাল পাকতে শুরু করে ও অক্টোবর মাস পর্যন্ত পাকা তাল পাওয়া যায়। ফলের আকার, রং ঘ্রাণ, স্বাদ ইত্যাদি বৈশিষ্ট্যগুলো বিভিন্ন জাতে তারতম্য দেখা ‍যায়। একটি পাকা তাল ৪৩০ গ্রাম হতে ৬০০ গ্রাম পর্যন্ত ওজনের হতে দেখা যায়। মাতৃগাছ নির্বাচনকালে তালের আকার আকৃতি , ফলের রসে চিনির পরিমাণ, ঘ্রাণ, স্বাদ, প্রতি গাছে তালের সংখ্যা, কাণ্ডের আকৃতি ইত্যাদি বৈশিষ্ট গুলো অবশ্যই বিবেচনা করতে হবে।

বীজ সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াকরণ

উত্তম মাতৃগাছ হতে তালবীজ সংগ্রহ করতে হবে। পরিপক্ব তাল হতে বীজ সংগ্রহ করে পাকা তালের উপরের শক্ত খোসা ছাড়িয়ে কিছু সময় পানিতে ভিজিয়ে রাখতে হবে এবং পরে হাত দ্বারা কচলিয়ে আঁশ হতে রস বের করতে হবে। প্রতিটি তালে সাধারণত তিনটি করে বীজ থাকে এবং রস সৎগ্রহ করার সময় বীজগুলো পৃথক হয়ে যাবে। বীজ সংগ্রহের পরপরই বীজতলায় বা সরাসরি মূল জমিতে বপন করতে হবে। বীজ শুকিয়ে গেলে অংকুরোদগম হবে না। তাই সংগৃহীত বীজ সতেজ অবস্থায় বীজতলায় রোপণ করতে হবে। পরিপক্ব তাল বীজের অংকুরোদগমের হার সাধারণত ৭০-৯০ ভাগ।

বীজ বপনের সময় : ভাদ্র থেকে কার্তিক মাস বীজ বপনের উপযুক্ত সময়।

বীজতলা তৈরি ও চারা উৎপাদন

পাকা মেঝে বা ইট বিছানো মেঝেতে বীজতলা তৈরি করতে হবে। তবে মাটির উপরও সরাসরি বীজতলা করা যেতে পারে। মাটির উপর বীজতলা করতে হলে মাটির উপর মোটা পলিথিন সিট বিছিয়ে দিয়ে তার উপর ৩০-৫০ সেমি. পুরু করে বেলে মাটি বা কম্পোস্ট মিশ্রিত মাটি বিছিয়ে দিয়ে বীজতলা তৈরি করা যায়। বীজতলার চারা ভলোভাবে পরিচর্যা করার জন্য বীজতলা ৯০-১০০ সেমি. প্রস্থ ও ১০ মিটার দৈর্ঘ্য বিশিষ্ট একটি বীজতলায় ৯০০-১০০০টি বীজ বপন করা যাবে। বীজ পাশাপাশি রেখে বীজতলার ওপর সারি করে সাজাতে হবে এবং বীজের ওপর ২-৩ সেমি. পুরো করে কম্পোস্ট মিশ্রিত বালু দিয়ে বীজ ঢেকে দিতে হবে। বীজতলা সব সময় পানি দিয়ে ভিজিয়ে রাখতে হবে। তিন থেকে চার সপ্তাহের মধ্যেই বীজ অংকুরিত হতে শুরু করবে। বীজ অংকুরোদগমের সময় শিকড়ের মতো দেখতে টিউবের আকৃতিতে বীজপত্র বের হয়। যাকে জার্মটিউব বলা হয়। জার্মটিউব সাধারণত ১৫-৪০ সেমি. লম্বা হয় এবং ১০-১৫ সপ্তাহের মধ্যে এটি লম্বা হওয়া সম্পন্ন হয়। জার্মটিউব লম্বা হবার পরেই ভ্রুণ কাণ্ডের আবরণী (Coleoptile) এবং ভ্রুণ মূলের আবরণী (Coleorhiza) এর বৃদ্ধি শুরু হয়। জার্মটিউবের মতো Coleoptile ১৫-৪০ সেমি. লম্বা হয়ে থাকে। Coleorhiza ও শিকড় এমনভাবে বৃদ্ধি পায় যে এদের পৃথক করা কঠিন এবং বীজতলার নিচে মেঝেতে বাধাপ্রাপ্ত হয়ে বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রিত হয়ে থাকে। ১০-১৫ সপ্তাহের মধ্যে Coleoptile এর ওপর একটি পাতলা আবরণীতে পরিণত হয়। এ সময় চারার একটি Coleoptile ও শিকড় থাকে। চারার গোড়া ও শিকড়ের গা হতে ছোট ছোট অনু শিকড়ও গজাতে শুরু করে। Coleoptile এর বৃদ্ধি শেষে বীজের সাথে জার্মটিউবের সংযোগ স্থানে পচতে বা শুকাতে শুরু করে। পলি ব্যাগে চারা স্থানান্তর করার আগে উক্ত স্থানে ধারালো চাকু দিয়ে কেটে আলাদা করে চারা পলিব্যাগে স্থানান্তর করতে হবে।

চারা পলিব্যাগে স্থানান্তর ও পরিচর্যা

বীজতলায় উৎপাদিত চারা গোবর/কম্পোস্ট মিশ্রিত মাটি দিয়ে পলিব্যাগে ভরে স্থানান্তর করতে হবে। পলিব্যাগের আকার ১৫×১৫ সেমি. (কৃষি বাতায়ন) এবং পলিথিনের পুরুত্ব ০.৬-০.৭ মিমি. হতে পারে। প্রতিটি পলিব্যাগের নিচে ২-৩টি ছিদ্র করতে হবে। চারা পলিব্যাগে স্থানান্তরকালে কম্পোস্ট মিশ্রিত বেলে মাটি সরিয়ে চারা উন্মুক্ত করতে হবে এবং বীজ হতে চারা আলাদা করতে হবে। বীজ হতে চারা আলাদা করতে হলে জার্মটিউবের উপরে অর্থাৎ বীজ সংলগ্ন চিকন, পচা/শুকনা স্থানে কাটতে হবে। যদি চারার শিকড় বেশি লম্বা হয় তবে প্রয়োজনে চারার সাথে ১০-১৫ সেমি. শিকড় রেখে ধারালো চাকু দিয়ে কেটে পলিব্যাগের ২/৩ অংশ গোবর/কম্পোস্ট মিশ্রিত মাটি দ্বারা ভরাট করতে হবে। তবে মাটিতে প্রয়োজনীয় রস থাকলে বা সেচ সুবিধা থাকলে চারা মৌসুমি বৃষ্টিপাতের পরেও রোপণ করা যায়। পরিকল্পিতভাবে তালের বাগান করতে হলে সারি থেকে সারি ও চারা থেকে চারার দূরত্ব হবে ০৬-০৭ মিটার। গর্তের আকার হবে ৫০ সেমি. চওড়া ও ৫০ সেমি. গভীর। চারা রোপণের ১০-১৫ দিন পূর্বে গর্ত করে রাখতে হবে। পলি ব্যাগ ভরার জন্য ১/৫ অংশ গোবর ও ৪/৫ অংশ মাটির মিশ্রণ ব্যবহার করতে হবে। পলিব্যাগের ১/৩ অংশ গোবর মিশ্রিত মাটি ভরতে হবে। এরপর চারাটি পলিব্যাগের মাঝামাঝি এমনভাবে রাখতে হবে যেন চারার গোড়ার প্রায় ৫ সেমি. ব্যাগের মধ্যে থাকে। অতঃপর গোবর মিশ্রিত মাটি দিয়ে ব্যাগের বাকি অংশ ভরতে হবে। পলি ব্যাগের চারা স্থানান্তরের পরে অন্তত (২-৩) সপ্তাহ আংশিক ছায়ার ব্যবস্থা করতে হবে এবং নার্সারিতে রাখতে হবে। পানি দিয়ে পলিব্যাগের মাটি আর্দ্র রাখার ব্যবস্থা নিতে হবে। পলিব্যাগের চারা সবসময় আগাছা মুক্ত রাখতে হবে এবং রোগবালাই দমন করতে হবে।

সমতল ভূমিতে পলিব্যাগের চারার আকৃতি অনুসারে গর্ত করে পলিথিন কেটে পলিব্যাগের মাটিসহ চারা বসাতে হবে। গুঁড়ো মাটি দিয়ে গর্তের ফাঁক ভরাটসহ ভালোভাবে চারার গোড়ায় মাটি চেপে দিতে হবে। চারা রোপণের পর অন্তত প্রথম তিন বছর রোগবালাই ও কীট পতঙ্গের আক্রমণের হাত হতে রক্ষা করা আবশ্যক। যে সকল জমি বর্ষার সময় সাময়িকভাবে প্লাবিত হয় সে সব জমিতে বর্ষার পর চারা রোপণ করা যেতে পারে। রাস্তা, বেড়ি বাঁধের ঢালু বা বাড়ীর ঢালুতে খন্তি বা শাবল দিয়ে গর্ত করে চারা লাগানো উত্তম। তবে সমতল জমিতে অন্যান্য বৃক্ষের চারার মতোই এ চারা লাগানো যেতে পারে। চারা আগাছামুক্ত ও গবাদি পশুর উপদ্রব এবং রোগবালাই ও কীট পতঙ্গের আক্রমণ হতে রক্ষার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। তালের বীজ সরাসরি মূল জমিতেও রোপণ করা যায়। এক্ষেত্রে ৩০×৩০×৩০ সেমি. গর্ত করতে হবে। বীজ রোপণের ১০-১৫ দিন পূর্বে গর্ত করে গর্ত ২-৩ দিন রৌদ্রে শুকানোর পর জৈবসার ৭-১০ কেজি, টিএসপি ১২৫ গ্রাম এবং এমপি ১০০ গ্রাম মাটির সাথে মিশিয়ে গর্ত ভরাট করে রাখতে হবে।

আন্ত:পরিচর্যা ও সার প্রয়োগ

প্রতি বছরই বর্ষার আগে ও পরে ইউরিয়া, টিএসপি ও পটাশ ১০০ গ্রাম করে সার প্রতি গাছে প্রয়োগ করতে হবে। গাছের বয়স বাড়ার সাথে প্রতি বছর সারের মাত্র ১০% হারে বাড়িয়ে দিতে হবে। পূর্ণবয়স্ক (১০-১২ বছর) গাছে প্রতি বছর গোবর ১৫-২০ কেজি, ইউরিয় ০১ কেজি, টিএসপি ৫০০ গ্রাম, এমপি ৫০০ গ্রাম সার প্রয়োগ করতে হবে। যেহেতু তালগাছের শিকড় মাটির গভীরে প্রবেশ করে সেহেতু গাছের চতুপার্শে চক্রাকারে গর্ত করে সার দিয়ে গর্ত ভরাট করে দিতে হবে। সার প্রয়োগ ছাড়াও আগাছা পরিষ্কার, সেচ ও নিষ্কাশনের প্রতি গুরুত্ব দিতে হবে।

ফাইল ১

এক্সেসিবিলিটি

স্ক্রিন রিডার ডাউনলোড করুন