কনটেন্টটি শেষ হাল-নাগাদ করা হয়েছে: বুধবার, ২৫ মার্চ, ২০২৬ এ ১০:৩৯ AM
কন্টেন্ট: ই-কৃষি ই-কৃষি বিভাগ: সবজি প্রকাশের তারিখ: ২৫-০৩-২০২৬
বিশ্বের ছোট বড় সব মানুষের পছন্দের খাবার টমেটো। এটি সুস্বাস্থ্যের জন্য প্রয়োজনীয় উঁচু মানের পুষ্টিগুনে ভরপুর একটি সবজি। এতে আরও আছে বিটা ক্যারোটিন যা রাতকানা রোগের মহৌষধ। ভিটামিন ‘সি’ এর জন্য টমেটো বিখ্যাত। এতে আরও আছে প্রচুর পরিমাণে আমিষ, শর্করা, খনিজ পদার্থ ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় উপাদান। টমেটো ভেষজ গুণেও সমৃদ্ধ। এর রস ও শাঁস সহজপাচ্য। কাঁচা টমেটোতে পাকা টমেটোর চেয়ে আমিষ, ভিটামিন-সি, খনিজ লবন, লৌহ ও খাদ্য শক্তি বেশি থাকে। একটি বড় আকারের লাল টমেটো থেকে আমাদের মোট চাহিদার প্রায় অর্ধেক ভিটামিন-(এ) পাওয়া যায়। পুষ্টি উপাদান সরবরাহ করার পাশাপাশি ঘাতক ব্যাধি ক্যান্সার রোধে টমেটোর কার্যকর ভূমিকা পালন করে। লাইকোপেন নামক এক প্রকার এন্টিঅক্সিডেন্ট দেহ কোষ থেকে বিষাক্ত ফ্রি রেডিকেল দূর করে। প্রোস্টেট ক্যান্সার সমূহ মূত্রথলি, অগ্ন্যাশয় ও অন্ননালির ক্যান্সার প্রতিরোধে সাহায্য করে। দৈনিক একটি করে টমেটো খেলে ক্যান্সার হওয়ার সম্ভাবনা ৬০ ভাগ হ্রাস পায়। একটি গবেষণা রিপোর্ট থেকে জানা যায় যে, সব মহিলার কোষে লাইকোপেন ও অন্যান্য ক্যারটিনয়েডের পরিমাণ বেশি তাদের ক্ষেত্রে ব্রেস্ট ক্যান্সারের ঝুঁকি কম। যারা নিয়মিত টমেটো খান তাদের পাকস্থলি, অন্ত্র ও মলদ্বারে ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা অনেক কম। টমেটো নানা ভাবে খাওয়া যেতে পারে। কাঁচা কিংবা রান্না ছাড়াও টমেটো থেকে সালাদ, জাম, জেলি, চাটনি, কেচ-আপ বা সস তৈরি করে খাওয়া যায়। আমাদের দেশে টমেটো চাষাবাদ ক্রমেই জনপ্রিয়তা লাভ করছে। বিনা থেকে এ পর্যন্ত টমেটোর ১৩টি উচ্চ ফলনশীল জাত উদ্ভাবন করা হয়েছে।
টমেটোর উৎপাদন প্রযুক্তিঃ
জমি নির্বাচনঃ প্রায় সব ধরনের মাটিতেই টমেটোর চাষাবাদ করা যায়। তবে বেলে দোআঁশ মাটি সবচেয়ে উপযোগী।
জমি তৈরিঃ তিন চারটি চাষ ও মই দিয়ে সাধারণভাবে জমি তৈরি করতে হয়। শেষ চাষের আগে নির্ধারিত পরিমাণে গোবর সারের অর্ধেক ও পুরো টিএসপি ছিটিয়ে দিয়ে পুনরায় চাষ ও মই দিয়ে জমি তৈরি করতে হবে। ইউরিয়া ও পটাশ সমান দু’ভাগে ভাগ করে চারা লাগানোর ১৫ এবং ৩৫ দিন পর প্রয়োগ করতে হবে।
বপন ও রোপণের সময়ঃ টমেটোর জন্য (কার্তিক মাসের শুরু থেকে তৃতীয় সপ্তাহ ), (অক্টোবরের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে নভেম্বরের ১ম সপ্তাহ) পর্যন্ত বীজতলায় বীজ বপনের উপযুক্ত সময়। কার্তিকের শেষ সপ্তাহ থেকে অগ্রহায়ণের ১ম সপ্তাহ (নভেম্বরের শেষ সপ্তাহ থেকে ডিসেম্বরের ১ম সপ্তাহ) পর্যন্ত চারা লাগানোর উপযুক্ত সময়। তবে অগ্রহায়ণের মাঝামাঝি পর্যন্ত চারা লাগানো যায়। বিনা টমেটো-২ এবংবিনা টমেটো-৩ মার্চের প্রথম থেকে এপ্রিলের শেষ সপ্তাহ পর্যন্ত (ফাল্গুনের মাঝামাঝি থেকে চৈত্রের শেষ সপ্তাহ পর্যন্ত) চারা রোপন করা যায়। ২০-৩০ দিন বয়সের চারা জমিতে লাগাতে হয়। মার্চ-এপ্রিলের (ফাল্গুনের ২য় সপ্তাহ থেকে চৈত্রের ২য় সপ্তাহ) মধ্যে লাগালে ফলন বেশি হয়। এ জাত দুটি শীতকালে আগাম রোপণ করলে আগাম ফলন পাওয়া যায় এবং অধিক মূল্য পাওয়া যায়। তবে বিনা টমেটো-৩ জাতটি শীতকালে আগাম চাষের উপযোগী।
টমেটোর জাতঃ বিনার উদ্ভাবিত টমেটোর জাতসমূহ হচ্ছে-বাহার, বিনা টমেটো-২, বিনা টমেটো-৩, বিনা টমেটো-৪, বিনা টমেটো-৫, বিনা টমেটো-৬, বিনা টমেটো-৭, বিনা টমেটো-৮, বিনা টমেটো-৯, বিনা টমেটো-১০, বিনা টমেটো-১১, বিনা টমেটো-১২, বিনা টমেটো-১৩ (গ্রীষ্মকালীন জাত)
বারি টমেটোর উন্নত জাত হলোঃ বারি টমেটো-১৮,বারি টমেটো-১৯, বারি টমেটো-২০, বারি টমেটো-২১, বারি টমেটো-২২, বারি টমেটো-২৩, বারি হাইব্রিড টমেটো-১০, বারি হাইব্রিড টমেটো-১১
বীজ হারঃ প্রতি হেক্টরে ৪৫০০০টি, প্রতি একরে ১৮২০০টি এবং প্রতি বিঘার জন্য ৬০০০টি চারা প্রয়োজন হয়।
বীজ বপন পদ্ধতিঃ টমেটোর বীজতলা তৈরি করতে মাটি ঝুরঝুরা করে তৈরি করতে হয়। জমি চাষ সম্পন্ন হলে ১০-১৫ সে.মি উঁচু করে ১ মিটার চওড়া ও মাটি সমতল করে বেড তৈরি করতে হয়। সেচ দেওয়ার সুবিধার্থে দুটি বেডের মাঝে মানুষ চলাচলের জন্য নালা রাখতে হবে। বীজের মধ্যে অনেক সময় রোগ জীবাণু লুকিয়ে থাকে। যেমন-আরলি ব্লাইট, মোজাইক, উইল্ট ইত্যাদি রোগের জীবাণু। বীজ মাটিতে ফেলার পর পানি পেয়ে এসব রোগ জীবাণু সক্রিয় হয়ে ওঠে ফলে চারা মারা যায়। বীজতলার মাটিতে রোগ জীবাণু থাকে যেমন, ড্যাম্পিং অফ রোগের জীবাণু। এসব রোগ চারাকে আক্রমণ করতে পারে। তাই বীজতলার মাটিও শোধন করে নিলে ভাল হয়। বীজতলার মাটির উপর ৩-৪ সে.মি. ধানের খড়ের স্তর তৈরি করে পুড়িয়ে মাটি শোধন করা যায়। কয়েকটি পদ্ধতিতে বীজ শোধন করা যেতে পারে। ৫০ ডিগ্রী সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রায় ৩০ মিনিট বীজ ভিজিয়ে রাখলে বীজের গায়ের লেগে থাকা এবং ভিতরের রোগ জীবাণু মারা যায়। এরপর ভিজানো বীজ ছায়ায় শুকিয়ে বপন করতে হয়। এছাড়া প্রোভ্যাক্স ২ গ্রাম/কেজি হারে বীজের সাথে ভালভাবে মিশিয়েও বীজ শোধন করা যায়। রবি ও খরিফ মৌসুমে চারা তৈরির জন্য ২.৫-৩ কেজি/হেক্টরে বীজের প্রয়োজন হয়। শোধিত বীজ হাতের মুঠোয় নিয়ে সমানভাবে ছড়িয়ে বা লাইন করে বীজতলায় লাগাতে হয়। বীজ বপনের পরে মাটি দিয়ে বীজ ঢেকে দিতে হয়। মাটিতে আর্দ্রতা কম থাকলে বীজতলায় পানি ছিটিয়ে দিতে হবে। তবে অনেক ক্ষেত্রে টমেটোর বীজ বপন করার পর পিঁপড়ায় বীজ নিয়ে যায়, ফলে বীজের অংকুরোদগম কম হয়। তাই সতর্কতা স্বরুপ বীজতলায় সেভিন বা গুঁড়া জাতীয় কীটনাশক ছিটিয়ে দিলে ঝুঁকি থাকে না।
রোপণ পদ্ধতিঃ জমিতে ৩-৪ সপ্তাহ বয়সের চারা লাগাতে হয়। চারা লাগানোর সংগে সংগে চারায় পানি দিতে হয়। সারি হতে সারির দূরত্ব ৫০ সে.মি. এবং গাছ হতে গাছের দূরত্ব ৫০সে.মি.।
আন্তঃপরিচর্যাঃ প্রয়োজনবোধে জমির অবস্থা বুঝে হালকাভাবে ঝরণা দিয়ে গাছে পানি দিতে হবে। চারা লাগানোর পরে জমিতে আগাছা দেখা দিলে নিড়ানী দিয়ে জমির মাটি ঝুরঝুরে করে দিতে হবে এবং হালকাভাবে আগাছাগুলো পরিস্কার করে ফেলতে হবে।
পলিথিন ছাউনিঃ গ্রীষ্মকাল বিশেষ করে ভরা মৌসুমে লাগানো চারার স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও পরবর্তীতে ভাল ফলনের জন্য অতিরিক্ত রোদ ও বৃষ্টির হাত থেকে বাঁচানোর জন্য নৌকার ছৈ এর আকৃতি করে স্বচ্ছ পলিথিন দিয়ে ছাউনি দিতে হবে।
বীজ সংগ্রহ এবং সংরক্ষণঃ ডাসা ডাসা পাকা ফল প্রথমে তুলতে হবে। এ পাকা ফলগুলি ঘরে ২-৩ দিন রাখতে হবে যাতে ফলগুলি নরম হয়। এর ফলে বীজ সংগ্রহ করতে সুবিধা হয়। ফলগুলো নরম হলে দু’ভাগে কেটে বীজ গুলি ১টি শুকনো কাঁচের অথবা প্লাষ্টিক পাত্রে ২৪ হতে ৪৮ ঘন্টা রেখে দিতে হবে। এরপর বীজগুলি পরিস্কার পানি দিয়ে ভালমত ধুয়ে মশারি নেটের সাহায্যে সংগ্রহ করতে হবে। সংগৃহীত বীজগুলি ভাল করে রোদে শুকিয়ে কাঁচ বা প্লাষ্টিকের পাত্রে মুখ ভালভাবে বন্ধ করে সংরক্ষণ করতে হবে।